ক্যান্সারের সঙ্গে এক দশক

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে জীবনকে ভালোবাসার, মানুষকে ভালোবাসার মিলন স্থান ক্যান্সার হাসপাতাল বা অন্য সকল হাসপাতাল। এরচেয়ে বড় তীর্থ আর কী হতে পারে?

দেবাহুতি চক্রবর্তী
Published : 8 Feb 2024, 02:35 PM
Updated : 8 Feb 2024, 02:35 PM

“এই ছিল আলো, সেদিনের ব্যস্ততা

তখন তুঙ্গে। ভাবিনি আকাশজুড়ে

এসে কালো মেঘ সহজ জীবন কথা

মুছে দিয়ে রাত উঠবে আকাশ ফুঁড়ে।”

—পবিত্র মুখোপাধ্যায় 

কেউই হয়তো কোনোদিন ভাবে না। আমিও ভাবিনি। প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছি দাপুটে মেজাজে। শরীর কিছু বলতে চায়, উপেক্ষা করেছি।

২০১২ সালের প্রথম থেকেই শরীরে চুলকানি শুরু হয়। অস্বস্তিকর অবস্থা। বাইরে ত্বকে কিছু দৃশ্যমান হয় না। অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি ঘরোয়া, আয়ুর্বেদি— কোনোটাতেই কোনো উন্নতি নেই। কিন্তু ক্রমেই চুলকানির সঙ্গে কাশি,  খাবারে অরুচি আর দ্রুত ওজন কমে যাচ্ছে। ক্লান্ত লাগে। কিন্তু কোর্টে মক্কেলের দায়িত্ব এড়াতে পারি না। এক সময় প্রিয়জনদের জোরাজুরিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধানের কাছে যেতে বাধ্য হলাম। আমার ব্লাড রিপোর্ট দেখেই তিনি  কেবিন ঠিক করতে বললেন। আমি রাজি নই। কোর্টে অসংখ্য মানুষের দায়িত্ব ফেলে এসেছি। ঘরে অসুস্থ মা। আমাকে তাড়াতাড়ি যেতেই হবে। কিন্তু, না, যেতে চাইলেই যাওয়া হয়ে ওঠে না। শুরু হলো ঘণ্টায় ঘণ্টায় শরীরে সূঁচ ফোটানো। কাছে থাকা, পরিজন শুভাকাঙ্ক্ষীদের চোখে-মুখে উদ্বেগ।

দ্রুত সময়েই ধরা পড়লো চতুর্থ স্টেজের  ক্যান্সার। নন হজকিংস লিম্ফোমা (রক্তের ক্যান্সারের একটি ধরন)। আমাকে কেউ না বললেও  অসুখটা কী বুঝে গেলাম। বাড়তি কোনো উদ্বেগ  আমার ছিল না। ক্যান্সার কতটা ভয়াবহ তা নিয়ে ধারণার অভাব বোধহয় একটা বড় কারণ ।

বড় ভাই ২০০৮ এ ফুসফুসের ক্যান্সারের রোগী হিসেবে শনাক্ত হন। সুইডেনের নাগরিকত্ব থাকার কারণে কেমো বা অন্যান্য চিকিৎসাকাল ওখানে কাটিয়ে ফাঁক পেলেই দেশে আসে, তার চলন-বলন ছিল গতানুগতিক মানুষের মতোই। সেটি দেখে ক্যান্সার নিয়ে প্রশ্ন করা বা পাত্তা দেওয়া হয়ে ওঠেনি। আমার ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার মাত্র পাঁচ মাস আগে সেই দাদার ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই শেষ হয়। এ যেন সেই গানের মতো— ‘তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা…’। 

ঢাকা মেডিকেলে ১২দিন ভর্তি থাকাকালীন ক্রমেই অবস্থার অবনতি হতে থাকল। মেডিকেল বোর্ড থেকে দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ এল। আমি তখন  শারীরিক নানাবিধ যন্ত্রণা নিয়েই মৃতবৎ পড়ে  ছিলাম। আমার পরিজনরা জানে, কী ভয়ংকর দিন তারা পার করেছেন। দেশে তখন একদিকে উত্তাল গণজাগরণ মঞ্চ-শাহবাগ আন্দোলন, অন্যদিকে হরতাল-জ্বালাও-পোড়াও ধারাবাহিকভাবে চলছে। এর মাঝে টাকার সংস্থান, পাসপোর্ট-ভিসা-যাত্রার আনুসঙ্গিক বিষয়াদির দ্রুত প্রস্তুতি পরিবারের জন্য রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছিল।

