Published : 28 Mar 2026, 12:36 AM
শিল্পী, সাংবাদিক ও সংগ্রামী সত্যেন সেন জন্ম নিয়েছিলেন ১৯০৭ সালের আজকের দিনটিতে। তার জন্মের বছরটি পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিচিত্র ঘটনাবহুল সময়। পরাশক্তি নির্ধারণে পৃথিবী তখন দুই শিবিরে বিভক্ত—একদিকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়া; অন্যদিকে পারস্য, তিব্বত ও আফগানিস্তান। এই মেরুকরণের মধ্যেই রোপিত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বীজ। বাংলার রাজনীতির ক্ষেত্রেও সময়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ সরকারের ঘোষিত বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) রদের দাবিতে বাংলা তখন উত্তাল। একটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের স্রোত ক্রমশ গভীর হয়ে উঠছিল এই সময়টিতে। তার প্রভাব পড়েছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গে, অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশে।
তার ১১৯তম জন্মদিনের এই দিনটিতে বাংলাদেশ, এমনকি গোটা পৃথিবীই আজ দাঁড়িয়ে আছে সেই পরাশক্তি বলয়ের যুদ্ধ সময়ের সামনে। সময় বদলেছে, কুশীলব বদলেছে, কিন্তু ঘটনার নড়চড় হয়নি। বাংলাদেশে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের যে জাতীয়তাবাদী চেতনা, তাকে ধূলিসাৎ করে দিতে উদ্যত হয়েছে একাত্তরের পরাজিত শক্তি। জনস্বার্থবিরোধী কতগুলো অসম চুক্তির সামনে বাংলাদেশটাকে দাঁড় করিয়ে রেখে গেছে দেশবিরোধীরা। এই দমবন্ধ নিষ্ঠুর সময়ে ২৮ মার্চ যখন আমরা সত্যেন সেনের মুখোমুখি হই, তখন খুঁজে পাই আমাদের লড়াইয়ের নিশানা।
বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলায় যে রাজনীতি সচেতনতায় ঋদ্ধ মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছিল, সত্যেন সেন তেমনই এক পরিবারে জন্মেছিলেন। ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের সোনারং গ্রামে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ১৯৪৭ সালে একদিকে যখন ভারতবর্ষ স্বাধীন হচ্ছে আর অন্যদিকে রচিত হচ্ছে দেশভাগের মর্মন্তুদ ইতিহাস—সত্যেন সেনের বয়স তখন চল্লিশ পেরিয়ে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশভাগের নির্মম পটচিত্র, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি এবং তার পরপরই বাঙালির মহান ভাষা আন্দোলন, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং বাংলার মানুষের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ—এসবই তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন; কখনো শিল্পীর চোখ দিয়ে, কখনো সাংবাদিকের কলমে, কখনো আবার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একনিষ্ঠ সংগঠকের কর্মকাণ্ড দিয়ে। নিঃসন্দেহে প্রতিটি ঘটনাই তাকে নাড়া দিয়েছে, ফলে তিনিও সাড়া দিয়েছেন কখনো শিল্পের ভাষায় আবার কখনো রাজনীতির ভাষায়। ১৯৮১ সালের ৫ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন; কিন্তু তার আগ পর্যন্ত এই মহান সংগ্রামীর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় মানুষের মুক্তির মন্ত্রে রচিত।
তার বাহাত্তর বছর সাত মাসের জীবনে তিনি জেলেই থেকেছেন অধিকাংশ সময়। কারাগারের বন্দী দিনগুলোতেই তিনি সাহিত্য সাধনায় মনোনিবেশ করেছিলেন। তার রচনাবলি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। তবে রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠক হিসেবে সত্যেন সেন জীবনের যে পাঠ রেখে গেছেন আমাদের জন্য—তা আজকের সময়ে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর বীজমন্ত্র।
সত্যেন সেন কৃষক সংগঠন গড়ার কাজ করেছেন স্কুলজীবন থেকেই। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়িয়ে তিনি কৃষকদের সঙ্গে একাত্ম হয়েছিলেন তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। সে পথ ধরেই পরবর্তীতে কৃষক সমিতি গড়ে তোলা এবং নিবেদিতপ্রাণ কৃষক নেতা হিসেবে তার পরিচিতি প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ প্রগতি লেখক সংঘের সংগঠক সোমেন চন্দ নিহত হলে সংগঠন পরিচালনার কাজে ঢাকা চলে আসেন সত্যেন সেন। কিন্তু কৃষক সংগঠন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি কোনোদিন। প্রগতি লেখক সংঘের সংগঠক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এ সময় থেকেই তার গান রচনা শুরু। ১৯৪৩ সালে বাংলাজুড়ে দুর্ভিক্ষ নেমে এলে তিনি যেমন গণসংগীতশিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন, তেমনি দায়িত্ব পালন করেছেন দুর্গত এলাকায় আর্ত মানুষের সেবায়।
১৯৪৬ সালের নির্বাচনে সত্যেন সেন কাজ করেছেন নারায়ণগঞ্জের কমিউনিস্ট নেতা ব্রজেন দাসের পক্ষে। নির্বাচনি প্রচারণার জন্যও তিনি বেছে নিয়েছিলেন সংগীতকে। গঠন করেছিলেন কবিয়াল দল। সত্যেন সেনের নেতৃত্বে শিল্পীদল নির্বাচনি প্রচার চালিয়েছেন নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, রহিমাবাদ প্রভৃতি এলাকায়। তার সঙ্গী ছিলেন শিল্পী সাধন দাশগুপ্ত।
১৯৫৫ সালে তিনি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত অজয় রায় প্রণীত ‘সত্যেন সেন জীবনী’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়—সংবাদ পত্রিকার বিখ্যাত ‘বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি’ শিরোনামের কলামটি সত্যেন সেনই লিখতেন। এই কলামটির জন্য ঢাকা শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় তিনি ঘুরে বেড়াতেন। ১৯৬৮ সালে দৈনিক সংবাদেই তার আরেকটি পাঠকনন্দিত কলাম ছিল ‘শহরের ইতিকথা’ শিরোনামে। সাহিত্য রচনার জন্যও এভাবেই পরিব্রাজকের মতো সারা দেশ ঘুরে বেড়াতেন সত্যেন সেন।
১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। তিন বছরের কারাবাসের পর মুক্তি পেলেন ১৯৬৮ সালে। এই তিন বছরেই প্রকাশিত হয়েছিল তার তিনটি গ্রন্থ: ‘গ্রাম বাংলার পথে পথে’ (১৯৬৫), ‘রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ’ (১৯৬৬) এবং ‘অভিশপ্ত নগরী’ (১৯৬৭)। ১৯৬৮ সালে মুক্তি পেয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন নারিন্দার মনির হোসেন লেনে সাংবাদিক এম এ করিমের বাড়িতে। এম এ করিমের নববিবাহিতা স্ত্রী হেলেন করিম ছিলেন তার অভিভাবকের মতোই। নিরলসভাবে তিনি সত্যেন সেনের রচনার শ্রুতিলিখনের কাজ করেছেন।
১৯৬৮ সালে এ বাড়িতেই ৬ জন মিলে ‘ওরে ওরে বঞ্চিত সর্বহারা দল’ গানটির মহড়ার মধ্য দিয়ে পত্তন হয়েছিল আজকের উদীচীর। ‘উদীচী’ নামটিও সত্যেন সেনেরই দেওয়া। ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের জোয়ারে সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লাহ কায়সারসহ আরও অনেকের নেতৃত্বে উদীচী অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি শরণার্থী শিবিরগুলোতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছেন। তার যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার এক অপূর্ব সংকলন ‘প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ’ (১৯৭১) গ্রন্থটি। বাংলার মানুষের মুক্তিসংগ্রামের এক অনন্য দলিল এই বইটি।
একজন দেশপ্রেমিক সংগঠক ও আজীবন বিপ্লবী মানুষ হিসেবে সত্যেন সেন প্রতিটি প্রজন্মের সামনেই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার আদর্শ ও জীবনবোধ যেমন প্রতিফলিত হয়েছে তার কর্মে, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনাচরণেও। এই মহাপ্রাণের প্রতিধ্বনি যুগ-যুগান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ আজও করে চলছে তারই প্রতিষ্ঠিত সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। ১৯৮৫ সালে তার বিপুল রচনাসম্ভার প্রথম প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিল উদীচী এবং ১৯৮৬ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত হয়েছিল তার প্রথম খণ্ড। এরপর ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত উদীচীর উদ্যোগেই পাঁচ খণ্ডের এই রচনাবলি প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক ও উদীচীর সাবেক সভাপতি বদিউর রহমানের সম্পাদনায় দশ খণ্ডে ‘সত্যেন সেন রচনাবলী’ প্রকাশিত হয়েছে।
আমাদের পৃথিবী যখন আবারও যুদ্ধে বিপর্যস্ত, নানা টানাপোড়েনে যখন মলিন স্বদেশের বদনখানি; তখন আদর্শের উৎসে ফিরে যেতে আবারও আমাদের নতুন করে ফিরে তাকাতে হবে সত্যেন সেনের জীবন ও কর্মের দিকে। দেশ ও দেশের মানুষকে চিনতে শিখতে হবে তার গান আর রচনার তীর্থভূমিতে। তাই তার এবারের জন্ম দিবসটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। এই দিনটি তাই তার আদর্শের লড়াইকে শাণিত করার শপথপাঠেরও দিন।