Published : 08 May 2026, 04:50 AM
এখন ঘোরতর রবীন্দ্র-বিরোধিতা চলছে। তাই দিনের পর দিন তরুণরা যেন তাঁকে ভুল বোঝে, অসম্মান করে—সেজন্য আদাজল খেয়ে লাগা মানুষগুলো এ লেখা না পড়লেই খুশি হব আমি।
রবীন্দ্রনাথ ছেলেবেলায় আমার বড় ধরণের উপকার করেছিলেন। আমি তখন হাই স্কুলের ছাত্র। কোনো কথাবার্তা ছাড়া আমাকে দাঁড়িয়ে করে দেওয়া হয়েছিল কবিতা পাঠ করার জন্য। রবীন্দ্রনাথের কোনো কবিতাই তখন পুরোপুরি মুখস্থ ছিল না। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে দেখি হেড স্যার ও অন্যান্য রাশভারী শিক্ষকের মুখ। অসহায়, বিপন্ন এই কিশোরের জন্য এক আবছায়ার মতো হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। পরপর মনে পড়ে গিয়েছিল:
“আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।”
মনে এসে গিয়েছিল ‘তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে’র ভগ্নাংশ। শেষটায় ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা…’। অতঃপর পালিয়ে বাঁচা কিশোরের হাতে উঠে এসেছিল চকচকে একটি বাসন ও একখানা বই। বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
সেই তালগাছ মনে গেঁথে ছিল। যেবার শান্তিনিকেতন গেলাম, উঠেছিলাম ‘রাতের তারা দিনের রবি’ নামের অতিথিশালায়। নামটাই কেমন কাব্যিক! সকালে গাইড এক ঝলক দেখিয়ে কাজ সেরে ফেলার মতো বলেছিলেন, “এই তালগাছগুলোই ‘তালগাছ’ কবিতার উৎস।”
মনের ভেতর ঘুরতে থাকা তালগাছ কি ঘুমাতে দেয়? দীপা তখন অঘোর ঘুমে। নিদ্রাহীন চোখে চুপিচুপি বেরিয়ে এসেছিলাম মধ্যরাতে। বাইরে হালকা শীত। নিঝুম, ‘তখন ঘুমিয়ে গেছে পাড়া’। বের হয়ে হনহন করে হেঁটে সোজা চলে গেলাম যে তালগাছ ছিল ভয়ের ও ভূতের নিবাস—যার পাতা নড়লে ভয়ে ঘুমাতাম না, তার কাছে। গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম অনেকক্ষণ।
শনশন হাওয়ায় ডানা ঝাপটানো তালের পাতা জিজ্ঞেস করছিল, কী চাও হে আগন্তুক? তার তলায় দাঁড়িয়ে বারবার মনে হচ্ছিল প্রশ্ন করি—একপায়ে তো সব গাছই দাঁড়ায়, তুমি কীভাবে কাছে টানলে তাঁকে? হি হি হাসির মতো গা-ছমছমে শব্দে বাদুড় উড়ে গেল।
ফিরে তো আসতেই হবে, কিন্তু পথ তো ভুলে গিয়েছি। যে জায়গাটির নাম শান্তিনিকেতন, যেখানে রবীন্দ্রনাথ হেঁটে বেড়ান, সেখানে কি পথ হারাবে কেউ? ভোর হতে থাকা ফিকে আলোয় কানের কাছে গুনগুন করছিল এক মেয়েলি কণ্ঠ, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’... ঠিকই পথ দেখিয়েছিল এক অচেনা আলো।
এই কবি বাংলাভাষী এই দুটি অঞ্চল এবং ভারত-বহির্ভূত ভূমণ্ডলের মধ্যে আদিগন্ত একটি খণ্ডিত ইন্দ্রধনুর সাঁকো হয়ে তখন এবং এখনও বিরাজমান। পূর্ববঙ্গ ও ত্রিপুরাকে জড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ সেই কবি-মনীষীর করতলে আশ্রিত। অন্যদিকে ভূমণ্ডল, বিশেষত ইউরোপ—এই সন্ধিক্ষণে তাঁর আত্মার প্রপন্নার্তি নিয়ে তাঁরই চরণতলে আশ্রয় খুঁজছে।
যারা খেয়ে না খেয়ে তাঁর বিরুদ্ধে লাগেন তাঁদের বলি: বাংলাদেশে জমিদারি করতে এসে রবীন্দ্রনাথ এক কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। তখনকার নিয়মমাফিক জমিদারের পরিচিতি সভায় কেবল উচ্চবংশীয় হিন্দু আর ব্রাহ্মণদের বসার অধিকারে ক্ষুব্ধ কবি সবাইকে ডাকার পরামর্শ দিলেও নায়েব শুনতে নারাজ। কিন্তু কবি নাছোড়বান্দা। তা না হলে তিনি সে অনুষ্ঠানে যাবেনই না—এমন জেদের পর হিন্দু-মুসলমান সবাই মেঝেতে গোল হয়ে বসেছিল, মাঝখানে রবীন্দ্রনাথ। এভাবেই তিনি মধ্যমণি হয়ে থাকতেন।
আলখাল্লা আর গৈরিক সাজের রবীন্দ্রনাথকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল প্রজাকুল। সে সময় শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে জমিদারি দেখাশোনার সুবাদে এখানকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সংযোগ গড়ে ওঠে, যাদের সিংহভাগই ছিলেন মুসলিম। এই অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলে।
