Published : 28 May 2026, 04:10 AM
ঈদুল আজহার একবারে শেষ দিকেও পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত সুবিশাল ধুলাগড় পশুর হাট যেন বিরানভূমি।
টিনের ছাউনির নিচে ব্যবসায়ীরা জড়ো হয়ে বসছেন। ঈদুল আজহার জন্য ২০০টিরও বেশি গবাদি পশু গ্রীষ্মের দাবদাহে বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা রয়েছে; কিন্তু চারদিকে ক্রেতার কোনো আনাগোনা নেই।
কলকাতা হতে ১৩০ কিলোমিটার দূরে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা থেকে আগত একজন হিন্দু বিক্রেতা আল-জাজিরাকে বললেন, তিনি উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ঈদুল আজহার জন্য গরু কিনেছিলেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল বুধ ও বৃহস্পতিবার গরুগুলো বিক্রি করা। রাজ্যে আড়াই কোটি মুসলমানের বসবাস, যা মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ। ঈদুল আজহা হচ্ছে গরু ব্যবসার যুতসই সময়। তবে এ বছর দৃশ্যটি সুখকর নয়।
“কে গরু কিনবে? মানুষ ভয়ের মধ্যে রয়েছে।” চারদিকের অবস্থা এমন থমথমে যে ওই বিক্রেতা নিজের নাম বলতেও ভয় পান।
বছরের পর বছর ধরে যেসব ব্যবসায়ী ধুলাগড় বাজারে পশু বিক্রি করেন, তারা অধিকাংশই হিন্দু ব্যবসায়ী। মুসলমান ক্রেতারা ঈদুল আজহা পালনের জন্য এ বাজারে পশু কিনতে আসেন। ছাগল কিংবা ভেড়ার পাশাপাশি, অনেক মুসলমান কমবয়সী বলদ, মহিষ কিংবা উট কেনেন; যার মাংস পরে সাত ভাগে ভাগ করে নেন।
১৯৫০ সালের এক আইন অনুযায়ী প্রকাশ্যে গবাদিপশু জবাই নিষিদ্ধ ছিল। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থি ও মধ্যপন্থি রাজনৈতিক শক্তির শাসন থাকায় আইনটি খুব কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়নি। ফলে পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষ করে রাজধানী কলকাতা, গরুর মাংসসহ নানা ধরনের মাংসের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির জন্য পরিচিতি পায়। ব্যস্ত সড়কের পাশের ঠেলাগাড়ি থেকে শুরু করে অসংখ্য খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁয় এসব খাবার সহজে পাওয়া যেত।
কিন্তু গত ৬ মে পরিস্থিতি বদলে যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের নির্বাচনি জয় পায়। নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ১৯৫০ সালের আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেন।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি অনুমোদন ছাড়া কোনো গবাদিপশু জবাই করা যাবে না। জবাইয়ের জন্য পশুকে ‘উপযুক্ত’ বলে সরকারি সনদ নিতে হবে এবং তা শুধু পৌর কসাইখানা বা প্রশাসনের অনুমোদীত স্থানে করা যাবে। আইনে আরও বলা হয়েছে, জবাইয়ের জন্য পশুর বয়স অন্তত ১৪ বছর হতে হবে।
ভারতের বহু হিন্দু, বিশেষ করে প্রভাবশালী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো, গরুকে পবিত্র প্রাণী হিসেবে মনে করে। এ কারণে দেশটির অধিকাংশ রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ। ২০১৪ সালে মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর, শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি সমর্থিত স্বঘোষিত গরুরক্ষাকারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গরুর মাংস বহন করেছে বা খেয়েছে সন্দেহে মুসলিম তো বটেই, হিন্দু গবাদিপশু ব্যবসায়ী ও খামারিদের ওপরও হামলা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ভারতজুড়ে অনেক মানুষ গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন।
বার্গারের কোনো ধর্ম নেই
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর গরুর মাংস বিক্রেতা, খাবার দোকানের মালিক এবং পথের খাবার ব্যবসায়ীরা আতঙ্কগ্রস্ত। এর প্রভাব পড়েছে গরুর মাংসের বাজারেও; বিক্রি হঠাৎ করেই তীব্রভাবে কমে গেছে।
কলকাতার পরিচিত খাবারের দোকান ‘দ্য বার্গার শপ’ তাদের জনপ্রিয় গরুর মাংসের বার্গার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ইনস্টাগ্রামে তারা লিখেছে, “আমাদের বার্গারের কোনো ধর্ম নেই। কিন্তু রাজনীতির আছে।”
দোকানটির সহ-মালিক উৎসা আল-জাজিরাকে বলেন, গত ১৪ মে তারা জানতে পারেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে গরুর মাংস সরবরাহকারী ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। স্থানীয় থানায় ডেকে ওই সরবরাহকারীকে সাময়িকভাবে দোকান বন্ধ রাখতে বলা হয়। নতুন সরবরাহকারী না পাওয়ায় তারা গরুর মাংসের বার্গার বিক্রি বন্ধ রাখছেন। তিনি বলেন, তাদের নিয়মিত ক্রেতারা এতে হতাশ; কারণ গরুর মাংস ছিল তাদের ব্যবসার বড় একটি অংশ।
বর্তমানে গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি ৪০০ রুপি থেকে কমে ১৫০ রুপিতে চলে আসায় অধিকাংশ মুসলিম মাংস বিক্রেতা দোকান বন্ধ রাখেন।

শহরের নিউ মার্কেট এলাকার দুটি দোকানের মালিক ৬৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ হাসিম বলেন, “আমরা ৬০ বছর ধরে মাংসের ব্যবসা করছি। এ জন্য আমাদের বৈধ লাইসেন্স আছে। কলকাতায় সবসময় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখেছি। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি দেখছি।”
তিনি আরও বলেন, “যারা মাংস সরবরাহ করেন, তারা এখন ভীত। ছোট ছোট যেসব দোকান গরুর মাংসের বিভিন্ন খাবার বিক্রি করত এবং আমাদের কাছ থেকে কাঁচা মাংস কিনত, তাদের চাহিদাও অনেক কম। এখন দুপুর দেড়টার মধ্যে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরতে হয়; আগে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত বিক্রি চলত।”
একই বাজারের লাইসেন্সপ্রাপ্ত গরুর মাংস ব্যবসায়ী হায়দার আলীও বলেন, ভয়ের কারণে এখন অনেকেই কাঁচা মাংস কিনতে চান না।
প্রচুর লোকসান
ধুলাগড় পশুর হাটে তিনজন হিন্দু বিক্রেতা নিজেদের অর্থনৈতিক দুর্দশার কথা বলছিলেন। তাদের একজন বলেন, “যদিও আমরা কিছু গরু বিক্রি করতে পেরেছি, তবুও ব্যাপক লোকসান গুণছি।” তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অবিক্রিত গরুতে পাঁচ হাজার রুপি লোকসান হয়। এসব মানুষ ঈদুল আজহায় গরুর ব্যবসা করেন, আর বছরের বাকি সময় নির্মাণশ্রমিকের কাজ করেন।
ধুলাগড়ের বিক্রেতাদের মধ্যে মুসলিম পশু ব্যবসায়ী সুন্দরও ছিলেন; সবাই তাকে ডাকনামেই চেনে। তিনি জানান, ঈদুল আজহা উপলক্ষে গরুর ব্যবসা করতে তিনি মায়ের গয়না বন্ধক রেখে ১০ লাখ রুপি ঋণ নেন। সুন্দর বলেন, “প্রতি উৎসবে আমরা সাধারণত ১০ থেকে ১৫ লাখ রুপি আয় করি। গত বছর প্রায় ১০০টি গরু বিক্রি করি। কিন্তু এ বছর ২৫টি গরুর একটিও বিক্রি করতে পারিনি। এখন কী করব? সত্যিই খুব ভয় লাগছে।”
গরু জবাই নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, “যেসব আইন আগে কার্যকর ছিল না, এখন সেগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে।”
ভারতের প্রাণী কল্যাণ বোর্ডের সাবেক সদস্য ও আইনজীবী জয় সিংহ নুগ্গেহাল্লি বলেন, ভারতে গরু জবাইবিরোধী আইনগুলোতে সাধারণত প্রাণী সুরক্ষার যুক্তি তুলে ধরা হয়; কিন্তু বাস্তবে এসব আইন পরিচয়, ব্যবসা ও গ্রামীণ জীবিকার প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
তার মতে, “আমরা পশ্চিমবঙ্গে যা দেখছি, তা বৃহত্তর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অংশ। এখানে গবাদিপশু ও মাংস সংক্রান্ত বিধিনিষেধ রাজনৈতিক বিতর্কের এক মঞ্চ। এ প্রবণতা নতুন নয়; ভারতের অনেক রাজ্যেই দীর্ঘদিন ধরে গরু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি মূলত সেই পুরোনো নীতিগুলোর ধারাবাহিকতা।”
রাস্তায় নামাজ পড়ার ওপর বিধিনিষেধ
ঈদুল আজহার আগে শুধু গরুর মাংসের ব্যবসা নিয়ে সরকারি বিধিনিষেধ নয়, আরও বহু কারণে মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়করা রাস্তায় নামাজ না পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ দক্ষিণ এশিয়ায় সেটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত এক রীতি। শুক্রবার কিংবা ঈদের জামাতে মসজিদে মুসল্লিদের ভিড় থাকে; ফলে জায়গার সংকুলান হয় না। তাই রাস্তায় নামাজ পড়তে মুসল্লিরা বাধ্য হন।
কলকাতার মল্লিক বাজার এবং পার্ক সার্কাসের মতো জনাকীর্ণ এলাকায় ঈদুল আজহার আগে মুসলমানদের আনাগোনা থাকে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসব অঞ্চলে ব্যবসা এখন শূন্যের কোঠায়। কর্তৃপক্ষের ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মল্লিক বাজারের এক লুঙ্গির দোকানদার বলেন, “বাজারগুলো এখন খালি। এমন পরিস্থিতি আগে কখনো ছিল না।”

বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও লেখক হর্ষ মান্দার মনে করেন, বিজেপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসেছে একটি আদর্শিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, “গত ১০০ বছর ধরে ভারতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ মুসলমানদের হিন্দুদের মতো সমান নাগরিক হিসেবে দেখেনি।” তার মতে, ১৯২০-এর দশকে ইউরোপের ফ্যাসিস্ট দলগুলোর আদলে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মতাদর্শ গড়ে ওঠে; যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা।
বর্তমানে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বহু হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপির অন্যান্য প্রধান নেতৃত্বসহ লাখো ভারতীয় হিন্দু দীর্ঘদিন ধরে এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।
মান্দারের ভাষায়, “তারা স্পষ্টভাবে বলছে, মুসলমানদের হয় দেশ ছাড়তে হবে, না হয় অধিকারহীন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে থাকতে হবে। ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে মুসলমানদের কোনো ভূমিকা রাখতে দেওয়া হবে না। বিজেপির রাজনীতি মূলত সেই হিন্দুত্ববাদী লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা; যা নিজ নাগরিকদের বিরুদ্ধেই এক প্রকাশ্য যুদ্ধ।”
প্রতিবেদনটি আল জাজিরা থেকে অনূদিত, এর লেখক ঋত্বিকা মিত্র একজন ফ্রিল্যান্স রিপোর্টার।