সেই উত্তরই খুঁজছি

চল্লিশ বছরে আমার পরিবারের পাঁচজন ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ক্যান্সার ধরা পড়ার পরে চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে একই পরিবারের তিনজন ক্যান্সারমুক্ত জীবন-যাপন করছি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারছি, ‘ক্যান্সার ভালো হয়’।

এস. এম. শহীদুল্লাহ
Published : 7 Feb 2024, 01:10 PM
Updated : 7 Feb 2024, 01:10 PM

উনিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে প্রবাদ ছিল, ‘যার হয় যক্ষ্মা, তার নাই রক্ষা’। পরে অ্যান্টিবায়োটিক স্ট্রেপ্টোমাইসিনের আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে মানবজাতি রক্ষা পেয়েছে। যুগে যুগে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব মানব জাতিকে বিপর্যস্ত করেছে, যার অন্যতম ক্যান্সার। বলা হয়, ‘ক্যান্সার হ্যাজ নো অ্যানসার’। আমি ও আমার পরিবার প্রায় চল্লিশ বছর যাবৎ সেই উত্তরই খুঁজছি। 

বাবা সবার জীবনে অনুসরণীয়, অনুকরণীয় এবং পূজনীয়। আমার বাবা আশির দশকের শেষের দিকে আনুমানিক ৮৩ বছর বয়সে ১৯৮৭ সালে মূত্রথলির ক্যান্সারে মারা যান। প্রথমে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া শুরু হলে ডাক্তার মনে করলেন সংক্রমণ। প্রাথমিকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা চলার পর সাময়িকভাবে সেরেও গেলেন। কিন্তু এক সমস্যা বার বার দেখা দিতে থাকল। তখন ইউরোলজিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী বায়োপসি করা হলো। রির্পোট ভালো আসল না। শুরু হলো চিকিৎসা। 

ছয় মাস পর আবার বায়োপসি করলে ক্যান্সার ধরা পড়ল। এ খবরে পরিবারের সবাই চিন্তিত এবং হতাশ হয়ে পড়লাম। মৃত্যুর আগপর্যন্ত বাবার ক্যান্সারের জন্য প্যালিয়েটিভ চিকিৎসা চালাতে হয়েছে। যে সময়ে বাবার ক্যান্সার ধরা পড়েছিল, তখন কেমোথেরাপি ছাড়া তার জন্য অন্য কোনো চিকিৎসা ছিল না। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল যন্ত্রণাদায়ক ও অসহনীয়। আমার ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বন্ধুরা সেটি বিবেচনা করেই কেমোথেরাপি নিতে নিষেধ করেছিলেন।

আমরা পাঁচ ভাই, পাঁচ বোন। আমার সবার বড়ভাই বহুদিন ধরে পেপটিক আলসারে ভুগছিলেন; হঠাৎ একদিন রক্তবমি হওয়ার পর এন্ডোসকপি ও বায়োপসি করা হলো। ধরা পড়ল তিনি পাকস্থলির ক্যান্সারে আক্রান্ত। সেটি ২০০১ সাল। আরও নিশ্চিত হতে বড় ভাই ভারতে যেতে চাইলেন। 

তার ইচ্ছা অনুযায়ী কলকাতার ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতালে গেলাম। সেখানেও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় একই ফল এল। দেশে ফেরত এসে প্রথমে অপারেশনের মাধ্যমে ক্যান্সারাক্রান্ত খাদ্যনালির ও পাকস্থলির কিছুটা কেটে ফেলা হলো। পরে কেমোথেরাপি দেওয়া হলো। কিছুদিন স্বাভাবিক জীবন-যাপন করার পর আবার জটিলতা দেখা দেওয়ায় আরেকবার পাকস্থলির অপারেশন করতে হলো। আবার কেমোথেরাপি চলল। কিন্তু ২০০৩ সালে তিনি মারা যান।

২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় আমাদের চতুর্থ বোন। তার বয়স কম হওয়ায় এটি আমাদের পরিবারের জন্য ছিল বড় ধরনের একটা ধাক্কা। ক্যান্সার তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায়, যেমন— মস্তিষ্কে, মেরুদণ্ডে, ফুসফুসে ও যকৃতে ছড়িয়ে পড়েছিল। 

ক্যান্সার ধরা পড়ার আগে আমার বোনের মেরুদণ্ড কিছুটা বাঁকা এবং ডান হাত কিছুটা শুকিয়ে যাচ্ছিল। শক্তিও কম পাচ্ছিল। প্রথমে অর্থোপেডিক সার্জন, ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং রিওমাটোলজিস্ট দেখানো হলো। সবশেষে নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখানো হলো। এরপর তার পরামর্শ মতে, এমআরআই ও সিটিস্ক্যান করানোর পরই জানা গেল তার ক্যান্সার।

তৈরি হলো আরেক বিড়ম্বনা। শরীরের ঠিক কোথায় তার ‘প্রাথমিক ক্যান্সার’ হয়েছে তা নির্ণয় করা গেল না দেশে। পরে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে ফুসফুসে প্রাথমিক ক্যান্সার চিহ্নিত হয়। সে অনুযায়ী, ওরাল কেমোথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু হয়। যার একেকটা বড়ির দাম ১২ হাজার টাকা! এটি আবার প্রতিদিন খেতে হবে। দাম শুনে ‘চক্ষু তো চড়কগাছ’। আমার এক ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বন্ধুকে ফোন করলাম। তিনি জানালেন বাংলাদেশে একই ওষুধ রয়েছে। জার্মান কোম্পানির তৈরি সেই ওষুধের দাম ছিল দেশে সাড়ে ৭ হাজার টাকা করে। একটা বড়ি নিয়েই দেশে ফিরলাম। সামান্য স্বস্তি পেলাম এই ভেবে যে, সঠিক চিকিৎসা তো অন্তত শুরু হলো। 

কিন্তু এক মাসের ওষুধ এবং স্বাস্থ্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ হিসেব করে পরিবারের সবাই রীতিমতো দমে গেলাম। আমাদের মতো চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ব্যয়ভার চালিয়ে যাওয়া দুরূহ মনে হচ্ছিলো। কোন এক ঈদের দিনে আমার ওই ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম— এটা কতদিন খেতে হবে? 

জবাবে বন্ধু বলল— আমৃত্যু। যদি ওষুধ কাজ না করে এবং পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া অসহনীয় হয়ে ওঠে, শুধু তখনই বন্ধ করা যাবে।

সেদিন আমি একাকী অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম এই ভেবে যে, আমাদের বোনটা বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে! আমি তখন উন্নয়ন সংস্থা প্ল্যান-বাংলাদেশে চাকরি করি। আমার এক নারী সহকর্মীর স্তন-ক্যান্সার শনাক্ত হয়। একদিন সংস্থাটির কান্ট্রি ডিরেক্টর আমাকে ডেকে সেই সহকর্মীর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বললেন। 

আমার এক সার্জন বন্ধুর সহায়তায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার অপারেশন হয়। পরে আমার আরও এক বন্ধুর সহায়তায় প্রথমে রেডিওথেরাপি এবং পরে কেমোথেরাপির কোর্স চলে। এটি শেষ হওয়ার পর ওই সহকর্মীকে হরমোন থেরাপিও দেওয়া হয়। 

সুস্থ হয়ে তিনি কাজে যোগ দেন। ভালোই চলছিল। কিছুদিন পর হঠাৎ আবার অসুস্থ হয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। তাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে তার চিকিৎসক ক্যান্সার বিশেষজ্ঞকে আমার পরিচয় দিই। রোগীর অবস্থা জানতে চাই। কথা প্রসঙ্গে আমার বোনের চিকিৎসা সম্পর্কেও আলোচনা করি। দামি ওষুধের কথা বলি।

আলোচনার এক পর্যায়ে সেই চিকিৎসক জানান, আমার বোনের যে ওষুধটি খাওয়া লাগছে তা বাংলাদেশের একটি কোম্পানি উৎপাদন শুরু করেছে। বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। 

চিকিৎসকের চেম্বার থেকে বের হওয়ার পরে ওই ওষুধ কোম্পানির একজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভ আমাকে ধরলেন। তিনি যেন কীভাবে টের পেয়েছেন ওষুধ নিয়ে আমি চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করছিলাম। তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন, নিচের ফার্মেসিতে ওষুধটি একবার দেখে যেতে। দাম মাত্র ৭৫০ টাকা!

দামের এ পার্থক্য শুনে আমি তাকে বলেই ফেললাম— এটা কি আটার দলা! 

আমার এরকম মন্তব্যের পরও কম দামের কারণ এবং ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে তিনি শান্তভাবে আমাকে ব্যাখ্যা করলেন। আমি আশ্বস্ত হতে পারলাম না। ওইখানে দাঁড়িয়েই আমি আমার ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বন্ধুর ফোনে কল দিলাম।

তিনি জানালেন, ইদানিং ওষুধটি সত্যিই দেশে উৎপাদন হচ্ছে এবং পরামর্শপত্রে তিনিও সেটি লিখছেন। বললেন, মনে হয় কার্যকর হবে। 

এ পর্যায়ে আমি নিজেই নিজের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ভুগি এবং জাতীয় ওষুধ নীতির কথা ভাবি। ১৯৮৬ সালে আমার স্ত্রীর জন্য একটি বিদেশি কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক কেনা লাগত। তখন এর প্রতিটি বড়ির দাম ছিল ১২ টাকা। আর এখন দেড় টাকায় একই ওষুধ পাওয়া যায়। জাতীয় ওষুধ নীতির বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে এটা সম্ভব হয়েছে। 

আমার ভাইবোন, ভগ্নিপতি, ভাগ্নে-ভাগ্নির কাছে বোনের ওষুধের তথ্যটি জানাতে বেশ দ্বিধা বোধ করছিলাম। কেননা চিকিৎসার ব্যয়বাহুল্যের কারণে ইতোমধ্যে আমার বোনের জন্যে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার কথাও ভাবা হচ্ছিল। অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীও সেই পরামর্শ দিয়েছেন।

তারপরও তাদেরকে বললাম দেশে প্রস্তুত হওয়া ওষুধের কথা। মনের ভেতরে তখনো আস্থা আসেনি। ‘না খেয়ে থাকার চেয়ে চিড়া খাওয়া কষা না’। কাজেই দেশীয় কোম্পানির ৭৫০ টাকার ওষুধই কিনলাম। সেখানে আবার ৫ শতাংশ ছাড়ও পেলাম। কিছুদিন পর আরেকটি কোম্পানির ওই একই ওষুধ আরও একশ টাকা কমে অর্থাৎ ৬৫০ টাকায় পেলাম। এবারও ৫ শতাংশ ছাড়।

দেশে-বিদেশে চিকিৎসার পরও আমার বোনটিকে বাঁচানো যায়নি। ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার প্রায় পৌনে তিন বছর পর ২০১৩ সালের জুনে সে মারা যায়।

আমার সেঝ বোনটি ২০১২ সালে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। তার স্তনের বাইরে পরিবর্তন দেখেই আমার চিকিৎসক মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সঙ্গে সঙ্গেই ময়মনসিংহে বায়োপসি করা হয়। ক্যান্সার শনাক্ত হলে ঢাকায় অপারেশন করে তার স্তন কেটে ফেলা হয়। পরে কেমোথেরাপি চলে। যেহেতু তখন আমার চতুর্থ বোনটির ক্যান্সারের চিকিৎসা চলছিল— সে অবস্থায় দুইজনকেই বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে পেট স্ক্যানসহ অন্যান্য পরীক্ষা-নীরিক্ষা শেষে চিকিৎসক বলেন, ‘নো ক্যান্সার’ ‘নো ক্যান্সার’। 

চিকিৎসক ছিলেন চীনা। ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন না। আমার ভগ্নিপতি ও ছোটভাই এ খবরে খুশি হয় খুব। বাংলাদেশি চিকিৎসকদের প্রতি অনাস্থাসূচক মন্তব্যও করে বসে। 

ফলে আমার সেঝ বোনের চিকিৎসার ধারাবাহিকতায় কিছুটা শিথিলতা আসে। উন্নাসিকতা কাজ করে। তাদেরকে বোঝাতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে যে, এই মুহূর্তে হয়তো তার শরীরে ক্যান্সারের কোষ পাওয়া যায়নি, কিন্তু রোগ নির্ণয়ে কোনও ভুল নেই। দুঃখজনক হলেও সত্যি আমার সেই বোনটি শেষ পর্যন্ত সময় মতো চিকিৎসা না করার কারণেই ২০১৮ সালে হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে মারা যায়।

এদিকে সেঝ বোনের চিকিৎসার মধ্যেই ২০১৬ সালে ক্যান্সারের শিকার হন আমার বড় বোন। তার বাম চোখের পাতার উপরটায় ছোট্ট টিউমারের মতো হয়। সন্দেহবশত, সেটি অপারেশন করে বায়োপসি করা হয়। রিপোর্টে Basal Cell Carcinoma শনাক্ত হয়। যা লোকালি ম্যালিগন্যান্ট অর্থাৎ কোথাও ছড়ায় না। বর্তমানে তিনি ভালো আছেন এবং ক্যান্সার মুক্ত।

আমাদের পরিবারের তিন প্রজন্মই ক্যান্সারাক্রান্ত। আমার মেঝ ভাইয়ের বড় মেয়ে পাকস্থলির ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় মার্চ ২০১৮ সালে। ভারতে তার অপারেশন হয়; তারপর কেমোথেরাপির সাহায্যে চিকিৎসা চলছিল। জটিলতা দেখা দেয়। সরাসরি মুখ দিয়ে খেতে পারছিল না। চিকিৎসকরা অনুমান করেন— খাদ্যনালির কোথাও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এন্ডোসকপি করে দেখা যায়, খাদ্যনালীতে ছিদ্র রয়েছে। নিবিড় চিকিৎসাকেন্দ্রে ২০১৯ সালের মার্চে তার মৃত্যু হয়। 

ওই একই বছরের জানুয়ারিতে আমার নিজেরই ক্যান্সার শনাক্ত হয়। প্রস্রাবের বেগ হলে তড়িঘড়ি করে টয়লেটে যেতে হচ্ছে— এই মামুলি লক্ষণ নিয়ে এক ইউরোলজিস্ট অনুজের কাছে চেক-আপ করতে যাই। প্রথমে পিএসএ, তারপরে পর্যায়ক্রমে আলট্রাসনোগ্রাফি অব হোল অ্যাবডোমেন এমআরআই প্রোস্টেট এবং বায়োপসি করে অবশেষে প্রোস্টেট ক্যান্সার শনাক্ত হয়। সান্তনা হলো, কোথাও ছড়ায়নি। আমাকে শোনানো হলো ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের এক বাণী, ‘আল্লাহ আমাকে যদি ক্যান্সার দাও, তবে প্রোস্টেট ক্যান্সার দিও।’ ব্যবস্থা দেওয়া হলো— Robotic Radical Prostatectomy /Active Surveillance। যত সান্তনাই থাকুক না কেন, অবচেতন মনে ক্যান্সারভীতি নীরবে কাজ করছিল। 

অনিদ্রা, দুঃশ্চিন্তা এবং ক্ষুধামন্দা দেখা দিল। ফলে আরেক নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হলাম; ডায়াবেটিসে ভুগছি ২০০৪ সাল থেকে এবং MRI-Brain করে  Meningiomaও শনাক্ত হয়। সবকিছু মিলিয়ে কিছুটা চিন্তাযুক্ত, কিছুটা হতাশা নিয়ে দিন যাপন করতে থাকলাম। ডায়াবেটিস এবং ব্লাড প্রেসারের চিকিৎসাসহ প্রোস্টেট ক্যান্সারের সার্জারি যুক্তরাষ্ট্রে করাব ঠিক করলাম। সেখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে উন্নতমানের; কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া খুবই দুরূহ। অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে হয় প্রাইমারি কেয়ার চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে। ইউরোলজিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেলাম ৩ মাস পর; তাও আবার তিনি Robotic Surgeon নন। মনোবাসনা অপূর্ণ রেখেই দেশে ফিরে এলাম; ক্যান্সার নিয়ে কতকাল বসে থাকা যায়! তাই অপেক্ষা না করে আমার দেশের কনসালটেন্ট ইউরোলজিস্টের পরামর্শে দিল্লীর গুরগাঁওয়ের ফরটিস হাসপাতালের একজন Robotic Surgeon-কে দেখালাম। 

