০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

হাইড্রোজেনের ভবিষ্যৎ: সম্ভাবনা বিপুল, কিন্তু অর্থনীতির পরীক্ষায় এখনো প্রস্তুত নয়

ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে গ্রিন হাইড্রোজেনের বিশাল প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা থাকলেও এর উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিশ্বব্যাপী পরিবহনের চড়া ব্যয় একে আন্তর্জাতিক বাজারে এখনও প্রতিযোগী করে তুলতে পারেনি।

হাইড্রোজেনের ভবিষ্যৎ: সম্ভাবনা বিপুল, কিন্তু অর্থনীতির পরীক্ষায় এখনো প্রস্তুত নয়

দীর্ঘমেয়াদি বা ঋতুভিত্তিক শক্তি সঞ্চয়, কিছু সামুদ্রিক ব্যবহার, ভারী শিল্প পরিবহন এবং এমন কিছু খনি পরিচালনায় হাইড্রোজেন উপযোগী হতে পারে যেখানে ব্যাটারির ওজন, পরিসীমা অথবা চার্জিং সময় বড় সীমাবদ্ধতা। ছবি: রয়টার্স

শুভংকর বিশ্বাস শুভংকর বিশ্বাস

Published : 03 Nov 2026, 11:44 PM

Updated : 03 Nov 2026, 11:44 PM

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি রূপান্তরের আলোচনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি শব্দ ক্রমেই বেশি শোনা যাচ্ছে, হাইড্রোজেন। অনেক দেশ জাতীয় হাইড্রোজেন কৌশল গ্রহণ করেছে, বড় বড় জ্বালানি কোম্পানি নতুন প্রকল্প ঘোষণা করছে, ইস্পাত, সার, খনি ও পরিবহন শিল্পে হাইড্রোজেনের ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো বিপুল সৌর ও বায়ুশক্তির দেশগুলো আবার ভবিষ্যতে গ্রিন হাইড্রোজেন ও অ্যামোনিয়ার বড় রপ্তানিকারক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

এই আগ্রহের যৌক্তিক কারণও রয়েছে। হাইড্রোজেন এমন কিছু শিল্পে কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারে, যেগুলোকে সরাসরি বিদ্যুৎনির্ভর করা কঠিন। যেমন, এটি সিমেন্ট শিল্পে, অ্যামোনিয়া ও রাসায়নিক শিল্পের কাঁচামাল, ইস্পাত তৈরিতে রিডিউসিং এজেন্ট, দীর্ঘমেয়াদি শক্তি সংরক্ষণের মাধ্যম এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারী পরিবহনের জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা আর অর্থনৈতিক বাস্তবতা এক বিষয় নয়। হাইড্রোজেন নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই, এটি কি বর্তমানে প্রচলিত বা বিকল্প প্রযুক্তিগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে প্রতিযোগিতা করতে প্রস্তুত?

আজকের বাস্তবতায় উত্তরটি হলো, বিস্তৃত পরিসরে এখনো নয়। হাইড্রোজেন কোনো নতুন জ্বালানি নয়। বিশ্বে বহু দশক ধরেই এটি ব্যবহৃত হচ্ছে, বিশেষ করে তেল পরিশোধন, অ্যামোনিয়া উৎপাদন, রাসায়নিক শিল্প এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রক্রিয়ায়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহৃত হাইড্রোজেনের বড় অংশই প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদিত হয়েছে। এর ফলে বিশ্বে হাইড্রোজেন উৎপাদন নিজেই উল্লেখযোগ্য কার্বন নিঃসরণের উৎস। হাইড্রোজেনওয়ান ক্যাপিটাল গ্রোথ পিএলসি-এর ২০২১ সালের শিল্প বিশ্লেষণেও প্রচলিত হাইড্রোজেন উৎপাদন থেকে বছরে প্রায় ৮৩০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

এখানে একটি মৌলিক বিষয় বোঝা জরুরি। হাইড্রোজেন নিজে প্রাথমিক কোনো শক্তির উৎস নয়; এটি মূলত একটি এনার্জি ক্যারিয়ার বা শক্তি বহনকারী মাধ্যম। সূর্যের আলো বা বাতাস থেকে আমরা সরাসরি শক্তি পাই। কিন্তু হাইড্রোজেন তৈরি করতে প্রথমে অন্য কোনো উৎস থেকে শক্তি সরবরাহ করতে হয়। গ্রিন হাইড্রোজেনের ক্ষেত্রে ওই শক্তি আসে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ থেকে। ইলেক্ট্রোলাইজারের মাধ্যমে পানিকে ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে আলাদা করা হয়।

এরপরও কাজ শেষ নয়। উৎপাদিত হাইড্রোজেনকে সংকুচিত করতে হয়, সংরক্ষণ করতে হয় এবং প্রয়োজনে দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহন করতে হয়। কখনো সেটিকে তরল হাইড্রোজেনে রূপান্তর করা হয়, কখনো অ্যামোনিয়ার মতো আরেকটি যৌগে পরিবর্তন করা হয়। ব্যবহারস্থলে আবার প্রয়োজন অনুযায়ী ওই হাইড্রোজেন বা তার শক্তিকে কাজে লাগাতে হয়। আর এটি করতে প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন হয় নতুন যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো, শক্তি এবং অর্থ।

গ্রিন হাইড্রোজেনের মূল বাধা—উৎপাদন ব্যয়

গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদনের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের একটি হলো বিদ্যুৎ। আধুনিক ইলেকট্রোলাইসিস ব্যবস্থায় এক কেজি হাইড্রোজেন উৎপাদনে সাধারণত প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বা তার কাছাকাছি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে, যা নির্ভর করে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও সামগ্রিক দক্ষতার ওপর। ফলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যত সস্তাই হোক, এত বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে তার প্রভাব সরাসরি প্রতি কেজি হাইড্রোজেনের উৎপাদন খরচে পড়ে। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে ইলেকট্রোলাইজারের মূলধনী ব্যয়, পানি বিশুদ্ধকরণ, কম্প্রেসর, সংরক্ষণাগার, রক্ষণাবেক্ষণ, জমি, ট্রান্সমিশন ও অর্থায়নের খরচ।

আইএইচএস মার্কিটের ২০২২ সালের একটি ব্যয় তুলনায় ইউরোপের উদাহরণ ব্যবহার করে দেখানো হয়েছিল যে, নির্দিষ্ট বায়ু বা সৌরশক্তি ব্যবহার করে ইলেকট্রোলাইসিসের মাধ্যমে উৎপাদিত হাইড্রোজেনের সমমাত্রিক উৎপাদন খরচ অনেক ক্ষেত্রে কার্বন ক্যাপচারসহ প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপাদিত ব্লু হাইড্রোজেনের দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।

অর্থাৎ সমস্যাটি প্রযুক্তি কাজ করে কি না সেটি নয়। প্রযুক্তি কাজ করে, কিন্তু এর অর্থনৈতিক উৎপাদন মূল্য এখনো অনুকূল নয়। আরেকটি বিষয় না বললে আলোচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কার্বনমুক্ত জ্বালানি কিন্তু একা হাইড্রোজেন তৈরি করছে না! এখানে হাইড্রোজেনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে সৌর, বায়ু ও ব্যাটারি প্রযুক্তি।

গত কয়েক দশকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ নাটকীয়ভাবে কমেছে। বায়ুবিদ্যুতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির মূল্যও বড় পরিসরে উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

ব্লুমবার্গ এনইএফের বিভিন্ন বিশ্লেষণে সোলার পিভি এবং বায়ু প্রযুক্তির শক্তিশালী লার্নিং রেট দেখা যায়। একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণে সোলার প্রযুক্তিতে প্রায় ২৯ শতাংশ লার্নিং রেট এবং অনশোর উইন্ডে প্রায় ১৪ শতাংশ লার্নিং রেট দেখানো হয়েছে। ব্যাটারি প্রযুক্তিতেও অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যয় সংকেত লক্ষ্য করা গেছে। অর্থাৎ, যখন পুঞ্জীভূত উৎপাদন বাড়ছে, তখন এসব প্রযুক্তির প্রতি ইউনিট খরচ বাস্তবে কমে এসেছে।

ইলেকট্রোলাইজারের ক্ষেত্রেও অবশ্য কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ব্লুমবার্গ এনইএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বড় মাত্রার অ্যালকালাইন ইলেকট্রোলাইজার সিস্টেমের বেঞ্চমার্ক মূলধন ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ এবং পিইএম সিস্টেমের ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছিল। তাই বলা ঠিক হবে না যে হাইড্রোজেন প্রযুক্তির খরচ মোটেই কমছে না।

মূল সমস্যা বরং অন্য জায়গায়। ইলেকট্রোলাইজার সস্তা হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত প্রতি কেজি হাইড্রোজেন সস্তা হওয়া এক বিষয় নয়। হাইড্রোজেনের চূড়ান্ত উৎপাদন খরচে বিদ্যুতের মূল্য, ইলেকট্রোলাইজার ব্যবহার, সক্ষমতার হার, অর্থায়ন, কম্প্রেসর ও স্টোরেজের মতো বিষয়গুলো বড় ভূমিকা রাখে। সোলার প্যানেল বা ব্যাটারি তৈরির কারখানা খরচ কমে গেলে তার সুবিধা তুলনামূলকভাবে সরাসরি গ্রাহকের কাছে পৌঁছায়। কিন্তু হাইড্রোজেনে পুরো ভ্যালু চেইন অনেক বেশি জটিল। এই কারণেই বহু বছর ধরে হাইড্রোজেনের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে আমরা এখনো বারবার পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর করছি।

ব্লুমবার্গ এনইএফসহ বিভিন্ন সংস্থা ২০৩০ ও ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য হাইড্রোজেনের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। কিন্তু পূর্বাভাস আর বাস্তবে অর্জিত খরচ হ্রাস এক নয়। এটাই বর্তমান হাইড্রোজেন অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা।

একটি যুক্তি প্রায়ই দেওয়া হয়, সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ যত সস্তা হবে, গ্রিন হাইড্রোজেনও তত সস্তা হবে। যুক্তিটি আংশিকভাবে সঠিক। তবে সস্তা নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎও পুরো সমস্যার সমাধান নয়। কারণ সৌর ও বায়ুর একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এগুলো ২৪ ঘণ্টা সমান হারে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। ফলে শুধু নবায়নযোগ্য উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল ইলেকট্রোলাইজারের ব্যবহার কমে গেলে হাইড্রোজেন প্ল্যান্টের মূলধনী খরচ তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণ উৎপাদনের ওপর ভাগ করতে হয়।

অন্যদিকে ইলেকট্রোলাইজারকে সারাক্ষণ চালাতে চাইলে গ্রিড বিদ্যুৎ, ব্যাটারি সঞ্চয় অথবা অতিরিক্ত নবায়নযোগ্য সক্ষমতা প্রয়োজন হতে পারে। এগুলোর প্রতিটিরই আর্থিক মূল্য রয়েছে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দাম দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও এর সাময়িক বিরতি এখনো জ্বালানি ব্যবস্থার নকশায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। হাইড্রোজেন এই সমস্যার একটি সমাধান হতে পারে, উদ্বৃত্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে হাইড্রোজেন তৈরি করে পরে ওই শক্তি ব্যবহার করা যায়।

কিন্তু এখানেও প্রশ্ন আসে, সরাসরি বিদ্যুৎ ব্যবহার করা গেলে কেন প্রথমে বিদ্যুৎ থেকে হাইড্রোজেন, তারপর আবার হাইড্রোজেন থেকে ব্যবহারযোগ্য শক্তি তৈরি করা হবে? প্রতিটি শক্তি রূপান্তরে দক্ষতার অপচয় ঘটে। এ কারণে যেসব কাজে সরাসরি বিদ্যুতায়ন সম্ভব, সেখানে হাইড্রোজেনের পক্ষে ব্যাটারি অথবা সরাসরি বিদ্যুতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হতে পারে।

উৎপাদন খরচের পর শুরু হয় আরেক খরচ

হাইড্রোজেনের কম আয়তনিক শক্তি ঘনত্বের কারণে বৃহৎ পরিমাণে পরিবহন সহজ নয়। হাইড্রোজেন তরলীকরণের জন্য প্রায় মাইনাস ২৫৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। উচ্চচাপে সংকুচিত হাইড্রোজেন পরিবহনের জন্য বিশেষ পাত্র ও অবকাঠামো দরকার। পাইপলাইনের ক্ষেত্রেও উপকরণের সামঞ্জস্য ও নতুন অবকাঠামোর প্রশ্ন রয়েছে।

আরেকটি বহুল আলোচিত সমাধান হলো অ্যামোনিয়া। হাইড্রোজেনকে অ্যামোনিয়াতে রূপান্তর করলে পরিবহন তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। কিন্তু অ্যামোনিয়া তৈরিতেও শক্তি লাগে। যদি গন্তব্যে আবার হাইড্রোজেন প্রয়োজন হয়, তাহলে অ্যামোনিয়া ক্র্যাকিংয়ের জন্য আবার কারখানা ও শক্তির দরকার হয়। অর্থাৎ, উৎপাদনস্থলে ‘দুই বা তিন ডলার প্রতি কেজি’ হাইড্রোজেন শুনতে আকর্ষণীয় লাগলেও সেটিই শেষ মূল্য নয়। বাস্তব প্রতিযোগিতা নির্ধারণ করবে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে কার্যকরভাবে ব্যবহারের সময় মোট খরচ কত তার ওপর।

ডিম আগে না মুরগি আগে ধরনের সমস্যাও রয়েছে এখানে। হাইড্রোজেন অর্থনীতি গড়ে তুলতে শুধু উৎপাদন কারখানা যথেষ্ট নয়। পাইপলাইন, স্টোরেজ, বন্দর অবকাঠামো, নৌপরিবহন, রিফুয়েলিং স্টেশন এবং নিশ্চিত গ্রাহক, সবকিছু প্রায় একই সময়ে তৈরি করতে হয়। ট্র্যানফিল্ডের হাইড্রোজেন বাজার বিশ্লেষণে বিষয়টিকে উৎপাদক এবং গ্রাহকের মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দ্বিধা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। উৎপাদক নিশ্চিত গ্রাহক ছাড়া বড় অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে দ্বিধা করে; অন্যদিকে গ্রাহকও নির্ভরযোগ্য হাইড্রোজেন সরবরাহ ছাড়া নিজস্ব কারখানা বা যন্ত্রপাতি পরিবর্তন করতে চায় না। এ কারণেই প্রাথমিক হাইড্রোজেন প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোই খোলা বাজারের বদলে সমন্বিত বা স্বয়ম্ভর প্রকল্প হিসেবে গড়ে উঠছে।

তাহলে কি হাইড্রোজেনের ভবিষ্যৎ নেই?

অবশ্যই আছে। তবে সম্ভবত হাইড্রোজেনের ভবিষ্যৎ সব জায়গায় নয়, নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। বর্তমানে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে যে হাইড্রোজেন অ্যামোনিয়া, সার, তেল শোধন ও রাসায়নিক শিল্পে ব্যবহৃত হয়, তাকে স্বল্প কার্বন হাইড্রোজেন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা একটি যৌক্তিক বাজার। গ্রিন স্টিলের ক্ষেত্রেও হাইড্রোজেন বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ডিরেক্ট রিডিউসড আয়রন বা ডিআরআই প্রক্রিয়ায় কার্বনের পরিবর্তে হাইড্রোজেন ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি বা ঋতুভিত্তিক শক্তি সঞ্চয়, কিছু সামুদ্রিক ব্যবহার, ভারী শিল্প পরিবহন এবং এমন কিছু খনি পরিচালনায় হাইড্রোজেন উপযোগী হতে পারে যেখানে ব্যাটারির ওজন, পরিসীমা অথবা চার্জিং সময় বড় সীমাবদ্ধতা।

এই জায়গাতেই হাইড্রোজেনের প্রকৃত শক্তি। তাকে ব্যাটারি বা বিদ্যুৎকে সব ক্ষেত্রে হারাতে হবে না। তাকে সফল হতে হবে ওইসব জায়গায়, যেখানে সরাসরি বিদ্যুতায়ন বাস্তবসম্মত নয়।

আশাবাদ প্রয়োজন, কিন্তু অর্থনীতিকে উপেক্ষা করে নয়

হাইড্রোজেন নিয়ে আমাদের আলোচনা প্রায়ই প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার ওপর কেন্দ্রীভূত হয়। কিন্তু বৃহৎ শিল্প রূপান্তর শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। সৌর, বায়ু এবং ব্যাটারি ইতোমধ্যে দেখিয়েছে, কীভাবে ব্যাপক প্রসার ও উৎপাদনের মাত্রা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রযুক্তির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।

হাইড্রোজেনের ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। ইলেকট্রোলাইজারের মূলধনী খরচ কমছে, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সস্তা হচ্ছে এবং উৎপাদনের মাত্রা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু এখনো গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি হলো, প্রতিযোগী প্রযুক্তিগুলোর খরচ হ্রাস অনেকাংশে বাস্তবে অর্জিত; হাইড্রোজেনের ক্ষেত্রে তা এখনো বহুদূর। এ কারণেই হাইড্রোজেনকে এখনই ভবিষ্যতের সর্বজনীন জ্বালানি হিসেবে ঘোষণা করা বোকামি হয়ে যাবে। বরং এটিকে দেখা উচিত শক্তি রূপান্তরের একটি বিশেষায়িত কিন্তু সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবে।

হাইড্রোজেনের ভবিষ্যৎ আছে, সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যৎও আছে। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি এখন আর গবেষণাগারে নয়; ওই পরীক্ষা বাজারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি এটা নয় যে, আমরা কত হাইড্রোজেন তৈরি করতে পারি। বরং প্রশ্ন হলো, কত কম খরচে আমরা সেটি উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহন করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে পারি এবং একই কাজের জন্য বিদ্যুৎ, ব্যাটারি বা অন্য কোনো প্রযুক্তি কি তার চেয়ে সস্তা?

যতদিন এই প্রশ্নের উত্তর হাইড্রোজেনের পক্ষে পরিষ্কারভাবে না আসে, ততদিন বলা যায়, হাইড্রোজেনের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা বিপুল, কিন্তু অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার জন্য এটি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

তথ্যসূত্র: ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি; ব্লুমবার্গ এনইএফ; আইএইচএস মার্কিট; হাইড্রোজেন কাউন্সিল; ইন্টারন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি এজেন্সি; হাইড্রোজেন ওয়ান ক্যাপিটাল; ট্র্যানফিল্ড, জে. ২০২১, ক্লিন এনার্জি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস

শুভংকর বিশ্বাস অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক প্রকৌশলী, গবেষক ও কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট। ই-মেইল: rtrshuvo@gmail.com