Published : 26 Jan 2026, 12:07 AM
নির্বাচনে নারীর ভোট যতটুকু আদরণীয়, রাজনীতির নীতি-নির্ধারণে তাদের উপস্থিতি যেন ঠিক ততটুকুই অনাকাঙ্ক্ষিত। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রার্থী তালিকার দিকে তাকালে একটি নির্মম পরিহাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নারীর ভোট ‘আরামদায়ক’ হলেও নারীর নেতৃত্ব এখনও অনেকের কাছে ‘হারাম’। মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ রাজনৈতিক দলে কোনো নারী প্রার্থী নেই। রাজপথের আন্দোলনে যে নারী ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, নির্বাচনের টিকিটে সেই নারীরাই ব্রাত্য হয়ে আছে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩১টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই। বাকি ২০টি দল ও স্বতন্ত্র মিলে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৭৬।
ঢাকায় টানা ২৬ বছর পুরানা পল্টনে আমার নিয়মিত উঠাবসা। এই দীর্ঘ সময়ে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির একজন সমর্থক হিসেবে রাজনীতির অসংখ্য চড়াই-উৎরাই প্রত্যক্ষ করেছি। দেখেছি হাজার হাজার মিছিল-মিটিং। কিন্তু এতগুলো বছরে আমি কোনো ইসলামী দলের মিছিল-মিটিংয়ে নারীর অংশগ্রহণ দেখিনি, দেখতে পাব এমন আশাও করিনি। তবু ইসলামী দলগুলোর অনেক নেতাকর্মীকে রসিকতাচ্ছলে জিজ্ঞেস করেছি, ‘নারীরা কই?’ প্রায় সবার বক্তব্যই ছিল এক ও অভিন্ন, ‘মা-বোনরা ঘরে থাকবে, পর্দায় থাকবে; তাদের রাজনীতি করার দরকার নেই। রাজনীতি করা পুরুষ মানুষের কাজ।’
এবারের নির্বাচনে ২৯৮টি নির্বাচনি আসনে মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, এর মধ্যে স্বতন্ত্র ২৪৯ জন। মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন, আর তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন। ভোটার তালিকায় নারী-পুরুষের ব্যবধান খুবই সামান্য। নির্বাচনে দলীয় নারী প্রার্থীদের হার ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ, অথচ স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীদের হার ১০ শতাংশ।
মাত্র ৭৬ জন নারী প্রার্থী— এই পরিসংখ্যান থেকে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মর্যাদা, ক্ষমতায়ন, সমতা ও মুক্তির বাস্তবতা কতটুকু, তা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এ বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকার কর্মী, সংবাদমাধ্যমকর্মী, নারীবাদী ও সচেতন রাজনৈতিক মহল শঙ্কিত ও কিছুটা আতঙ্কিত। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো হয়ত তাদের এই ব্যর্থতার জন্য সামান্য লজ্জিত! বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস এবং সব গণঅভ্যুত্থানে অনন্য সাহসী ভূমিকা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে তারা চরম অবহেলিত। স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত এ চিত্র একই। এজন্য দায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর নারী নেতৃত্ব বিকাশে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চার চরম উদাসীনতা।
ভোটের বিনিময়ে আল্লাহর আইন বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৩টি এবং ‘বেহেশতের টিকেট প্রদানকারী’ জামায়াতে ইসলামী ২২৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও নারীর অংশগ্রহণ শূন্য। এছাড়াও খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টিসহ অন্যান্য ইসলামপন্থি দলগুলোর কোনো নারী প্রার্থী নেই। এই দলগুলো না হয় নারীর নেতৃত্ববিরোধী, কিন্তু সক্রিয় দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল বিএনপির অবস্থাও তো আশাব্যঞ্জক নয়। বিএনপির নারীর প্রার্থী ১০ জন।
আর মাত্র কয়েক দিন পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে অন্য সব রাজনৈতিক দলের নারীর ক্ষমতায়নের বাস্তব পরিসংখ্যান হলো—এনসিপির ২ জন, জাতীয় পার্টির ৬ জন, গণ অধিকার পরিষদের ৩ জন, গণসংহতির ৪ জন, কমিউনিস্ট পার্টির ১ জন, বাসদের ৫ জন, বাসদ-মার্ক্সবাদীর ১০ জন, জেএসডির ৬ জন, ইনসানিয়াতের ৪ জন, গণফোরামের ২ জন, নাগরিক ঐক্যের ১ জন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ২ জন, রিপাবলিকান পার্টির ১ জন, এবি পার্টির ১ জন, পিপলস পার্টির ১ জন, আম জনতার দলের ১ জন, লেবার পার্টির ১ জন, ইসলামী ফ্রন্টের ১ জন, সুপ্রিম পার্টির ১ জন, মুসলিম লীগের ১ জন, স্বতন্ত্র ১৫ জন ও তৃতীয়লিঙ্গ ১ জন।
পত্রিকাগুলো বাসদের ৪ জন নারী প্রার্থী উল্লেখ করলেও তাদের প্রার্থী মূলত ৫ জন। কারণ দিনাজপুর-৩ থেকে কিবরিয়া হোসেন নামে তাদের একজন প্রার্থী রয়েছেন। নামের কারণে হয়ত এই ভুলটি হয়েছে। অন্যদিকে গণসংহতির ৩ জন উল্লেখ করলেও তাদের প্রার্থী ৪ জন বলে দলটি নিশ্চিত করেছে।
গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি হলো সমান অধিকার, সমান অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সকল নাগরিকের উপস্থিতি। সেখানে নারী-পুরুষের বিভাজন নয়, মানুষ হিসেবেই নাগরিকের মর্যাদা মুখ্য। এই প্রাথমিক সত্য মেনে নিলে একটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে যে—রাজনৈতিক দল সচেতনভাবে নারী নেতৃত্বকে অস্বীকার করে, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে অপ্রয়োজনীয় বা হারাম বলে মনে করে, সে দল কীভাবে নিজেকে গণতান্ত্রিক দাবি করতে পারে?
ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নারীর ভূমিকা অনন্য। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নারীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন, আন্দোলন সংগঠিত করেছেন, আহতদের চিকিৎসা ও সহায়তা করেছেন। কর্মজীবী নারী, গৃহিণী, চিকিৎসক ও নার্স—সব পেশার নারী একত্র হয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ঐক্য সৃষ্টি করেছেন। এই সমস্ত ইতিহাস প্রমাণ করে, মানব সমাজে নারীর মর্যাদা, সমতা, ক্ষমতায়ন ও মুক্তি ছাড়া কোনো সংগ্রাম, অর্জন বা স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ।
‘জগতে যাহা কিছু কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক নর’—এই অমর পংক্তির মধ্য দিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম মানবসভ্যতার নির্মাণে নারী-পুরুষের সমান অবদানকে গভীর দার্শনিক সত্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি নারীর ভূমিকা কোনো করুণা বা সহানুভূতির জায়গায় নয়, বরং ইতিহাস, সমাজ ও মানবকল্যাণের সহ-নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন।
গণতন্ত্র জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি। সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি নারী হয়, তবে প্রতিনিধিত্বে তাদের অনুপস্থিতিতে গঠিত নেতৃত্ব কখনোই পূর্ণাঙ্গ বা প্রতিনিধিত্বশীল হতে পারে না। যে দল নারীকে নেতৃত্বেকে অস্বীকার করে, সে দল আসলে কোনো আদর্শ রাজনৈতিক দল নয়, গণতান্ত্রিক দল নয়, বরং তা শুধুই পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী। যে সব দল নিজেদের দলের ভেতরে নারীর সমান অধিকার স্বীকার করে না, সে দল রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে কীভাবে নারীর অধিকার রক্ষা করবে?
সংরক্ষিত নারী আসনের ইতিহাস আমাদের আরেকটি সত্য মনে করিয়ে দেয়। ১৯৭৩ সালে যেখানে ১৫টি সংরক্ষিত আসন দিয়ে শুরু হয়েছিল, সেখানে আজ সংখ্যা ৫০। কিন্তু এই আসনগুলো নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারেনি। কারণ এগুলো সরাসরি ভোটে আসা প্রতিনিধিত্ব নয়, বরং দলীয় অনুগ্রহের রাজনীতি। ১৯৯১ থেকে ২০২৪— প্রতিটি নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলছে, নারী প্রার্থী বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হয়নি। দ্বাদশ সংসদে ২৬ জন নারী সরাসরি লড়েছেন স্বতন্ত্র হিসেবে, জয়ী হয়েছেন ১৯ জন; কিন্তু সেই সাফল্যও মূলত একদলীয় কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। আজ যখন বলা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলের সব স্তরে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে— তখন প্রশ্ন ওঠে, সংসদের টিকিটেই যদি নারীকে জায়গা না দেওয়া হয়, তাহলে সেই লক্ষ্য পূরণ হবে কীভাবে?