অপারেশনের জন্য শারীরিকভাবে ঠিক আছি কিনা সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সময় হৃদপিণ্ডে ৬টি ব্লক ধরা পড়ল। অথচ দুদিন আগেও বিএসএমএমইউ-তে ক্লাস নেওয়ার জন্য ৬ তলা হেঁটে ওঠানামা করেছি, কোনো বুকব্যথা বা ক্লান্তিবোধ করিনি। সম্ভবত দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসের কারণেই এই ব্লক হয়েছিল। অবশেষে প্রোস্টেটের অপারেশন না করে হার্টে বাইপাস সার্জারি করে দেশে ফিরে এলাম। অভিজ্ঞতাটুকু আমার কাছে মনে হয়েছে, ‘ওমরাহ করতে গিয়ে হজ করে ফিরলাম।’ সান্ত্বনা পেলাম এই ভেবে যে, হার্ট অ্যাটাক করেও তো মারা যেতে পারতাম! কিন্তু পাশাপাশি ক্যান্সারভীতিটা রয়েই গেল। পরবর্তী ৬ মাস অপারেশন করা যাবে না। 

এরমধ্যে ২০২০ সালে শুরু হলো কোভিড। এ যেন ’কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’। গৃহবন্দিত্ব আবারও অনিদ্রা ও ক্ষুধামন্দা নিয়ে এল। শরীরের ওজনও কমে গেল। করোনা ভ্যাকসিন নিলাম। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে গ্রিনকার্ডের শর্তানুসারে আবার যুক্তরাষ্ট্রে যাই। সেখানে একটি হাসপাতালে আমার Robotic Radical Prostatectomy হয়। পোস্ট অপারেটিভ পিরিয়ডে করোনাক্রান্ত হলাম। পরিবারের সবার জন্য ছিল তা ছিল বেশ ভয়ের। কারণ, আমিই পরিবারে প্রথম করোনাক্রান্ত হই। সামান্য জ্বরের ওপর দিয়ে ফাঁড়া কাটে।

২০২১ সাল ভালোই গেল; কিন্তু ২০২২ সাল থেকে PSA বাড়তে শুরু করল। দুইবার পিএসএমএ পেট স্ক্যান করার পরও শরীরের কোথাও ক্যান্সারের কোষ পাওয়া গেল না। কিন্তু শুধু পিএসএ বাড়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা আমাকে রেডিওথেরাপি ও হরমোন থেরাপির পরামর্শ দেন। সে অনুযায়ী বাংলাদেশেই আমার আরেক অনুজ, যিনি বাংলাদেশে প্রথম রেডিয়েশন অনকোলজিতে এমডি করা, তার চিকিৎসাধীন রেডিওথেরাপি কোর্স সম্পন্ন করি। এরপর হরমোন থেরাপি চলছে, যা দুই বছর চলবে— উদ্দেশ্য ক্যান্সার নিরাময় করা। 

২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আমার মেঝ ভাইয়ের স্বরনালিতে ক্যান্সার ধরা পড়ে। শুরুতে কাশি, শ্বাস-নালির প্রদাহ, ঢোক গিলতে ও কথা বলতে অসুবিধা বোধ করছিলেন। অনতিবিলম্বে ল্যারিংগোস্কপি ও বায়োপসির সাহায্যে স্বরনালির ক্যান্সার শনাক্ত হয়। যথাসময়ে অপারেশন করে রেডিওথেরাপির সাহায্যে চিকিৎসা নিয়ে তিনি বর্তমানে ক্যান্সারমুক্ত। 

চল্লিশ বছরে আমার পরিবারের পাঁচজন ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ক্যান্সার ধরা পড়ার পরে চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে একই পরিবারের তিনজন ক্যান্সারমুক্ত জীবন-যাপন করছি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারছি, ‘ক্যান্সার ভালো হয়’। 

লেখক: চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

(সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশনের ‘এখানে থেমো না’ বইয়ে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে)