অচেনা তারাশঙ্কর

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী তারাশঙ্কর বন্দোপ্যাধায় ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মারা যান।

চিররঞ্জন সরকারচিররঞ্জন সরকার
Published : 14 Sept 2022, 02:43 PM
Updated : 14 Sept 2022, 02:43 PM

এমনিতে দেখতে তিনি ছিলেন শ্যামবর্ণ, শীর্ণ, সাধারণ চেহারার এক মানুষ। ছিলেন অনেক শৌখিনও। স্নানের আগে গায়ে দিতেন সুগন্ধ তেল। মাথায় জবাকুসুম। স্নান শেষেও গায়ে দামি কোম্পানির ভারী মিষ্টি সুগন্ধি ক্রিমের প্রলেপ। এমনকি তাঁর আঙুলের পান্নার আংটিটা থেকে পর্যন্ত সৌরভের আভাস পাওয়া যেত। উল্লিখিত বর্ণনার পর তারাশঙ্করের নাতনি লিখেছেন, "আমাদের কাছে দাদু মানেই সুগন্ধ।" শুধু পরিবারেই নয়, পুরো সমাজেই সৃজনশীলতার ‘সুগন্ধ’ ছড়িয়েছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার। কিন্তু সাংবাদিক তারাশঙ্করকে আমরা কতটকু চিনি? অথবা গীতিকার বা চিত্রকর তারাশঙ্করকে?

সাংবাদিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের বড়ই অচেনা। অথচ জীবনের প্রায় শেষ পর্বে এই সাংবাদিকতার কাজ তাকে গ্রহণ করতে হয়েছিল কতকটা দায়ে পড়েই। প্রিয় জামাতা শান্তিশঙ্কর মারা গিয়েছেন। তার বিধবা স্ত্রী (তারাশঙ্করের বড় মেয়ে গঙ্গা দেবী), তিনটি কন্যা ও একটি পুত্র, সকলের দায় তারাশঙ্করের কাঁধে। নাতি-নাতনিদের খাওয়া-পরা জোগানোটা তারাশঙ্করের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিল। এই অবস্থায় তারাশঙ্কর যুগান্তর পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজ নেন। তাঁর আত্মজীবনীর শেষ পর্ব ‘আমার কথা’য় তিনি বলেছেন, ‘‘আমাকে এগিয়ে যেতে হয়নি আমার দুর্দিনে, তুষারবাবুই ঘটনাটি জানতে পেরে নিজেই এগিয়ে এসে সমাদর করে আহ্বান জানালেন।’’ তবে এই কাজটি তার জন্য সহজ ছিল না। সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছিল তার রাজনৈতিক সত্তার সঙ্গে লেখক সত্তার বিরোধ। তারাশঙ্কর ছিলেন একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ। ১৯৩০ সালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে তিনি কারাবরণ করেন। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে, রাজনীতির পাশাপাশি লেখালেখি শুরু করেন।

১৯৬৩ সালের ২৭ জুলাই থেকে ১৯৬৭ সালের জুন পর্যন্ত চার বছর ধরে প্রতি শনিবার যুগান্তরের সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় তিনি গ্রাম বাংলার সংবাদ লিখতেন ‘গ্রামের চিঠি’ নামে। গ্রামের চিঠিতে তারাশঙ্কর লিখেছেন গ্রামের চাষবাস, জল-হাওয়ার কথা, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা, গ্রামের ক্রমপরিবর্তনের কথা। এ-সব চিঠি যখন লিখছেন তারাশঙ্কর, তখন তিনি রাজ্যসভায় কংগ্রেস দলের সদস্য। নিজে যেই দলের এমপি, সেই দলের অন্তর্কলহ, দুর্নীতি সম্পর্কে সমালোচনা করছেন অকুণ্ঠ চিত্তে।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিল্লির হাই কমান্ড পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এ বিষয়ে তার অবস্থান জানিয়ে এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘‘...আমার দিক থেকেও সত্যকে প্রকাশ করতে ভীত আমি কোনদিন হব না। কারণ লেখক এক সত্যের কমাণ্ড ছাড়া অন্য কোন কমাণ্ডের অধীন নন। আমিও নই।”

তার এই গ্রামের চিঠিতে সেই সময়ের রাজনীতির কথা বারবার এসেছে। এসেছে গ্রামবাংলার সমস্যার কথা, গ্রামের দলাদলির কথা, নোংরামীর কথা বলতে গিয়ে উঠে এসেছে সাহিত্যের কথাও। গ্রামের সমাজব্যবস্থাই শুধু নয়, তার কৃষি ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, শোষণের স্বরূপ সবই ছিল তারাশঙ্করের নখদর্পণে। বহু চিঠিতে উঠে এসেছে সেসব কথা। এ-সব চিঠিতে কথাকার তারাশঙ্কর আর সাংবাদিক তারাশঙ্করের কলম যেন বারবার লুকোচুরি খেলেছে।

স্বাধীনতা লাভের পরে দুর্নীতির চরম বাড়বাড়ন্ত তারাশঙ্করকে ব্যথিত করেছিল। কিন্তু দুর্নীতির মধ্যেও যখন স্বল্পসংখ্যক ‘নবযুগের তরুণ’দের মাঝে আলোর সন্ধান পেয়েছেন, আশায় দীপ্ত হয়ে উঠেছেন তিনি। বলেছেন, ‘‘আমি দেখলাম, দুর্নীতির অন্ধকারের মধ্যে নীতির আলোও জ্বলছে। ... মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে বলব, এই প্রদীপ, নতুন প্রদীপগুলিকে সন্ধান করুন। তাদের শিখামুখের সলতে উসকে দিন। তাতে তেল যোগান দিন।’’’

এবার তারাশঙ্করের নাট্যজীবনের দিকে একটু নজর ফেরানো যাক। নাটক লেখা দিয়েই সাহিত্যের জগতে পা রাখেন তারাশঙ্কর। ‘ইতিহাস ও সাহিত্য’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, "...অভিনয় ভালো লাগে, নাটক রচনা করি। সে রচনা অবশ্য তখন solitary pride- এর সামিল আমার কাছে। মধ্যে মধ্যে জমজমাট নাট্যমঞ্চে অভিনয় করি। দেশপ্রেম, নাট্য রচনা ও অভিনয়-স্পৃহা এই তিনের সম্মিলিত ফল এক সময় দাঁড়াল একখানি পঞ্চাঙ্ক নাটক। নাম ‘মারাঠা তর্পণ’।"

‘মারাঠা তর্পণ’ নাটকটি বীরভূমের বিশিষ্ট অভিনেতা-নাট্যকার নির্মলশিব বন্দ্যোপাধ্যায়—তিনি সম্পর্কে তারাশঙ্করের আত্মীয় ছিলেন— কলকাতার পেশাদার মঞ্চে অভিনয়ের জন্যে দেন অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে। শোনা যায়, অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ‘মারাঠা তর্পণ’ না পড়েই নির্মলশিবকে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। এই ঘটনা জেনে তারাশঙ্কর এতটাই দুঃখ পেয়েছিলেন যে, এই নাটকের পাণ্ডুলিপি আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। আর এই ঘটনার পরেই তিনি নাটক থেকে সরে এসে কথাসাহিত্যের পথে যাত্রা শুরু করেন। সময় গড়িয়ে যায়। তারাশঙ্কর ছোটগল্প, উপন্যাস লেখায় মনোনিবেশ করেন। ক্রমশ সাহিত্যজগতে তার পরিচিতি ও খ্যাতি দুই-ই বাড়তে থাকে। আর সেই খ্যাতির সূত্রেই আবার সদর্পে তিনি প্রবেশ করেন নাটকে। মনের গভীরে কোথাও নাটকের প্রতি ভালোবাসা যেন লুকিয়ে ছিল। ১৯৪১ সালের ১২ জুলাই ‘নাট্যনিকেতন’ মঞ্চস্থ করল তারাশঙ্করের ‘কালিন্দী’ নাটক।

গীত রচনা ও সুর-সৃজন করলেন স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম। ২৭ রজনীর পর মামলাসংক্রান্ত ঝামেলায় এ নাটকের প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু নাটকের জগতে তারাশঙ্করের জায়গা বেশ পাকাপোক্ত হয়। পরের বছর, ১৯৪২ সালের ১৮ মে ‘নাট্যভারতী’ তারাশঙ্করের ‘দুই পুরুষ’ মঞ্চে নিয়ে আসে। নুটু ও রানির চরিত্রে অভিনয় করেন যথাক্রমে ছবি বিশ্বাস ও প্রভা দেবী। চল্লিশ থেকে ষাটের দশকের প্রায় শেষ পর্যন্ত ‘পথের ডাক’, ‘বিংশ শতাব্দী’, ‘দ্বীপান্তর’, ‘যুগ বিপ্লব’, ‘কবি’, ‘কালরাত্রি’, ‘সংঘাত’, ‘আরোগ্য নিকেতন’ ইত্যাদি নাটক অভিনীত হতে থাকে ‘নাট্যনিকেতন’, ‘রঙমহল’, ‘স্টার’, ‘বিশ্বরূপা’ ইত্যাদি বিখ্যাত নাট্যমঞ্চে, বিপুল দর্শক-সমর্থন নিয়ে।

তারাশঙ্করের বেশির ভাগ নাটকই তাঁর গল্প ও উপন্যাস থেকে লেখা। শুধু ‘যুগবিপ্লব’ ও ‘দ্বীপান্তর’ নাটক দু’টি সরাসরি নাটক হিসেবেই লিখেছিলেন। তবে তাঁর কথাসাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি যেমন তুঙ্গে উঠেছিল, নাট্যকার হিসেবে পরিচিতি ততটা হয়নি। যদিও তার বেশ কিছু নাটক জনপ্রিয়তার নিরিখে ভালো মঞ্চসাফল্য পেয়েছিল।

শুধু নাটক লেখা নয়, নাটকে অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তার উৎসাহ ছিল অসীম। বীরভূমের লাভপুরের অতুলশিব মঞ্চে তিনি অনেক নাটকে অভিনয় করেন। ‘সীতা’ নাটকে তিনি সীতার চরিত্রে অভিনয় করে জন-সমাদৃত হয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। এ ছাড়াও ‘গৃহলক্ষ্মী’ নাটকে মেজবৌ, ‘প্রতাপাদিত্য’ নাটকে কল্যাণী, ‘চাঁদবিবি’ নাটকে মরিয়ম, ‘বঙ্গলক্ষ্মী’ নাটকে বিনোদিনীর চরিত্রেও তিনি দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। তৎকালে পুরুষ শিল্পীরা নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন, এটা খুব আশ্চর্যের ছিল না। তবে তারাশঙ্কর শুধু নারী চরিত্রেই নয়, ‘কর্ণার্জুন’, ‘চিরকুমার সভা’, ‘বশীকরণ’, ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ ইত্যাদি নাটকে তিনি পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করেও প্রশংসা পেয়েছিলেন। এ ছাড়া ‘পার্থসারথি’, ‘পোষ্যপুত্র’, ‘প্রফুল্ল’, ‘মন্ত্রশক্তি’, ‘সরমা’ ইত্যাদি নাটকেও তিনি অভিনয় করেছিলেন। এই সব নাটকের অনেকগুলিই তারাশঙ্করের নির্দেশনাতেই মঞ্চস্থ হয়েছিল, প্রায় সব নাটকই মঞ্চস্থ হয় লাভপুরের অতুলশিব মঞ্চে ও সংলগ্ন অঞ্চলে।

‘আমার সাহিত্যজীবন’ রচনায় তারাশঙ্কর লিখেছেন, "আজ বলি আমার সাহিত্যিক জীবনে এই রঙ্গমঞ্চের সাহায্য পরিমাণে সামান্য হলেও দুঃসময়ের পাওনা হিসাবে অসামান্য। সেদিন রঙ্গমঞ্চের এই সাহায্য না পেলে সাধনার অকৃত্রিম নিষ্ঠা সত্ত্বেও আমার জীবনে এ সাফল্য অর্জন সম্ভবপর হত না।"

নাটক লেখা এবং মঞ্চেও অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি সিনেমার জন্য গানও লিখেছেন। কয়েকটি উদাহরণ: ‘বিদগ্ধ যৌবন’, ‘বঁধু অনেক কাঁদায়ে’ (শিল্পী ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়, সিনেমার নাম ‘রাইকমল’), ‘হাঁসুলি বাঁকের কথা বলব কারে’ (শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সিনেমার নাম ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’), ‘এই খেদ মোর মনে’, ‘কালো যদি মন্দ তবে’ (শিল্পী রবীন মজুমদার, সিনেমার নাম ‘কবি’), ‘এক ঘেঁটু তার সাত বেটা’ (শিল্পী মান্না দে ও সহশিল্পীবৃন্দ, সিনেমার নাম ‘গণদেবতা’)। তারাশঙ্করের লেখা গান ‘মধুর মধুর বংশী বাজে কোথা কোন কদমতলিতে’ সন্ধ্যার কণ্ঠের অনবদ্য নিবেদনে সংগীতের দুনিয়ার এক চিরন্তন সম্পদ হয়ে আছে।

তারাশঙ্কর ছবিও আঁকতেন, তার শিল্পচর্চার শুরু বাড়ির দেওয়ালে— চুঁইয়ে-আসা জলে দেওয়ালের গায়ে যে জলছবি আপনা-আপনিই গড়ে উঠত, তাতে খড়ি-রং-কাঠকয়লা বুলিয়ে।

১৯৬২ সালে তাঁর বড় জামাই অকালে প্রয়াত হওয়ায় শোকস্তব্ধ হয়ে তিনি দীর্ঘদিন হাতে কলমই প্রায় ধরেননি। কিন্তু জাতশিল্পী কি প্রকাশ ছাড়া বাঁচতে পারেন? তাই বুঝি ওই সময় তিনি হাতে রংতুলি তুলে নিয়েছিলেন। ছবি এঁকেছিলেন নিরন্তর। এর মধ্যে বিখ্যাত ব্যক্তিদের অনেকগুলি প্রতিকৃতি ছিল। ছিল আত্মপ্রতিকৃতিও। ছিল তাঁর নিজের উপন্যাসের ক’টি চরিত্রের রূপায়ণ— কৃষ্ণেন্দু, রিনা ব্রাউন প্রভৃতি। এর মধ্যে সবচেয়ে ভাল হয়েছিল ‘আরোগ্য নিকেতন’ উপন্যাসের মৃত্যুরূপিণী অমৃতস্বরূপার দার্শনিক অভিব্যক্তিপূর্ণ ছবিটি। তার সব ছবিই ছিল তেলরঙে আঁকা।

পাতলা কাঠের ক্যানভাসেও তিনি অনেক ছবি এঁকেছেন। ল্যান্ডস্কেপে আঁকা তাঁর কিছু ছবিতে হলুদ, সবুজ আর চারকোল কালো রঙ ব্যবহারের দক্ষতা লক্ষ করা যায়। সবুজ ধানখেতের ওপর হলুদ রঙের রোদ্দুরের আঁচল পড়ে থাকার দৃশ্য-আর ঘন গাছের জঙ্গলে অন্ধকারের স্তর— গাঢ় থেকে আবছা, কত রকমের কালো রঙের ব্যবহার!

তার সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিশীল জীবনের সমাপ্তি ঘটে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর কোলকাতা শহরে। এই মহান সৃষ্টিশীল মানষটির প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছি।

 ঋণ: আমার সাহিত্য জীবন, ১ম খণ্ড (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়), তারাশঙ্কর: ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্য (সম্পদনা: প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য), বিশেষ তারাশঙ্কর সংখ্যা (বৈশাখী), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় জন্মশতবর্ষপূর্তি সংখ্যা (কথাসাহিত্য), তারাশঙ্কর সংখ্যা (আজকের কাদম্বরী), আনন্দবাজার পত্রিকা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক