১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশ কি আরববিশ্বের প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চলেছে?

হুতিদের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপে বাংলাদেশ সরাসরি যুক্ত হলে তা ইরানকেও যুক্ত করে ফেলবে। ফলে, পশ্চিম এশিয়ার জটিল প্রক্সি যুদ্ধে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি হবে। আর তা হলে এই জটিল ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশের হাতও রঞ্জিত হবে।

বাংলাদেশ কি আরববিশ্বের প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চলেছে?
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বাংলাদেশসহ ৪৩টি দেশের সামরিক প্রতিনিধি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন শেষে জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়। ছবি: এসপিএ

এম. টি. ইসলাম এম. টি. ইসলাম

Published : 03 Aug 2026, 06:40 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

বাংলাদেশ কি পশ্চিম এশিয়ার প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চলেছে? সম্প্রতি বাংলাদেশ সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ‘বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট’-এ যুক্ত হওয়ায় স্বভাবতই এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে। গত কয়েকদিনের দেশি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এই জোটে যোগ দিয়েছে। বলা চলে অনেকটাই 'পাকিস্তানের হাত ধরে' সৌদি আরবের সঙ্গে এই প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ।

গত ২৭ জুলাই সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতি থেকে জানা যায় যে ‘সামুদ্রিক প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে যৌথ সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে’ এই জোট গঠন করা হয়েছে। সৌদি আরবসহ মোট ১৪টি দেশ এই সামুদ্রিক সামরিক জোট গঠনে সম্মত হয়েছে। এই জোট গঠনের লক্ষ্যে আয়োজিত বৈঠকে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সৌদি আরব ও বাংলাদেশ ছাড়া এই জোটের অন্যান্য সদস্যরা হলো তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান এবং কোমোরোস।

মুসলিম দেশ নিয়ে গঠিত এই জোটের মূল লক্ষ্য বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগর দিয়ে অবাধ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা। এই নতুন জোটের বদৌলতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। কারণ বাংলাদেশ তার জন্মলগ্ন থেকে যে ‘নন-অ্যালাইন্ড’ বা ‘নিরপেক্ষ’ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এসেছে, এই জোটে যোগদানের মাধ্যমে তার একধরনের নৈতিক পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই জোট কীভাবে বাংলাদেশকে পশ্চিম এশিয়ার রক্তক্ষয়ী প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে?

এই জোটে যোগদানের পর বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। ওই প্রেক্ষাপটে গত ২ অগাস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, বাংলাদেশ মূলত ‘হুতিদের ঠেকাতে’ এই বহুজাতিক জোটে যোগ দিয়েছে; ইরানকে ‘আক্রমণ’ করতে নয়। ফলে, প্রাথমিক পর্যায়ে এটিকে ইরানবিরোধী জোট মনে করা হলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে এই জোটে যোগদানের লক্ষ্য স্পষ্ট করা হয়েছে। আশাবাদী হলে বলা যায়, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হতে পারে এই জোট।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, হুতি সংকট কি পশ্চিম এশিয়ায় শুধু একটি ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হওয়ার কারণে? নাকি এটি পশ্চিম এশিয়ার আঞ্চলিক শক্তি চর্চার অন্যতম প্রভাবক হওয়ার কারণে? এই প্রশ্নের উত্তর জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পশ্চিম এশিয়ায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলা প্রক্সি যুদ্ধের অন্যতম অনুঘটক ইয়েমেন থেকে পরিচালিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠী। হুতি গোষ্ঠী কেন আঞ্চলিক শক্তি যুদ্ধের অন্যতম ক্ষেত্র, তার প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে এই জোট কেন তৈরি হলো ওই প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে।

২০২২ সালে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকার ও হুতিদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর এ বছর জুলাইয়ের শুরুর দিকে এই প্রথম হুতি ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী দাবি করে যে, ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্য শেষে হুতি নেতাদের ফিরে আসা ঠেকাতে সৌদি আরব সানার বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরব এই হামলার দায় অস্বীকার করার পরও হুতিরা সৌদি আরবের জাতীয় তেল কোম্পানি ‘আরামকো’র বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা জানায়। এভাবে দীর্ঘদিনের এই প্রক্সি যুদ্ধ নতুন মোড় নেয়।

এই হুতি-সৌদি উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার পর ইরান এই যুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করে। ইরান ঘোষণা দেয় তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বৃদ্ধি পেলে লোহিত সাগরে তেল পরিবহন বন্ধ করে দেবে। একই সঙ্গে ইরান তার আঞ্চলিক প্রক্সিগ্রুপ হুতিকে লোহিত সাগরে হামলা ও মোটামুটি একটি অর্থনৈতিক জ্বালানি অনিশ্চয়তা তৈরিতে নীতিগত অনুমোদন ও উস্কানি দেয়। শুধু উস্কানি নয়, গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হুতি ইতোমধ্যে সৌদি আরবের কয়েকটি তেলের ট্যাংকারে হামলাও করেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ফলে সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানির বিকল্প ছিল লোহিত সাগর। কিন্তু সেখানে হুমকি তৈরি হলে রিয়াদ নড়েচড়ে বসে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে নতুন এই জোট তৈরির ঘোষণা দেয়।

আপাতদৃষ্টিতে এই জোট লোহিত সাগরকেন্দ্রিক হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা লোহিত সাগরকেন্দ্রিক যে থাকবে না, তা হলফ করে বলা যায়। একই সঙ্গে এটিও বলা অত্যুক্তি হবে না যে, এই জোট পক্ষান্তরে হুতিদের বারুদের শক্তি জোগানো ইরানের বিরুদ্ধে একটি জোটও। বাংলাদেশ সরকার দেশের সাধারণ জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা সফল হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওই চেষ্টা অতটা সফল হওয়া হবে না। তবে, এটিকে নির্দিষ্ট ‘হুতিবিরোধী জোট’ বা ‘ইরানবিরোধী জোট’ যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এই জোটে যোগদান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন ও জটিল এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

তাই, বাংলাদেশের জনগণের দুটি বিশেষ প্রভাব ও ফলাফলের জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, এই জোট প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান জটিল প্রক্সি যুদ্ধের অংশ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, হুতিসহ ইরানের অন্যান্য সশস্ত্র প্রক্সিগ্রুপকে নির্মূল করা ব্যতীত বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগর-এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। পশ্চিম এশিয়ার এই প্রক্সি যুদ্ধের অন্যতম প্রধান দুই অ্যাক্টর যেহেতু সৌদি আরব ও ইরান, সেহেতু ভবিষ্যতে এই জোটের ভূমিকা পশ্চিম এশিয়াকেন্দ্রিক প্রক্সি যুদ্ধে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থেকে যায়। ইরান-সৌদি আরবের এই প্রক্সি যুদ্ধ যেহেতু ইয়েমেন, হিজবুল্লাহ ও হামাসের মাধ্যমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এবং প্রায় আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত, সেহেতু ভবিষ্যতে এই জোটের ভূমিকা বৃদ্ধির চাপ আসলে বাংলাদেশের পক্ষে সেটি থেকে বের হওয়া অনেক জটিল হয়ে পড়বে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনীতি ও নিরাপত্তায় এটির সম্ভাব্য প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো কীভাবে বৈদেশিক নীতি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব ফেলে। ওই সূত্র ধরে বলা যায়, এই জোটের ভূমিকা ইরান তার প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলে তা পশ্চিম এশিয়ার আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ফেলবে। অর্থাৎ কোনো সামরিক যুক্ততা তৈরি হলে সেখানে বাংলাদেশকে সরাসরি যুক্ত হওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে। এই প্রেক্ষিতে ওপরের প্রেক্ষাপট বাস্তবে রূপ নিলে সেখানে হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর যুক্ত হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা আছে। আর তা হলে সন্ত্রাসবাদের ‘উচ্চ’ ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, ওই ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ কি আদৌ প্রস্তুত? এই প্রশ্নের উত্তর জানা অত্যন্ত জরুরি, কারণ অভ্যন্তরীণভাবে সৃষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকি নিরসনে হিমশিম খাওয়া বাংলাদেশের পক্ষে নতুন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন হবে। আর এই ধরনের ঝুঁকি তৈরিতে হুতি, হিজবুল্লাহ বা হামাসের মতো ধুরন্ধর আন্তর্জাতিক অ্যাক্টর যুক্ত হলে ওই ঝুঁকির মাত্রা যে আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে, তা ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখে না। এটি আরও বড় ঝুঁকির কারণ, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিসরে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বহু ‘সিম্প্যাথাইজার’ রয়েছে। ফলে, দেশের অভ্যন্তরে নতুন কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করা তাদের জন্য এতটা কঠিন হবে না।

এবার পরবর্তী প্রশ্ন। এই জোটে বাংলাদেশের ভূমিকা কী হবে? এটি যেহেতু পরামর্শ সভা নয় এবং একটি প্রতিরক্ষা জোট, সে ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোর নির্দিষ্ট ভূমিকা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ঝাপসা হলেও এই জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ভূমিকা সম্পর্কে কিছুটা আভাস দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি উল্লেখ করেন যে, “যেকোনো সময় যদি সৌদি আরব নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো সহায়তা চায়, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নৈতিক ও আদর্শিক জায়গা থেকে সবসময়ই সাড়া দেবে এবং সহায়তা করবে”। এছাড়াও তিনি উল্লেখ করেন, “কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং ঢাকা ও রিয়াদের সম্পর্ক হবে কৌশলগত [...]”।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার এই বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ পশ্চিম এশিয়ায় কৌশলগত সম্পর্কে জড়াতে চলেছে বা কৌশলগত সম্পর্ক বাড়িয়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু তিনি এটি স্পষ্ট করেননি যে, বাংলাদেশ যেহেতু সেখানে পরামর্শক বা সহযোগী কোনো সদস্য নয়, সেহেতু এই জোট হুতিদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিলে সেখানে বাংলাদেশের সরাসরি ভূমিকা রাখার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে কিনা।

অর্থনৈতিক কারণে এই সৌদি জোটে বাংলাদেশের যোগদানের একধরনের বাধ্যবাধকতা ছিল, এটি সত্য। একইভাবে এটিও সত্য যে, এই জোট কোনো সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিলে তাতে অংশগ্রহণে আরও অধিকতর বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে। আর তা হলে, অর্থাৎ হুতিদের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিলে, সেটি ইরানের মতো একটি অথোরিটেরিয়ান রেজিম কি স্বাভাবিকভাবে নেবে? অতীতে ঘটনা থেকে দেখা যায় যে, হুতিদের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক হামলা হলে ইরান বিভিন্নভাবে সেটির পাল্টা প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই সম্পর্কে ইরানের নানান লুকোছাপা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের পর হুতি-ইরান সম্পর্ক আরও শক্তিশালী রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি ইরানের আহ্বানে হুতিদের লোহিত সাগরে হামলা ওই পারস্পরিক বোঝাপড়াকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

তাই, বলা যায় হুতিদের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপে বাংলাদেশ সরাসরি যুক্ত হলে তা ইরানকেও যুক্ত করে ফেলবে। ফলে, সেটি বাংলাদেশকে পশ্চিম এশিয়ার এই জটিল প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করবে। আর সেটি হলে পশ্চিম এশিয়ার এই জটিল ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশের হাতও রঞ্জিত হবে।

এছাড়াও প্রশ্ন আসতে পারে, পররাষ্ট্রনীতির এই মৌলিক পরিবর্তন হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য মিত্রশক্তি এই ধরনের সামরিক যুক্ততার আহ্বান জানালে সেটিতে যুক্ত হওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। নানান অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা জনিত কারণে বাংলাদেশ যেহেতু পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে শতভাগ স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে না, তাই পররাষ্ট্রনীতির এই মৌলিক পরিবর্তন দেশের বৈদেশিক নীতিতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করতে পারে।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীক সরকারের ‘কেস টু কেস’ পররাষ্ট্রনীতির কারণে বাংলাদেশ যে জটিলতার মুখোমুখি হয়েছে, বর্তমান সরকার ওই একই পথে হাঁটলে বাংলাদেশ আরও বড় জটিলতর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে। কারণ সবসময় পররাষ্ট্রনীতির মূল শক্তি ‘অ্যাকশন নয়’; বরং ‘কৌশল’ মূল শক্তি। এটিও মনে রাখতে হবে যে, পররাষ্ট্রনীতি একটি সংগঠিত দর্শন। তাই সেখানে কোনো কেস ভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত। সর্বোপরি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’-এর ভাষায় বললে বলতে হয়, পররাষ্ট্রনীতি কোনো ‘বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তের সমষ্টি নয়’। বরং এটি একটি দেশের ‘জাতীয় লক্ষ্য ও সেটি অর্জনের উপায়গুলোর সমষ্টি’।

এম. টি. ইসলাম শিক্ষক ও গবেষক। ই-মেইল: toriqul38@gmail.com