Published : 30 Jan 2026, 06:17 PM
গণভোটকে সাধারণত গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের এক বিশেষ রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—যেখানে জনগণ সরাসরি কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি বা সাংবিধানিক প্রশ্নে মতামত প্রদান করে। কিন্তু রাজনৈতিক বিজ্ঞান সাহিত্যে বহুদিন ধরেই একটি সমান্তরাল বিতর্ক রয়েছে: গণভোট কি সত্যিই গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রতিফলন, নাকি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর জন্য বৈধতা উৎপাদনের একটি নিয়ন্ত্রিত হাতিয়ার? বিশেষ করে হাইব্রিড বা কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় গণভোট প্রায়ই ‘গণভোট‑নির্ভর রাজনীতি’ বা ‘managed legitimacy exercise’‑এ পরিণত হয়—যেখানে ফলাফল অনিশ্চিত প্রতিযোগিতার চেয়ে পূর্বনির্ধারিত বৈধতার প্রদর্শনী হয়ে ওঠে। David Altman, Andreas Schedler এবং Steven Levitsky & Lucan Way‑এর মতো গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে অনেক রাষ্ট্রেই গণভোটকে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনর্গঠনের একটি কৌশলগত উপায় হিসেবে, যেখানে জনগণের অংশগ্রহণের চেয়ে ফলাফলের রাজনৈতিক ব্যবহারই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বর্তমান গণভোটকে এই বৃহত্তর তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—গণভোটে যদি ‘না’ জয়ী হয়, তাহলে কী হবে? অন্তর্বর্তী সরকার কি সেই সম্ভাবনাকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত, নাকি তারা ‘হ্যাঁ’‑কেই একমাত্র সম্ভাব্য ফলাফল ধরে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে? এই প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক কৌতূহল নয়; এটি সরকারের বৈধতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
বাংলাদেশের অতীতের দুইটি গণভোট—১৯৭৭ এবং ১৯৮৫—এই প্রশ্নকে আরও জটিল করে তোলে। জিয়াউর রহমানের সময় অনুষ্ঠিত ১৯৭৭ সালের গণভোটে সরকারি হিসেবে প্রায় ৯৮–৯৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেখানো হয়। এরশাদের সময় ১৯৮৫ সালের গণভোটেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের হার ছিল ৯০ শতাংশের অনেক ওপরে। এই ধরনের ফলাফল গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার মানদণ্ডে ব্যাখ্যা করা কঠিন। বরং এগুলোকে রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা সাধারণত ‘কর্তৃত্ববাদী গণভোট’ বা ‘নিয়ন্ত্রিত গণভোট’ হিসেবে চিহ্নিত করেন—যেখানে প্রশাসনিক প্রভাব, বিরোধী কণ্ঠের দমন এবং ভোটের ফলাফলকে রাজনৈতিকভাবে কাঠামোবদ্ধ করার প্রবণতা কাজ করে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বর্তমান গণভোটের ওপর একটি দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে। জনগণের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে—এবার কি সত্যিকারের ভোট হবে, নাকি আবারও অস্বাভাবিকভাবে একপেশে ফলাফল দেখা যাবে?
এখানে আন্তর্জাতিক তুলনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ একা নয়—বিশ্বের বহু দেশেই গণভোটকে ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষমতার পুনর্গঠন, সাংবিধানিক পরিবর্তন, কিংবা শাসকগোষ্ঠীর বৈধতা পুনর্নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে। লাতিন আমেরিকার উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যায়। চিলিতে ১৯৮০ সালে অগুস্তো পিনোশের সামরিক শাসনের অধীনে অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক গণভোটে সরকারি হিসেবে প্রায় দুই‑তৃতীয়াংশ ভোট ‘হ্যাঁ’ দেখানো হয়। বিরোধী দলগুলোর ওপর দমন‑পীড়ন, গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে এই গণভোটকে অনেক গবেষকই ‘নিয়ন্ত্রিত গণভোট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু ১৯৮৮ সালে আরেকটি গণভোটে, যেখানে পিনোশের শাসন অব্যাহত থাকবে কি না, সেই প্রশ্নে ‘না’ ভোট জয়ী হয় এবং সেটি চিলির গণতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। এই উদাহরণ দেখায়, গণভোট কখনো কখনো কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিরোধেরও হাতিয়ার হতে পারে—যদি প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক থাকে।
অন্যদিকে মিশর, রুয়ান্ডা বা রাশিয়ার অভিজ্ঞতা ভিন্ন ধরনের। মিশরে ২০১৪ সালের সাংবিধানিক গণভোটে সরকারি হিসেবে প্রায় ৯৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেখানো হয়, যদিও বিরোধী দলগুলোর বড় অংশই প্রক্রিয়াটি বয়কট করে। রুয়ান্ডায় ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ বাড়ানোর প্রশ্নে গণভোটে প্রায় ৯৮–৯৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেখানো হয়। এই ধরনের ফলাফলকে অনেক গবেষক ‘প্রায়‑সর্বসম্মত গণভোট’ হিসেবে দেখেন, যা বাস্তব রাজনৈতিক বিভাজনকে প্রতিফলিত না করে বরং রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ের রাজনীতিকে প্রতিফলিত করে। রাশিয়ার ২০২০ সালের সাংবিধানিক গণভোটে সরকারি হিসেবে প্রায় ৭৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেখানো হয়, যা অনেক পর্যবেক্ষকের মতে ‘managed democracy’‑র অংশ—যেখানে নির্বাচন ও গণভোট আছে, কিন্তু প্রক্রিয়াটি ক্ষমতাসীনদের পক্ষে কাঠামোবদ্ধ।
তুরস্কের ২০১৭ সালের সাংবিধানিক গণভোট আবার ভিন্ন ধরনের উদাহরণ। সেখানে প্রেসিডেন্টশিয়াল সিস্টেম চালুর প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলেও ব্যবধান ছিল খুবই কম—প্রায় ৫১–৫২ শতাংশের মতো। এই ফলাফল দেখায় যে সমাজের ভেতরে গভীর রাজনৈতিক বিভাজন আছে এবং গণভোট সেই বিভাজনকে সংখ্যাগতভাবে দৃশ্যমান করেছে। এটি ‘প্রতিযোগিতামূলক গণভোট’‑এর একটি উদাহরণ—যেখানে ফলাফল ক্ষমতাসীনদের পক্ষে গেলেও প্রতিযোগিতা ছিল বাস্তব।
এই আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, অস্বাভাবিকভাবে বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোট (৯৫–৯৯ শতাংশ) সাধারণত সেই প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, যেখানে বিরোধী কণ্ঠ দমন করা, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়ত, তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক গণভোটে ফলাফল সাধারণত কাছাকাছি থাকে—৫৫–৪৫ বা ৬০–৪০—যা সমাজের ভেতরের বাস্তব রাজনৈতিক বিভাজনকে প্রতিফলিত করে। তৃতীয়ত, গণভোটের বৈধতা শুধু ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না; বরং প্রক্রিয়ার প্রতিযোগিতামূলকতা, বিরোধী পক্ষের অংশগ্রহণ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ফলাফল গ্রহণের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশের বর্তমান গণভোটকে যখন এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেখা হয়, তখন স্পষ্ট হয় যে অতীতের ৯৭–৯৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের অভিজ্ঞতা গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার চেয়ে ‘গণভোট‑নির্ভর কর্তৃত্ববাদ’-এর সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যদি আবারও একই ধরনের অস্বাভাবিক একপেশে ফলাফল দেখা যায়, তাহলে তা আন্তর্জাতিক তুলনামূলক মানদণ্ডেও গণতান্ত্রিক বৈধতার প্রশ্নে দুর্বল অবস্থানে পড়বে।
এখন প্রশ্নে ফিরে আসা যাক—গণভোটে যদি ‘না’ জয়ী হয়, তাহলে কী হবে? এই প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক কৌতূহল নয়; এটি সরকারের বৈধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। যদি অন্তর্বর্তী সরকার সত্যিই গণভোটকে একটি প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করে থাকে, তাহলে ‘না’ জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাকেও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ধরে নিয়ে আগেই একটি বিকল্প রোডম্যাপ প্রস্তুত থাকা উচিত ছিল—যেখানে বলা হত, ‘না’ জিতলে পরবর্তী সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে। কিন্তু যদি বাস্তবে সরকার ‘হ্যাঁ’‑কেই একমাত্র সম্ভাব্য ফলাফল ধরে নিয়ে অগ্রসর হয়, এবং ‘না’‑র সম্ভাবনাকে রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বা অচিন্তনীয় ধরে নেয়, তাহলে গণভোটের পুরো প্রক্রিয়াই ‘প্রতীকী বৈধতা অর্জনের প্রচেষ্টায়’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও এই অনিশ্চয়তাকে আরও জটিল করে। ‘না’‑র পক্ষে জাতীয় পার্টি ও সিপিবি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি ‘হ্যাঁ’‑র পক্ষে। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হ্যাঁ’ সমর্থন করলেও তাদের প্রচারণায় দ্বৈততা, নীরবতা এবং মিশ্র সংকেত দেখা যাচ্ছে—যা ‘strategic ambiguity’‑র একটি উদাহরণ—যেখানে একটি দল অনিশ্চিত ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের অবস্থান নমনীয় রাখে, যাতে পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করতে পারে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের এই গণভোট কেবল একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি সরকারের বৈধতা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর একটি গভীর পরীক্ষা। ‘না’ জয়ী হলে এই পরীক্ষার ফলাফল শুধু রাজনৈতিক সমীকরণই বদলাবে না; এটি সরকারের ক্ষমতার যৌক্তিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতাকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে। আর ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সরকার তাদের কাঙ্ক্ষিত রূপান্তরকে গণভোটের মাধ্যমে প্রাপ্ত বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করবে। কিন্তু যে ফলাফলই আসুক, গণভোটের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করবে এর প্রতিযোগিতামূলকতা, স্বচ্ছতা এবং ফলাফল গ্রহণের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি সংখ্যার মধ্যে নয়—প্রক্রিয়ার মধ্যে। আর সেই প্রক্রিয়া কতটা উন্মুক্ত, কতটা প্রতিযোগিতামূলক এবং কতটা বিশ্বাসযোগ্য—সেটাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এই গণভোট ইতিহাসে কীভাবে লেখা হবে।