০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

গাধা উন্নয়ন প্রকল্প এবং একটি ভালো কলেজের গল্প

একজন ছাত্র গণিতে দক্ষ হতে পারে, অন্যজন হয়তো বিতর্কে, কেউ প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে, কেউ বা চমৎকার সংগঠক। ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই বৈচিত্র্যকে মর্যাদা দেয়, ছাত্রদের দায়িত্বশীল ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

গাধা উন্নয়ন প্রকল্প এবং একটি ভালো কলেজের গল্প

একটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্থকতা কেবল ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের প্রশংসায় সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের টেনে তোলা ও সার্বিক বিকাশে অবদান রাখার ওপর নির্ভর করে। নটর ডেম কলেজের ফাইল ছবি।

মুনতাসির মামুন মুনতাসির মামুন

Published : 01 Nov 2026, 07:27 PM

Updated : 01 Nov 2026, 07:27 PM

নটর ডেম কলেজে আমাদের সময় একটা প্রকল্প ছিল। নাম ‘অ্যাস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’, সংক্ষেপে এডিপি। বাংলায় বললে ‘গাধা উন্নয়ন প্রকল্প’। নাম শুনে মনে হতে পারে, কোনো প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচি। বাস্তবে এটি ছিল কলেজের পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের গণিতে উন্নতি করার ব্যবস্থা।

নামটা কলেজ কর্তৃপক্ষের দেওয়া ছিল, নাকি ছাত্রদের নিজেদের উদ্ভাবন, সাতাশ বছর পর আর নিশ্চিত করে বলতে পারব না। তবে নামটা যে আমাদের মধ্যে বেশ চালু ছিল, তা মনে আছে। আর xই ক্লাসগুলোর কথা তো আরও ভালোভাবেই মনে আছে।

১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত নটর ডেম কলেজে পড়েছি। আমরা ১৯৯৯ ব্যাচ। বিজ্ঞান বিভাগের গ্রুপ টু-তে ছিলাম। প্রথম বর্ষ থেকে দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার সময় গণিত পরীক্ষায় আমাদের বড় একটি অংশ ফেল করল। নটর ডেমের মতো কলেজে এত ছাত্র গণিতে ফেল করছে, ব্যাপারটা নিশ্চয়ই খুব সুখকর ছিল না। কলেজ কর্তৃপক্ষ তখন এডিপি চালু করল। নিয়মিত ক্লাস শেষ হওয়ার পর আমাদের অতিরিক্ত গণিত ক্লাস করতে হতো।

আমাদের গণিতের শিক্ষক ছিলেন বিদ্যুৎ কুমার ভদ্র, যাকে আমরা বি সি ভদ্র নামে চিনতাম। তার রসবোধ ছিল বেশ ধারালো। ছাত্রদের বিব্রত করতে তিনি বিশেষ কার্পণ্য করতেন না। একদিন বললেন, “তোমরা যারা শূন্য পেয়েছ, তোমাদের নিয়ে আমার আশা বেশি। কারণ তোমরা মূলবিন্দুগামী। সবকিছুর শুরু তো মূলবিন্দু থেকেই। সমস্যা হচ্ছে যারা দশ-পনেরো পেয়েছ, তাদের নিয়ে। তোমরা জানোও, আবার জানোও না। তোমাদের নিয়ে এগোনো কঠিন।”

এত বছর পরও কথাগুলো মনে আছে। তখন নিশ্চয়ই খুব আনন্দ পাইনি। আজ ভাবলে হাসি পায়। তবে এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষকের ব্যঙ্গ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি কলেজ তার ফেল করা ছাত্রদের নিয়ে কী করেছিল।

কলেজ তাদেরকে ছেঁটে ফেলেনি। তাদের ব্যর্থতাকে কেবল ব্যক্তিগত অযোগ্যতা ধরে নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। বরং নিয়মিত ক্লাসের বাইরে আলাদা সময় আর শিক্ষক বরাদ্দ করে তাদের উৎরে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

আজকের আধুনিক শিক্ষা ভাবনায় এডিপি নামটা হয়তো আপত্তিকর শোনাবে। দুর্বল শিক্ষার্থীকে ‘গাধা’ বলা কোনো আদর্শ চর্চা নয়, আর শিক্ষকের খোঁচাও সবার জন্য একরকম ফল দেয় না। তবে নাম ও পদ্ধতির খোলস ছাড়িয়ে দেখলে এর পেছনে একটা দায়িত্বশীল প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে, পিছিয়ে পড়া ছাত্রের দায়িত্বও কলেজের।

এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। এবারও নটর ডেম কলেজ বরাবরের মতোই ভালো করেছে। ২০২৬ সালে তাদের ৩ হাজার ২৫৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩ হাজার ২১৮ জন পাস করেছে, যার মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ২২৯ জন। পাসের হার ৯৮.৮৩ শতাংশ, যেখানে সারা দেশে পাসের গড় হার ৫২.১২ শতাংশ।

এমন অর্জনে প্রশংসা হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমার চোখ যায় অন্য জায়গায়। একটা প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে এই ধারা ধরে রাখে কীভাবে?

নটর ডেমের শিক্ষকরা কি দেশের আর সব শিক্ষকের চেয়ে বেশি মেধাবী? এমনটি দাবি করার ভিত্তি নেই। কিংবা সেখানকার ছাত্ররাই কি দেশের সেরা মেধাবী? সেটাও ঢালাওভাবে বলা যায় না।

অবশ্যই ভর্তি পরীক্ষার ছাঁকনি দিয়ে ভালো প্রস্তুতি নিয়ে আসা ছেলেদের বেছে নেওয়ার বাড়তি সুবিধা কলেজটি পায়। এই বাস্তবতাকে বাদ দিলে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সব প্রতিষ্ঠান তো আর একই মানের শিক্ষার্থী বা সমান সুযোগ-সুবিধা পায় না।

কিন্তু ভালো ছাত্র ভর্তি করানো আর দুই বছর পর তাকে আরও ভালো ফলাফলে পৌঁছে দেওয়া এক কথা নয়।

স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে পা দিয়েই ছাত্ররা কঠিন ও বিশাল পাঠ্যক্রমের মুখোমুখি হয়। অথচ হাতের সময়টুকু খুব কম। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি যুদ্ধের আগাম ভাবনাসহ নানা মানসিক চাপ তো আছেই।

এই পরিস্থিতিতে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা শুধু পাঠ্যবই শেষ করানো হতে পারে না। তাকে এমন এক আবহ তৈরি করতে হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখাকে গুরুত্বও দেবে, আবার পাঠ্যবইয়ের বাইরে নিজেদের নানা দক্ষতা চিনে নেওয়ার সুযোগও পাবে।

নটর ডেমের বিশেষত্ব সম্ভবত এখানেই। এখানে অজস্র ক্লাব ও সহশিক্ষা কার্যক্রম সক্রিয়। বিজ্ঞান, বিতর্ক, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, দাবা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, নানা ধারায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায় ছাত্ররা। এসব কার্যক্রম কেবল সনদ সংগ্রহ বা বার্ষিক প্রদর্শনীর মধ্যে আটকে থাকে না। নিয়মিত চর্চা, মাঠপর্যায়ের কাজ, প্রকাশনা ও দলগত দায়িত্ব সামলানোর মধ্য দিয়ে ছেলেরা বেড়ে ওঠে।

আমি নিজে নটর ডেম নেচার স্টাডি ক্লাবের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবটি দেশে প্রকৃতি অধ্যয়নভিত্তিক সংগঠনগুলোর অন্যতম পথিকৃৎ। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, মাঠের কাজ, আলোকচিত্র আর পরিবেশবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনার হাতেখড়ি আমার এই কলেজজীবনেই।

একজন ছাত্র গণিতে দক্ষ হতে পারে, অন্যজন হয়তো বিতর্কে, কেউ প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে, কেউ বা চমৎকার সংগঠক। ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই বৈচিত্র্যকে মর্যাদা দেয়, ছাত্রদের দায়িত্বশীল ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

আরেকটি বিষয় রয়েছে, যা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না, তা হলো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। নটর ডেমে পড়ার সময় একটা বোধ অলক্ষ্যে ছাত্রদের মনে ঢুকে যায়, এখানে পড়াশোনাটা গুরুত্ব দিয়ে করতে হয়। ভালো করার একটা তাগিদ চারপাশেই থাকে। শিক্ষক, সহপাঠী, সিনিয়র ভাই, ক্লাব আর ঐতিহ্য, সবকিছু মিলেই ওই ইতিবাচক চাপ তৈরি করে।

এটা কেবল জিপিএ-৫ পাওয়ার চাপ নয়; একটা ঐতিহ্যের অংশ হওয়ার অনুভূতি। একধরনের আত্মপরিচয়, যা কলেজ ছাড়ার বহু বছর পরও ম্লান হয় না।

এই পরিচয়ের অবশ্য বিপদও আছে। প্রতিষ্ঠানের প্রতি গর্ব কখনো কখনো আত্মতুষ্টি কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানকে ছোট করে দেখার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। ওই কারণে নটর ডেমকে ব্যতিক্রমী বলে প্রশংসা করার চেয়ে বেশি জরুরি হলো, এর কার্যকর পদ্ধতিগুলো বোঝা।

বাংলাদেশের আরও অনেক ভালো কলেজ আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ভালো কলেজের সংখ্যা আরও বেশি হচ্ছে না কেন?

প্রতিটি কলেজের পক্ষে নটর ডেমের মতো ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়। সবার একই অবকাঠামো, অর্থ কিংবা শিক্ষকসংখ্যাও থাকবে না। কিন্তু নিয়মিত পাঠদানের প্রতি দায়বদ্ধতা, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা, সহশিক্ষা কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া এবং শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যে একটি কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা, এসব কি অসম্ভব?

একটা কলেজের সার্থকতা শুধু কতজন জিপিএ-৫ পেল তা দিয়ে মাপা যায় না। দেখতে হয়, ভর্তির সময় যে ছেলেটা যেখানে ছিল, দুই বছর পর সে সেখান থেকে কতটা পথ এগোল। যে আগে থেকেই ভালো ছিল তাকে ধরে রাখা যেমন সাফল্য, যে পিছিয়ে ছিল তাকে সামনে টেনে আনাও তেমনই সাফল্য।

এমনকি পরীক্ষার খাতায় খুব ভালো না করলেও একটা ছেলে যদি অনুসন্ধিৎসু, দায়িত্বশীল ও আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ হয়ে বের হতে পারে, তবে সেটাও ওই প্রতিষ্ঠানের অনেক বড় অর্জন।

সাতাশ বছর আগে আমাদের গণিত পরীক্ষার বিপর্যয়ের পর নটর ডেম কলেজ যে বাড়তি ক্লাসের ব্যবস্থা করেছিল, তা কোনো বৈপ্লবিক শিক্ষা আন্দোলন ছিল না। কিন্তু তার ভেতর একটা সহজ সত্য ছিল, ছাত্রের দুর্বলতা থাকলে তাকে আরও শেখাতে হবে।

আজ এইচএসসির ফল ঘিরে যখন চারদিকে ভালো-খারাপ কলেজ, জিপিএ-৫ আর পাসের হারের হিসাব চলছে, তখন আমার ওই পুরোনো ‘গাধা উন্নয়ন প্রকল্প’-এর কথাই বারবার মনে পড়ছে। কারণ একটা ভালো কলেজের আসল পরিচয় শুধু তার সেরা শিক্ষার্থীদের সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের তারা কীভাবে সামলে নেয়, তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

মুনতাসির মামুন: লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী। ইমেইল: muntasir@gmail.com