Published : 15 May 2026, 05:51 PM
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘বীরাঙ্গনা’—যাদের ত্যাগের ধরণকে মূল্যায়ন করে পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে সম্মানিত ও মহিমান্বিত করা হয়েছে। সেই তাদেরই একজন, ঠাকুরগাঁও জেলার বীরাঙ্গনা ও বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা টেপরি রাণী বর্মণ সম্প্রতি ইহলোক ত্যাগ করেছেন। ২০১৬ সালে তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক টেপরি রাণীর ওপর ঘটে যাওয়া অবর্ণনীয়, অকল্পনীয় ও অমানবিক নৃশংস পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনা সম্পর্কে জানার জন্য যখন তার বাড়ি যাই, তখন তিনি ছিলেন টগবগে, বেশ উঁচু-লম্বা মধ্যবয়সী এক নারী। তার পরনে এক প্যাঁচের সাদা শাড়ি, গলায় মোটা তুলসীর মালা এবং লম্বা চুলের মাথার চেয়ে বড় খোপা। রোদে শুকানোর জন্য উঠান ভর্তি ধান, উঠানের এক কোনায় ধান সিদ্ধ হচ্ছে এবং দাউদাউ করে চুলা জ্বলছে। মাথা থেকে ঘাম টপটপ করে পড়ে মুখসহ পরনের কাপড় ভিজে চুপচুপ। গায়ের রং তেমন ফর্সা না হলেও দেখতে বেশ স্মার্ট ছিলেন। আমাদের দেখেই ঘামে আধাভেজা অবস্থায় ছুটে এসে একগাল হাসি দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আমার শরীর ঘামে ভিজে বিশ্রী গন্ধ বের হচ্ছে, তারপরও কেন যেন না বুঝেই তোমাকে জড়িয়ে ধরেছি। তুমি কি আমাকে মনে মনে ঘৃণা করছো? তোমাকে দেখে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গিয়েছে। যখন যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন, মায়েরা কখনো সন্তানদের ঘৃণা করে না।”
তখন সেই মুহূর্তে আমার মনে একটা আলাদা আবেগ তৈরি হয়েছিল। আমি মুখে কিছু না বললেও আমার ভাবে তিনি বুঝে নিয়েছেন যে, আমি কিছু মনে করিনি; বরং তার আন্তরিকতা আমার ভালো লাগছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে টেপরি রাণী বললেন, “কতদিন পর মনে হচ্ছে একজন আপন মানুষের সঙ্গে দেখা হলো, যে কি-না আমার দুঃখ-কষ্টের কথা শুনতে এসেছে। কেউ তো এমন করে আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সেই দুর্ঘটনার কথা শুনতে আসে না। শুনতে আসা তো দূরের কথা, এ প্রসঙ্গে কথা বলার সুযোগ বা সাহস কোনোটিই ছিল না।”
টেপরি রাণী তার কাজ রেখে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। একদিনে তো আর নয় মাসের সেই দুর্বিষহ জ্বালা-যন্ত্রণার কথা বলে শেষ হয় না; তাই বারবার, বেশ কয়েকবার তার কাছে যেতে হয়েছে।
আজ সকালে যখন বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা টেপরি রাণীর ইহলোক ত্যাগ করার কথা শুনলাম, তখন ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল আর বারবার তার সঙ্গে কাটানো পুরোনো স্মৃতিগুলো ভেসে উঠছিল। কত কথা, কত কিছু খাওয়া হয়েছে এবং তিনি গুনগুন করে কত কষ্টের গান গেয়েছেন। আজ এসব শুধুই স্মৃতি। আমি বাসার বাইরে ছিলাম। যখন সিরাজুল ইসলাম আবেদ তার মৃত্যুর সংবাদ দিয়ে বললেন, “বীরাঙ্গনা টেপরি রাণী সম্পর্কে কিছু লিখুন”, আমি আমার হাতের কাজ রেখে বাসায় ছুটে এসে লিখতে বসে গেলাম। চোখের সামনে ভেসে আসছে—টেপরি রাণী যখন তার একাত্তরের সেই দুর্বিষহ যন্ত্রণার কথা বলতেন, তখন কিছুক্ষণ বলার পর তার গলা ভারী হয়ে যেত। একদৃষ্টিতে ওপরের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতেন; আবার কখনো কখনো হাউমাউ করে জোরে চিৎকার করে কান্না করতেন। মাঝে মাঝে আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করতেন। আমার বুকে মাথা রেখে বলতেন, “মা, আমার এই কষ্টের কথাগুলো তোমার নিকট বলে বুকের ভেতরটা অনেক হালকা লাগছে। আরও আগে কেন তুমি এলে না আমার কাছে? আমার ভেতরের তিন মণ ওজনের কষ্টের পাথরটা তুমি সরিয়ে দিয়েছো।”
মাঝে মাঝে এমন সব নির্যাতনের বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, যা শুনে আমি নিজেও তখন নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিলাম না। চোখ দিয়ে গড়গড়িয়ে পানি পড়ছিল এবং বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু তাকে তা বুঝতে দিচ্ছিলাম না।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু জীবনযুদ্ধ শেষ হয়নি। সারাটি জীবন বহন করতে হয়েছিল একটি নারীর জীবনের সবচেয়ে ভারী জিনিস—পাকিস্তানি শত শত সৈন্যের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হওয়া এবং একজন হিন্দু নারী হয়ে মুসলমানের জারজ সন্তান জন্ম দেওয়া। এই অপরাধবোধ সারা জীবনভর তাকে সহ্য করতে হয়েছে। আজ থেকে আর কোনো অপরাধবোধ তাকে সহ্য করতে হবে না। আজ তিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে শান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছেন।
কতই-বা আর বয়স ছিল তার তখন অর্থাৎ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি তার বয়স একবার বলতেন ২০ বছর, আবার কখনো-বা বলতেন ১৬/১৭ বছর। তার বিয়েও হয়েছিল বেশ ঘটা করে। বাপ-ভাই বহু টাকাপয়সা খরচ করে তাকে বিয়ে দিয়েছিলেন। তখন তো তাদের সংসারে এত অভাব-অনটন ছিল না। গৃহস্থ বাড়ি; যদিও আহামরি কিছু না থাকলেও ছিল গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ। বাড়িঘরও ছিল মোটামুটি বেশ বড়, ছিমছাম ও সাজানো-গোছানো। তাই সাধ্যমতো ধুমধাম করে তাকে বিয়ে দিয়েছেন।

বিয়ের মাত্র আট দিন পর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের আগেই তাদের বাড়িঘর, বিশেষ করে তাদের গরুর ওপর নজর পড়ে গ্রামের কিছু লোকের। যুদ্ধ শুরু হলে টেপরি রাণী তার বাবার বাড়িতে চলে যান। নতুন বিয়ে হয়েছে, বাবার বাড়িতে ভয়। তাছাড়া যুদ্ধ শুরু হয়েছে—ভেতরে ভেতরে ভয় ঢুকে যায় সবার। স্বামীর বাড়ি থেকে বলে আসেন, কয়েক দিন পর ফিরে আসবেন। তখন কি জানতেন যে, স্বামীর বাড়ি থেকে এটিই তার শেষ আসা? স্বামীর বাড়িতে তার আর ফিরে যাওয়া হবে না। টেপরি রাণী কি জানতেন যে তার জীবন থেকে, স্বামীর আদর-সোহাগ-ভালোবাসা থেকে তিনি চিরদিনের জন্য বঞ্চিত হচ্ছেন? বিনিময়ে তার নামের আগে যোগ হতে যাচ্ছে চরিত্রহীন, কলঙ্কিত বা নষ্ট নারী? না, এসব তার জানা ছিল না। এক বুক আশা আর দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে বাবার বাড়ি এসেছিলেন স্বামীর কাছে ফিরে যাবেন বলে; কিন্তু তা আর হলো না।
যুদ্ধ যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে—উত্তেজনা, আতঙ্ক আর ভয়ে মানুষ পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে, টেপরি রাণী বর্মণরাও যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমন সময় তারা সুবিধাবাদী একদল প্রতারকের পাল্লায় পড়ে যান। মকবুল হোসেন নামের একজন প্রভাবশালী তার দলবল নিয়ে টেপরি রাণীর বাপ-ভাইদের বুঝিয়ে, নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে জোরপূর্বক টেপরি রাণীদের তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। এবং বেশ আদর-যত্নে তাদেরকে আটকে রেখে টেপরি রাণীদের বাড়ি থেকে গরুসহ সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে তাদের বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়। ইতিমধ্যে টেপরি রাণীর বাড়ির লোকজন মকবুলের আসল উদ্দেশ্য কী, তা জেনে ফেলেছে; কিন্তু এই সময় এই অবস্থায় তাদের আর কিছুই করার ছিল না।
টেপরি রাণীর বাড়ির লোকজনসহ তাদের মকবুল হোসেনের বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছে, আর এদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী টেপরি রাণীকে মকবুল হোসেনের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় তাদের ক্যাম্পে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে আটকে রেখে পালাক্রমে ধর্ষণ করে সারাদিন-রাত। এভাবে পুরো যুদ্ধকালীন সময় চলেছে টেপরি রাণীর ওপর নির্যাতন। অগণিত পাকিস্তানি সৈন্য তাকে দিনভর ধর্ষণ করত। কিন্তু যখন অতিরিক্ত কষ্ট পেতেন আর তখন যদি নড়াচড়া করতেন, তখনই শুরু হতো তার ওপর অন্যান্য অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন। আর যদি টেপরি রাণী তার কষ্ট প্রকাশ করতেন, তাহলে পাকিস্তানি মিলিটারিরা তাতে খুব আনন্দ পেত। এভাবে ধর্ষণের শিকার হতে হতে একসময় টেপরি রাণী বর্মণ গর্ভবতী হয়ে পড়েন। পুরো যুদ্ধের সময় এভাবেই টেপরি রাণী বন্দিজীবন কাটিয়েছেন দীর্ঘ প্রায় সাত-আট মাস। দেশ স্বাধীন হলে তিনি মুক্তি লাভ করেন; কিন্তু এ সময় তিনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। এত কষ্টের মাঝেও তার বাবা তাকে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তোলেন; যদিও সুস্থ হতে তার অনেক সময় লেগেছিল।
দেশের যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু তারপর শুরু হলো টেপরি রাণী বর্মণের জীবন সংগ্রাম। দিন যাচ্ছে আর সব দিক দিয়ে কঠিন হচ্ছে তার জীবন। নেই ঘর-বাড়ি বা থাকার মতো জায়গা; নেই টাকাপয়সা। এমনই কষ্টে চলছে তার জীবন। এরই মাঝে জন্ম নিল একটি পুত্রসন্তান—সুধীর বর্মণ। যখনই এই পুত্রসন্তান জন্ম নিল, তখন থেকেই সবার মুখে মুখে স্লোগানের মতো বলাবলি শুরু হলো—হিন্দু ঘরে ভিনদেশি মুসলমান সৈন্যের জারজ সন্তান জন্ম নিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শুনতে হতো শুধু একজনকে নিয়ে, এর সঙ্গে যোগ হলো জারজ সন্তান। যার মুখ দিয়ে যা আসে তা-ই বলে যাচ্ছে। ছেলে দিন দিন বড় হচ্ছে আর মানুষের নিন্দা, ঘৃণা, জ্বালা ও যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। এই বাচ্চাকে গ্রামের অন্য বাচ্চারা খেলতে নেয় না। খেলতে গেলেই খারাপ খারাপ ভাষায় গালি দেয়। তার বাবার পরিচয় জানতে চায়। তখন ছেলে এসে তার মায়ের কাছে জানতে চায়—তার বাবা কে, দাদা কে, কোথায় তার বাড়ি-ঘর। স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে গেলে বাবার নাম-পরিচয় দিতে পারেনি বলে স্কুলে ভর্তি করতে পারেনি। হাজার জনের হাজারও কথা সহ্য করে টেপরি রাণী পথ চলছেন একাই। এরই মাঝে কিছু কিছু গ্রামবাসী এগিয়ে এলো টেপরি রাণীর পাশে। গ্রামের লোকজন চাচ্ছে তার একটা ঠিকানা থাকুক, পরিচয় থাকুক—এভাবে তো আর চলে না। গ্রামবাসীরা কষ্ট করে টেপরি রাণীর একটি বিয়ে দেয়। যদিও প্রথমে টেপরি রাণী এই বিয়েতে রাজি ছিলেন না, কিন্তু পরে সবার চাপে তিনি রাজি হন। সেই বিয়েও বেশিদিন টিকেনি। যখন তার স্বামী সব জানতে পেরেছে, তখন তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। শত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে একাকীত্বের মাঝে জীবন কাটিয়েছেন টেপরি রাণী।
আর দশজনের মতো স্বামী-সংসার কিছুই ছিল না তার। তারপরও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তিনি বেঁচেছিলেন। তার কথা, “বাবা নেই, নেই তার পরিচয়; কিন্তু সে আমার গর্ভে এসেছে, দশটি মাস আমি পেটে রেখে তাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছি। কারণ, আমি যে মা।”
দুই-তিন বছর আগে এমনিতেই ঠাকুরগাঁও বেড়াতে গিয়েছিলাম। তখন হঠাৎ মনে হলো টেপরি রাণীর কথা। তখন তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। এ সময় তিনি বেশ অসুস্থ ছিলেন। বয়স হয়েছে, তাছাড়া ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না। তখন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “এখন তিনি শুধু মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। অনেক কিছু পাওয়ার কথা ছিল এ জীবনে, তা পাইনি; তাই বলে দুঃখ করি না আর আফসোসও নেই।”
জীবনের যত রঙিন দিন এবং দুঃখ-কষ্ট, বেদনা, জ্বালা-যন্ত্রণা সবকিছু সঙ্গে নিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু আপনি যা রেখে গিয়েছেন, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতায়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ, ঐতিহাসিক, লোমহর্ষক ও রক্তাক্ত-স্বর্ণালি অধ্যায়। যতদিন এই নশ্বর পৃথিবী থাকবে, বিশ্ব মানচিত্রে লাল-সবুজ খচিত পতাকার এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ থাকবে—ততদিন আপনার এই অবর্ণনীয়, অকল্পনীয়, অমানবিক, নৃশংস, নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক নির্যাতনের কষ্ট ও ত্যাগের কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। স্যালুট আপনাকে।
আজ আপনার সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বারবার আমার কলম থেমে যাচ্ছে। বারবার মনে পড়ছে আপনার বলা সেই নৃশংস, অমানবিক ও পৈশাচিক নির্যাতন-ধর্ষণের কথাগুলো—যা আজও আমার কানে বাজছে, চোখের পাতায় ভাসছে এবং হৃদয়ের মাঝে গ্রথিত হয়ে আছে। যদিও সব কথা লেখা এখানে সম্ভব হয়নি।
যে অজানা জগতে আপনি চলে গিয়েছেন, সেখানে ভালো থাকুন।