Published : 13 Jun 2026, 09:32 PM
গণভোটের রায় মেনে সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, জনরায় উপেক্ষা করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না।
তিনি বলেন, গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশ ও জনগণের ক্ষতি করলে সরকারকে বেশি দিন ‘সময় দেওয়া হবে না’।
শনিবার চট্টগ্রামে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশে দলটির আমির এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। কীভাবে সংস্কার বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও তার মিত্র দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির তীব্র মতবিরোধ থাকায় শেষ পর্যন্ত তা গণভোটে দেওয়া হয়।
গেল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও হয়। গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে ৬৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ ভোট পড়ে।
জুলাই সনদ অনুযায়ী গণভোটের রায় কার্যকর করার জন্য যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল তা থেমে যায় বিএনপির আগ্রহ না থাকায়।
নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও তার জোটের শরিক দলের বিজয়ীরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু বিএনপির সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্যের শপথ নেন।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে বিরোধী জোট আগেই মাঠে নেমেছে। তারই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামে তারা সমাবেশ করল।
সে সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, “দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে আপনারা অপমান অগ্রাহ্য করছেন। জনগণ বসে বসে আঙ্গুল চুষবে না। রায় দিয়েছে জনগণ, মানতে হবে সরকারকে। যে সরকার জনরায় মানে না, সে সরকার জনগণের সরকার হতে পারে না।”
জনরায় উপেক্ষা করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না বলেও হুঁশিয়ার করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, “জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করা গণতন্ত্রের চেতনার পরিপন্থি। জনগণ তাদের ভোটাধিকার ও গণরায়ের যথাযথ প্রতিফলন দেখতে চায়। সরকার যদি জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণই তার জবাব দেবে।”
তিনি বলেন, “আমাদের পরিষ্কার কথা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি না করেন তাহলে যেভাবে ৯৬ সালে নিজেরাই শেষ পর্যন্ত কেয়ারটেকার সরকারের বিল নিজেরা পাস করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই রেফারেন্ডামও বাস্তবায়ন করতে আপনারা বাধ্য হবেন।
“ভালোয় ভালোয় মেনে নিন। জনগণকে রাজপথে ঠেলে দিবেন না। আমরা শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ধারায় থাকতে চাই। আমাদেরকে হুমকি ধামকি দিবেন না। জেলের ভয় দেখানো হয়। ফাঁসিকে যারা তুচ্ছ মনে করে তাদেরকে জেলের ভয় দেখাবেন না।”
দেশ এবং জনগণের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা চাই না একটার পর একটা গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশ এবং জনগণের ক্ষতি আপনারা করুন। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, আমরা দীর্ঘকাল বসে বসে আপনাদেরকে এই সুযোগ দেব না। সুযোগের সময় খুবই সীমিত। সময় ফুরিয়ে আসছে।
“এই সময়ের ভিতরে যদি পরিবর্তন হয়ে যান আপনাদেরকে অভিনন্দন জানাব। যদি পরিবর্তন না হন, তাহলে আপনাদেরকে আপনাদের পরিণতি গোনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”
তিনি বলেন, “দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে যোগ্য, সৎ ও দেশপ্রেমিক লোকদের মূল্যায়ন না করে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন এবং দলীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে।
“সংসদে জনগণের সমস্যা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে গেলেও নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ সংসদ জনগণের কথা বলার জায়গা।”
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বিদেশি শক্তির কাছে ইজারা দেওয়া হবে না। দেশের ১৮ কোটি মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে এই দেশকে রক্ষা করবে। আমরা জাতির সঙ্গে বেঈমানি করব না, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত আছি।”
চট্টগ্রাম নগরীর লালদিঘী মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবির পাশাপাশি জনদুর্ভোগ নিরসন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি তোলা হয়।

সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, “সরকার ঘোষিত বাজেট সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জনগণ চরম দুর্ভোগে রয়েছে। অথচ বাজেটে এসব সংকট মোকাবিলায় কার্যকর কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
“মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে জনগণের জীবনে যে দুর্ভোগ নেমে এসেছে, তা দেশের মানুষকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। সরকার জনগণের কষ্ট উপলব্ধি না করে সমালোচনাকে উপহাসের চোখে দেখছে। বাস্তবতা হল, দেশের অর্থনীতি ও জনজীবন আজ গভীর চাপের মধ্যে রয়েছে।”
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী অলি আহমদ বলেন, “দেশের সার্বিক পরিস্থিতি জনগণকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সামাজিক অস্থিরতা এবং জননিরাপত্তার সংকট সাধারণ মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
“নারীরা ঘরের বাইরে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছে, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বিরাজ করছে।”
সীমান্তে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনা অব্যাহত থাকলেও সরকারকে আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষায় শক্তিশালী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের বিকল্প নেই।”
সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির সাখাওয়াত হোসাইন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি-বিডিপির চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চান ও আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও চট্টগ্রাম অঞ্চল টিম পরিচালক মুহাম্মদ শাহজাহান।