রবীন্দ্রনাথ মুসলিমদের সম্পর্কে তাঁর ভাবনা কোনো তাত্ত্বিক বই পড়ে নয়, পদ্মাপাড়ে কাটানো বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে গড়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, গ্রামীণ মুসলিম কৃষকেরা হিন্দু মহাজন ও উচ্চবর্ণের দ্বারা কতটা শোষিত ও অবহেলিত। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি অনুভব করেন যে, হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে হৃদয়ের যোগ না থাকলে কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনে মুক্তি মিলবে না।
তিনি তাঁর ‘কালান্তর’ ও ‘আত্মশক্তি’ প্রবন্ধমালায় স্পষ্ট লিখেছিলেন যে, আমরা মুসলিমদের অবহেলা করেছি বলেই আজ ব্যবধান তৈরি হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার প্রসার এবং সমবায় ব্যবস্থার মাধ্যমেই উভয় সম্প্রদায়ের দরিদ্র মানুষের মুক্তি সম্ভব। রবীন্দ্রনাথের ‘রাখীবন্ধন’ উৎসব ছিল এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরই এক অমর প্রতীক। তিনি সবসময় চেয়েছেন এমন এক সমাজ, যেখানে ধর্মীয় কোনো বিভেদ নয়, বরং মানুষ হিসেবে একে অপরের পরিপূরক হবে।
ইসলাম ধর্মের প্রতি রবীন্দ্রনাথ কতটা শ্রদ্ধা পোষণ করতেন তা দেখিয়েছেন অমিতাভ চৌধুরী। তাঁর ‘রবিকাহিনী’ এবং ‘জমিদার রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থদ্বয় রবীন্দ্র-জীবনের সেই অধ্যায়গুলোকে উন্মোচিত করে, যেখানে কবির তাত্ত্বিক দর্শনের চেয়েও তাঁর লৌকিক ও ব্যবহারিক জীবন অধিকতর উজ্জ্বল। অমিতাভ চৌধুরী অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন যে, রবীন্দ্রনাথের ইসলাম বা মুসলিম সমাজ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি কোনো কল্পনাবিলাস ছিল না; বরং তা ছিল পূর্ববঙ্গের মাটিতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে পথ চলার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ।
‘জমিদার রবীন্দ্রনাথ’ বইটিতে অমিতাভ চৌধুরী প্রমাণ করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথের কাছে জমিদারি ছিল প্রজা-কল্যাণের একটি সুযোগ। তৎকালীন পূর্ববঙ্গে মুসলিম প্রজারা হিন্দু মহাজন ও বর্ণহিন্দুর সামাজিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল। অমিতাভ চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথই প্রথম সেই প্রথা ভেঙেছিলেন যেখানে মুসলিম প্রজাদের বাড়ির বারান্দায় বসার অধিকার ছিল না। কবি পতিসরে গিয়ে তাঁদের পাশে বসার আসন করে দিয়ে কেবল সামাজিক দূরত্বই ঘোচাননি, বরং মহাজনি শোষণ থেকে এই দরিদ্র কৃষকদের বাঁচাতে নিজের নোবেল পুরস্কারের টাকা দিয়ে সমবায় ব্যাংক গড়ে তুলেছিলেন।
আবার ‘রবিকাহিনী’ গ্রন্থে তিনি কবির অসাম্প্রদায়িক চেতনার আরও গভীর স্তরের সন্ধান দিয়েছেন। অমিতাভ চৌধুরী ব্যাখ্যা করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ কেন মনে করতেন হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিরোধের মূলে রয়েছে শিক্ষার পাহাড়প্রমাণ ব্যবধান। হিন্দু সমাজ মুসলমানদের প্রান্তিক করে রেখেছিল বলেই যে বিচ্ছেদ ঘনীভূত হয়েছে, তা অমিতাভ চৌধুরী রবীন্দ্র-উদ্ধৃতিসহ বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথ মুসলিম সমাজকে একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় সত্তার চেয়ে ‘অবিচ্ছেদ্য প্রতিবেশী’ হিসেবেই গুরুত্ব দিয়েছেন। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উচ্চ ধারণা ছিল এবং তিনি মনে করতেন এই ধর্মের সংহতি ও সাম্যবোধ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। অমিতাভ চৌধুরীর এই কাজগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রবীন্দ্রনাথের ইসলাম-ভাবনা বা প্রজা-বাৎসল্য ছিল মূলত তাঁর গভীর মানবতাবোধেরই বহিঃপ্রকাশ।
