Published : 14 Jan 2026, 03:00 AM
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, যাকে সংক্ষেপে বিএনপি নামেই আমরা চিনি। বর্তমানে বাংলাদেশে সক্রিয় সবচেয়ে বড় এই দলটির নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন তারেক রহমান। চেয়ারম্যান হওয়ার পর তিনি ঢাকার গণমাধ্যম কর্মী ও মালিকদের সঙ্গে দেখা করেছেন। সেই অনুষ্ঠানের ছবি এবং ভিডিও এখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি নিজেও অনেক সাংবাদিকের বক্তব্যের ভিডিও দেখেছি, সংবাদে পড়েছি তাদের কথা। কিন্তু কেউ সেভাবে বিএনপির রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফা রূপরেখার ১১ নম্বর দফাটি বিষয়ে জানতে চাননি। হয়তো তারা নিজেরা এই বিষয়টা নিয়ে পরিষ্কার করে জানেন। কিন্তু আমার কাছে কেমন জানি ‘অপরিষ্কার’ লেগেছে।
আমি ১১ নম্বর দফাটি হুবহু এখানে তুলে দিচ্ছি আগে–“গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান ও সার্বিক সংস্কারের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি, মিডিয়া সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী এবং বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য মিডিয়া ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি ‘মিডিয়া কমিশন’ গঠন করা হবে। সৎ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এই লক্ষ্যে সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯-এর প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী সকল কালাকানুন বাতিল করা হবে। চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনি হত্যাসহ সকল সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে।”
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি আলাদা কোনো খাত নয়, এটি সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা, নাগরিক অধিকার এবং গণতন্ত্রের পরিস্থতিতি নির্দেশ করে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামত রূপরেখার ১১ নম্বর দফাটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে, কারণ এখানে সরাসরি গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। তবে এই দফাটি যতটা আশাব্যঞ্জক শোনায়, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে ততটাই জটিল ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
বিএনপি তাদের রূপরেখায় বলেছে, ‘গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান ও সার্বিক সংস্কারের লক্ষ্যে’ একটি মিডিয়া কমিশন গঠন করা হবে এবং ‘সৎ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ পুনরুদ্ধার’ করা হবে। এই ভাষা নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনার শাসনামলে সংকুচিত গণমাধ্যম বাস্তবতার বিপরীতে একটি রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধরে সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়া সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় চাপ, মামলা ও নজরদারির মুখে কাজ করেছে। ফলে এই প্রতিশ্রুতি জনমনে স্বাভাবিকভাবেই আশার জন্ম দেয়।
তবে এই দফার ভাষাগত কাঠামো বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট স্ট্র্যাটেজিক ভেগনেস বা কৌশলগত অস্পষ্টতা চোখে পড়ে। ‘প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’, ‘গ্রহণযোগ্য মিডিয়া ব্যক্তিত্ব’, কিংবা ‘মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী সকল কালাকানুন’ এই শব্দবন্ধগুলো শুনতে শক্তিশালী হলেও বাস্তবে নির্দিষ্ট নয়। কোন আইন বাতিল হবে, কোন আইনে সংশোধন আসবে কিংবা কারা ‘গ্রহণযোগ্য’ হিসেবে বিবেচিত হবেন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ইচ্ছাকৃতভাবে খোলা রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক ইশতেহারে এই ধরনের ভাষা ভবিষ্যতে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায় সীমিত করার একটি পরিচিত কৌশল।
এই দফার কেন্দ্রবিন্দু হলো একটি মিডিয়া কমিশন গঠনের প্রস্তাব। কমিশন ধারণাটি তাত্ত্বিকভাবে সংস্কারমুখী হলেও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা সতর্ক হওয়ার মতো। অতীতে এ ধরনের কমিশন রাজনৈতিক নিয়োগ ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যকর স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকশিত হতে পারেনি। বিএনপির প্রস্তাবে মিডিয়া কমিশনের নিয়োগ পদ্ধতি, ক্ষমতার সীমা এবং জবাবদিহির কাঠামো নিয়ে কোনো স্পষ্টতা নেই। এটি সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষাকারী প্রটেক্টর হবে, নাকি রাষ্ট্রের পক্ষে নিয়ন্ত্রণকারী রেগুলেটর এই প্রশ্নের উত্তর অনুপস্থিত থাকাই উদ্বেগের কারণ।
খুব বেশি দূরে যেতে চাই না, সংস্কারের ‘বুলি’ আওড়ানো অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার একতা মিডিয়া সংস্কার কমিশন করেছিল। বড় বড় সাংবাদিক, এনজিও কর্মীর সমন্বয়ে গঠিত এই কমিশনের ‘ফলাফল’ কি তা দেশবাসী দেখতেই পাচ্ছে। ফলে কমিশনের সদস্যদের ‘গ্রহণযোগ্যতা’ নিয়েও বারবারই প্রশ্ন উঠবে।
আইন সংস্কারের প্রসঙ্গে বিএনপি ‘সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯’ সংশোধনের কথা বলেছে এবং ‘মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী সকল কালাকানুন’ বাতিলের অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিতি হলো ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট এবং পরবর্তীকালে রূপান্তরিত সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট। বাস্তবে শেখ হাসিনার আমলে সাংবাদিক দমন, ভয়ের সংস্কৃতি এবং সেলফ সেন্সরশিপ তৈরি হয়েছে মূলত এই ডিজিটাল আইন ও অনলাইন নজরদারির মাধ্যমে। এই আইনগুলোর নাম সরাসরি উল্লেখ না করা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি নীরবতা।
এখানেই এসে হাজির হয় রাষ্ট্রীয় সার্ভিল্যান্স বা নজরদারি ব্যবস্থার প্রশ্ন। গত দেড় দশকে গণমাধ্যমের ওপর সবচেয়ে ভয়ংকর চাপ এসেছে সরাসরি সেন্সরশিপের মাধ্যমে নয় বরং ডিজিটাল মনিটরিং, মেটাডাটা ট্র্যাকিং এবং অনলাইন আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। সাংবাদিকরা জানতেন, তাদের ফোন, অনলাইন উপস্থিতি ও যোগাযোগ নজরদারির আওতায় থাকতে পারে। অথচ বিএনপির এই দফায় বাকস্বাধীনতা, অনলাইন মতপ্রকাশ কিংবা সাংবাদিকদের ডাটা প্রাইভেসি নিয়ে একটি লাইনও নেই। এই নীরবতা ইঙ্গিত দেয় যে রাষ্ট্রের ডিজিটাল ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে ফেলার প্রশ্নটি এখনও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। এটা বলার কারণ বারবার উঠে এসেছে, তারেক রহমানের লম্বা সময় পশ্চিমা বিশ্বে থাকার ফলে আধুনিক সমস্যা ও সংকটগুলো তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেসব দেশ এগুলো কিভাবে ডিল করে তাও তিনি শিখেছেন। কাজেই যুক্তরাজ্যও এসব বিষয় নিয়ে খুব সিরিয়াস। ফলে মুক্ত স্বাধীনতার প্রসঙ্গে তারেক রহমান ও তার বিএনপি এই বিষয়গুলো দেখবে বলেই আমাদের ধারণা ছিল।
সাগর–রুনি হত্যাসহ সাংবাদিক নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয়। কিন্তু সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনকে কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল ধরা পড়ে না। বাংলাদেশে সাংবাদিক নিপীড়নের পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী দায়মুক্তির সংস্কৃতি, যেখানে ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা থাকলে তদন্ত থমকে যায়। বিএনপির দফায় বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও, এই দায়মুক্তির কাঠামো ভাঙার জন্য কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
তবুও বিএনপির ৩১ দফার ১১ নম্বর দফাটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে, কিন্তু এটি এখনো একটি ‘আংশিক ও শর্তসাপেক্ষ প্রতিশ্রুতি’। এখানে গণমাধ্যমকে মুক্ত করার ভাষা আছে, কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতা, নজরদারি ও ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের সীমা নির্ধারণের প্রশ্নে সচেতন নীরবতা রয়েছে। এই দফা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার একটি কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ চিত্র আঁকে, কিন্তু সেই ভবিষ্যতে পৌঁছানোর পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ দেয় না।
অতএব, এই দফাটি পড়ার সময় শুধু প্রতিশ্রুতির দিকে নয় বরং যেসব বিষয় বলা হয়নি সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি। কারণ বাংলাদেশের বাস্তবতায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল কমিশন গঠন বা কয়েকটি আইন বাতিলের প্রশ্ন নয়, এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের ক্ষমতার সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রশ্ন। সেই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এই প্রতিশ্রুতি আশার পাশাপাশি সতর্কতার কারণ হিসেবেই রয়ে যায়।
তবে আমাদের সাংবাদিকরা চাইলেই সেদিন তারেক রহমানের কাছে এর পরিষ্কার ব্যাখ্যা চাইতে পারতেন। তাহলে আজকে হয়তো আমার এসব লিখতে হতো না। বিএনপি বা তারেক রহমানের মত ক্ষমতাবান ব্যক্তির রূপরেখাকে প্রশ্ন করতে হতো না। যদিও এই ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার দায়িত্ব ছিল সাংবাদিকদের। প্রশ্ন করে পরিষ্কার উত্তর বের করে আনা দরকার ছিল।