তৌফিক ইমরোজ খালিদী: ডিজিটাল সংবাদপত্রের পথিকৃৎ
প্রচলিত সংবাদের বাঁধাধরা ধারা ভেঙে দেশের প্রথম ২৪/৭ অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সূচনা করেছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ক্ষমতার কাছে মাথা নত না করা পথিকৃৎ এই সম্পাদকের জীবন ও কাজের নীতি নিয়ে লিখেছেন নাদিম মাহমুদ।
১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের পুনর্নির্বাচন কমিটির (সিআরপি) তহবিলসংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের বব উডওয়ার্ড ও কার্ল বার্নস্টিন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিলেন। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির সেই প্রতিবেদনটির বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা’ তথ্য দেওয়ার অভিযোগ তোলে হোয়াইট হাউজ। ক্ষমা চেয়ে সংশোধনী দেওয়ার চাপ দেওয়া হয়। প্রতিবেদকরাও কিছুটা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তবে সীমাহীন চাপের মুখেও পত্রিকাটির সম্পাদক বেন ব্র্যাডলি ‘নিজেদের প্রকাশিত’ খবরে আস্থা রাখেন; কোনো ধরনের সংশোধনী প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
প্রতিবেদকদের প্রতি আস্থা রাখার ফলস্বরূপ পরবর্তীতে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ওয়াশিংটন পোস্ট। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পরও নিক্সনের ভবিষ্যৎ আর সুখকর হয়নি। বেন ব্র্যাডলির মেরুদণ্ড সোজা থাকার কারণেই ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ প্রমাণ করতে পেরেছিল ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে জড়িতরা ‘অল দ্য প্রেসিডেন্টস ম্যান’। একজন সম্পাদক প্রতিবেদকদের পেছনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়েছিলেন বলেই দিন শেষে একজন প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। ক্ষমতা হারিয়েছিলেন নিক্সন।
বেন ব্র্যাডলি, হোরেস গ্ৰিলি কিংবা রোসেনথালদের মতো সম্পাদকরা কীভাবে সংবাদপত্রের মৌলিক রূপায়ণে কাজ করেছেন, প্রতিবেদকদের আস্থায় রেখে পত্রিকাকে এগিয়ে নিয়েছেন, তা গণযোগাযোগের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে পাঠ নিতে পারেন। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে অনেক সম্পাদক এলেও, গতানুগতিক সম্পাদনারীতির বাইরে কেউই খুব একটা যেতে পারেননি। মূলত একই ধারার প্রতিবেদন বছরের পর বছর ধরে চলে এসেছে। সংবাদপত্রগুলো কখনো রাষ্ট্রযন্ত্রের থাবা, আবার কখনো ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারেনি। কেউ বেন ব্র্যাডলিদের মতো ‘সংবাদপত্রের’ মৌলিক রূপান্তরে এগিয়ে আসেননি।
সংবাদপত্রের দীর্ঘদিনের সেই কৌশলে ফাটল ধরিয়ে জন্ম নিয়েছিল ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’। সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে দুই দশক আগে ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম যখন যাত্রা শুরু করেছিল, তখন কেউ ভাবতে পারেনি ডটকম সংবাদসেবা এত দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। দেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে ২৪/৭ ‘সংবাদসেবার’ যে যুগান্তকারী সূচনা, তা তৌফিক ইমরোজ খালিদীর হাত ধরেই হয়েছিল।
যদিও তৌফিক ইমরোজ খালিদীর হাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নতুন রূপ নেওয়ার আগে অন্য এক বর্ষীয়ান সাংবাদিক আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে ‘বিডিনিউজ’ প্রচলিত বার্তা সংস্থার মতো কাজ করত। মূলত পত্রিকা ও টেলিভিশনের জন্য একটি সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক সংবাদসেবা প্রদান করে আসত তারা। কিন্তু বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস থেকে ফিরে ৩৯ বছর বয়সী তৌফিক ইমরোজ খালিদী ‘বিডিনিউজ’কে স্বতন্ত্র মালিকানায় এনে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার, ভিন্ন স্বাদের এক নতুন মাত্রার সংবাদ মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলেন।
আজ আমাদের মাঝে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী আর নেই। কিন্তু দেশে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ধারণার অন্যতম এই স্বপ্নদ্রষ্টা দেশের সংবাদপত্র শিল্পে যে লিগ্যাসি রেখে গেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে আমরা দেশের অনলাইন সংবাদপত্রের জনক কিংবা পথিকৃৎ বলছি। কেন তিনি এই বিশেষণের জন্য উপযুক্ত, তা বোঝার জন্য অবশ্যই আমাদের কিছু বিষয় আলোচনা করতেই হবে।
শুরুতে প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলো বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের বিষয়ে নাক শিটকালেও, অল্পদিনের মধ্যেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম পুরোনো সেকেলে ধাঁচের সংবাদ উপস্থাপনের ভঙ্গিমায় কুঠারাঘাত করে। যখনকার ঘটনা, তখনই উঠে আসে ওয়েবসাইটে, পৌঁছে যায় পাঠকদের কাছে। বাসি খবরের পরিবর্তে পাঠকরা পায় টাটকা খবর।
ইন্টারনেট প্রযুক্তির উন্মেষ ও তথ্যের প্রাচুর্যের মধ্যে সত্যটা জানানোর যে অঙ্গীকার তৌফিক ইমরোজ খালিদী নিয়েছিলেন, সেই পথ ধরে হাঁটছে আজকের হাজারো দেশি নিউজ পোর্টাল ও প্রতিষ্ঠিত সব গণমাধ্যম।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর ভাষায়, “আমরা রূপান্তরিত হলাম ২৪ ঘণ্টার, সবার জন্য উন্মুক্ত একটি সংবাদমাধ্যমে, যেখানে বাংলাদেশের প্রত্যেক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বিনামূল্যে খবর পড়তে পারেন। সেই মুহূর্তে আমরা যে শুধু ব্যবসার ধরন পাল্টে ফেললাম, তা নয়; আমাদের নিয়তিও বদলে গেল। সীমিত গ্রাহককে সেবা দেওয়ার বদলে আমরা পৌঁছে গেলাম বৃহৎ জনপরিসরে। দেশের প্রথম অনলাইন সংবাদপত্র হয়ে উঠলাম আমরা। আমাদের বিশ্বাস, পুরো বিশ্বেও এই ধরনের প্রথম সংবাদমাধ্যমগুলোর একটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। এ পথ সহজ ছিল না। আমাদের প্রতিনিয়ত উদ্ভাবন করে যেতে হয়েছে। ধরে রাখতে হয়েছে নির্ভুলতা, নিরপেক্ষতা আর স্বাধীনতার নীতি। ভ্রান্তিময় এক যুগে আমরা চেষ্টা করেছি আপনার কাছে আস্থা আর স্পষ্টতার প্রতীক হয়ে উঠতে।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এই সম্পাদক বুঝতে পেরেছিলেন, “সূত্র বলছে” বা “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক” ব্যবহার করে পাঠকদের মনে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই তিনি শুরু করেছিলেন উদ্ধৃতি ও তথ্যসূত্রভিত্তিক সাংবাদিকতা। সংবাদের প্রয়োজনে জড়িতদের সরাসরি উদ্ধৃতিই সংবাদের প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে। অস্পষ্টতা এড়িয়ে নামসহ উদ্ধৃতি ব্যবহার করে সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল তার এই অনন্য সম্পাদকীয় নীতি।
যদিও শুরুতে অন্যান্য সংবাদমাধ্যম এই বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেনি, কিন্তু বিডিনিউজের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে তারাও সময় নেয়নি। দ্য ডেইলি স্টার ও বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজের অভিজ্ঞতায় তৌফিক ইমরোজ খালিদী কাজে লাগিয়েছিলেন নির্ভুল সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠায়। দেশের পাঠকরা প্রায় দুই দশক ধরে বিডিনিউজের সংবাদকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেন মূলত এই সব বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভুল সংবাদ উপস্থাপনের কারণে।
তাৎক্ষণিক খবর জানাতে চালু করেন মোবাইল এসএমএস সেবা, যাতে করে পাঠকরা ইন্টারনেট ব্যবহার না করলেও ঘরের বাইরে থাকার সময় নিজেদের তথ্য হালনাগাদ রাখতে পারেন এবং বাসে-ট্রেনে বসেই দেশের কোনো প্রান্তে কী ঘটছে তা জানতে পারেন।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী জানতেন, শিশুরা খুব শিগগির ইন্টারনেটভিত্তিক গ্যাজেট ব্যবহারে অভ্যস্ত হবে। তাই তাদেরকে নিয়েও স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছিল তার। শিশুদের মানসিক বিকাশ ও চাহিদার কথা ভেবে তিনি চালু করেন ‘কিডজ’। ভবিষ্যৎ সংবাদকর্মী তৈরি করতে স্কুল-কলেজের শিশুদেরই সংবাদবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ‘হ্যালো ডটকম’ পাতায় প্রতিবেদন করে শিশুরা, শিশুদের দ্বারাই পরিচালিত হয় সেটি। আজ সেখান থেকে তৈরি হচ্ছেন অনেক পেশাদার সাংবাদিক, যার মূল স্বপ্নদ্রষ্টা অবশ্যই তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
একটি সংবাদমাধ্যমের জন্য কেমন সম্পাদক প্রয়োজন, তা বুঝতে হলে তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে জানতে হবে। বিশেষ করে রাষ্ট্র ও প্রভাবশালীদের চাপের মুখে যারা নিজেদের প্রকাশিত সংবাদের পাশে দাঁড়াতে পারেন না, তাদের জন্য তৌফিক ইমরোজ খালিদী এক অনুপ্রেরণার নাম।
মাঠপর্যায় থেকে সাংবাদিকতা শুরু করে ধাপে ধাপে সম্পাদক হয়ে ওঠা মানুষ আমাদের দেশে হাতে গোনা। সেই তালিকায় অবধারিতভাবে থাকবে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নাম, যার গোটা জীবন কেটেছে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চায়। স্বচ্ছ ভাবমূর্তির এই মানুষটি রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রভাবমুক্ত সাংবাদিকতার পক্ষে সব সময় ছিলেন সোচ্চার।
২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যখন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামকে দেশজুড়ে একের পর এক মামলায় হয়রানি করা হচ্ছিল, তখন তিনি লিখেছিলেন “মাহফুজ আনামকে হয়রানি বন্ধ করুন” শিরোনামে একটি অভিমত। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, এর পেছনে সরকারের হাত থাকার অভিযোগ সত্যি হলে আমরা বলব, এসব থামান। তিনি লিখেছিলেন, আমরা সবাই যদি সোসাইটি অব প্রফেশনাল জার্নালিস্টসের নীতিমালা মেনে চলি এবং গণমাধ্যমের অনিয়মের বিষয়েও ওয়াচডগের ভূমিকা নিই, তাহলে আমাদের প্রিয় এই কর্মক্ষেত্র আরও ভালো জায়গা হয়ে উঠতে পারে। শেষে বলেছিলেন, আমরা মাহফুজ আনামের পাশে আছি।
সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের মূল্য কতটা চড়া হতে পারে, তার বহু উদাহরণ তার জীবনেই রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অটল এই সংবাদমাধ্যমটিই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিডিনিউজ প্রকাশিত সংবাদ কখনো সরিয়ে নেয় না। এ কারণেই পুরোনো সংবাদের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে এই পোর্টালটি পরিচিত। দেশের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পুরোনো সংবাদ সরিয়ে নিতে চাপ দিয়েছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, আদালত থেকে তারা খালাস পেয়েছেন, অথচ পুরোনো সংবাদের কারণে ভিসা জটিলতায় পড়ছেন। কিন্তু বিডিনিউজের নীতি ছিল, প্রকাশিত কোনো সংবাদ সরানো হবে না। এ কথা জানানোর পর মাহফুজ আনামের মতোই দেশের নানা প্রান্তে তার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। তবু তৌফিক ইমরোজ খালিদী মাথা নত করেননি। নিজেদের সংবাদের পক্ষে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়েছিলেন, যা একজন সম্পাদকের নৈতিক অবস্থানেরই প্রকাশ।
২০১৮ সালের ২৫ জুন আজিজ আহমেদ সেনাপ্রধান হন। সেই সংবাদে তার পরিচয় স্পষ্ট করতে দণ্ডপ্রাপ্ত ভাইদের নাম উল্লেখ করায় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বিটিআরসিকে দিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল়। অনেক ভোগান্তির পর তা আবার খুলে দেওয়া হয়।
ওই সময় কিছু অলিগার্ক ও ক্ষমতালিপ্সু মানুষের চোখের বালি হয়ে ওঠে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ২০১৯ সালের ১০ জুন সংবাদমাধ্যমটি পূর্বাচলে ‘নিয়ম ভেঙে’ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের খবর প্রকাশ করে। এরপর থেকে নানাভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে চাপে রাখা হয়। সে বছরের ১৩ অক্টোবর নিউ ইয়র্কভিত্তিক একটি কোম্পানি বিডিনিউজে ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। সেই খবর প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশন তার বিরুদ্ধে ‘জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ’ অর্জনের অভিযোগ তোলে।
ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়ে তিনি লিখেছিলেন “শুধু সাংবাদিকতাই তো করেছিলাম।” সেখানে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, কিছু বিতর্কিত লোক, যাদের কাজ সব সময়ই প্রশ্নবিদ্ধ, তাদের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এতটা নগ্নভাবে ব্যবহার হতে তারা কখনো দেখতে চান না; বিশেষ করে যখন তারা এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার চেষ্টা করছেন, যা হবে মানুষের ভরসার জায়গা। লিখেছিলেন, বাস্তবিক অর্থেই তাদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, আইনের দ্বারস্থও হতে পারছেন না; আইনজীবীরা বলেছেন, সব যেখানে সাজানো, সেখানে চেষ্টা করাও বৃথা। প্রায় পাঁচ বছর আদালতে হয়রানির পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করা হয়।
রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ক্ষমতার দুষ্টচক্র যখন কোনো সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে বাধা দেয়, তখন তা মুক্ত গণমাধ্যমের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তৌফিক ইমরোজ খালিদী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের নীতিতে অটল ছিলেন। সেই অলিগার্কদের দাপটে বিডিনিউজ পড়েছিল আর্থিক টানাপোড়েনে, আর তিনি নিজে হয়েছিলেন শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
চব্বিশের ৫ অগাস্টের পর দেশজুড়ে যখন নানাস্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ও স্থাপত্যগুলো ভেঙে ফেলা হচ্ছিল, তখন তিনি বেশ সাহসিকতার সঙ্গে প্রকাশ করেন, ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের কোনো ঘাটতি তার মধ্যে ছিল না। তার ভাষায়, “আমরা নিরপেক্ষ নই, আমাদের প্রচণ্ড পক্ষপাতিত্ব আছে; একাত্তরের প্রতি, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি।”
মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এই পক্ষপাতিত্বের কারণে এই দেশের একটি গোষ্ঠীর চক্ষুশূল ছিলেন তিনি। অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে অবস্থানের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে বিডিনিউজ আতঙ্কের নাম। এজেন্ডাভিত্তিক সংবাদ উপস্থাপনের কৌশলকে ভেঙে ফেলতে বিডিনিউজ ছিল ব্যবসায়ী প্রতিপক্ষদের কাছে এক অদম্য প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম—যার সবকিছুই পরিচালিত হতো তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে।
তিনি গত বছর বিডিনিউজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ভাষণে বলেছেন, “৫ অগাস্ট-পরবর্তী অস্থির সময়ে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশংসা ছিল—বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে কিছুই বদলায়নি। দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যখন ব্যাপক এবং অনেক ক্ষেত্রে অযাচিত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে, আমাদের সম্পাদকীয় অবস্থান ছিল ঠিক আগের মতোই।”
আর সেই কারণেই, আজও মানুষের কাছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম মেরুদণ্ড সোজা করে থাকা সংবাদপত্র হিসেবে পরিচিত। অসীম সাহসী এই মানুষ কারও কাছে মাথা নত করেননি। ক্ষমতার কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেননি। দেশের মানুষের জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন যৌবনের সেরা সময়। আইন ও আদালতের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল।
দেশ, সমাজ, অর্থনীতি ও বিশ্ব নিয়ে গভীর জ্ঞানের অধিকারী এই মানুষটি ছিলেন এক জীবন্ত আর্কাইভ। ওয়াশিংটন পোস্টের বেনের মতোই তিনি প্রতিবেদকদের তথ্যের ওপর রাখতেন অগাধ আস্থা, দিতেন কাজের স্বাধীনতা।
সংবাদের শব্দপ্রয়োগে ছিলেন ভীষণ সচেতন ও সংবেদনশীল। সংবাদপত্রে অনেক রুচিশীল শব্দপ্রয়োগের পুরোধা ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের অনেক ব্যক্তির নাম ও প্রতিষ্ঠানের বাংলা নামের সঠিক প্রতিবর্ণীকরণ তিনি করে গিয়েছেন।
অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অবিচল এই মানুষটির অসময়ে চলে যাওয়া আমাদের সংবাদমাধ্যমের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হলো। জাতি হারাল একজন আপাদমস্তক নিউজমেকারকে—যার হাতে তৈরি হয়েছেন দেশের বহু সাংবাদিক, যার হাতে গড়ে উঠেছে রুচিশীল, বস্তুনিষ্ঠ ২৪ ঘণ্টার সংবাদসেবার ক্ষেত্র।
কিংবদন্তির মৃত্যু হয় না। তারা বেঁচে থাকেন নিজেদের সৃষ্টির মধ্যে। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর লিগ্যাসি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ধরে রাখবে। তিনি কখনো হারিয়ে যাবেন না। যখনই কেউ আধুনিক বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাস পড়বে, তখনই সামনে আসবে তৌফিক ইমরোজ খালিদী। অন্য ভুবনের মানুষ হয়েও তিনি আমাদের মাঝে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকবেন।
নাদিম মাহমুদ: গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: nadim.ru@gmail.com
