সারাদেশে পাসের হার কমলেও নটর ডেম-আইডিয়ালে স্বস্তি
“যখন দেখলাম, সারা দেশে পাসের হার মাত্র ৫২ শতাংশ, তখন কিছুটা চিন্তা শুরু হয়।”
এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সকালে সুনসান নীরবতা থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৈ হুল্লোর দেখা গেছে ঢাকার নটর ডেম কলেজ এবং মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে।
এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সারাদেশে পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। সারাদেশের এ চিত্র নিয়ে হতাশা থাকলেও ঢাকার দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্ছ্বাসই দেখা গেছে।
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, নটর ডেম কলেজ থেকে এবার ৩ হাজার ২৫৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৩ হাজার ২১৮ জন। পাসের হার ৯৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ২২৯ জন। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১ হাজার ৮০৭ জন, ব্যবসায় শিক্ষায় ৩৩৩ জন এবং মানবিকে ৮৯ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
অন্যদিকে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ১ হাজার ৭৯১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছেন ১ হাজার ৭৫৯ জন। পাসের হার ৯৮ দশমিক ২১ শতাংশ। এ কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৮৭ জন। এর মধ্যে বিজ্ঞানে ৩৪৬ জন, ব্যবসায় শিক্ষায় ৩১ জন এবং মানবিকে ১০ জন।
নিজেদের ফলে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে মতিঝিল আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক লাল মোহাম্মদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সারাদেশে পাসের হার ৫২ শতাংশের কিছু বেশি হলেও আমাদের প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ৯৮ দশমিক ২১ শতাংশ। এ ফলাফলে আমরা সন্তুষ্ট।”
ভালো ফলের জন্য পাঁচ মাসের বিশেষ প্রস্তুতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, একদিন ক্লাস এবং পরের দিন মডেল টেস্ট নেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠার বিষয়ে শিক্ষকদের নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এবারের প্রশ্নপত্র সম্পর্কে লাল মোহাম্মদ বলেন, “আমার কাছে মনে হয়েছে, এবারের প্রশ্নপত্র, বিশেষ করে বিজ্ঞানের পদার্থবিজ্ঞান, বাংলা ও ইংরেজির প্রশ্ন কিছুটা এলোমেলো ছিল।”
বিজ্ঞানের ফল খারাপ হওয়ার পেছনে শিক্ষাগত ভিত্তি, পর্যাপ্ত সময় ও শ্রম, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং নিয়মিত তদারকির অভাব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
সারাদেশে পাসের হার কমার বিষয়ে নটর ডেম কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সোলায়মান ওয়ালিদ খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত বাসায় পড়াশোনা, কলেজে যাওয়া ও ক্লাস করার মতো মৌলিক অভ্যাস কমে যাচ্ছে।”
ভালো ফলের পেছনে বিশেষ কোনো কৌশল নেই মন্তব্য করে তিনি নিয়মিত পড়াশোনা, ক্লাসে অংশগ্রহণ ও কুইজের মাধ্যমে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
ওয়ালিদ খান বলেন, “শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের পাঠদান, প্রশ্নোত্তর ও অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে যে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়, তা বাসায় একা পড়ার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়।”
অসুস্থতার সঙ্গে লড়েও সব বিষয়ে জিপিএ-৫
বাণিজ্য বিভাগ থেকে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পাওয়া মতিঝিল আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী শান্তা আক্তার পরীক্ষার সময় গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। এ সময় তার তিনবার অস্ত্রোপচার হয়।
শান্তা বলেন, “মা, বোন, ভাই এবং শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারণেই আজ আমি এই ফল করতে পেরেছি। এতো অসুস্থতার মধ্যেও গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাব, তা আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না।”
শান্তার মা শারমিন বেগম বলেন, “মেয়েকে অনেক কষ্ট করে লড়াই করতে হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পরও সে কোনো পরীক্ষা বাদ দেয়নি। শিক্ষকরাও সবসময় তার খোঁজখবর রেখেছেন ও সহযোগিতা করেছেন। মেয়ের এই ফলাফলে তিনি গর্বিত।”
নটর ডেম কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া জুবায়ের ইসলামের স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া।
তার মা কামরুন্নাহার বললেন, ছেলের পড়াশোনার সুবিধার জন্য স্বামীকে বরিশালের উজিরপুরে রেখে তিনি ঢাকায় এসে ছেলেকে নিয়ে থাকছেন। এজিবি কলোনিতে একটি বাসার এক কক্ষে সাবলেটে থাকেন তারা।
কামরুন্নাহার বলেন, “আমি ছেলেকে কোনো প্রাইভেট পড়াতে পারিনি। কলেজের শিক্ষকেরা যা পড়িয়েছেন, সে সেগুলোই অনুসরণ করেছে।”
ছেলের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বাসায় ফিরে জুবায়ের প্রচুর পড়াশোনা করত। খাওয়ার কথা বললেও পড়া শেষ না করে উঠতে চাইত না।
তার প্রত্যাশা, ছেলে চিকিৎসক হয়ে অন্তত ১০ জন মানুষের সেবা করবে।
নটর ডেমের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী সিফাত আহমেদও কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়ে আনন্দিত।
এসএসসিতে অল্পের জন্য জিপিএ-৫ না পাওয়ায় এবার তা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ছিল তার বেশি।
সিফাত বলেন, “যখন দেখলাম, সারা দেশে পাসের হার মাত্র ৫২ শতাংশ, তখন কিছুটা চিন্তা শুরু হয়। তবে সারা বছর পড়াশোনা করেছি, নিয়মিত কুইজ দিয়েছি, তাই নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস ছিল।
“আমি কখনো প্রাইভেট পড়িনি বা কোচিং করিনি। আমার এই ফলের পেছনে সম্পূর্ণ অবদান নটর ডেম কলেজের শিক্ষকদের।”
তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে ভর্তির প্রস্তুতি নেবেন। আইবিএর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি কিছুটা ভিন্ন ও গণিতনির্ভর হওয়ায় সেখানে ভালো করতে আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
নটর ডেমের আরেক শিক্ষার্থী শাহনেওয়াজ বলেন, “সামগ্রিকভাবে জিপিএ-৫ পেয়েছি। তবে বাংলা ও ইংরেজিতে এ প্লাস আসেনি।
“আমার অনেক বন্ধুর ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে। ফিজিক্স-কেমিস্ট্রিসহ বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে ভালো হওয়ায় উদ্বেগ ও স্বস্তি, দুই অনুভূতিই কাজ করছে।”
‘জিপিএ-৫ই জীবনের সবকিছু নয়’
অল্পের জন্য জিপিএ-৫ না পাওয়া বুশরা আক্তার বলছেন, জিপিএ-৫ না পাওয়া নেই হতাশার কিছু নেই।
তিনি বলেন, “এবারের পরীক্ষা অনেক কঠিন হয়েছে। জিপিএ-৫ না আসাটা মন খারাপের বিষয় নয়। কারণ জিপিএ-৫ই জীবনের সবকিছু নয়। হয়তো সামনে তার জন্য আরও ভালো কিছু অপেক্ষা করছে।”
কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে না পারা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বুশরা বলেন, ফল নিয়ে হতাশ না হয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মনোযোগ বাড়ানো উচিত। জিপিএ গুরুত্বপূর্ণ হলেও কঠোর পরিশ্রম করে ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করার সুযোগ রয়েছে।
মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া একই কলেজের তাহমিনা মজুমদার বলেন, বাবা-মা ও শিক্ষকদের সহযোগিতার পাশাপাশি নিজের পরিশ্রমের কারণেই তিনি ভালো ফল করেছেন। এখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেবেন।
অকৃতকার্য বন্ধুদের উদ্দেশে তাহমিনা বলেন, খারাপ ফল হয়েছে বলে কেউ জীবনে পিছিয়ে পড়েনি। আরেকটু চেষ্টা করলে তারা আবার এগিয়ে যেতে পারবে। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী আনজুর রহমানও কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তবে এবারের প্রশ্নপত্র নিয়ে অভিযোগ রয়েছে তার।
বাংলা প্রথম পত্রের বহুনির্বাচনি এবং পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নে ভুল ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
কয়েকটি বিষয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়নেও নম্বরের অসংগতি রয়েছে বলে মনে করেন আনজুর।
শিক্ষার মান উন্নয়নে শুধু উত্তরপত্র কঠোরভাবে মূল্যায়ন নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদানের মানও নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আনজুর বলেন, “আমি জানতে পারলাম ২৯৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি। খাতা কঠোরভাবে দেখলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও কেন কঠোরভাবে তদারক করা হবে না? বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের অনেক কলেজে নিয়মিত ক্লাস হয় না।
“কোথাও শিক্ষকেরা ঠিকমতো পড়াতেও চান না। শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে প্রশ্ন কঠিন করার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কী পড়াচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে।”
অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ফেল করলেই সব শেষ, বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুল। যারা ফেল করেছেন, তাদের আরেকটি সুযোগ দেওয়া উচিত। পরিবারেরও উচিত সন্তানদের পাশে দাঁড়ানো।
“এক-দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হলে সম্ভব হলে পরবর্তী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ফল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে। কারণ তাদের জায়গায় আমরাও থাকতে পারতাম।”
ভবিষ্যতে আর্কিটেকচার বিষয়ে পড়ার ইচ্ছা রয়েছে জানিয়ে আনজুর বলেন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা পূরণ হলে সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেবেন। তা না হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যাবেন।
