আখতার ভাই: একটি আলিঙ্গনের দীর্ঘ স্মৃতি
কিছু মৃত্যু স্রেফ একজন মানুষের চলে যাওয়া নয়, জীবনের একটি আস্ত অধ্যায়ের অবসান। দৈনিক সংবাদের স্মৃতি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শেষ বয়সের নীরব সংগ্রাম—প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেনের বর্ণাঢ্য ও বেদনাময় স্মৃতিচারণ।
কলেজজীবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে আমার দীর্ঘ পথচলার দিনগুলো এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে। তখন আমাদের মন-মননজুড়ে ছিল ছাত্র ইউনিয়নের আদর্শ। মিছিল, সভা, পোস্টার, বিতর্ক, গান—সবকিছুর মধ্যেই আমরা যেন আমাদের স্বপ্নের ভবিষ্যৎকে খুঁজে ফিরতাম।
সেই সময় একটি গান আমরা খুব গাইতাম। এটা ছিল ছাত্র ইউনিয়নের দলীয় সংগীত। জাতীয় সংগীতের পর সম্ভবত এই গানটিই সবচেয়ে বেশি গেয়েছি— ‘আমরা তো ঐক্যের দৃঢ় বলে বলীয়ান/ শোষণের কারাগার ভাঙবই,/ শিক্ষার আলোকে প্রতি গৃহকোণকে/ রাঙব তো আমরা রাঙবই।’
গানটির কথায় তখন থেকেই এক ধরনের আকর্ষণ অনুভব করতাম। ভাষার সরলতা, স্বপ্নের দৃঢ়তা আর ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদ—সব মিলিয়ে মনে হতো, আমাদের মতো তরুণদের জন্যই বুঝি গানটি লেখা। তখন কে জানত, এই গানের গীতিকার একদিন আমার খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠবেন—আখতার হুসেন, আমাদের আখতার ভাই।
তার সঙ্গে আমার পরিচয় অবশ্য আরও আগে—তার লেখার মধ্য দিয়ে। যখন খেলাঘর করেছি, তখনও আমরা গাইতাম: ‘আমরা তো সৈনিক,/ শান্তির সৈনিক/ অক্ষয় উজ্জ্বল সূর্য।/ সৃষ্টির লক্ষ্যে, আমাদের যাত্রা/ আমরা তো জীবনের তূর্য।’ পরে জেনেছি এটাও আখতার হুসেনের লেখা।
তার লেখা ছড়া পড়েছি, গল্প পড়েছি, কবিতা পড়েছি। তার লেখা সেই বিখ্যাত ছড়া : ‘হ্যাঁরে, খবরটা কি উড়ো?/ শুনতে পেলাম নিখিলপুরের চার–চারটে বুড়ো/ কাঁদেন কেবল লাগিয়ে চোখে শুকনো মরিচ গুঁড়ো,/ আরে, কী বললি দূরো!’ মুখস্ত বলতে পারতাম। পরে আরও পড়েছি, ‘মা-ও বলেন, বাবা-ও বলেন/ অভিযোগের সুরে/ আমি নাকি আলসে এবং কুঁড়ে/ কাজ করি না মোটে/ মিনু যেমন করে/ সারাটা দিন ধরে।’ কিন্তু ১৯৯৯ সালে দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দেওয়ার পর সেই দূরের পরিচিত লেখকই হয়ে উঠলেন আমার সহকর্মী।
সংবাদে প্রায় সাত বছর কাজ করেছি। সেই সময় প্রতিদিনই আখতার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হতো। কাজের ফাঁকে গল্প চলত—সাহিত্য, সংবাদপত্র, বই কিংবা একেবারেই অন্য কোনো প্রসঙ্গে। তার সঙ্গে কথা বলার মধ্যে আলাদা এক স্বস্তি ছিল। বড় লেখক, ছড়াকার, গীতিকার ও শিশুসাহিত্যিক—এই পরিচয়গুলো তার ব্যক্তিত্বকে ঘিরে থাকলেও তার নিজের আচরণে তার কোনো ভার ছিল না। তিনি ছিলেন সহজ, নিরাভরণ, শিশুর মতো সরল একজন মানুষ।
তার গল্পের বিষয় শেষ হতো না। কিন্তু কথাগুলোর অনেকটাই আজ আর মনে নেই। মনে আছে মানুষটিকে। তার হাসি, তার আন্তরিকতা, আর মানুষের সঙ্গে খুব সহজে আপন হয়ে যাওয়ার সেই বিরল ক্ষমতাটি।
সংবাদ থেকে বেরিয়ে আসার পর নিয়মিত দেখা হওয়ার সুযোগ কমে গেল। তিনি চলে গেলেন জনকণ্ঠে, পরে প্রথম আলোয়। তবু বিভিন্ন অনুষ্ঠান, উৎসব কিংবা সাহিত্যিক আড্ডায় দেখা হয়ে যেত। আর দেখা হলেই দূরত্ব বলে কিছু থাকত না। তিনি এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরতেন। যেন দীর্ঘ বিরতির কোনো হিসাব নেই, যেন আগের দিনই দেখা হয়েছিল।
আজ সেই দৃশ্যটিই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।
আর কোনো অনুষ্ঠানে হঠাৎ তার সঙ্গে দেখা হবে না। ভিড়ের মধ্যে পরিচিত মুখটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরবেন না, হাসতে হাসতে বলবেন না—‘কী খবর?’ কোনো নতুন লেখা নিয়ে তার সঙ্গে তর্ক হবে না, গল্প হবে না।
কিছু মৃত্যু তাই শুধু একজন মানুষের চলে যাওয়া নয়; নিজের জীবনের একটি সময়েরও অবসান। আখতার ভাইয়ের মৃত্যু আমার কাছে তেমনই একটি মুহূর্ত। তার সঙ্গে হারিয়ে গেল আমার জীবনের একটি দীর্ঘ পর্ব—যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংবাদ অফিস, সহকর্মীদের আড্ডা, সাহিত্য নিয়ে কথোপকথন আর এক সহজ-সরল মানুষের সান্নিধ্য।
কিন্তু আখতার ভাইয়ের জীবন শুধু আমার ব্যক্তিগত স্মৃতির গল্প নয়। তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দেশের ইতিহাসও। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি খুলনায় ছিলেন। ষাটের দশকের আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, দেখেছেন উনসত্তর-সত্তরের উত্তাল দিন। ২৫ মার্চের ভয়াল রাতেও ছিলেন ঢাকায়। গণহত্যার পর কারফিউ উঠে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও সদরঘাটে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন লাশের স্তূপ—একটি তরুণ মানুষের মনে যে দৃশ্য সারাজীবনের জন্য দাগ কেটে থাকার কথা।
২৯ মার্চ ঢাকা ছেড়ে তিনি কুলাউড়ায় পরিবারের কাছে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ার ইচ্ছা তার ছিল। কিন্তু পারিবারিক বাস্তবতা তাকে সীমাবদ্ধ করেছিল। তবু তিনি যুদ্ধ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখেননি। তার অস্ত্র হয়ে উঠেছিল কলম ও গান।
১৯৬৮ সালে লেখা একটি গান তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় নতুন করে লিখেছিলেন—‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে আজ জাগছে বাঙালিরা/ আর রুখবে তাদের কারা।’ গানটি নিয়ে সীমান্ত পেরিয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। অপেক্ষার পর অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দিন গানটি বেতারে প্রচারিত হয়।
সেদিন নিজের রেডিও তার কাছে ছিল না। পাশের বাসার রেডিওতে নিজের গান শুনেছিলেন। শুনতে শুনতে কেঁদেছিলেন। তার মনে হয়েছিল—মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণও যেন সম্পূর্ণ হলো।
এই জায়গায় এসে আখতার ভাইকে আমি নতুন করে দেখি। অফিসে যাকে দেখেছি হাসিখুশি, গল্পপ্রিয়, শিশুর মতো সরল একজন মানুষ হিসেবে, তার ভেতরে যে ইতিহাসের এত গভীর স্মৃতি, বেদনা ও গৌরব বহন করে চলেছিলেন, তা প্রতিদিনের সহকর্মিতায় হয়তো পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি।
শিশুদের জন্য তিনি লিখেছেন অসংখ্য ছড়া, গল্প, নাটক ও অন্যান্য রচনা। তার ভাষা ছিল সহজ, প্রাণবন্ত ও ছন্দময়। শিশুরা যেন শব্দের ভারে আটকে না গিয়ে আনন্দের সঙ্গে পড়তে পারে—তার লেখায় সেই স্বাভাবিক প্রবাহ ছিল। প্রায় ৮০টি বই লিখেছেন, সম্পাদনা করেছেন আরও বহু গ্রন্থ। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ নানা স্বীকৃতি। কিন্তু এসব অর্জনের কোনো অহংকার তার ব্যবহারে কখনো দেখিনি। সাদাসিধে জীবনযাপন করে নিজের কাজ করে গেছেন—নিরবে, বিনয়ের সঙ্গে।
তার জীবনের শেষ অধ্যায়টি অবশ্য ততটা স্বস্তির ছিল না। দীর্ঘ সৃষ্টিশীল জীবন ও স্বীকৃতির পাশাপাশি তাকে শেষ বয়সে অভাব-অনটন ও দারিদ্র্যের সঙ্গেও লড়তে হয়েছে। একজন সৃষ্টিশীল মানুষের জীবনের এই নীরব সংগ্রাম আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। এত কিছু দেওয়ার পরও তাকে জীবনের শেষ প্রান্তে অর্থকষ্টের মুখোমুখি হতে হয়েছে—এই বাস্তবতাটি তার স্মৃতিকে আরও বেদনাময় করে তোলে। তবু প্রতিকূলতা তার মানুষের প্রতি মমতা কিংবা সৃষ্টিশীলতাকে নিঃশেষ করতে পারেনি।
আখতার ভাইকে তাই শুধু তার পুরস্কার, বই, গান বা মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা দিয়ে স্মরণ করলে তাকে সম্পূর্ণ পাওয়া যাবে না। তার বড় পরিচয় হয়তো তার মানবিকতায়—কীভাবে একজন মানুষ অন্য একজনকে মুহূর্তেই আপন করে নিতে পারেন, কীভাবে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই একটি আলিঙ্গন বহুদিনের সম্পর্কের উষ্ণতা বহন করতে পারে।
জীবন শেষ পর্যন্ত অনেক কিছুই সরিয়ে নেয়। পদ-পদবি থাকে না, চেয়ার থাকে না, অফিস থাকে না, প্রতিদিনের ব্যস্ততাও একসময় অর্থহীন হয়ে যায়। থেকে যায় কিছু মুখ, কিছু কণ্ঠ, কিছু মুহূর্ত এবং কিছু সৃষ্টির আলো।
আখতার ভাইও সেভাবেই থেকে যাবেন—তার গান ও ছড়ায়, বইয়ের পাতায়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে, শিশুদের শৈশবে এবং যাঁরা তাকে কাছ থেকে পেয়েছেন তাদের ব্যক্তিগত স্মৃতিতে।
হয়তো কোনো একদিন কোনো অনুষ্ঠান শেষে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে অজান্তেই তাকে খুঁজব। মনে হবে, এই বুঝি পরিচিত মুখটি দেখা গেল; এই বুঝি এগিয়ে এসে বলবেন—‘কী খবর?’ তারপর হঠাৎ মনে পড়বে, সেই মানুষটি আর আসবেন না।
এই সত্য মেনে নেওয়া কঠিন। কিন্তু মানুষের চলে যাওয়া তার রেখে যাওয়া ভালোবাসাকে মুছে দিতে পারে না। কিছু মানুষ আমাদের জীবন থেকে বিদায় নেন, কিন্তু আমাদের স্মৃতি থেকে নয়।
আখতার ভাইও তেমনই একজন। তিনি আর আমাকে জড়িয়ে ধরবেন না। কিন্তু সেই আলিঙ্গনের উষ্ণতা, সেই সরল হাসি, সেই আপন করে নেওয়ার ভঙ্গি—এসব আমার স্মৃতিতে থেকে যাবে।
আখতার ভাই, আপনাকে আর জড়িয়ে ধরা হবে না। কিন্তু আপনাকে খুব মনে পড়বে।
চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: chiros234@gmail.com