অমিতাভ চৌধুরী তাঁর বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, রবীন্দ্রনাথ ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সাম্যের দর্শনকে ভারতের সংহতির জন্য অপরিহার্য মনে করতেন। ফাতেহা ইয়াজদহমের বাণীতে কবি আহ্বান জানিয়েছিলেন যাতে মানুষ ধর্মের বাহ্যিক আচারের চেয়ে অন্তরের পবিত্রতা ও মানবসেবাকে অধিক গুরুত্ব দেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, বড় পীর সাহেবের মতো মহাপুরুষদের জীবন ও বাণী মানুষকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দিয়ে উদার বিশ্বজনীনতার পথে পরিচালিত করতে পারে। মহৎ ব্যক্তিদের এই আদর্শগুলোই হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক প্রীতি ও মৈত্রীর সেতুবন্ধন রচনা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন। কবির সেই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ বাণীটি আজও ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
১৯৩৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লির জামে মসজিদ থেকে প্রকাশিত ‘পয়গম্বর সংখ্যা’র জন্য যে শুভেচ্ছা বাণী পাঠান, তাতে তিনি লিখেছিলেন: “মানুষের ইতিহাসে এক নতুন, সম্ভাবনাময় জীবনীশক্তির সঞ্চার করেছিলেন পয়গম্বর হজরত। এনেছিলেন নিখাদ, শুদ্ধ ধর্মাচরণের আদর্শ।”
রবীন্দ্রনাথ এই আশাবাদও ব্যক্ত করেছিলেন যে, “পবিত্র পয়গম্বরের প্রদর্শিত পথ যাঁরা অনুসরণ করছেন, আধুনিক ভারতবর্ষের সুসভ্য ইতিহাস রচনা করে তাঁরা যেন জীবন সম্পর্কে তাঁদের গভীর আস্থা এবং পয়গম্বরের প্রদত্ত শিক্ষাকে যথাযথ মর্যাদা দেন।”
ধর্ম বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না; তিনি ছিলেন ঋষিতুল্য একজন বাঙালি। লাঠালাঠি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি প্রমথ চৌধুরীকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন: “আমরা নাকি ধর্মপ্রাণ জাতি! তাই তো আজ দেখছি, ধর্মের নামে পশুত্ব দেশজুড়ে রাজত্ব করে বসেছে।”
এই রবীন্দ্রনাথ হলেন আমাদের প্রিয় রবীন্দ্রনাথ। যাঁকে আজকাল অপমান করে ডাকা হয় ‘র ঠা’। নাম সংকুচিত করার নামে এই ধরনের হীনম্মন্য সমাজেও ব্যাপক আলোচিত আর প্রণম্য মানুষ হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এমন এক রবীন্দ্রনাথকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে তুলে আনা হচ্ছে, যা বিকৃত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সকালে ঘুম ভাঙা থেকে জীবনের আনন্দ-বিরহ-মিলনে, এমনকি মৃত্যুতেও বাঙালির এমন বন্ধু, এমন হিতৈষী আর কে আছেন?
কতটা বিনয়ী আর অমায়িক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ? তান ইয়ুন-সান এসেছিলেন চীন থেকে। পড়াবার জন্য শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলায় এসে দেখলেন গুটিকয়েক ছাত্র বসে। একটু মনখারাপ তো হবেই। যথারীতি ক্লাস শুরুর আগে মনঃসংযোগের জন্য চোখ মুদে প্রাণায়ামে বসলেন। চোখ খুলে আনন্দে মন নেচে উঠল তাঁর; স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বসে আছেন ছাত্রদের সঙ্গে।
পুত্র রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছবির তলায় দাঁড়িয়ে সেবার আমার মনে হচ্ছিল, এই এখনই তিনি গেয়ে উঠবেন— ‘কাটবে গো দিন আজও যেমন দিন কাটে...’।
সকাল থেকে রাত, জীবন থেকে মৃত্যু অবধি এমন করে আর কে আমাদের জীবনতরী বেয়ে চলেছেন? কবিতা, গান ও গদ্যে এমন স্বয়ম্ভুকে শ্রদ্ধা জানাই তাঁর প্রিয় শ্লোক দিয়ে, যা তাঁরই পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন; যা শান্তিনিকেতনের মূল মন্ত্র বা বাণী হিসেবে পরিচিত এবং সেখানকার ছাতিমতলার ফলকে খোদাই করা আছে:
“তুমি আমার প্রাণের আরাম
তুমি আমার মনের আনন্দ
তুমিই আমার আত্মার শান্তি।”
রবীন্দ্রনাথের অনেক কিছুই বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু তাঁকে বাদ দেওয়া যায় না। যায় না কেন? কারণ তাঁর মতো করে আর কেউ লিখতে পারেননি:
“কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো—
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।”
শুভ জন্মদিন, ছায়াময় মায়াময় রবীন্দ্রনাথ। আমরাও মানি মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ; আপনি ঠিক তাই শিখিয়েছেন আমাদের।