পাঠ্যপুস্তকে নকলের অভিযোগ, প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি এবং একজন জাফর ইকবাল

অপরিণামদর্শী লেখকের ভুলের দায় সম্পাদক হিসেবে নিজের কাঁধে নিয়ে অধ্যাপক জাফর ইকবাল মহত্বের পরিচয় দিয়েছেন এবং দায়িত্বহীনতা ও খামখেয়ালের লীলাভূমি এই বঙ্গদেশে ভুল স্বীকারের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

শিশির ভট্টাচার্য্যশিশির ভট্টাচার্য্য
Published : 24 Jan 2023, 02:18 PM
Updated : 24 Jan 2023, 02:18 PM

বায়োপসির রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়ে দুরারোগ্য রোগে ভোগা এক রোগী জানতে চাইলেন, ‘ডাক্তার সাহেব, আমার আসলে কী হয়েছে, বলুন তো!’ ডাক্তার জবাব দিলেন, ‘আপনার আসলে কী হয়েছে, সেটা জানা যাবে অটোপসির পর। বায়োপসি দিয়ে সব জানা যায় না।’

১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফলের মতো একাধিক বায়োপসি রিপোর্টের ভিত্তিতে বাংলাদেশে তিনটি জনখণ্ড আছে বলে দাবি করা যেতে পারে; ১) আওয়ামী লীগপন্থী, ২) আওয়ামী লীগ-বিরোধী এবং ৩) আপাত-নিরপেক্ষ যারা কখনও প্রথম, কখনও দ্বিতীয় জনখণ্ডের সঙ্গে গিয়ে জুড়ে যায়। বাংলাদেশে নির্বাচন যদি কখনও শতভাগ নিরপেক্ষ হয়, তবে এই তিন জনখণ্ডের প্রকৃত ভোটার-সংখ্যা দিয়ে উপরোক্ত দাবিটিকে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করা যেত। কিন্তু তেমন সৌভাগ্য আমার জীবৎকালে হবে বলে মনে হয় না।

সত্তরের দশকের শেষে সেনা-ছত্রছায়ায় জন্ম নেয়া জাতীয়তাবাদী দল দ্বিতীয় জনখণ্ডের প্রধান উপাদান। নিজেদের সুবিধা এবং স্বার্থ অনুসারে বামপন্থীরা কখনও প্রথম, কখনও দ্বিতীয় জনখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়, যে কারণে কখনোই তাদের পৃথক একটি জনখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। যেসব নেতা ও কর্মীরা আজ প্রথম খণ্ডে, কাল দ্বিতীয় খণ্ডে আনাগোনা করে থাকেন নিজের সুযোগ-সুবিধামতো, সেই সব দুদেল বান্দাদের আমি হিসাবের বাইরে রাখছি।

ধর্মপন্থী দলগুলো সাধারণত দ্বিতীয় জনখণ্ডের সঙ্গে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তবে ক্ষমতায় যাওয়া এবং থাকার প্রয়োজনে পঞ্চাশের দশকে জন্ম নেয়া আওয়ামী লীগ বিভিন্ন কৌশলে দ্বিতীয় খণ্ডের সঙ্গে তাদের জুড়ে যেতে বাধা দেয়। এটা অনেকটা স্বাভাবিক রাসায়নিক বিক্রিয়াকে বাধা দেবার মতো। লোহার ওপর রঙ লাগিয়ে যেমন অক্সিজেন পরমাণুর সর্বশেষ ইলেক্ট্রন বলয়ের সঙ্গে লোহার পরমাণুর সর্বশেষ ইলেক্ট্রন বলয়ের সংযোগে বাধা দেওয়া হয়, লোহায় যাতে মরিচা না পড়ে।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১– এই চব্বিশ বছর দ্বিতীয় জনখণ্ডের প্রতিনিধিরা পূর্ববঙ্গ বা বর্তমান বাংলাদেশ শাসন করেছিল। ১৯৭১ সালে এদের একটি অংশ রাজাকার-আলবদর হয়ে বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর অকথ্য হত্যা-নির্যাতন চালিয়েছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বা করিয়ে এরাই ক্ষমতা দখল করেছিল। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৫– এই ২০ বছর এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ এই ৫ বছর মিলিয়ে মোট ২৫ বছর ক্ষমতায় ছিল দ্বিতীয় জনখণ্ডের প্রতিনিধিরা। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ – এই ৪ বছর, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ – এই ৫ বছর এবং ২০০৮ থেকে ২০২২ এই ১৪ বছর মিলিয়ে কমবেশি ২৩ বছর ক্ষমতায় ছিল প্রথম জনখণ্ডের প্রতিনিধিরা।

দুটি জনখণ্ড সমপরিমাণে দুর্নীতিপরায়ন। ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উভয়েই সমান ব্যর্থ। এই সব বারোয়ারি ব্যর্থতার বাইরে দ্বিতীয় জনখণ্ডের প্রধান একটি সমস্যা হচ্ছে, তাদের মনের গহীনে রয়েছে ‘পাকিস্তান’ নামক এক ব্যর্থ রাষ্ট্রের সঙ্গে পুনর্মিলনের আকুতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মন থেকে মেনে নিতে না পারার অভিযোগে দ্বিতীয় জনখণ্ডের গ্রহণযোগ্যতা অতীতেও বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে।

প্রকৃতপক্ষে, ক্ষমতার স্বাদবদল ছাড়া জনগণকে দ্বিতীয় খণ্ড কখনও নতুন কিছু দিতে পেরেছে কিংবা ভবিষ্যতে দিতে পারবে বলে মনে হয় না। এই জনখণ্ডের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থা ইদানিং এতটাই কাহিল যে অগত্যা তাদের ‘কী নাকি’ এক ভট্টাচার্য্যরে শরণ নিতে হচ্ছে। দাদারা যে এখনও তেনাদের বিপদে কাজে লাগেন, এক ভট্টাচার্য্য এত দিন পরে হলেও সেটা প্রমাণ করতে পেরেছেন দেখে সমবংশীয় হিসেবে কিছুটা গর্ববোধও করছি না কি?

বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে প্রথম জনখণ্ডের অবদান। জন্মকাল থেকে প্রথম জনখণ্ড বা আওয়ামী রাজনীতির প্রধান চারটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: ১) বন্ধুকে সন্দেহ করা, ২) শত্রুকে বার বার সুযোগ দেওয়া, ৩) কী করা দরকার তা না জানা এবং ৪) যা করার দরকার নাই তা করা। এই চারটি বৈশিষ্ট্য প্রথম জনখণ্ড দীর্ঘদিন ঐক্যবদ্ধ না থাকা এবং একাধিকবার ক্ষমতাচ্যুত হবার অন্যতম কারণ।

প্রথম খণ্ডের কোনো অর্জনকেই দ্বিতীয় খণ্ড পারতপক্ষে সমর্থন দেয় না। যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা। কোনো ফিকিরে যদি প্রথম খণ্ডের অতি সামান্য একটি খুঁতও বের করা যায়, তবে দ্বিতীয় খণ্ড সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেমন যেন একটা জেহাদী জোশ যেন এসে যায় তাদের মনে, যে ধরনের আক্রমণাত্মক জোশ প্রথম খণ্ডের মনে কখনোই আসে না। এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ পাঠ্যপুস্তকে নকলের অভিযোগ। দেশের দুই সফল বিজ্ঞানীকে সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক লেখা ও সম্পাদনার ভার দেওয়া হয়েছিল। এত বড় মাপের ব্যক্তিকে পাঠ্যপুস্তক সম্পাদনার মতো অতি সাধারণ দায়িত্ব কেন দিতে হবে, সে প্রশ্নটা অবান্তর নয়। অনিন্দ্যসুন্দর প্রস্তর-ভাষ্কর্য দিয়ে কেন খামাখা মশারির পেরেক ঠুকতে হবে?

যেকোনো সরকারই শিক্ষার দায়িত্ব নিজের হাতে নেয়, জাতিকে শিক্ষিত করার প্রয়োজনে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি নিজের দৃষ্টিভঙ্গী অনুসারে শিশুদের ‘উচিৎ শিক্ষা’ দেবার উদ্দেশ্যে। বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, জাতিরাষ্ট্রের স্কুলে সেই ইতিহাসই পড়ানো হয়, সরকার যা পড়াতে চায়। যে ইতিহাস পড়ানো উচিত, সভ্য বা অসভ্য কোনো দেশেই তা পড়ানো হয় না। দেশের মনন ও রাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে সরকারকে শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হয়। যেমন ধরুন, বাংলাদেশে তৃতীয় শ্রেণি থেকে বিজ্ঞান এবং ধর্ম দুটি বিষয়ই পড়ানো হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। নিঃসন্দেহে ধর্ম ও বিজ্ঞান সাংঘর্ষিক, সবাই জানে, কিন্তু বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের পশ্চাদপদ মানসিকতা এবং দ্বিতীয় জনখণ্ডের ঝোপ বুঝে কোপ মারার প্রবৃত্তিকে হিসাবের মধ্যে নিলে, এই সাংর্ঘষিকতাকে মেনে নেওয়া ছাড়া প্রথম জনখণ্ডের সরকারের উপায়ান্তর নেই।

অনুসন্ধিৎসু হয়ে সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি বা জাশিপাব) ওয়েবসাইটটি খুলে দেখেছিলাম। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক, সব শ্রেণির সিলেবাস, বই, শিক্ষক-সহায়িকা দেওয়া আছে এই ওয়েবসাইটে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে থেকে যে কেউ যেকোনো একটি বই ডাউনলোড করে পড়ে নিতে পারে বাংলা কিংবা ইংরেজিতে। আছে মাদ্রাসা মাধ্যমের সব বই, আছে ই-লার্নিং এবং মাল্টিমিডিয়া ম্যানুয়াল। যার যেমন ইচ্ছা, যার যেমন প্রয়োজন, যার যেমন রুচি, সব ধরনের পাঠ্যবই এই ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।

২০১৭ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত পাঠ্যবইগুলোর যতগুলো ভার্সন বের হয়েছে, সবগুলো এই ওয়েবসাইটে আছে। পাঠ্যবইয়ের কালানুক্রমিক তুলনামূলক বিচার যদি কেউ করতে চায়, তাও সে করতে পারবে স্রেফ এই ওয়েবসাইটের সাহায্যে। পৃথিবীর আর কোনো দেশের টেক্সটবুক বোর্ড সর্বজনের ব্যবহারার্থে বিনামূল্যে এত শত পাঠ্যবই নিজেদের ওয়েবসাইটে দিয়ে রেখেছে কিনা আমার জানা নেই। শিক্ষাখাতে বাংলাদেশের এই বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগের সুফল ভবিষ্যতে অবশ্যই পাওয়া যাবে। জানি না কার আগ্রহে, প্রধানমন্ত্রীর নিজের, নাকি টেক্সটবুক বোর্ডের, কিছু কিছু বইয়ে, প্রধানমন্ত্রীর পায়রা ওড়ানো ছবি মুদ্রিত হয়েছে, যা আমার মতে, জননেত্রীর গৌরব কিছুমাত্র বৃদ্ধি করেনি।

জাশিপাবের ওয়েবসাইটটি একেবারেই দৃষ্টিনন্দন নয়, বাংলাদেশ সরকারের কোনো ওয়েবসাইটেরই অবশ্য এই প্রয়োজনীয় গুণটি নেই। ‘আগে তো দর্শনধারী, তারপর গুণবিচারি।’ সৌন্দর্য ছাড়া আর সব কিছু এই ওয়েবসাইটে আছে। ওয়েবসাইটটির স্বচ্ছতা বা ট্রান্সপারেন্সি প্রশংসা করার মতো। কয়টি টেবিল-চেয়ার আছে বোর্ডে, কীভাবে বোর্ড কেনাকাটা করে, বোর্ড কীভাবে চলে, সব তথ্য ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে। তথ্যগুলো সত্য কিনা, সে ভিন্ন প্রশ্ন। কোনো সন্দেহ নেই যে দীর্ঘদিনের এক সফল কর্মযজ্ঞের ফসল এই ওয়েবসাইট যার জন্যে জাশিপাব এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ দেওয়া যেতেই পারে।

বিশ্বাসীরা মনে করেন, ঈশ্বরই একমাত্র সর্বাঙ্গ সুন্দর। চন্দ্রেও কলঙ্ক থাকে। কিন্তু স্রেফ কলঙ্ক নিয়ে যারা পড়ে থাকে, ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভাঙা উছলে পড়া আলো’ উপভোগের সৌভাগ্য তাদের কখনোই হয় না। আরব লিপিকরেরা কোরআন নকল করার পর তাতে নাকি কলমের খানিকটা কালি ছিঁটিয়ে দিতেন, যাতে মনে এই গর্ব না আসে যে অনুলিপিটি শতভাগ নিখুঁত-নির্ভুলভাবে নকল করা হয়েছে। ভুল মানুষেরই হয় এবং কৃত ভুল স্বীকার করে নিলে মরণশীল মানুষের মহত্ব বৃদ্ধি পায় ছাড়া কমে না।

সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ের একটি অধ্যায়ের দুই এক প্যারা আন্তর্জালের অন্য এক ওয়েবসাইট থেকে অনুবাদ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ইংরেজি ভার্সনে এই অংশটুকু নাকি ভুলভাল ইংরেজিতে পুনর্লিখিত হয়েছে। ডজনখানেক বিজ্ঞান বই আছে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত। এর মধ্যে সম্ভবত দুটি বইয়ের সম্পাদক অধ্যাপক জাফর ইকবাল। প্রতিটি বইয়ের শুরুতেই লেখা আছে, ‘পরীক্ষামূলক সংস্করণ’ অর্থাৎ বইয়ে কোনো ভুল পাওয়া গেলে পরবর্তী সংস্করণে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। একটি বিজ্ঞান বইয়ে লেখকের নামের বানানে পর্যন্ত ভুল দেখেছি। এ নিয়ে কোনো কথা ওঠেনি, কারণ জাফর ইকবাল ওই বইটির সম্পাদক নন।

জাফর ইকবাল সম্পাদিত একটি পাঠ্যবই নিয়ে অভিযোগ করার সুবর্ণ সুযোগ যেহেতু মিলে গিয়েছে, দ্বিতীয় জনখণ্ডের লোকজন এই সুযোগ হেলায় হারাতে চাননি। অন্তর্জালে ইচ্ছামতো গালাগালি করা হচ্ছে জাফর ইকবাল এবং তার চৌদ্দপুরুষকে। বলা হচ্ছে, তিনি নিজেই নাকি এক নকলবাজ– তার এবং তার মরহুম ভাই হুমায়ূন আহমেদের লেখায় কোনো সারবত্তা নেই, আরও কত কি। গালাগালির উত্তরে কেউ যখন লিখছেন, ‘তুমিই লিখো না কেন একটি কবিতা!’, তখন যে প্রতিউত্তর আসছে তা অনেকটা এরকম, ‘আমি যা লিখেছি, দুই ভাই তার ধারে কাছেও আসতে পারবে না!’ একাধারে হাস্যকর ও দুঃখজনক এই ডিজিটাল কলতলার কাজিয়া।

‘তোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, তুই আমাদেরই লোক!’ দ্বিতীয় জনখণ্ডের লোকজনের বিচারে জাফর ইকবাল তাদের লোক নন। তাকে এখনও তারা টেনেহিঁচড়ে নিজেদের কাতারে নামাতে পারেনি। এদের একটি উপগোষ্ঠী অতীতে তাকে ‘মুরতাদ’ ঘোষণা করেছিল। প্রথম জনখণ্ডের খাঁটি সমর্থক না হলেও জাফর ইকবালের মনমানসিকতার সঙ্গে প্রথম খণ্ডের লোকজনের মনমানসিকতার অধিকতর মিল আছে বটে। মাও সে তুং-এর মতে শত্রুর শত্রু যদি বন্ধু হয়, তবে শত্রুর বন্ধু শত্রু হওয়া অবশ্যম্ভাবী। জাফর ইকবালকে আক্রমণ করে দ্বিতীয় জনখণ্ড মূলত ক্ষমতায় থাকা প্রথম জনখণ্ডের সরকারকেই আক্রমণ করছে।

জাফর ইকবালকে নিয়ে আমি দুটি ‘পান’ বা শব্দরঙ্গ তৈরি করেছিলাম, ‘যা ফর ইকবাল, তা নট ফর এভরিবডি’ এবং ‘যা ফর ইকবাল, পরে মজা বুঝবি’। পান দুটি আমি তাকে শুনিয়েছিলাম শান্তিনিকেতনে। শুনে তিনি মুচকি হেসেছিলেন। ভদ্রলোক আর কাকে বলে! বিজ্ঞানী, বিজ্ঞান-লেখক, শিশুসাহিত্যিক, সুলেখক, সমাজচিন্তক, শিক্ষাবিদ ইত্যাদি গুণের সমন্বয়ে জাফর ইকবাল বাংলাদেশে এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব। সমালোচনা সহ্য করার মতো ভদ্রতা ও ঔদার্য ওনার চরিত্রে আছে। ওনার যা করার ক্ষমতা আছে, তা অন্য যে কেউ বা ‘এভরিবডি’-এর নেই। আমি যে এখানে তার পক্ষে দুই-একটি কথা লিখছি, সেই অপরাধে আমাকেও নিশ্চয়ই কোনো সুযোগে ‘মজা বোঝানো’ হবে।

সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ের আলোচ্য অংশটি নেওয়া হয়েছে অন্তর্জালের এক মুক্ত উৎস থেকে। মুক্ত উৎস যেহেতু, টেক্সটটি সেখান থেকে নিতে আইনগত বাধা নেই, তবে ঋণস্বীকার করলে ভালো হয়। স্কুলপাঠ্য বইয়ে ঋণস্বীকার করা হবে কি হবে না, সেটা টেক্সটবুক বোর্ডের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। জাফর ইকবাল এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, টেক্সট বইয়ে ঋণ স্বীকারের সুযোগ নেই। তিনি এটাও বলেছেন, আলোচ্য দুই প্যারার টেক্সটের বক্তব্য এতটাই সাধারণ যে কোনো ওয়েবসাইট থেকে সেটা টুকলি করার কোনো প্রয়োজনই ছিল না।

নকলের অভিযোগ যখন উঠেছে, দুই বিজ্ঞানী-সম্পাদক, আমার ধারণা, সরকারের অনুরোধে যারা সম্পাদনার ঢেঁকি গিলতে বাধ্য হয়েছিলেন, প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে নিজেদের ভুল তারা স্বীকার করে নিয়েছেন। ভুল স্বীকারের বিবৃতিতে সম্পাদকদ্বয়ের আরও দুটি ভুল হয়েছে। বিবৃতিতে তারা বলেছেন, ‘আমরা লিখিনি, তবে সম্পাদক হিসেবে দায় আমাদের ওপর বর্তায়!’ এই বাক্যের দুটি প্রস্তাব বা ক্লজই হাস্যকর। লেখক হিসেবে আপনার নাম আছে বইয়ে, আপনি লেখেননি মানে? আপনি সম্পাদক, আপনার উপর দায় বর্তাবে না কি শিক্ষামন্ত্রীর ওপর বর্তাবে?

১৯৭৮ সাল থেকে গত প্রায় ৪৫ বছর আমি প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত। এই অভিজ্ঞতার আলোকে আমার মাথায় ঢুকছে না, নকল রচনা নিয়ে কিংবা লেখকের নামের ভুল বানানসহ মুদ্রিত হয়ে একটি বই কীভাবে শিশুদের হাতে পৌঁছে যেতে পারে? বই তো রাতারাতি লেখাও হয় না, ছাপাও হয় না। এর পেছনে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া থাকে। হ্যাঁ, এখানে ওখানে দুই-একটা বানান ভুল তো হতেই পারে। দুটি মাত্র চোখে দেখায় ভুল হতে পারে, কিন্তু একটি পাঠ্যবই যেহেতু মুদ্রণকালীন কমপক্ষে বিশজোড়া চোখে নিরীক্ষিত হয়ে যাওয়ার কথা, যাওয়া উচিত, সেহেতু সাধারণত ভুল হবার কথা নয়।

শিশু-কিশোরদের ওপর পাঠ্যবইয়ে ছাপার ভুলের প্রভাব মারাত্মক। আমার নিজের কৈশোরে, ১৯৭৩-৭৪ সালে, মাধ্যমিকের নিচের দিকের কোনো এক শ্রেণির সাহিত্যের পাঠ্যবইতে ছাপা হয়েছিল ‘ইউপোকার আত্মকথা’। ইংরেজি বইয়ে ‘ওয়াইফ’ শব্দের অর্থ ছাপা হয়েছিল ‘পেত্নি’। যেহেতু শৈশবে-কৈশোরে আমরা প্রমিত বাংলা বলতাম না, চট্টগ্রামের উপভাষা বলতাম, আমার বন্ধু বাবুনকে কোনোমতেই বোঝানো যায়নি যে শব্দ দুটি যথাক্রমে ‘উইপোকা’ এবং ‘পত্নী’। তার বক্তব্য ছিল, স্কুলের বইয়ে বানান-ভুল থাকতেই পারে না। তার যুক্তি আমাদের কাছে অকাট্যই মনে হতো, অত বড় বড় সব পণ্ডিতেরা কি ভুল লিখতে পারেন কখনও?

শিশুখাদ্যে ভেজাল আমাদের দেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। এবার ভেজাল হলো শিশুপাঠ্যে। পাঠ্য বইয়ে নকলের অপরাধ যারা করেছেন, তারা হেঁজিপেঁজি কেউ নন। দেশ ও বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী ব্যক্তিই তারা হবেন। পণ্ডিতেরা নকল করেছেন, এই নকল ধরার দায়িত্ব ছিল দুই সম্পাদকের। হয়তো লেখক/লেখকদের উপর পূর্ণ বিশ্বাস ছিল সম্পাদকদের। যে কারণে দায়িত্বটি ঠিকভাবে পালিত হয়নি, না লেখার, না সম্পাদনার, সেই কারণটা কী, জানতে ইচ্ছে করে, কিন্তু অটোপসির আগে রোগের প্রকৃত কারণ জানার সৌভাগ্য নিয়ে আমরা. মরণশীল বাঙালিরা জন্মগ্রহণ করিনি।

৭ম শ্রেণির বিজ্ঞান বই পুরোটা আমি পড়েছি! চমত্কার বই, আমাদের ছোটবেলার চেয়ে অনেক বেশি ভালো! সুন্দর ভাষা, বিজ্ঞান তো আছেই, সাথে আরও এমন অনেক তথ্য আছে যা শিশুদের বিশ্বনাগরিক করে গড়ে তুলবে! সম্ভবত মাদ্রাসাতেও এই বই পড়ানো হচ্ছে! মাদ্রাসার ছাত্ররাও সেই বিজ্ঞানই শিখবে, যে বিজ্ঞান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিখছে! আমি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় একই পর্যায়ের বিজ্ঞানের বই দেখেছি ফ্রান্স ও কানাডায়! এই বই সে সব বইয়ের চেয়ে ভালো ছাড়া খারাপ নয়!

তবে বইয়ের শেষে যে ছবিটা দেয়া হয়েছে, সে রকম ছবি আমার ছোটবেলায় বিজ্ঞান বইয়ে ছিল না, বিদেশি বইয়েও কখনও দেখিনি! পাঠ্যবইয়ে শাসকের পরিবারের ছবি কেন থাকবে? দ্বিতীয় জনখণ্ডের জিয়াউর রহমান, এরশাদ, কিংবা খালেদা জিয়া শাসক হিসেবে এত ভালো ছিলেন না হয়তো, কিন্তু তারা কিংবা তাদের পুত্রকন্যার ছবি পাঠ্যবইয়ে ছাপা হতো না! ৭ম শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ের মূল সমস্যা ওয়েবসাইট থেকে নকলও নয়, জাফর ইকবালও নয়! হায়! কী নিয়ে প্রতিবাদ করতে হবে, তাই জানে না বাংলাদেশের ‘নটিজন ফেসবোকারা’! দিন যায়, ছবি থাকে! বইয়ে এই ছবি যখন মেনে নিতে হচ্ছিল, তখন সম্পাদক জাফর ইকবালের কানে হয়তো হৈমন্তী শুক্লার গাওয়া সেই গানটি বাজছিল: ‘আমার বলার কিছু ছিল না, চেয়ে চেয়ে দেখলাম...’

বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই পাঠ্য বই সরকারি উদ্যোগে লিখিত-মুদ্রিত হয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে বিনামূল্যে পৌঁছে যাচ্ছে গত সম্ভবত প্রায় এক দশক ধরে। আমার দৃষ্টিতে এটা খুব বড় একটা অর্জন। আওয়ামী লীগ বিরোধীরা কখনও ভুলেও কি সরকারের এই সাফল্যটুকু মেনে নিয়েছেন, প্রশংসা করেছেন কি কখনও? জাশিপাব এত বড় একটা কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে, বহু শত লোক যার সঙ্গে যুক্ত, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কারও না কারও ভুল তো হতেই পারে। প্রকাশনায় ভুল কি নতুন কোনো ঘটনা। নিজের লেখা বাংলা ভাষার ব্যাকরণের পঞ্চম সংস্করণেও ডক্টর শহীদুল্লাহ লিখেছেন, ‘এই বারও মুদ্রণ-রাক্ষসের হাত হইতে মুক্তি পাইলাম না!’, অর্থাৎ পাঁচ পাঁচবার সুযোগ পেয়েও শহীদুল্লাহর মতো চৌকশ সম্পাদক-লেখকও সব ভুল সংশোধন করতে সক্ষম হননি।

ভুল যত ক্ষুদ্রই হোক, নিজের ভুলটুকু স্বীকার করে কিংবা তালকানা, অপরিণামদর্শী লেখকের ভুলের দায় সম্পাদক হিসেবে নিজের কাঁধে নিয়ে অধ্যাপক জাফর ইকবাল মহত্বের পরিচয় দিয়েছেন এবং দায়িত্বহীনতা ও খামখেয়ালের লীলাভূমি এই বঙ্গদেশে ভুল স্বীকারের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যিনি বা যারা এই ভুলের প্রতি জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, তারাও প্রশংসার দাবিদার বৈকি। কিন্তু একজন মান্য ব্যক্তির সামান্য একটি ভুলের কারণে চায়ের কাপে ঝড় তুলে জল ঘোলা করার চেষ্টা যারা করছেন, তারা কী হাসিল করতে চাইছেন?

সরকারের ভুল হলে অবশ্যই ভুল ধরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু সরকারের কোনো কাজ যদি প্রশংসনীয় হয়, তবে সেটা স্বীকার করতে সমস্যা কোথায়? জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি ভালো কিছু করে থাকে, তবে তার প্রশংসা করার মতো উদারতা কেন আমাদের থাকবে না? সরকার হোক কিংবা জাফর ইকবাল, যারে দেখতে নারি, তার সব চলনই কেন বাঁকা হতে হবে? নৈব্যক্তিক ও গঠনমূলক হবার পরিবর্তে সমালোচনা যদি কেবল রাজনীতি এবং হীন স্বার্থ দ্বারা তাড়িত হয়, তবে তাকে সুস্থ সমালোচনা বলা যায় না এবং এমন সমালোচনা কোনো শুভফল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক