সোশ্যাল মিডিয়ার অনৈতিক ব্যবহার: বিশ্বব্যাপী নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রধান চ্যালেঞ্জ

ইমরান খানের বিজয়ে আমি তাকে অভিনন্দন জানাতে পারি, সেটা ভিন্ন আলাপ। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার অনৈতিক ব্যবহারের যে উদাহরণ পিটিআই সৃষ্টি করল তা গণতন্ত্রের জন্য কতবড় হুমকি সেটা আমরা এখনও অনুধাবন করতে পারছি না।

সুমন জাহিদসুমন জাহিদ
Published : 11 Feb 2024, 06:17 PM
Updated : 11 Feb 2024, 06:17 PM

পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে নিয়ে একটা কৌতুক বেশি প্রচলিত— ‌‘এ বাহিনী কখনো কোনো যুদ্ধে জেতেনি, কোনো নির্বাচনে হারেনি।’ কিন্তু এবারে তারা নির্বাচনেও হারল। ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে পাকিস্তানি সেনারা অতীতে যত ন্যাক্কারজনক অপকর্ম করেছে, এবার তার যাবতীয় রেকর্ড ভেঙ্গেছে। ইমরান খানসহ দলের অনেক শীর্ষ নেতা কারাগারে, বাকি নেতারা ফেরারি। শুধু তাই নয় পিটিআই-এর প্রতীক ‘ক্রিকেট ব্যাট’ও নিষিদ্ধ করেছে। এতকিছুর পরও ইমরানকে দাবিয়ে রাখতে পারল না সেনারা। সব হিসেব-নিকেশ উল্টে দিয়ে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্ররা এবার বাজিমাৎ করেছে কল্পানাতীতভাবে।

এবারের নির্বাচনে ইমরান সমর্থকদের জয়ের নেপথ্যে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে সোশ্যাল মিডিয়ার বহুমাত্রিক ব্যবহার। পাকিস্তানের এবারের নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়ার সর্বগ্রাসী ব্যবহার বিশ্বব্যাপী নির্বাচনি ব্যবস্থাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি নিজ অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট (টুইটার) থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে জাতির উদ্দেশ্যে তিন তিনবার ভার্চুয়াল ভাষণ দিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার এই অনৈতিক ব্যবহার আটকানোর মতো বিধি-ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশনের নেই। তবে এটার জন্য নির্বাচনি আইন কেন, প্রচলিত আইনই যথেষ্ট হওয়ার কথা! পৃথিবীর কোনো জেল কোড, পেনাল কোড, অন্যান্য আইন বা বিধিতে কনভিক্টেড আসামি পাবলিক স্পিচ দিতে পারে না। হোক সেটা এআই জেনারেটেড, কিন্তু প্রচার তো হচ্ছে ভেরিফাইড অ্যাকাউন্ট থেকে যার ইমপ্যাক্ট মোর দ্যান রিয়েল। কিন্তু এখন পর্যন্ত স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো মিডিয়া, সংস্থা বা ব্যক্তিত্ব এই অনৈতিক ব্যবহার নিয়ে আওয়াজ তুলছে না।

ইমরান খানের বিজয়ে আমি তাকে অভিনন্দন জানাতে পারি, সেটা ভিন্ন আলাপ। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার অনৈতিক ব্যবহারের যে উদাহরণ পিটিআই সৃষ্টি করল তা গণতন্ত্রের জন্য কতবড় হুমকি সেটা আমরা এখনও অনুধাবন করতে পারছি না।

গত ১০ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দা’ভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম 'গ্লোবাল রিস্কস রিপোর্ট ২০২৪' ঘোষণা করেছে যেখানে ৩টি প্রধান বৈশ্বিক ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অপতথ্য ও কুতথ্যকে। দ্বিতীয় ঝুঁকি অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব এবং তৃতীয় ঝুঁকি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা।

রিপোর্টে বলা হয়েছে ২০২৪ সাল বিশ্বব্যাপী নির্বাচনের বছর। এ বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৮টি দেশে হবে জাতীয় নির্বাচন। ভোট দেবেন বিশ্বের ৬০ শতাংশ মানুষ। সংখ্যার হিসেবে ৪২০ কোটির বেশি। সোশ্যাল মিডিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অপতথ্য ও কুতথ্য দিয়ে জনমতকে কলুষিত করা হবে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।

কথায় আছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে যত না সাফল্য, তার চেয়ে বেশি 'সাফল্য' নিজের দেশকে পঙ্গু করে ফেলায়। পিটিআইকে চূড়ান্ত প্রকারে দমন নিপীড়ন করে বাঘের গর্জনে দেশকে প্রকম্পিত করতে চেয়েছিল সেনাবাহিনী। বাঘ হচ্ছে সেনাসমর্থিত নওয়াজ শরীফের দল পিএমএলএন-এর প্রতীক। আর পিপিপির প্রতীক তলোয়ার। ইমরানের অদৃশ্য ব্যাটের শক্তির কাছে বাঘ-তলোয়ার কোনোটাই টেকেনি। এর কারণ পাকিস্তানের নতুন প্রজন্ম। পাকিস্তানের মোট ভোটারের ৪৫ শতাংশই তরুণ।

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে শতকরা ৪৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। সে হিসাবে দেশটির ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ভোটার ভোট দিয়েছেন। ইতোমধ্যেই ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে। জাতীয় পরিষদে ১০১ আসনে জয়লাভ করেছেন স্বতন্ত্ররা যার মধ্যে ৯৩ জনই হলেন ইমরান সমর্থিত। এরপরই পাকিস্তান মুসলিম লীগ–নওয়াজ (পিএমএল-এন) ৭৫ আসনে, পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ৫৪ ও মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট পাকিস্তান (এমকিউএম) ১৭ আসনে জয়ী হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য দল পেয়েছে ১৭টি আসন। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে পাকিস্তানে ইসলামপন্থী দলগুলো থেকে তরুণরা মুখ সরিয়ে নিচ্ছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামী (এফ) মাত্র দুটি আসন পেয়েছে। জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান একটিও আসন পায়নি, যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ইমরানের পরই জামায়াতে ইসলামের ফেইসবুক ফলোয়ার বেশি। পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরম্পরার ইতিহাসে আরেকটি ঝুলন্ত পর্লামেন্ট নিয়ে নড়বড়ে সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে, এটাই বাস্তবতা।

পিটিআই সমর্থিতদের এই ভূমিধস বিজয় ইমরান খানের তুমুল জনপ্রিয়তারই প্রমাণ যা বাস্তবায়ন করতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে দলটির সোশ্যাল মিডিয়া টিম।

এই টিম প্রধান জিবরান ইলিয়াস আমেরিকার নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির তরুণ অধ্যাপক, সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট ও প্রখ্যাত সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট। জানা যায়, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৮২৭ মিলিয়ন রুপি খরচ করেছেন শুধু সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের পেছনে। এবার নিশ্চয়ই কয়েক বিলিয়ন রূপি হবে, কেননা এবার তিনি বেশ কিছু অ্যাপ তৈরি করেছেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে বারবার ইমরান খানের ভাষণ প্রচার করেছেন দেশজুড়ে।

ইমরান সমর্থিত প্রার্থীরা কেউই প্রকাশ্যে নির্বাচনি প্রচারণা করতে পারেননি। প্রায় সব প্রার্থী হয় কারাগারে না হয় ফেরারি। তদুপরি কারও দলীয় মার্কা নেই। ফলে পিটিআই তাদের ওয়েবসাইটে এমন কিছু অ্যাপ লিঙ্ক করেছে, যাতে ভোটাররা সহজেই ইমরান সমর্থিত প্রার্থীদের নাম ও মার্কা জানতে পারে। আরেকটি অভিনব প্রচারণা কৌশল এবার পিটিআইয়ের অনেক প্রার্থী ব্যবহার করেছে, সেটি হল ডিজিটাল ভ্যান। প্রার্থী যেহেতু আত্মগোপনে তাই তার বক্তব্য বা ভাষণ রেকর্ড করে ভ্যানগাড়িতে ডিজিটাল স্ক্রিন বসিয়ে এলাকাময় ঘুরে ঘুরে তা প্রদর্শন করেছে। ভারতের পিকে (প্রশান্ত কুমার) বা এসকে'র (সুনীল কানুলুলু) মতো পাকিস্তানেও জিবরান ইলিয়াস ভোটকুশলী হিসেবে দেশময় সাড়া ফেলেছেন। পাকিস্তান মুসলিম লীগের সোশ্যাল মিডিয়া টিম নেতৃত্ব দিচ্ছেন নওয়াজকন্যা মারিয়াম মান্নান আর পিপিপির শারজিল ইনাম মেমন সবাই যেন জিবারন ইলিয়াসের কাছে শিশু।

নওয়াজ শরীফ ৬০ আসনে বিজয়ী হয়েই বৃহস্পতিবার ভিক্টরি স্পিচ দিয়েছেন জাতির সামনে। এর কাউন্টারে শুক্রবার রাতেই দেশময় সস্প্রচারিত ইমরান খানের এআই জেনারেটেড ভিক্টরি স্পিচ, তার ব্যক্তিগত এক্স একাউন্ট দিয়ে। এটা কখনোই আইনসিদ্ধ হতে পারে না।

সোশ্যাল মিডিয়ার বহুবিধ ব্যবহার নিয়ে কোনো আপত্তি নেই, আপত্তি এর অনৈতিক ব্যবহার নিয়ে। ডিপ ফেইক দিয়ে ভয়েস ক্লোনিং অবশ্যই অনেক বড় একটি প্রোপাগান্ডা যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি, একে অপরাধ না ভাবার কোনো কারণ নেই।

পাকিস্তানে নির্বাচনের দিন, ৮ ফেব্রুয়ারি ১৮ ঘণ্টা মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ ছিল। গতকাল থেকে মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্স (টুইটার) বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়, এটা স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ। সকল সুযোগ অবারিত রেখেই সকলের অধিকার সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো দমন, নিপীড়ন, নির্যাতন বা কোনো পরিষেবা বন্ধ করা সমস্যার সমাধান নয়।

বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশনকে সোশ্যাল মিডিয়া বিধিমালা নিয়ে ভাবতে হবে। ভারতের অনেক রাজ্যে নির্বাচনি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে প্রি-সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করেছে। সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিংয়ের জন্য সকল জেলায় অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সোশ্যাল মিডিয়া বিধিমালা প্রণয়ন হয়নি। বাংলাদেশে ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ইসি সংশ্লিষ্ট নানা সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বড়সর কমিটি করেছিল যা পুরোটাই কাগুজে। এবার দু-একটি মিটিং করেছে শুনেছি, এ পর্যন্তই। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া শুধু উপমহাদেশের নির্বাচনের জন্যই নয় বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্যই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। আরব বসন্তের পরও কিন্তু আমরা শিক্ষা নেইনি। নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়ার সর্বগ্রাসী প্রভাব নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট যথেষ্ট নয়। বিশ্বনেতাদের নতুন করে ভাবতে হবে।