সাংবাদিকতায় বিনিয়োগ, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ও বিকল্প আয়: মেন্টর যখন টিআইকে
শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়, গণমাধ্যমের অর্থনীতি, নতুন আয়ের উৎস তৈরি ও বিনিয়োগ আকর্ষণে কীভাবে নতুন পথ দেখিয়েছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী? সাবেক সহকর্মী সুলাইমান নিলয়ের স্মৃতিকথায় মেন্টর টিআইকের লিডারশিপ ও ইনোভেশনের আলেখ্য।
একবার ঈদের সময় দ্বিগুণ বোনাস পেয়েছিলাম। সেদিন সন্ধ্যায় আমরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কর্মীরা মিটিংয়ে বসেছি। তৌফিক ভাই বেশ খোশমেজাজে, একের পর এক সহকর্মীকে প্রশংসা করছেন। এর মধ্যেই আমার মোবাইল ফোনে একটি এসএমএস এলো। অ্যাকাউন্টে ঈদের বোনাসের সমপরিমাণ টাকা জমা হয়েছে। কোথা থেকে এলো এই টাকা, ভাবছি। পাশের সহকর্মী জানালেন, তার অ্যাকাউন্টেও টাকা এসেছে। অথচ ঈদের বোনাস তো আমরা আগেই পেয়েছি! তাহলে সবার অ্যাকাউন্টে আবার টাকা আসছে কেন?
কিছুক্ষণ পর তৌফিক ভাই জানালেন, আমাদের কাজের ফলে প্রতিষ্ঠান ভালো করছে; তাই সবাইকে অতিরিক্ত একটি বোনাস দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি আজও মনে আছে। তখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আয়ের প্রধান উৎস ছিল মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ব্রেকিং নিউজ পাঠানোর সেবা। তৌফিক ভাই বলতেন, “ভুল করে শেখার জায়গা সাংবাদিকতা না।” আর আমরা জানতাম, বিডিনিউজে ব্রেকিং নিউজে কোনোভাবে কিছুতেই ভুল করা যাবে না। তাই আমাদের ওপর আস্থা রেখে লাখ লাখ মানুষ এটি সাবস্ক্রাইব করেছিল।
এই অভিজ্ঞতা আমাকে সংবাদমাধ্যমের অর্থনীতি নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছে। সাংবাদিকতার মান ও স্বাধীনতার সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানের আয়, নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সামর্থ্য এবং সেই সাফল্যের সুফল কর্মীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সম্পর্কও যে গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে শুরু করি তৌফিক ইমরোজ খালিদী বা টিআইকে—আমাদের তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করতে গিয়েই।
সাংবাদিকতা করতে গিয়ে তৌফিক ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছি, একটি গণমাধ্যমকে এগিয়ে নিতে শুধু ভালো সাংবাদিকতা যথেষ্ট নয়; নতুন আয়ের উৎস খুঁজতে হয়, বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি করতে হয়, পরিকল্পনা করতে হয় এবং সীমিত সম্পদের মধ্যেও নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথ বের করতে হয়। তার কাছ থেকে পাওয়া এই শিক্ষা আমার পেশাগত জীবনের নানা পর্যায়ে কাজে লেগেছে।
একটি পরিকল্পনা, জনবলকাঠামো ৯৮ এবং বিনিয়োগের পাঠ
বিডিনিউজে বিশ্ববিদ্যালয়, হাইকোর্ট, সচিবালয় ও সংসদ বিটে কাজ করেছি। ২০১৭ সালে মাল্টিমিডিয়া নিয়ে কাজ শুরু করি। ২০১৯ সালে যোগ দিই শিশু-কিশোরদের সাংবাদিকতার প্ল্যাটফর্ম ‘হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এ। ওই বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বা অক্টোবরের শুরুতে একদিন তৌফিক ভাই জানতে চাইলেন, মাল্টিমিডিয়া বিভাগ নিয়ে আমার কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে কি না, যা এখনই বাস্তবায়নে যাওয়া যাবে। “স্বপ্ন বা পরিকল্পনার কোনো সীমা আছে কি না?”—আমার এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “সীমা নেই।”
কথাটি আমার মনে দাগ কেটেছিল। আমি প্রায় দেড় দিন সময় নিয়ে মাল্টিমিডিয়া বিভাগের সম্প্রসারণের একটি পরিকল্পনা তৈরি করি। তাতে ৯৮ জনের একটি জনবলকাঠামোও ছিল। পরিকল্পনাটি পাঠানোর পর এক দুপুরে তৌফিক ভাই ফোন করে জানতে চাইলেন, আমি কোথায় আছি। বললাম, অফিসে। তিনি জানালেন, পরিকল্পনাটি প্রজেক্টরে দেখতে চান, তাই নিজেই আসছেন।
মিটিং রুমে বসে তিনি পরিকল্পনার নানা দিক নিয়ে প্রশ্ন করলেন। বিশেষ করে জনবলকাঠামো নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল। আমি যথাসাধ্য উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলাম। পরিকল্পনাটি কেমন হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর একজনকে ফোন করে আধা ঘণ্টার মধ্যে আসতে বললেন।
তিনি ছিলেন একটি টেলিভিশন চ্যানেলের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এবং তৌফিক ভাইয়ের ছোট ভাইয়ের বন্ধু। তৌফিক ভাই তাকে পরিকল্পনাটি দেখিয়ে বললেন, এর ভিত্তিটা ভালো; তবে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও স্টুডিও পরিকল্পনাসহ এটিকে আরও পেশাদার রূপ দিতে হবে।
তৌফিক ভাই আমার পরিকল্পনার সম্ভাবনা দেখেছেন—এই উপলব্ধিতে আমি ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলাম। পরে আমরা সবাই মিলে সেটিকে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনায় রূপ দিই। প্রস্তাবনার মূল কাঠামো তৈরিতে আমি আছি ভাবতেই ভীষণ আনন্দ লাগছিল। সহকর্মী হারমাছি ভাই, সাবেক সহকর্মী রাশেদ ভাই, হিসাব বিভাগের জসিম ভাইসহ অন্যরাও দারুণ সহযোগিতা করেছিলেন।
এরপর শুরু হয় তৌফিক ভাইয়ের মেন্টরশিপের আরেকটি অধ্যায়। তিনি আমাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যমে বিনিয়োগ, কোম্পানির মূল্যায়ন (ভ্যালুয়েশন) এবং এ ধরনের বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে উৎসাহিত করেন। একটি নতুন বিভাগের ধারণাকে কীভাবে জনবল পরিকল্পনা, আর্থিক যুক্তি, অবকাঠামো এবং বিনিয়োগকারীর কাছে উপস্থাপনের উপযোগী একটি প্রস্তাবে রূপ দিতে হয়, তা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাই।
পরদিন এলআর গ্লোবালের সঙ্গে প্রথম বৈঠকটি হয়েছিল তৌফিক ভাইয়ের বাসার স্টাডি রুমে। বৈঠক শুরু হলে আমি হয়তো উঠে চলে যাব, এমনটা কেউ কেউ ভেবেছিলেন। কিন্তু তৌফিক ভাই আমাকে থাকতে বললেন; কারণ মাল্টিমিডিয়া পরিকল্পনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এরপর ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রায় সবগুলো বৈঠকে অংশ নিয়েছি। এলআর গ্লোবাল নিজেদের মতো করে ভ্যালুয়েশন করিয়েছিল, সেটাতে আমার যুক্ত থাকার সুযোগ হয়েছে।
পরে এলআর গ্লোবাল ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। সে সময় এই বিনিয়োগকে বাংলাদেশের একটি ডিজিটাল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়েছিল। বিনিয়োগের একটি বড় অংশ ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ ও নতুন উদ্যোগে ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল।
এই পুরো বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার দায়িত্ব আমার ছিল না। তবে একটি বিভাগের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা তৈরি করা, সেটির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা এবং বিনিয়োগকারীদের সামনে পরিকল্পনাটি ব্যাখ্যা করার অভিজ্ঞতা আমার পেশাগত জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। তৌফিক ভাই শুধু একটি পরিকল্পনা তৈরির সুযোগ দেননি, সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবতার কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানোর অভিজ্ঞতাও দিয়েছেন।
পরে এই বিনিয়োগ ব্যয় করার আগেই এটা নিয়ে ৫ বছরের লড়াই শুরু করতে হয়; আমাদের সেটা ভিন্ন গল্প। পুরোটা আরেক দিন বলতে হবে। তবে রেপুটেশন, মিডিয়া ক্রাইসিস এবং লিগ্যাল ক্রাইসিসের এত গভীর সংযোগের ঘূর্ণিতে আমি বাংলাদেশের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে পড়তে দেখিনি। চরম বিদ্বেষভাব পোষণ করা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাব কমিয়ে কীভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়, এর চেয়ে ভালো শিক্ষার সুযোগও আর কেউ পেয়েছে কি না, আমি জানি না।
বিনিয়োগ প্রক্রিয়া চলাকালে তার কাছ থেকে জেনেছিলাম, বিডিনিউজে বিনিয়োগ আনার জন্য এর আগেও বিভিন্ন চেষ্টা হয়েছিল। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগগুলোর কথাও তিনি আমাকে বলেছিলেন এবং পড়ার জন্য কিছু নথি দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল নিউ ইয়র্কভিত্তিক মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (এমডিআইএফ) সঙ্গে বিডিনিউজে সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনার ইতিহাস। সেই উদ্যোগ অবশ্য সফল হয়নি। তবে তিনি মনে করতেন, একটি গণমাধ্যমের টিকে থাকার জন্য শুধু সাংবাদিকতার মান নয়, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিকতার ইনোভেশনে উৎসাহ তৌফিক ভাইয়ের
তৌফিক ভাইয়ের কাছ থেকে শেখার বড় একটি জায়গা ছিল সাংবাদিকতার পেশাগত সীমানার বাইরে গিয়ে ভাবতে শেখা। একটি ভালো প্রতিবেদন কীভাবে তৈরি হয়, তা জানা জরুরি; কিন্তু একটি গণমাধ্যম কীভাবে টিকে থাকবে, নতুন বিভাগ কীভাবে গড়ে উঠবে, বিনিয়োগকারীকে কীভাবে পরিকল্পনার যৌক্তিকতা বোঝাতে হবে, কিংবা সীমিত সম্পদ দিয়ে নতুন কিছু কীভাবে শুরু করা যায়—সেসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
এসব বিষয়ে আমারও আগ্রহ ছিল; সেটা দেখে তিনি আরও উৎসাহ দিয়েছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সংবাদ সংগ্রহের ধারণাটি নিয়েও বিডিনিউজে কাজ করতে চেয়েছিলাম ২০১১ সালের দিকে। পলাশ দত্ত দাদার কাছ থেকে সোশ্যাল মিডিয়া রিপোর্টিংয়ের ধারণা পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। তখন নিউজরুমে এ নিয়ে প্রশ্ন ও আপত্তি ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো পোস্টকে সংবাদসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি কথা না বলে পোস্টের ভিত্তিতে প্রতিবেদন করা কতটা গ্রহণযোগ্য—তা নিয়ে আলোচনা হতো। বরাবরের মতো এ ক্ষেত্রেও সমাধান নিয়ে এলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। কীভাবে কোন শর্তপূরণ সাপেক্ষে আমরা এসব তথ্য নিউজে উদ্ধৃত করতে পারব, সেটা তৌফিক ভাই বিস্তারিত বললেন।
আমার মনে আছে, এক নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তা করার ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তির গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে কাজ করেছিলাম। আরেকবার কাবায় সাঈদীর মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনের একটি ভুয়া খবর ছড়ানোর ঘটনা নিয়ে কাজ করি। আমরা সেটি নিয়ে স্টোরি করি। দাবিটি পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয় এবং দৈনিক সংগ্রাম তাদের ওয়েবসাইট থেকে প্রতিবেদনটি সরিয়ে নেয়। এসব অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একদিকে যেমন সংবাদ সংগ্রহের নতুন সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে যাচাই ও জবাবদিহির নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।
তৌফিক ভাই ২০১৩ সালে আমাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সাংবাদিকতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মাস্টার্স করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আইইএলটিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এক মাসের ছুটিও নিয়েছিলাম। ছুটির আগে রিপোর্টার্স মিটিংয়ে তিনি বলেও দিলেন, “নিলয় বিদেশে লেখাপড়া করতে যাবে। ফিরে এসে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট হেড হিসেবে জয়েন করবে।” ২০১৫ বা ২০১৬ সালের ফল সেমিস্টারে যাওয়ার লক্ষ্য ছিল। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রটি দ্রুত মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টিংয়ের দিকে এগোতে থাকে।
আমি ভাবতে শুরু করি, বিদেশে পড়তে যাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে দেশে থেকেই মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার কাজ শুরু করা যায় কি না। ২০১৫ সালে উত্তরবঙ্গে ছিটমহল নিয়ে প্রতিবেদন করার সময় দুটি ভিডিও প্যাকেজ তৈরি করেছিলাম, যাতে মাল্টিমিডিয়া কনটেন্টের সম্ভাবনা দেখানো যায়। পরে মাল্টিমিডিয়া বিভাগ গড়ে তোলার পরিকল্পনায় এই অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লেগেছিল।
এখানেও তৌফিক ভাইয়ের মেন্টরশিপের একটি দিক স্পষ্ট হয়। তিনি শুধু একটি নতুন বিষয়ে পড়াশোনা করতে বলেননি; নতুন প্রযুক্তি ও পরিবর্তিত বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে এবং সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে উৎসাহিত করেছিলেন। তার কাছে প্রশিক্ষণ শুধু সনদ অর্জনের বিষয় ছিল না; শেখা জ্ঞানকে কাজে লাগানোর প্রস্তুতিও ছিল এর অংশ।
২০১২ সালের শেষ দিকে বা ২০১৩ সালের শুরুর দিকে, একবার প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ভবিষ্যৎ মিডিয়া নিয়ে মার্কেটিং পরিচালকের সঙ্গে ব্যক্তিগত ক্ষমতায় একটি বৈঠকে অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে তাকে আমি প্রস্তাব দিই, তারা যাতে তরুণদের নিয়ে তরুণদের নেতৃত্বে একটি গণমাধ্যম গড়ে তোলেন। আমি তাদের একটি প্রস্তাবনাও দিয়েছিলাম; বলেছিলাম, সঠিক পরিকল্পনায় এটা করা গেলে আপনারা বাজারে সেরা হয়ে উঠতে পারেন। ঘটনাটি তৌফিক ভাই কোনোভাবে জানতে পারেন। আমি ভেবেছিলাম, তিনি বিষয়টাকে ভালোভাবে নেবেন না। কিন্তু তিনি উৎসাহ দেখিয়েছিলেন; কেবল বলেছিলেন, “গেটকিপার হিসেবে অসাধারণ কিছু তরুণ লাগবে অথবা কিছু অভিজ্ঞ মানুষ লাগবে।”
জার্মানির রাইন নদীর তীরে তৈরি হওয়া পরিকল্পনা
২০১৭ সালে বিডিনিউজ আমাকে জার্মানিতে প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত করে। তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে ডয়চে ভেলের গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামেও অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। সেখানে তিনি বিভিন্ন দেশের সাংবাদিক ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
আমার প্রতিবার বিদেশে যাওয়ার আগে তিনি বলতেন, বাংলাদেশে যে সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি, অন্য দেশগুলো সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করছে—তা খেয়াল করতে। সেখানকার সমাধান হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব না-ও হতে পারে। তার মতে, এরপরও সেগুলো থেকে শেখা যায়; নিজেদের বাস্তবতায় কীভাবে কিছু প্রয়োগ করা যায়, তা ভাবা যায়।
সেই সফরের সময় রাইন নদীর পাশে বসে এবং হাঁটতে হাঁটতে তার সঙ্গে মিলে মাল্টিমিডিয়া নিউজ টিম গড়ে তোলার একটি পরিকল্পনা তৈরি করি। পরে সেটা তৌফিক ভাইকে ইমেইলে পাঠালে তার উত্তর ছিল, “ফিরে এসে শুরু করো।” দেশে ফিরে ২০১৭ সালেই আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে মাল্টিমিডিয়া নিয়ে কাজ শুরু করি।
মাল্টিমিডিয়া নিয়ে কাজ শুরুর পর আমরা আরও দুটি বড় উদ্যোগের পরিকল্পনা করেছিলাম।
প্রথমটি ছিল ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের নিয়ে রিয়েলিটি শোর আদলে একটি অনুষ্ঠান। উদ্দেশ্য ছিল দেশের সেরা ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতাদের চিহ্নিত করা এবং তাদের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত পর্যটন গন্তব্যগুলোকে তুলে ধরা। সহকর্মী মোতাসিম বিল্লাহ পিন্টু ভাইয়ের সঙ্গে মিলে এর আনুষ্ঠানিক প্রকল্প প্রস্তাবনাও তৈরি করেছিলাম।
দ্বিতীয় উদ্যোগটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে। পরিকল্পনা ছিল, ফ্রিল্যান্স কনটেন্ট নির্মাতাদের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে জীবিত প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার মৌখিক ইতিহাসের প্রাথমিক নথি তৈরি করা। হ্যালোতে আমাদের হাজারো শিশু সাংবাদিককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল; সেটাই আমরা ভিন্ন আঙ্গিকে করতে চেয়েছিলাম। দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ছোট ছোট চারটি পাইলট করতে চেয়েছিলাম, যার দুটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। প্রথম পাইলটে কয়েকজন সেক্টর কমান্ডার এবং শীর্ষস্থানীয় মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার নিয়ে একটি ধারাবাহিক তৈরি করা হয়। এখানে আমরা যুক্ত করি এমন রিপোর্টারদের, যারা এর আগে মাল্টিমিডিয়া নিয়ে কাজ করেননি। আমরা বুঝতে চেয়েছিলাম, মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট আগে না করা ব্যক্তিরা এটা করতে গেলে কতটুকু সাপোর্টের দরকার হয়। মাসুম বিল্লাহ, সাজিয়া আফরিন, নাফিয়া রহমানসহ অন্যরা তা দারুণভাবে বাস্তবায়ন করেন। বিষয়টা বুঝতে আমরা সিটিজেন জার্নালিস্টদের কাছ থেকেও কিছু ভিডিও আনি। পরের পাইলটে আমরা শুরু করি ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর মোবাইল জার্নালিজম নেটওয়ার্ক’, যার মাধ্যমে ফ্রিল্যান্স কনটেন্ট নির্মাতাদের কাছ থেকে কনটেন্ট সংগ্রহ করা হতো। তাদের ধারণ করা ক্লিপ থেকে তৈরি ‘ভয়ংকর সুন্দর সুন্দরবন’ কনটেন্টটি সে সময় ইউটিউবে আমাদের সর্বাধিক দেখা কনটেন্টগুলোর মধ্যে ছিল। সহকর্মী আব্দুল্লাহ আলিফ এটি খুব সুন্দর করে সম্পাদনা করেছিলেন। এই পাইলটে আমরা ৫০টির বেশি কনটেন্ট প্রকাশ করি। তবে এই নেটওয়ার্ককে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কনটেন্ট নির্মাণ পর্যন্ত আমরা যেতে পারিনি।
তৌফিক ভাই এই উদ্যোগগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এই দুই বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়নি আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে। তবে পরিকল্পনা করা, পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরু করা এবং সেখান থেকে শেখার অভিজ্ঞতাও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বুঝতে শিখেছি, সব ভালো ধারণা বাস্তবায়িত হয় না। কিন্তু একটি ধারণা বাস্তবায়নের জন্য কী কী দরকার, কোথায় বাধা আসতে পারে, কোন অংশ আগে পরীক্ষা করা যায় এবং কোন পর্যায়ে অর্থায়ন প্রয়োজন—সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অংশ।
হ্যালো: সাংবাদিকতা, অ্যাডভোকেসি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা
২০১৯ সালে তৌফিক ভাই আমাকে ‘হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী সম্পাদক ও প্রকল্প ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব দেন। শিশু-কিশোরদের এই সাংবাদিকতা প্ল্যাটফর্মে সাংবাদিকতার সঙ্গে অ্যাডভোকেসিরও সম্পর্ক ছিল। শিশুদের সমস্যা ও অধিকার নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করা ছিল উদ্যোগটির গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
এই সময়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার নানা দিক হাতে-কলমে শিখেছি। দাতা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয়, সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা এবং সীমিত সম্পদ কাজে লাগানো—সবই ছিল শেখার অংশ। তৌফিক ভাই তখনও মেন্টর হিসেবে পাশে ছিলেন।
যে পথ তৌফিক ভাই দেখিয়েছিলেন, বিডিনিউজ ছাড়ার পরও সে পথে আমি এখনো চলছি। যেমন, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের বোঝাপড়াকে পরের ধাপে নিয়ে যেতে আমি একটি পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমাসহ নানা কোর্সও সম্পন্ন করেছি।
নতুন নতুন নানা ইনিশিয়েটিভ নেওয়ার যে অভ্যাস তৌফিক ভাই তৈরি করে দিয়েছিলেন, সেটা ব্র্যাকে এসেও চলছে। এখানে কাজ করতে গিয়ে দুটি উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগ হয়েছে। ‘ক্লাইমেট কনটেন্ট নেটওয়ার্ক’ একটি, যার মাধ্যমে স্থানীয় ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলারদের যুক্ত করে জলবায়ু পরিবর্তনের স্থানীয় বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আর ‘ইনফ্লুয়েন্সিং দ্য ইনফ্লুয়েন্সার্স’ আরেকটি উদ্যোগ, যেখানে কনটেন্ট নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আরও বিস্তৃত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
আজ পেছনে ফিরে তাকালে দেখি, তার কাছ থেকে শেখা বিষয়গুলো কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে বা নির্দিষ্ট একটি পেশায় সীমাবদ্ধ নেই। সাংবাদিকতা, উন্নয়ন যোগাযোগ, প্রকল্প পরিকল্পনা কিংবা দল পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই সেগুলো কাজে লেগেছে। নতুন সম্ভাবনা খোঁজা, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা, সীমিত সম্পদ কাজে লাগানো, মানুষকে সঙ্গে নেওয়া এবং প্রশ্নের মুখেও একটি ধারণার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার সাহস—এসবই তার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা।
তার মেন্টরশিপের ফল শুধু আমি কী কী কাজ করেছি, তার মধ্যে নেই; বরং এখন কীভাবে নতুন ধারণা তৈরি করি, পরিকল্পনা করি, মানুষকে যুক্ত করি এবং সীমিত সম্পদের মধ্যেও সম্ভাবনা খুঁজি—তার মধ্যেও আছে।
তৌফিক ভাইকে স্মরণ করার সময় তাই শুধু তার সম্পাদনা, সাংবাদিকতা কিংবা প্রতিষ্ঠানের জন্য নেওয়া উদ্যোগগুলোর কথা মনে পড়ে না; মনে পড়ে, তিনি অন্যদের কীভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন, কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন এবং তাদের নিজস্ব সক্ষমতা বিকাশে সহায়তা করেছেন।
একজন মেন্টরের অবদান হয়তো এভাবেই তার নিজের কাজের বাইরেও বেঁচে থাকে—তার কাছ থেকে শেখা মানুষদের কাজের মধ্যে, তাদের তৈরি করা উদ্যোগে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অভিজ্ঞতার মধ্যে।
তিনি মনে করতেন, আগামী পৃথিবীর কেন্দ্রে যেহেতু এশিয়া, তাই পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার মাঝখানে থাকা বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে একটি গ্লোবাল মিডিয়া হতে পারে। সেটাও তিনি বহুবার আমাকে বলেছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর সেটা হতে পারে কীভাবে, কতটা কঠিন—এটা নিয়ে আমাদের আলাপ হয়েছিল। ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভিকে তিনি সাউথ এশিয়ার বেস্ট টিভি বানাতে চেয়েছিলেন, সেই আক্ষেপ আমি তার মাঝে দেখেছি।
তৌফিক ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া, নতুন সম্ভাবনা খোঁজার সাহস ধরে রাখা এবং সাংবাদিকতার টেকসই ভবিষ্যতের জন্য কাজ করে যাওয়াই হতে পারে তার প্রতি আমাদের সবচেয়ে অর্থবহ শ্রদ্ধা।
আহা তৌফিক ভাই, ভালো থাকবেন। আপনার স্বপ্ন একদিন দেখুক পৃথিবী।
সুলাইমান নিলয়: উন্নয়ন পেশাজীবী এবং সাংবাদিকতা-যোগাযোগ প্রশিক্ষক; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক কর্মী।