মেডিকেল থেকে ডিসচার্জের পরদিনই মুম্বাই রওয়ানা হতে হবে। শ্যামলীর বাসা ভর্তি নানা শুভাকাঙ্ক্ষী। কারো কারো চোখে বাঁধভাঙা জল। সবারই মনে উদ্বেগ— এই কী শেষ দেখা? শরীর ছেড়ে দিয়েছে।  এত ভালোবাসা  পেয়ে মন নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। হঠাৎ সচকিত হলাম। সদ্য আঠারোয় পা দেওয়া সান্দ্র বলছে, ‘বড়পিসি,তোমার চোখে জল মানায় না।’ তাই তো!  নিজেকে সামলে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি পরদিন বিমানবন্দরে  যাওয়া অবধি। শেষ পর্যন্ত সেখানেও বিদায় দিতে আসা কাছের মানুষগুলোর চোখের জলের সামনে নিজের অজান্তেই অসহায় আত্মসমর্পণ করেছি। দীর্ঘদিন আমাকে কাছ থেকে দেখা অন্য একজনের প্রশ্ন— 'তাহলে তুমিও কাঁদো?' হেসে ফেলেছি। উত্তর দিতে পারিনি সেই মুহূর্তে। কী করে বোঝাই— এই চোখের জল মৃত্যুভয়ের নয়, অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা প্রাপ্তির কৃতজ্ঞতা মাত্র।

আমার চেনাজানা সব স্তরের মানুষের ভালোবাসা-শুভকামনা এই সময়ে আমি এবং আমার পরিবার পেয়েছি। এই ভালোবাসার মানুষগুলোর কাছে নতি স্বীকার করার মধ্যে কোনো দুর্বলতা, দীনতা, মালিন্য ছিল না। আজও নেই। প্লেন ছাড়ছে। কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি— সব ভাবনা ছাড়িয়ে  তাই  মনে হয়েছিল, এই সেই ব্রাহ্ম মুহূর্ত যখন বলা যায়, ‘সবারে আমি প্রণাম করে যাই…’।

পরদিন অর্থাৎ ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল মুম্বাই অভিমুখী যাত্রার সময় মনে পড়ল সারা বাংলাদেশে আজ নববর্ষের প্রথম প্রভাত। নতুনের অর্থই কী জীবন থেকে, সংসার থেকে, সময় থেকে একটু একটু করে পুরাতন হওয়া? মনে হলো, আগামী সূর্যোদয় কার জীবনে কীভাবে আসবে কেউ জানে না, এটাই কী তাহলে সত্য?  

টাটা ক্যান্সার মেমোরিয়াল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারে সেদিনই ইমার্জেন্সি থেকে চিকিৎসার নতুন অধ্যায় শুরু। পরদিন বিদেশী প্রাইভেট রোগী হিসেবে রেজিস্ট্রেশন হয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যাদি পেতে সহায়তা, মুম্বাইয়ে থাকা-খাওয়ার সহায়তা বিভিন্ন জনের কাছ থেকে পেয়েছি। এই হাসপাতালে প্রথম দেখলাম ক্যান্সার রোগীদের সহায়তায় পাশে দাঁড়ানো বিভিন্ন সমাজসেবী সংস্থার কর্মকাণ্ড। ভারতের বিভিন্ন ক্যান্সার হাসপাতালে এই ধরনের সংস্থা ও সমাজকর্মীরা নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন।

টাটা হাসপাতালের গণ্ডি ছাড়িয়ে ফুটপাতের রাস্তার দুধারে অসংখ্য ক্যান্সার রোগী। মাথার ওপর কারো খোলা আকাশ, কারো সামান্য আচ্ছাদন। ভারতের সব রাজ্য থেকে, বিদেশ থেকে প্রতি বছর নতুন রোগী বাড়ে ৩০-৪০ হাজারের মতো। 'ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট এ তরী…’।

নাই তো কী হয়েছে? কাউকে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে না। রেজিস্ট্রেশন করলে সবাই চিকিৎসা পাচ্ছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে জেনারেল, সেমি প্রাইভেট, প্রাইভেট ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ভারতীয় ধনী এবং বিদেশীরা প্রাইভেট কোটাতে যারা ভর্তি হন, তাদের জন্যও সিরিয়ালের কোনো ভিন্নতা নেই। বিনামূল্যে সরকারি সেবা পাওয়া রোগী আর ধনী রোগীকে এক কাতারেই চিকিৎসা নিতে হবে। অজস্র ক্যান্সার হাসপাতাল মুম্বাই জুড়ে। তারপরেও বুঝেছি- ম্যান, মানি আর মেশিন ছাড়া সত্যিই ক্যান্সার চিকিৎসা সম্ভব নয়। আর তাই বোধহয় চিকিৎসা নিতে আসা রোগী আর পরিবারগুলো খণ্ড খণ্ড সময়ের মাঝ দিয়েই নিজেদের মধ্যে পারষ্পরিক সহমর্মিতার এক অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি করে। ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়, লিঙ্গ, বয়স, জাতীয়তা, ভাষা— কোনোটাই যেন এই গণ্ডিতে বিভেদ সৃষ্টি করে না।

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে জীবনকে ভালোবাসার, মানুষকে ভালোবাসার মিলন স্থান ক্যান্সার হাসপাতাল বা অন্য সকল হাসপাতাল। এরচেয়ে বড় তীর্থ আর কী হতে পারে?

চতুর্থ স্টেজের ক্যান্সার রোগী হিসেবে আমার ফিরে আসাটা অনেক কঠিন ছিল। অর্ধমৃত আমি  ভাই-বোন, সকল পরিজন, শুভাকাঙ্ক্ষীদের একান্ত চেষ্টায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপের মধ্য দিয়ে টিকে গিয়েছি। এই পর্যায়ের রোগীদের শরীরের যন্ত্রণা ছাড়া আর কোনো ভাবনা কার্যকরী করার পথ থাকে না। সেই দুঃসময়ের দায়িত্ব পরিবার বা প্রিয়জনদের যারা নেন, শরীর আর মন দুটোর সঙ্গেই তাদের নিয়ত যুদ্ধ করতে হয়। রোগীর সামনে অনেকক্ষেত্রেই তাদের দুশ্চিন্তা চেপে রাখতে হয়। চিকিৎসকদের, নার্স ও অন্যান্যদের ভূমিকাও ইতিবাচক না হলে কষ্টদায়ক হয়। সেদিক থেকে আমি অনেক বেশি কৃতজ্ঞ ঢাকা-মুম্বাই-কলকাতার চিকিৎসক ও চিকিৎসায় দায়িত্বরত সকলের কাছে।

সাতমাস একটানা চিকিৎসার প্রটোকল সেরে দেশে ফিরেছি। কিছুদিন পরপর ফলোআপ করতে আবার আসা-যাওয়া করতে হয়েছে, এই অর্থ এবং সময়ব্যয় বাকি জীবনের জন্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। 

দেশে এসে শরীরটা নিয়ে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে আরও এক বছর টানা যুদ্ধ করতে হয়েছে। একটু সুস্থ হতেই শুরু হলো আর এক লড়াই।

এক ছাদের নিচে থাকা মানুষটা (সুব্রত সরকার) অসুস্থ হতে থাকল। ওর অস্থিরতার ধরন-ধারণ বুঝতে সময় লেগেছে। যখন বুঝলাম, তখন আরেক লড়াইয়ের শুরু। 

ফুসফুসের ক্যান্সার। স্মল সেল কারসিনোমা।

গ্রিন লাইফ হসপিটাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, রাজবাড়ী ক্লিনিকের চিকিৎসা। তারপর শেষ দুমাস নিয়মিত মরফিয়া দিয়ে বাড়িতেই হাসপাতালের মতো ব্যবস্থা  করতে  হয়েছে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর ওর যুদ্ধও শেষ হলো। ২০২১- এ আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রী ক্যান্সারে চলে গেলেন। অনেকের মনেই প্রশ্ন— এক পরিবারে এতজন কেন ক্যান্সারে আক্রান্ত! সঠিক উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে ক্যান্সার কোনো পাপের দণ্ড নয়, কোনো  অভিশাপের পরিণতি নয়। এই সত্যটুকু  বিশ্বাস করি। 

নিজের আর পরিবারের মধ্যে ক্যান্সারের সঙ্গে বোঝাপড়া চালিয়ে এখন যে কোনো  ক্যান্সার রোগী আর তার পরিবারকে আপন মনে হয়। ২০১৮ সালে এমনই সমমনা কয়েকজন ‘ক্যান্সার সোসাইটি, রাজবাড়ী’ প্রতিষ্ঠা করে যথেষ্ট উদ্যমের সঙ্গে কাজ শুরু করেছি। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আহমেদ নিজাম মন্টু ক্যান্সার যুদ্ধে চলে গেলেন। কোভিড বিপর্যয় কাটিয়ে এই ধাক্কাটি সংগঠনের জন্য অনেক বড় ছিল এবং এখনো রয়েছে। নানাভাবে আমিও প্রায়ই বিপর্যস্ত থাকি। সংগঠনটা বেশ একটা নাজুক অবস্থায় চলছে। সামাজিক দায়িত্ব নীরবে পালনের— নিরবধি পালনের স্বেচ্ছাসেবী মনোভাবের অভাবটা তীব্রই মনে হয়। অধিকাংশ মানুষ প্রতিটি কাজের নগদ স্বীকৃতিতে প্রত্যাশী। এরই মাঝে পথ কেটে কেটে পথ চলা। তাকালেই দেখা যায়, অসংখ্য ক্যান্সার রোগী। বিপরীতে চিকিৎসা সুবিধা নিতান্তই অপ্রতুল। বাংলাদেশ এগিয়েছে যেমন সত্য, তেমনি সত্য প্রদীপের নিচের অন্ধকার। সেটা শুধু ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে নয়। সংক্রামক-অসংক্রামক প্রায় সকল ব্যাধির কাছেই এই দেশের মানুষ নিতান্তই অসহায়। 

একটানা চিকিৎসায় থাকা অবস্থায় আমি কিছু লেখালেখি করেছিলাম। সেগুলো নিয়ে ‘সাথে ক্যান্সার, ক্যান্সারের সাথে’ বইটি দু'বার মুদ্রিত হয়েছে। বইটিতে বিচ্ছিন্নভাবে একটা কথাই বলার চেষ্টা করেছি যে,আমরা শুধু দৈহিকভাবে ক্যান্সার বহন করি না। আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন প্রকোষ্ঠে লুকানো অনিয়ম, দুর্নীতি, অবহেলা-অযত্ন,  সঙ্গতি-অসঙ্গতির ভারসাম্যহীনতা নিয়ে আমাদের যাপিত জীবন ক্যান্সারের সঙ্গেই। অন্যরকম ক্যান্সার।

বহুবার শুনেছি লাইফস্টাইল সঠিক না থাকার কারণে ক্যান্সার হয়। লাইফস্টাইল সঠিক না থাকার যতটুকু দায় ব্যক্তির একক, তারচেয়ে বেশি দায় এই ভোগবাদী সমাজের। দায় রাষ্ট্রযন্ত্রের, দায় আধিপত্যবাদী বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের। 

আমাদের খাদ্য, পরিবেশ, জল-হাওয়া, চিকিৎসার অভাব, আমাদের ওপর নিত্য মানসিক চাপ— সব মিলিয়ে প্রতিদিনের নিঃশ্বাসজুড়ে রয়েছে কার্সিনোজেনের বিস্তারিত জাল। একটা সময় অবধি চারপাশের এই বিস্তৃতিকে সহনীয় করে নেয় আমাদের শরীর। একটা সময় প্রতিরোধ ক্ষমতাও হারিয়ে যায়। স্বাস্থ্য অধিকার যে আমাদের মৌলিক অধিকার— সেটা শুধু কেতাবে লেখা। ক্যান্সার চিকিৎসার এই  ব্যয়বহুলতার বড় কারণ আন্তর্জাতিক মুনাফাখোরদের ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি। আমাদের শরীর-মন-ব্যক্তিসত্তা,পরিবার-সংসার-সমাজ-রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে বিশ্ববাজার। ক্যান্সারের বাঁধ ভাঙ্গা বন্যার প্রতিরোধ তাই কঠিন হয়েই দাঁড়িয়েছে।

২০১৩-২০২৩ অবধি ‘সাথে ক্যান্সার, ক্যান্সারের সাথে’ চলতে চলতে একটা কথা ইদানিং দৃঢ়ভাবে মনে হয়— সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার অভাব ক্যান্সারকে ‘নো আনসার’-এর তকমা দিয়েছে। আমাদের যা আছে, যতটুকু আছে তার মধ্যেই সচেতন হতে হবে। সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড জোরদার করতে হবে।

ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষটাকে রোগটা সম্পর্কে জানানো ও বোঝানো জরুরি। তা না হলে চিকিৎসা ও চিকিৎসকের পর রোগী আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারেন। মনের জোর ভেঙে পড়তে পারে। তাছাড়া রোগ সম্পর্কে সম্যক জানাবোঝাও মানুষের অধিকারের মধ্যেই পড়ে। 

আমার অভিজ্ঞতায় মনে হয়, ক্যান্সার রোগীরা প্রত্যেকেই যার যার ভুবনে রীতিমতো যোদ্ধা। প্রথম পর্যায়টা সবাই সমানভাবে মেনে নিতে না পারলেও, একটা পর্যায়ে প্রায় সকলেই সাহসের সঙ্গে লড়াইয়ে নামেন। যার যতটুকু সম্বল তাই নিয়ে। শুধু ক্যান্সার নয়, অন্যান্য জটিল ও কঠিন ব্যাধির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আসলে, বেঁধে মারলে সবই সয়ে যায়। 

জীবনের প্রতি ভালোবাসা জীবনেরই শর্ত। সেই অঙ্গীকার নিয়েই পথ চলা। পথের শেষ কোথায়, কীভাবে জানার চেষ্টাও বিশেষ নেই। এটুকুই জানি, ভালোবাসার আরেক নাম দায়িত্ব— নিজের প্রতি, মানুষের প্রতি। মানুষের পৃথিবীতে অমানুষের দাপটে মানুষ সত্যিই আজ বড় অসহায়।

লেখক: আইনজীবী ও ক্যান্সার লড়াকুদের সংগঠক

(সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশনের ‘এখানে থেমো না’ বইয়ে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে)