প্রসঙ্গ: শিখণ্ডী অধিকার

Published : 22 July 2014, 03:55 AM
Updated : 22 July 2014, 03:55 AM

''হায়রে বাবু মুশাইরা, আপনার স্ত্রীর গর্ভেও যে আমাগো মতন সন্তান আসব না কেমন কইরা বুঝলেন…?''

প্রায় পঁচিশ বছর আগে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমীতে 'শিখণ্ডী কথা' নাটকে কলকাতার মূকাভিনেতা প্রয়াত যোগেশ দত্ত এ ডায়ালগ নিয়ে যখন আসনে বসা দর্শকদের মাঝখানে চলে এসেছিলেন, গা শিউরে উঠেছিল সবার সঙ্গে আমারও। হ্যাঁ, যে কারও সন্তান হতে পারে শিখণ্ডী অর্থাৎ প্রচলিত অর্থে 'হিজড়া'। কিন্তু আমরা গতানুগতিক সংস্কারাচ্ছন্ন মানুষেরা তা মানি না। আর মানি না বলেই তাঁদের ভয় পাই, দূরে ঠেলে দিই। ধর্মও এঁদের নেয় না, রাষ্ট্র তো নয়ই!

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা আমাদের দেশে 'হিজড়া' বলে পরিচিত। তাঁরা আমাদের সমাজে অস্পৃশ্য, অযাচিত ও কুৎসিত বলে অনাদৃত। অথচ আমাদের মতোই তাঁদের আহার গ্রহণ করতে হয়, নিদ্রায় যেতে হয়। আমাদের মতোই তাঁদের সুখ ও দুঃখবোধ রয়েছে। পুলক ও যন্ত্রণার অভিব্যক্তিও বাদ নেই। তাঁদের যা নেই তা হল কর্মসংস্থান, পুনর্বাসন, আবাসন অথবা স্থায়ী পল্লী আর স্বাভাবিক মানুষের মতো বাঁচার অধিকার।

বর্তমান লেখাটির মাধ্যমে আমি আমাদের দেশের শিখণ্ডীদের অধিকার ও তাঁদের পক্ষে রাষ্ট্রের নেওয়া সাম্প্রতিক উদ্যোগের ওপর সামান্য আলোকপাত করতে চাই। তবে এ নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে 'শিখণ্ডী কথা' নাটকের আখ্যান কথকতায় ফিরে যেতে চাই। পাঠক সম্ভবত বিরক্ত হবেন না।

ধ্রুপদী আখ্যান মহাভারতের এক নিপীড়িত রাজকন্যা 'অম্বা'– পরজন্মে হলেন 'শিখণ্ডী' যিনি না নারী না পুরুষ। নিপীড়নের প্রতিশোধ নিতে শিখণ্ডী রূপে জন্মলাভের বর পেতে লড়তে হয়েছে অম্বাকে। এভাবে চিরঞ্জীব হয়ে আছে মহাভারতের অম্বা ও শিখণ্ডী দুটো চরিত্রই।

পূর্বজন্মের অম্বা কাশীরাজের তিন কন্যার মধ্যে জ্যেষ্ঠ। ওদিকে পরাক্রমশালী হস্তিনাপুর রাজ্যের সিংহাসনের রক্ষাকর্তা ভীষ্ম। তাঁর অসুস্থ ও দুর্বল বৈমাত্রেয় ভ্রাতা বিচিত্রবীর্য সিংহাসনে আসীন, রাজ্য চালান মূলত মহাশক্তিধর ভীষ্মই। তিনি চিরকুমার থাকার ব্যাপারে পিতার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। তাই ভ্রাতা বিচিত্রবীর্যের বিবাহের জন্য কাশীরাজের তিন কন্যা, অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকাকে স্বয়ম্বর সভা থেকে বলপূর্বক হরণ করে আনেন তিনি। পথে জ্যেষ্ঠ ভগ্নি অম্বা ভীষ্মকে জানান যে, তিনি মনে মনে শাল্বরাজকে বরণ করেছেন।

শক্তিধর হলেও সদাশয় ভীষ্ম অম্বার অধিকার স্বীকার করে তাঁকে শাল্বরাজের কাছে পাঠালেন। কিন্তু শাল্বরাজ অম্বাকে নিজের ভার্যা করতে রাজি হন না। তিনি তাঁকে বললেন যে, তিনি 'অন্যপূর্বা', ভীষ্ম তাঁকে স্পর্শ করেছেন, অতএব তাঁর স্থান ভীষ্মের কাছে। অপমানিত অম্বা পরশুরামের শরণাপন্ন হলেন। পরশুরাম ভীষ্মকে আদেশ দেন অম্বাকে বিবাহ করতে। ভীষ্ম চিরকুমার থাকার ব্রত নিয়েছিলেন বলে আদেশ পালনে অসম্মত হন।

পরশুরাম ক্রুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ শুরু করেন নিজের শিষ্য ভীষ্মের সঙ্গে, কিন্তু তাঁকে পরাজিত করতে পারলেন না। তখন অম্বা নিজেই ভীষ্মকে বধ করার সংকল্প নিয়ে তপস্যা শুরু করেন। তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে মহাদেব দেখা দিলে, তাঁর কাছে অম্বা ভীষ্ম-নিধনের বর চান। মহাদেব 'পরজন্মে ওঁর বাসনা পূর্ণ হবে' বলে বর দিলেন। অম্বাকে তিনি জানালেন যে, পরজন্মে তিনি পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের (পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী দ্রৌপদীর পিতা) কন্যা হয়ে জন্মলাভ করে পরে 'পুরুষত্ব' লাভ করবেন।

অনেক পরে বিচিত্রবীর্যের দুই স্ত্রী অম্বিকা ও অম্বালিকার (অম্বার ছোট দু'বোন) গর্ভজাত পুত্রদ্বয় ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডুর পুত্রদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এর পরিণতিতে কুরুক্ষেত্রে ভয়ানক যুদ্ধও শুরু হয়ে যায় দু'পক্ষে। ভীষ্ম উভয় পক্ষের পিতামহ, তবু সিংহাসনে আসীন ভ্রাতুষ্পুত্র ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের (দুর্যোধন ও তাঁর ভ্রাতাদের) পক্ষে অস্ত্র ধরেন তিনি। ফলে পাণ্ডুপুত্ররা (যুধিষ্ঠিরসহ পঞ্চপাণ্ডব) তখন ভীষ্মের শত্রুপক্ষ।

ততদিনে অম্বা পরজন্ম লাভ করেছেন, পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের সন্তান 'শিখণ্ডী' হিসেবে। গড়ে উঠেছেন যোদ্ধা হিসেবে। পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী দ্রৌপদী তাঁর ভগ্নি, যাকে কুরু রাজসভায় বস্ত্রহরণের চেষ্টা করেছিল দুর্যোধনের পক্ষ। তারই প্রতিশোধ নিতে কুরুক্ষেত্রের রণভূমিতে তখন মুখোমখি দু'পক্ষ। সঙ্গত কারণেই পঞ্চপাণ্ডবের পক্ষের যোদ্ধা এখন শিখণ্ডী।

শিখণ্ডীর জন্ম-রহস্য জানতেন পিতামহ ভীষ্ম। তাই দুর্যোধনকে তিনি আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, শিখণ্ডীর বিরুদ্ধে তিনি অস্ত্রধারণ করবেন না। পাণ্ডবরাও তা জানতেন। শিখণ্ডী ভালো যোদ্ধা ছিলেন না। তাঁকে সামনে রেখে পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে তৃতীয় ভ্রাতা ও কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের মহাবীর অর্জুন আপন পিতামহ ভীষ্মের দিকে শর ছুঁড়তে থাকেন। ভীষ্ম শিখণ্ডীর বিরুদ্ধে অস্ত্র না ধরার পণ রাখতে গিয়ে পাল্টা শর ছোঁড়া বন্ধ করে দেন। তখন অর্জুন তাঁকে শরশয্যায় শায়িত করেন।

ভীষ্ম তাঁর যৌবনের শুরুতে পিতার (রাজা শান্তনু) সুখের জন্য চিরকুমার থাকার ব্রত নিয়ে দেবতাদের কাছ থেকে অমরত্ব ও ইচ্ছামৃত্যুর বর পেয়েছিলেন। তাই শরের তীব্র যন্ত্রণা সইতে না পেরে নিজেই মৃত্যু বেছে নেন।

তবে শিখণ্ডীকে এ জন্য মূল্য দিতে হয়েছে। দু'পক্ষের রাজপুত্রদেরই অস্ত্রগুরু ছিলেন দ্রোণাচার্য। তাঁর পুত্র অশ্মত্থামা যুদ্ধের শেষে গভীর রাতে পাঞ্চালরাজের শিবিরে ঘুমন্ত রাজা ও রাজপুত্রদের ওপর হামলা চালান। তাঁর আক্রমণে নিহত হন শিখণ্ডীসহ পাঞ্চালরাজের পুরো বংশ। মাতামহের পরিবারের সঙ্গে শিবিরে অবস্থানকারী পঞ্চপাণ্ডবের পাঁচ পুত্রও (দ্রৌপদীর গর্ভজাত) সে হামলায় নিহত হন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জয়লাভকারী পাণ্ডব শিবিরে নেমে আসে বিষাদের গভীর ছায়া।

মহাভারত অনেকের কাছে মহাকাব্য, অনেকের কাছে ইতিহাস আর নৃতত্ত্ব, অনেকের কাছে সর্বোচ্চ মাত্রার সাহিত্য। তবে যেহেতু তা চিরায়ত, তাই এ যুগেও তার গভীর অন্তঃরহস্য বা ইন্দ্রজাল থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। মহাভারতের শিক্ষা থেকে আজকের দিনের শিখণ্ডীদের দেখার প্রয়াস অমূলক নয়। সেদিনের রাজ্য, রাষ্ট্রচরিত্র থেকে আমাদের শিক্ষণীয় দিকগুলো আজও প্রাসঙ্গিক।

যেমন প্রাসঙ্গিক গ্রিক মিথও। গ্রিক পুরানে বর্ণিত দেবী আফ্রেদিতি আর হারমেসের সন্তান উভলিঙ্গ, তাঁর নাম হারমাফ্রোদিতোস। তাঁর পিঠে ছিল পাখা । উড়তে পারতেন তিনি। তাঁরও অনেক কাহিনি রয়েছে, যে অমরগাঁথা থেকে আমাদের শিক্ষণীয় আছে অনেক কিছু।

আমাদের আজকের যুগের শিখণ্ডীদের অধিকার নিয়ে একটি প্রস্তাবনা নির্বাচন কমিশন আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। ভোটাধিকার ও জাতীয় পরিচয়পত্রে নারী বা পুরুষ নয়, নিজেদের প্রকৃত পরিচয়েই তাঁদের পরিচিত হওয়ার অধিকার দেওয়া হবে– এ মর্মে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন বিধিমালায় সংশোধনী আনার জন্য নির্বাচন কমিশন আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবে বলেছে।

এর ফলে সরকারি নথিপত্র ও পাসপোর্টে শিখণ্ডীরা তাঁদের লিঙ্গ-পরিচয় 'হিজড়া' হিসেবে উল্লেখ করতে পারবেন। শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের প্রতি চলমান বৈষম্য ঘোচাতেও কার্যকর হবে এই স্বীকৃতি। ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সংক্রান্ত 'নীতিমালা' অনুমোদন করা হয়।

আমাদের দেশে সম্প্রতি দলিতদের জন্য আইন তৈরির প্রস্তাবনায় হিজড়াদের লিঙ্গ-প্রতিবন্ধী বলা হয়েছে, তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়াসেই। বেশ দেরিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও একে সাধুবাদ জানাচ্ছি। এটি দ্রুত কার্যকর করার জন্য জানাচ্ছি জোর দাবিও।

যদিও সচেতন একটি মহলে বিষয়গুলোকে তথাকথিত 'পশ্চিমা মানবাধিকার' বলে অভিহিত করছেন। তারা বলছেন, শিখণ্ডীদের যদি তৃতীয় লিঙ্গ বলা হয় তবে জন্মান্ধকে কেন চতুর্থ লিঙ্গ বলা হবে না? তাঁরা কী দোষ করলেন? তাঁরা তৃতীয় লিঙ্গের বিষয়টিকে 'লিঙ্গ-প্রতিবন্ধিতা' হিসেবে উল্লেখ করে এই জনগোষ্ঠীর অধিকারের বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা নিতে বলছেন সরকারকে।

বাংলাদেশে মাত্র ৮ বছর আগে. ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো শিখণ্ডীরা ভোটাধিকার পান। তবে ভোটার আইডি কার্ডে জেন্ডার নির্ধারণ করা না থাকায় সেখানেও তাদের বিড়ম্বনা ছিল। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে অনেক আগেই থার্ড জেন্ডারভুক্তদের নিজ পরিচয় স্বীকার করে ভোটাধিকার ও কর্মক্ষেত্রে নারী পুরুষদের মতো স্বাভাবিক অধিকার দেওয়া হয়েছে।

শিখণ্ডীদের থার্ড জেন্ডার বা ক্রস-জেন্ডার বলা হয়ে থাকে ইউরোপ মহাদেশ, আমেরিকা ও অষ্ট্রেলিয়ায়। এছাড়াও আরও অনেক দেশে তাঁদের অধিকারের স্বীকৃতি মিলেছে। তবে আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলোর উদাহরণ আমাদের জন্য বেশি অনুসরণযোগ্য হতে পারে। নেপালের সুপ্রিম কোর্ট ২০০৭ সালে সে দেশের সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নারী ও পুরুষ পরিচয়ের পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গের পরিচয়ের অবস্থান রেখেই জনসংখ্যা শুমারি ও নাগরিক পরিচয়পত্র তৈরির নির্দেশ দেয়। সেখানে এখন সে নির্দেশ মানা হচ্ছে।

পাকিস্তানে উর্দু ভাষায় শিখণ্ডীদের খোজা সারা বা খুশরা নামেও অভিহিত করা হয়। ২০০৯ সালের জুন মাসে সেদেশের সুপ্রিম কোর্ট খুশরাদের একটি তালিকা তৈরি করে। পরিসংখ্যানে ৮০ হাজার থেকে তিন লাখ খুশরা আছেন বলে জানা যায়। ট্রান্স-জেন্ডার, ট্রান্স-সেক্সুয়াল, ক্রস-ড্রেসার অর্থাৎ রূপান্তরিত লিঙ্গ-বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, পোশাক ও সাজগোজে নারীভাবাপন্ন ব্যক্তিরা আস্তে আস্তে পাকিস্তানের সমাজে মর্যাদা পেতে শুরু করেছেন– তাঁদের নেত্রী ও খোজা সারা সমিতির প্রধান আলমাস ববি দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে এমনটিই বলেছেন।

নিউজিল্যান্ডে সন্তানের জন্ম সনদ (বার্থ সার্টিফিকেট ) দেওয়ার সময় যদি লিঙ্গ বা জেন্ডার শনাক্ত করা না যায় তবে তাদের 'ইনডিটারমিনেটেড' বা 'আনস্পেসিফাইড সেক্স' বলে অভিহিত করে সে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের পাসপোর্টে এক্স (x) চিহ্নিত করে পরিচিতি দেওয়া হয়।

থাইল্যান্ডে থার্ড সেক্সকে বলা হয় ক্যাাথোস বা লেডিবয়। এঁদের শারীরবৃত্তীয় বিষয় পুরুষের হলেও নারীর মতো থাকতে এঁরা ভালোবাসেন– পোশাকে, আচরণে, মুদ্রাভঙ্গীতে। দেশের উৎপাদন ও অর্থনীতির মূল স্রোতে এঁরা যেন মিলতে পারেন, সেজন্য থাই সরকার ব্যাপক তৎপর। বিনোদন, ট্যুরিস্টদের অভ্যর্থনা, ফ্যাশন হাউজ ও দোকানে সেলস সামলানোসহ নানা ব্যবসায় নিয়োজিত থেকে থাই শিখণ্ডীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে জন্মগত যৌন-প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, যাদের জন্মপরবর্তী লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয়, মূলত তারাই ‍ তৃতীয় লিঙ্গ। 'ট্রান্সজেন্ডার' বলতে এমন এক লৈঙ্গিক অবস্থাকে বুঝায় যা জেনিটিক কারণে নারী বা পুরুষ, এ রকম কোনো শ্রেণির ক্যাটাগরিতে পড়ে না। শিশু জন্ম নেওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট বয়সে এসে পুরুষ বা নারীতে পরিণত হতে যেসব হরমোন স্বাভাবিক মাত্রায় থাকা প্রয়োজন, সেসব হরমোনের তারতম্যের কারণেই নারী-পুরুষের বাইরে আরেকটি লিঙ্গের সৃষ্টি হচ্ছে বলে প্রচলিত ব্যাখ্যায় বলা হয়। তবে এভাবে বেড়ে ওঠার জন্য হরমোনের তারতম্যের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক কারণও থাকতে পারে।

ইতিহাসে খুব উজ্জ্বল হয়ে আছেন অনেক লিঙ্গ-প্রতিবন্ধী যারা শুধুমাত্র উচ্চমানের প্রতিভার বলে রাজা বা সম্রাটদের প্রিয়ভাজন হয়েছেন। তবে ভারতীয় মিথের বিদ্যাধরীরা প্রতিভাশালী হলেও সামাজিক মর্যাদা পাননি অথবা সাধারণের কাছে কখনও-ই সম্মানের সঙ্গে গৃহীত হননি। শিখণ্ডীদের মধ্যে যুগে যুগে নানা দেশে অনেক গুণী চিত্রকর, অভিনয়শিল্পী ও সঙ্গীতশিল্পীর জন্ম হয়েছে।

শিখণ্ডীদের অনেকে তৃতীয় লিঙ্গের বৈশিষ্ট্যধারী হলেও মাত্রায় কম, অর্থাৎ প্রকটভাবে প্রকাশিত নন। এমন অনেক ব্যক্তি যারা প্রতিষ্ঠিত, তাদের নাম উল্লেখ করা যেত। কিন্তু তাঁরা সামাজিক কারণেই তাঁদের ওই পরিচয় কখনও প্রকাশ হতে দেননি। তবে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অসম্ভব প্রতিভাধর নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম, নিজেকে তিনি লুকিয়ে রাখেননি। শিখণ্ডীদের নিয়ে চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন তিনি। তাঁর আত্মজৈবনিক চলচ্চিত্র 'চিত্রাঙ্গদা এবং আর একটি প্রেমের গল্প'-তে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জীবন ও প্রেমের কাহিনি নান্দনিকভাবে ফুটে উঠেছে।

গণমাধ্যমে পরিবেশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে সরকারিভাবে শিখণ্ডীদের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। আদমশুমারিতে তৃতীয় লিঙ্গের অপশন না থাকায় তাঁদের গণনা করা হয়নি। অথচ ভারত, নেপাল তো বটেই, পাকিস্তানের মতো মুসলিম দেশে তাঁদের 'তৃতীয় লিঙ্গ' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে– তাহলে বাংলাদেশে কেন নয়?

বেসরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী দেশে এ সংখ্যা ১৫ হাজার। এই তালিকা আরও অনেক লম্বা হতে পারে, কেননা অনেকেই নিজেদের পরিচয় গোপন করেন। লিঙ্গ-জটিলতায় তাদের ভোট প্রয়োগে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ২০০৮ সালে লিঙ্গ নির্ধারণ না করেই তাঁদের প্রমবারের মতো ভোটাধিকার দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সমাজ সেবা অধিদপ্তর ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো শিখণ্ডী শিশুদের শিক্ষা উপবৃত্তি ও প্রশিক্ষণের ওপর পাইলট প্রকল্প শুরু করেছে। কারণ এই জনগোষ্ঠীর শিশুরা একটা পর্যায়ে স্কুল থেকে ঝরে যায়। অনেকেই পরিবার থেকে বের হয়ে গিয়ে, এক অর্থে ভাসমান জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। সমাজের প্রত্যেক স্তরে, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়ে তাঁরা চরম অবহেলা ও বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।

সুপারিশকৃত আইনের খসড়া যেটি সংসদে আইন বা অ্যাক্ট আকারে উত্থাপন ও পাসের অপেক্ষায় রয়েছে, এর নাম 'বৈষম্য বিলোপ আইন, ২০১৪', সেখানে ৪ ধারার (ঘ), (ঙ), (চ), (ছ), (জ) উপধারায় লিঙ্গ-প্রতিবন্ধীদের জন্ম, পরিবার, উত্তরাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে বৈষম্য বিলোপের কথা বলা হয়েছে।

আমাদের সংবিধানের ১৯, ২৭, ২৮, ২৯ অনুচ্ছেদেও সকল নাগরিকের সমতা, সমান সুযোগ ও সব ধরনের বৈষম্য বিলোপের বিধানাবলী লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু লিঙ্গ-প্রতিবন্ধীদের জন্য অন্য ধর্ম, জাত-পাত, দলিত ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে বৈষম্য বিলোপ আইন তৈরি ও কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের এসব উদ্যোগ অবশ্যই কাগজে-কলমে বেঁধে রাখলে হবে না, সঠিকভাবে কার্যকরও করতে হবে। এভাবেই অসীম তমসায় বিন্দু বিন্দু আকারে আলো সঞ্চারিত হোক আমাদের এই ভূখণ্ডে।

এই রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় শিখণ্ডীদের পক্ষে সকল অধিকার অর্জন ও চর্চা সম্ভবপর হবে একসময়, সে আশা করতে চাই আমরা। তাই আজকের দিনে তাঁদের তৃতীয় লিঙ্গ বা লিঙ্গ-প্রতিবন্ধী যা-ই বলি না কেন– তাঁদের কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনে পদক্ষেপ নিতেও রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে অনেকখানি।

প্রকাশ বিশ্বাস: আইনজীবী ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আদালত প্রতিবেদক।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক