তৌফিক ভাইকে নিয়ে একটি নির্মোহ বিশ্লেষণের প্রয়াস
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের শুরু, বস্তুনিষ্ঠতার লড়াই এবং তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতা দর্শন নিয়ে কামরান রেজা চৌধুরীর স্মৃতিচারণ।
সিদ্ধান্ত নিয়েই একটু দেরি করে লিখতে বসেছি। গত ২ অক্টোবর লন্ডনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর আকস্মিক মৃত্যুর পর অনেকেই তার ব্যাপারে লিখেছেন। তার সম্পর্কে নিজেদের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন।
লেখাগুলোতে আবেগের পরিমাণ এত বেশি যে, সেগুলোর বেশ কিছু লেখা অনেকের কাছে স্তুতি মনে হতে পারে। ফলে সাংবাদিকতায় তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অবদান ঠিক কোন জায়গায়, সেটি অনেকের কাছে অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে আরেক দল সাংবাদিক ও সহকর্মী মৃত্যুর পরও তাকে অসম্মানিত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। এক সাবেক সাংবাদিক লিখেছেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদী মৃত্যুবরণ করেছেন—সেটি ভালোই হয়েছে। এই জাতীয় মন্তব্যগুলো আমাকে খুবই মর্মাহত করেছে। এই চর্চা আমাদের সমাজে ছিল না। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, আমাদের সমাজে মানবিক মূল্যবোধের কতটুকু অধঃপতন হয়েছে।
বিরূপ মন্তব্যকারীদের উদ্দেশে আমার বিনীত নিবেদন: যত অপছন্দেরই হোক না কেন, দয়া করে কোনো মৃত ব্যক্তির প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ করবেন না। তৌফিক ইমরোজ খালিদী এখন সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। একজন মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার মন্দ দিক বলতে হয় না; কারণ সমালোচনা করে সেই ব্যক্তিকে শোধরানো যায় না। তা ছাড়া, সমালোচনার বিপরীতে তিনি আর আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারবেন না।
অনেকটা বিবেকের তাড়নায় তৌফিক ভাইকে নিয়ে একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব। জানি না সেখানে আবার আমিও আবেগী হয়ে পড়ি কি না!
পাঠকদের একটি তথ্য জানা দরকার। বিডিনিউজ নামে প্রতিষ্ঠানটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নামে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে যাওয়ার পর আমিই প্রথম রিপোর্টার, যাকে তিনি নিয়োগ করেন। আমার আগে তার কাছে সাক্ষাৎকার দিয়ে বিডিনিউজে কোনো রিপোর্টার চাকরি পাননি। আমি যোগদান করার আগে কেবল খালেদ মুহিউদ্দীন (বার্তা সম্পাদক, বাংলা) এবং সাব-এডিটর সুপ্রীতি ধর নিয়োগ পেয়েছিলেন। সে কারণে অন্য যেকোনো রিপোর্টারের চেয়ে আমি তৌফিক ভাইয়ের বেশি পরামর্শ এবং দিকনির্দেশনা পেয়েছি।
তা ছাড়া, ২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানটির গঠনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে শুরু থেকে আমি যুক্ত ছিলাম এবং সেখানে কাজ করেছি। আমি দুই ব্যবস্থাপনায় সাংবাদিকতা দেখেছি।
সেই জায়গা থেকে আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন—বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সাম্প্রতিক ইতিহাস বলতে গেলে তৌফিক ভাইয়ের অবদানের কথা বলতে হবে। তিনি কীভাবে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মানকে একটি উন্নত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, সেগুলোর কয়েকটি উদাহরণ দেব, যা সাংবাদিকতার ইতিহাস নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের জন্য কাজে আসবে।
যেভাবে এলো বিডিনিউজ?
বর্তমানের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আগের নাম ছিল বিডিনিউজ। এই প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০০৪ সালে। কিন্তু তার এক বছরের বেশি সময় ধরে কয়েকজন আশাবাদী সাংবাদিকের মধ্যে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আলোচনা চলছিল। সেই ব্যক্তিরা হলেন—বেসরকারি বার্তা সংস্থা ইউএনবির রাশেদ চৌধুরী, জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল, ফরিদ আহমেদ সাজু, ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিনিধি নাদিম কাদের, নিউ এইজ পত্রিকার টিটু দত্ত গুপ্ত, ইত্তেফাকের সাগর সারোয়ার, যুগান্তরের বিপ্লব রহমান, দ্য ডেইলি স্টারের নজরুল ইসলাম মিঠুসহ আরও অনেকে। তাদের মতে, বাংলাদেশে মিডিয়ার ভবিষ্যৎ অনলাইনে; এবং সেটি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এক নতুন দিক উন্মোচন করবে। আমিও একজন সৌভাগ্যবান প্রতিবেদক, যাকে রাশেদ চৌধুরী ডেকে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন আমাকে যোগদান করতে হবে। তখন আমি দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার। প্রায়ই গুলশানের একটি বাসায় আমরা সবাই বসে কীভাবে সেই প্রতিষ্ঠানকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে, সেগুলো নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চলত।
যাই হোক, প্রতিষ্ঠান গঠন প্রায় হয়ে গেল। কিন্তু আর্থিক সংস্থান কঠিন হয়ে পড়ল। কোনো ব্যবসায়ী মালিক হলে তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থে সেটিকে ব্যবহার করবেন—সেই আশঙ্কা থেকে ইত্তেফাকের কূটনৈতিক প্রতিবেদক ও নামকরা সাংবাদিক আলমগীর হোসেনকে এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্পাদক হিসেবে পছন্দ করলেন সবাই। তাকে অফার দেওয়া হলে তিনি সেটি গ্রহণ করেন এবং বিনিয়োগ করতে রাজি হন। প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্প অফিস প্রতিষ্ঠিত হয় ইস্কাটনের গাউসনগরে, যেখানে তার একটি বাড়তি ফ্ল্যাট ছিল। সেখানেই আমরা যাওয়া শুরু করি।
প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই নাদিম কাদের চলে যান। অন্যান্য প্রতিবেদক যারা সেখানে যোগদানের কথা চিন্তা করছিলেন, তারা আর যোগদান করলেন না। আমি নিজেও যোগ দিতে চাইলাম না। কিন্তু সম্পাদক রাশেদ ভাই আমাকে বললেন, আমাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও থাকতে হবে তাদের সঙ্গে। আমি সেখানে পার্টটাইমার হিসেবে সংবাদ পরিবেশন করতাম। তবে কয়েক মাস কাজ করেছি মাত্র।
যে ভুলটি করেছিল বিডিনিউজ
আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে শুরু থেকে বেশ ভালোই করছিল বিডিনিউজ। দেশের দুই শীর্ষ সংবাদ সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এবং ইউএনবির পাশাপাশি দেশের টেলিভিশনসহ সংবাদমাধ্যমগুলো বিডিনিউজ পয়সা দিয়ে সাবস্ক্রাইব করতে শুরু করল। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বিডিনিউজের সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকল।
কিন্তু একটি সংবাদ যেন কাল হয়ে দাঁড়াল প্রতিষ্ঠানটির জন্য। তখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। ২০০৬-০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান কে হবেন, তা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত। বিএনপি বলছে, সংবিধান অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে. এম. হাসানই তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হবেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বলছে, তারা কোনোক্রমেই কে. এম. হাসানকে মানবে না; কারণ তিনি বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। আওয়ামী লীগ অভিযোগ করে, বিএনপি-জামায়াত সরকার এমনভাবে সংবিধান সংশোধন করেছে যাতে কে. এম. হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারেন।
এই অবস্থায় বিডিনিউজ একটি সংবাদ প্রকাশ করে, যা দেশের একটি শীর্ষ দৈনিকসহ প্রায় সকল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। সেই সংবাদে বলা হয় যে, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো না চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হবেন না কে. এম. হাসান। কোনো সূত্র উল্লেখ না করে সংবাদে বলা হয়, দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কে. এম. হাসান তার কাছের কয়েকজন ব্যক্তির কাছে এমন অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন এবং তাদের একজনের সঙ্গে বিডিনিউজ প্রতিনিধি কথা বলেছেন।
এই সংবাদ প্রকাশের পর কে. এম. হাসান বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রতিবাদ পাঠান এবং সংবাদমাধ্যমগুলো জানায় সংবাদটি বিডিনিউজের। সুতরাং, এই সংবাদের প্রধান দায় বিডিনিউজের। এই ঘটনার পর প্রথম আলোসহ দেশের প্রায় সকল মিডিয়া বিডিনিউজ সাবস্ক্রাইব করা বন্ধ করে দেয়। বদনাম রটে যায়। এভাবে চলতে থাকলে এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের আয় কমে যায় এবং ফলে সাংবাদিকদের বেতন বকেয়া পড়ে যায়। বাজারে রটে যায় বিডিনিউজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
যেভাবে তৌফিক ভাই এলেন
তৌফিক ইমরোজ খালিদী বিবিসি বাংলা বিভাগে প্রডিউসার হিসেবে চুক্তি শেষ করে ঢাকা ফিরেছেন কয়েক মাস আগে। তিনি আলমগীর হোসেনের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছান। আলমগীর ভাই চান প্রতিষ্ঠানটি যেন বন্ধ না হয় এবং সেখানকার কোনো সাংবাদিক যেন চাকরিচ্যুত না হন। এই শর্তে তিনি বিডিনিউজের সকল দায়সহ প্রতিষ্ঠানটি তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে একটি সফটওয়্যার কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করেন। তখন প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয় ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’।
যা হয়, নতুন ব্যবস্থাপনার পর তৌফিক ভাই ভালো রিপোর্টার খুঁজতে থাকেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির বদনামের কারণে কোনো ভালো সাংবাদিক আসতে অনাগ্রহী ছিলেন। তবে আমি তৌফিক ভাইয়ের সুনামের কারণে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার প্রতিষ্ঠানে যোগ দিই। সকলেই তখন যুগান্তরের মতো একটি বড় প্রতিষ্ঠান ছেড়ে আমার বিডিনিউজে যোগদানকে পাগলামি বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু আমার ইচ্ছা ছিল তার কাছ থেকে ভালো সাংবাদিকতা শিখব।
যেহেতু রিপোর্টার কম ছিল, তিনি আমার সঙ্গে নিয়মিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতেন, সাংবাদিকতা নিয়ে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতেন।
প্রথম বিপত্তি বাঁধে একটি সংবাদ নিয়ে। একদিন রাতে বাসায় যাওয়ার পথে দেখি কারওয়ান বাজার রেলক্রসিংয়ের কাছে রাস্তার মাঝখানে শত শত মানুষ একটি ম্যানহোলের চারদিক ঘিরে রেখেছে। কৌতূহলী হয়ে গিয়ে জানলাম, ওই ম্যানহোলে একটি বাচ্চা পড়ে গেছে। আমি আবেগাক্রান্ত ও উত্তেজিত হয়ে খালেদ মুহিউদ্দীনকে ফোন করলাম। জানালাম আমি স্পটে আছি, নিউজটা দিতে হবে। তিনি তখন বললেন, “কোট কোথায়?” বললাম, “এখনও পুলিশ অথবা ফায়ার সার্ভিস আসেনি।” তখন তিনি বললেন, “তাহলে নিউজ যাবে না।” আমি বললাম, যিনি বাচ্চাটিকে পড়ে যেতে দেখেছেন তার সঙ্গে কথা বলেছি; তার নাম-ঠিকানা আছে। খালেদ নিউজটি দিলেন না। সত্যি কথা বলতে কী, এ নিয়ে আমার মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায়।
আমি বিষয়টি তৌফিক ভাইকে বলার পর তিনি আমাকে বলেন, “খালেদ ঠিক আছে। অথরিটি না বললে আমরা এই ঘটনা নিশ্চিত করব কীভাবে? তুমি নিজে তো আর বাচ্চাটিকে পড়ে যেতে দেখোনি! তুমি যাকে কোট করছ সে তো মিথ্যাও বলতে পারে! অথরিটি যদি বলে বাচ্চা পড়েনি, তাহলে আমরা কীভাবে প্রমাণ করব?”
তার কথা আমার চোখ খুলে দেয়। বুঝতে পারি আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে সংবাদ লিখতে হবে।
এরপর সাংবাদিকদের সঙ্গে মিটিংয়ে তিনি জানান, “এখন থেকে বেনামি সূত্র দিয়ে আর কোনো সংবাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত হবে না।”
আমার তো মাথায় হাত! তাকে আমি বললাম, “ভাই, তাহলে তো কোনো কিছুই লেখা যাবে না।” তিনি আমাকে বললেন, “তোমরা বেনামি সূত্র দিয়ে সংবাদ লিখে একটি বাজে রীতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছ। নাম প্রকাশ করে সূত্র উল্লেখ করে সংবাদ লিখেও অনেক ভালো সাংবাদিকতা করা যায়।”
তার নির্দেশনা ছিল, “স্পিড ও অ্যাকিউরেসির মধ্যে আমরা অ্যাকিউরেসিকে প্রাধান্য দেব। তাড়াহুড়ো করে সংবাদ দিতে গিয়ে ভুল করা যাবে না। সোর্স হিসেবে সঠিক মানুষকে সঠিকভাবে লিখতে হবে। সংবাদ একটু পরে গেলে অসুবিধা নেই, কিন্তু সেটি অবশ্যই নির্ভুল হতে হবে।”
তিনি আরও বললেন, “একটি সংবাদ না লিখলে কিছু হবে না। কিন্তু একটি ভুল সংবাদ প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিতে পারে।”
এর মধ্যে নবরূপে আবির্ভূত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ছেড়ে অনেকেই চলে গেলেন। এরপর শুরু হলো আমার সাংবাদিকতার নতুন যাত্রা। নোটবুকে লেখার পাশাপাশি প্রমাণ হিসেবে টেপ রেকর্ডার রাখা শুরু করলাম। সত্যি, রেকর্ড করা বক্তব্য শুনে দেখলাম সোর্স উল্লেখ করেও ভালো সংবাদ লেখা যায়। দেখলাম আমার সংবাদ নিয়ে আর কেউ কোনো আপত্তি তুলতে পারে না। কোনো সন্দেহ হলে রেকর্ডার বাজিয়ে শোনাতে হতো বার্তা সম্পাদকদের; তার পরেই সংবাদ আপলোড হতো।
এভাবে মানুষ ধীরে ধীরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বিশ্বাস করতে শুরু করে। অনেকেই তখন আগ্রহী হয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে যোগদান করেন। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসের শেষ দিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছায়। রাস্তায় বিরোধী দল আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষ। সেই সময় প্রায় ২০ ঘণ্টা রাস্তায় সহিংসতা কভার করেছি। যেহেতু অন্য কোনো অনলাইন সংবাদমাধ্যম তেমন ছিল না, পাঠকেরা তখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সংবাদের উৎস হিসেবে নির্ভর ও বিশ্বাস করতে থাকেন।
এক বছরের মধ্যেই যে প্রতিষ্ঠানটিকে কেউ বিশ্বাস করত না, সেই প্রতিষ্ঠানটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভুল সংবাদমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে। বাংলাদেশে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমই সম্ভবত একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যাকে মানুষ ফেলে দেওয়ার পর আবার তুলে নিয়েছে। সেটি হয়েছে তৌফিক ভাইয়ের নীতির কারণে।
তার এই নীতির কারণে সাংবাদিকদের মানসপটে একটি পরিবর্তন ঘটে যে, সংবাদ লিখতে গেলে সঠিক কর্তৃপক্ষের এবং সঠিক ব্যক্তির মূল বক্তব্য লাগবে। তা ছাড়া সংবাদ লেখা যাবে না—যা অন্যান্য সংবাদমাধ্যমকেও বেশ প্রভাবিত করে।
২০০৭ সালে সরকারের একটি এজেন্সি থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল ও শেখ সেলিমের বক্তব্যসংবলিত সিডি সরবরাহ করা হয়। সেখানে শোনা যাচ্ছিল, তারা শেখ হাসিনাকে গালাগাল করছেন। দেশের প্রায় সব মিডিয়া সেগুলো প্রকাশ করলেও তৌফিক ভাই ওই এজেন্সির শীর্ষ কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেন, জলিল ও সেলিমের বক্তব্য ছাড়া এই সকল জেরার ওপর ভিত্তি করে কোনো সংবাদ প্রচার করবে না তার প্রতিষ্ঠান। তিনি আরও বলেন, জলিল-সেলিম গ্রেপ্তার হয়ে আছেন; গ্রেপ্তার অবস্থায় তাদের এই কথোপকথন কে এত সুন্দরভাবে রেকর্ড করল, সে সম্পর্কে সংবাদ করতে চায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তারপর আর সিডি আসেনি।
এরপর থেকে অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি মাথা নত করেনি। তবে প্রতিষ্ঠানটির যে কোনো ভুল নেই, সেটি নয়; কিন্তু সেটি প্রাতিষ্ঠানিক নয়।
পরিশেষে বলতে চাই, আর দশটা মানুষের মতো তৌফিক ইমরোজ খালিদীও মানুষ। আমাদের মতো তার দোষ, রাগ, অভিমান, লোভ, জেদ থাকবে—সেটিই স্বাভাবিক। আমরা যেন সেই বিষয়টি মাথায় রেখে নির্মোহভাবে তাকে বিচার করি। তার ব্যক্তিগত বিষয়গুলো মাথায় না নিয়ে সাংবাদিকতায় তার অবদান বিবেচনা করেই তাকে মূল্যায়ন করা উচিত। সেই বিবেচনায় তৌফিক ইমরোজ খালিদী বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় একটি নবদিগন্তের সূচনা করেছেন বললে অত্যুক্তি হবে না বলে মনে হয়।
কামরান রেজা চৌধুরী: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক কর্মী; সংসদীয় রাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছেন তিন দশক ধরে। ই-মেইল: kamran.reza@gmail.com
