Published : 21 Feb 2026, 02:14 AM
ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। আমাদের ক্ষেত্রে এই সত্যটি আরও বেশি আবেগপ্রসূত। কারণ, বাঙালি রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষা করেছে। সমাজের চিন্তা, রাজনীতি, ক্ষমতার কেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক ঝোঁক—সবকিছুই শব্দের ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, রাজনীতির ভাষা, সংবাদের শিরোনাম এবং দৈনন্দিন কথোপকথনেও হঠাৎ বেড়েছে কিছু নির্দিষ্ট আরবি, উর্দু, ফারসি ও ধর্মীয় পরিভাষার ব্যবহার। বাংলায় সহজ ও প্রাত্যহিক বিকল্প থাকা সত্ত্বেও হিস্যা, মোকাম, ইনসাফের মতো শব্দগুলো জায়গা করে নিচ্ছে মূলধারার ভাষায়। এই পরিবর্তন কি নিছক ভাষাগত বিবর্তন, নাকি এর গভীরে রয়েছে সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক পরিবর্তনের এক সূক্ষ্ম সংকেত?
বাংলা ভাষা বরাবরই মিশ্র ভাষারীতির অনুসারী। পাল-সেন যুগ থেকে সুলতানি, মুঘল ও ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত অসংখ্য বিদেশি শব্দ বাংলায় আত্মস্থ হয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রবণতা ভিন্ন। প্রচলিত ও সহজবোধ্য বাংলা শব্দকে সচেতনভাবে ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে এখন বহুল আলোচিত কিছু শব্দ ও তার উৎপত্তির দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। ইনসাফ, হিস্যা, মোকাম, মোবারকবাদ, ফিতনা, জুলুম, ফয়সালার মতো শব্দগুলো আরবি, উর্দু, ফারসি থেকে নেওয়া হয়েছে। অথচ প্রতিটি শব্দের সহজ ও অতীতে বহুল ব্যবহৃত বাংলা রয়েছে। যেমন, ইনসাফ শব্দটির সহজ ও ব্যবহৃত বাংলা ন্যায়বিচার, হিস্যা নয় আগে ব্যবহৃত হতো অংশ বা ভাগ। তেমনি মোকামের বাংলা স্থান বা বাণিজ্যিক জায়গা, মোবারকবাদের বাংলা শুভেচ্ছা বা অভিনন্দন, ফিতনা মানে বিরোধ বা অশান্তি আরও সহজ করে ঝগড়া বা ঝামেলাও ব্যবহার করা যায়। জুলুম শব্দটি বাংলায় নির্যাতন বা অত্যাচার, ফয়সালার বাংলা রায় বা সিদ্ধান্ত।
কিছুদিন আগে প্রথম সারির একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ শিরোনামে চোখ আটকে গেল। শিরোনামটি ছিল, ‘দাম বাড়তি পেঁয়াজের মোকামে’। আরেক পত্রিকার শিরোনাম, ‘মোকামের সিন্ডিকেটে পেঁয়াজের দাম লাগামহীন’। অথচ ছোট থেকে পেঁয়াজের আড়ৎ কথাটির সঙ্গেই বাঙালি পরিচিত।
ভাষার এই পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক অঙ্গন, বক্তৃতা বা সংবাদে সীমাবদ্ধ নেই। দৈনন্দিন জীবন, মৌখিক আলাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এটি ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের বিয়ের ঐতিহ্যে গায়ে হলুদ, বিয়ে, বৌভাতের মতো স্বতন্ত্র নামগুলো এখন হালদি, নিকাহ, ওয়ালিমায় রূপান্তরিত হচ্ছে। উপমহাদেশে উর্দু-আরবির প্রভাব পুরোনো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হঠাৎ করে কেন বাংলা শব্দের জায়গা দখল করে এগুলো বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে? এ কি স্বাভাবিক বিবর্তন, নাকি আদর্শিক আগ্রাসন?
শব্দ কি সত্যিই নিরপেক্ষ? কোন শব্দ ব্যবহার হচ্ছে আর কোনটি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়ছে তা ক্ষমতার ভাষা বলে দেয়। ‘ন্যায়’ থেকে ‘ইনসাফ’-এ রূপান্তর হলে শুধু ধ্বনি বদলায় না, ন্যায়ের ব্যাখ্যার কাঠামোও বদলে যায়। এটি সাংবিধানিক বা নাগরিক ধারণা থেকে ধর্মীয় ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে। একইভাবে ‘অংশ’ থেকে ‘হিস্যা’ বললে সম্পত্তি-অধিকার-বণ্টনের প্রশ্নে ধর্মীয় আইনের ছায়া পড়ে। শব্দ ধারণা বহন করে আর ধারণা রাজনীতি তৈরি করে।
বাংলায় হঠাৎ আরবি, ফারসি বা ধর্মীয় শব্দের প্রবণতা বাড়ার পেছনে একক কারণ নেই। এটি রাজনৈতিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিনির্ভর বিবর্তনের জটিল মিশ্রণ। ইন্টারনেটের যুগে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘প্যান-ইসলামিক’ পরিচয়ের জোয়ার এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি ও ভাষাকে ধর্মীয় বিশুদ্ধতার মাপকাঠি মনে করা হচ্ছে। ফলে অনেক বাঙালি মুসলমান বাঙালিয়ানার চেয়ে বৈশ্বিক মুসলিম পরিচয়কে বড় করে দেখছেন, যার প্রতিফলন শব্দচয়নে। ‘শুভেচ্ছা’র বদলে ‘মোবারকবাদ’ এখান থেকেই এসেছে।
ফেইসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ধর্মীয় বক্তা ও ইনফ্লুয়েন্সারদের লাখ লাখ ফলোয়ার। তারা বাংলার পরিবর্তে গালভরা ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহার করলে তরুণরা সেগুলোকে ‘ট্রেন্ড’ মনে করে গ্রহণ করে। এতে ভাষাগত আধিপত্য তৈরি হচ্ছে।
আরেকটি কারণ পরিচয় সংকট। অনেকে মনে করেন, বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিতে হিন্দু ধর্মের প্রভাব বেশি। এই ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ থেকে মুক্তির জন্য ভাষাকে ধর্মীয় ছাঁচে ঢালাই করতে চান তারা। ‘ন্যায়বিচার’ সবার জন্য হলেও ‘ইনসাফ’ বললে নির্দিষ্ট ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়, যা এই গোষ্ঠীটি পছন্দ করেন।
রাজনৈতিক ও আদর্শিক মেরুকরণ এই বিষয়টিতে প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। ধর্ম বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় ফ্যাক্টর। গত কয়েক দশকে ধর্মীয় রক্ষণশীলতার বিস্তার ভাষার ওপর প্রভাব ফেলেছে। কিছু গোষ্ঠী সচেতনভাবে প্রচলিত বাংলা শব্দকে ‘সংস্কৃতঘেঁষা’ বা ‘হিন্দুয়ানি’ বলে বর্জন করে ‘ইসলামিক’ শব্দ প্রচার করে। রাজনীতির মাঠে যখন অন্য সব ইস্যু ম্লান হয়ে যায়, তখন ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর ভাষা এখানে অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে।
ঠিক এইখানেই লুকিয়ে রয়েছে জরুরি একটি কৌশল। ফরাসি দার্শনিক রোলাঁ বার্থের ‘মিথোলজিস’ বইয়ে বলা হয়েছে, কীভাবে কথা বলা হবে, কোন ভাষা ব্যবহার করা হবে এবং কী কায়দায় বাচন উদ্ধৃত হবে, তার মাধ্যমেই ‘মিথ’ নির্মিত হয়। ভাষার বিশেষ কন্ডিশনিংই ‘মিথ’ নির্মাণ করে। বিগত কয়েক বছরে ভাষা ও বাচনের ধর্মীয়করণের মাধ্যমে একটি প্যান-ইসলামিক আধিপত্যের মিথ আমাদের চিরায়ত বাঙালিয়ানার সংস্কৃতিতে নিঃশব্দে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে।
ভাষার পরিবর্তন চিরন্তন, কিন্তু যখন এটি বিশেষ আদর্শিক চাপ বা ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের হাতিয়ার হয়, তখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রবণতা আশঙ্কাজনক কারণ এটি ধীরে ধীরে ভাষার মাধ্যমে ধর্মীয় আধিপত্যকে স্বাভাবিক করে তোলে। বাংলাদেশে বহুত্ববাদী সমাজ বিরাজমান। ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাসের বৈচিত্র্যই তার শক্তি। কিন্তু রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও গণমাধ্যমের ভাষায় ধর্মনির্ভর শব্দ প্রাধান্য পেলে বহুত্ববাদ সংকুচিত হয়। আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে নয়, এটি শব্দের নীরব আগ্রাসনের মাধ্যমে সমাজের মানসিক কাঠামো বদলে দেয়। ফলে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য লোপ পায়। এতে আরবি-ফারসি পরিভাষাকে ‘পবিত্র’ বা ‘শ্রেয়’ মনে করানো হয়, যা হাজার বছরের সমন্বিত বাঙালি সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে।
ভাষার এই কৃত্রিম রূপান্তর সমাজে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়। একপক্ষ ভাষার ‘ইসলামীকরণ’ করতে চাইলে অন্যপক্ষ প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠতে পারে। ফলে ভাষা মিলনের মাধ্যম না হয়ে বিভাজনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ সৃষ্টি হয়।
এই প্রবণতা মহান ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সচেতনভাবে বাংলা শব্দ বর্জন করে ধর্মীয় শব্দ গ্রহণ করলে পরোক্ষভাবে ওই রক্তের ঋণ অবজ্ঞা করা হয়। বাঙালি মাতৃভাষার জন্য রাজপথে প্রাণ দিয়েছে। এটি শুধু রাষ্ট্রভাষার দাবি নয়, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, রাজনৈতিক মর্যাদা ও বাঙালি পরিচয়ের লড়াই ছিল। ভাষা আন্দোলন থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনা। ভাষার ওপর আধিপত্য মানে মানুষ, রাষ্ট্র ও দেশের ওপর আধিপত্য। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে আজকের এ শব্দ পরিবর্তনকে নতুন করে দেখতে হবে।