অ্যান কারসন এর প্রবন্ধ: যেখানে শেষ সেখানেই এখন এর শুরু
কবিরা প্রেমকে একজাতীয় দখল বা নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখান, কিন্তু সক্রেটিস আত্মাকে মুক্ত করার হাতিয়ার হিসেবে দেখান প্রেমকে।
অ্যান কারসন: ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত। জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ জুন কানাডার টরন্টোতে। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, ক্লাসিকবিদ ও অধ্যাপক। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যে সুপণ্ডিত। প্রাচীন গ্রিক ও আধুনিক রূপক মিলিয়ে তিনি লিখেছেন নতুন কবিতা। স্মৃতি তাঁর লেখার অন্যতম উপাদান। তাঁর প্রধান গ্রন্থগুলো হলো: দ্য গ্লাস এসে, নক্স, দ্য বিউটি অব দ্য হাসবেন্ড, ফ্লট ইত্যাদি। কাব্যধর্মী উপন্যাস: অটোবায়োগ্রাফি অব রেড।
এ প্রবন্ধটির নাম The Ends where Now begins, এটি কারসনের Eros the bittersweet গ্রন্থ থেকে নেওয়া।
...................
মূল: অ্যান কারসন
তর্জমা: কুমার চক্রবর্তী
...................
যৌনপ্রেম অভিজ্ঞতার লক্ষণীয় সত্যকে নিয়ে সক্রেটিস এবং লাইসিয়াস (প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত বাগ্মী ও আলংকারিক---অনুবাদক) প্রায় একই মত পোষণ করেন, তবে তাঁদের প্রদত্ত সেই সত্যকে অনুধাবনের ক্ষেত্রে, তাঁদের রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বাস্তবতা হলো, এরোস আপনাকে এতটা বদলে দিচ্ছে যে আপনি যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন ব্যক্তি হয়ে যাচ্ছেন। প্রচলিত চিন্তাধারায় এমন পরিবর্তনকে উন্মাদনা হিসেবে সবচেয়ে ভালোভাবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়।
একজন উন্মাদ ব্যক্তির সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা সবচেয়ে উত্তম? এক্ষেত্রে লাইসিয়াসের উত্তর হলো, তাকে আপনার ইতিবৃত্ত (story) থেকে বাদ দিয়ে দিন। এটি তাঁর সমসাময়িকদের কাছে কিছুটা অর্থপূর্ণ মনে হতে পারে, কারণ তাঁর এরোসের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণরূপে প্রচলিত ধারণার উপর ভিত্তি করে। দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত কাব্যিক ধারার পরিপ্রেক্ষিতে এটি আকাঙ্ক্ষাকে আত্মার ওপর ধ্বংসাত্মক নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণত একটি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হিসেবে উপলব্ধি করে। যেভাবে সেই সময়ের সাধারণ নৈতিক চিন্তাধারায় এটি প্রচলিত ছিল সেভাবে এটিকে ধরে নেওয়া যায় ‘‘আত্মসংযম’’ (sophrosyne) , যা হলো আলোকিত জীবনের নিয়ম।
সক্রেটিস উভয় গতানুগতিক ধ্যানধারণাকেই ওলটপালট করে দেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত এবং অধিক প্রগতিশীল। প্রেমহীন যে-কেউই ‘‘আত্মসংযমে’’ চূড়ান্ত সিদ্ধি অর্জন করতে পারে, এ বিষয়ে সক্রেটিস সন্দেহমুক্ত ছিলেন। তিনি অস্বীকার করেন না যে এরোস আত্মার দখলদার, এক ধরনের উন্মাদনা; কিন্তু তিনি উন্মাদনাকে বৈধতা দেন। দেখা যাক কীভাবে।
প্রচলিত গ্রিক মনোভাব অনুযায়ী, আত্মার পরিবর্তন মানে আত্মার ক্ষতিসাধন। উন্মাদনা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হলে এটি প্রশ্নাতীতভাবে মন্দ হিসেবে গণ্য। সক্রেটিস এতে একমত নন:
আমাকে বলতেই হবে এই বাণী (লোগোস), এই যুক্তিটি সত্য নয় যে-যুক্তি বলে যে, প্রেমিকের চেয়ে অপ্রেমিককে বেশি প্রধান্য দিয়ে তার ইচ্ছা পূরণ করা উচিত; কারণ প্রেমিক উন্মাদ, আর অপ্রেমিক সুস্থ ও সংযত। এখন যদি উন্মাদনা ( মেনিয়া) নিছক মন্দ কিছু হতো তবে এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য হতো। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, ঈশ্বরের উপহার হিসেবে যখন উন্মাদনা আমাদের ওপর ভর করে তখন তার মাধ্যমেই আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণ লাভ করতে পারি।
সক্রেটিসের প্রধান যুক্তি হলো, উন্মাদনাকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে গিয়ে নিজের মনকে কেবল নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার অর্থ হলো দেবতাদের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। প্রকৃত কল্যাণকর, এমনকি ঐশ্বরিক বিষয়গুলোও আমাদের বাইরের জগতে জীবন্ত ও সক্রিয়; সেগুলোকে প্রবেশ করতে দিতে হবে যাতে তারা জীবনে এসে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এই প্রভাব আমাদের সামাজিক জীবনকে গঠিত ও সমৃদ্ধ করে; কোনো ভবিষ্যদ্বক্তা, আরোগ্যকারী বা কবি তার মানসিক সংযম হারানো ছাড়া নিজের শিল্পচর্চা করতে পারেন না,যদি তিনি নিজের স্বাভাবিক মানসিক অবস্থার সীমা অতিক্রম না করতেন। উন্মাদনা হলো সেই অন্তর্দৃষ্টি লাভের মাধ্যম। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ব্যক্তিগত জীবনে প্রেমজনিত উন্মাদনা একটি মূল্যবান বিষয়। এটি তোমার আত্মায় ডানা জুড়ে দেয়।
উন্মাদনাকে ব্যক্তিগত উপকারের অভিজ্ঞতা হিসেবে প্রতিপন্ন করার সক্রেটীয় ব্যাখ্যা, যা আত্মার গতিশীলতার একটি সুপরিকল্পিত তত্ত্বের উপর নির্ভর করে এবং প্রচলিত কবিতায় উপস্থাপিত কামনা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়। তাঁর বিশ্লেষণ প্রেমের দেবতা এরোস সম্পর্কে কবিদের প্রচলিত রূপকগুলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করে, একই সাথে তাদের অতিক্রমও করে; এর ফলে তিনি প্রেমের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তাঁদের ঐতিহ্যগত ধারণাকে পুনর্নির্মাণ করতে পারেন। যেখানে তাঁরা ক্ষতি ও ধ্বংস দেখেন, কিন্তু সক্রেটিস সেখানে দেখেন লাভ ও বিকাশ। যেখানে তাঁরা বরফ গলে যাওয়াকে দেখেন, সেখানে তিনি বলেন ডানা গজানোর কথা। যেখানে তাঁরা নিজেদের আত্মসমর্পণ করা থেকে রক্ষা করার জন্য শক্ত অবস্থানে থাকেন, সেখানে তিনি উড়ে যাওয়ার জন্য নিজেকে মেলে ধরেন।
প্রাথমিক মিল থাকা সত্ত্বেও, শেষ পর্যন্ত সক্রেটিসের প্রেমবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি, লাইসিয়াসের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচলিত গ্রিক ভাবনার মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। প্লেটো সেই পার্থক্যকে একটি চিত্রকল্পের মাধ্যমে সংক্ষেপে উপস্থাপন করেছেন যা সত্যিই অসাধারণ। প্রচলিত কাব্যিক রীতিতে, পাখা হলো এরোসের হাতিয়ার, যা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে প্রেমিকের উপর আছড়ে পড়ে এবং তার ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বকে দখল করে। পাখা ক্ষতির যন্ত্র এবং অনিরোধ্য শক্তির প্রতীক। প্রেমে পড়লে, পরিবর্তন আপনাকে পাখার মাধ্যমে আচ্ছন্ন করে এবং আপনি আপনার প্রিয় আত্মাকে আটকে রাখতে পারেন না।
আমরা দেখেছি কীভাবে সাফো (ফ্রেগমেন্ট ৩১) আত্মার ক্ষতিকে বর্ণনা করেন। আকাঙ্ক্ষা যখন তার শরীর, মন এবং বোধশক্তি দখল করে, সে বলে ওঠে “eptoaisen”, যার অনেকটা অর্থ হলো: “এটি আমার হৃদয়কে যেন ডানা মেলে উড়তে দেয়,” বা “আমার বুকের ভিতরকে উড়িয়ে বেড়ায়।” অ্যানাক্রেয়ন (প্রাচীন গ্রিসের একজন বিখ্যাত কবি যিনি প্রেম, মদ্যপান, যৌবন, সৌন্দর্য এবং জীবনের আনন্দ নিয়ে কবিতা রচনা করতেন; --অনুবাদক।) একই অনুভূতির কথা বলেন এবং একই কারণ দেখান।
হেলেনের জন্য পাগল করা সেই আকাঙ্ক্ষার কথা আলকাইওসও (প্রাচীন গ্রিসের একজন বিখ্যাত গীতিকবি, ---অনুবাদক) একইভাবে প্রকাশ করেন:
হেলেনের হৃদয়কে বুকের মধ্যে নিয়ে এরোস পাখার মতো মেলে দিল, আর
সে ট্রয়ের পুরুষের জন্য তার মন হারিয়ে সমুদ্র পেরিয়ে গেল।
এরোসের পাখার গুরুত্ব হেলেনীয় সময়ের কাব্যের একটি প্রচলিত প্রতীক হয়ে ওঠে। প্লেটো প্রচলিত এরোসের পাখাকে পুনর্নির্মাণ করেন। তার দৃষ্টিতে, পাখা কোনো বহিরাগত দখলের সামগ্রী নয়। এগুলো তো প্রতিটি আত্মার মধ্যে স্বাভাবিকভাবে রয়েছে, এগুলো তার অমর সূচনার অবশিষ্টটুকু। আমাদের আত্মা এক সময় দেবতাদের সঙ্গে পাখার ওপর বাস করত। এখন আমরা সেই স্থানের এবং জীবনের গুণমান থেকে নির্বাসিত, তবে সময়ে সময়ে আমরা এটি মনে করি, যেমন সৌন্দর্য দেখার সময় এবং প্রেমে পড়ার সময়।
এছাড়াও, আত্মার পাখার মাধ্যমে এটিকে পুনরুদ্ধার করার ক্ষমতা রয়েছে আমাদের। সক্রেটিস ব্যাখ্যা করেন কীভাবে সঠিক পরিবেশে পাখা বৃদ্ধি পাবে, যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে আত্মাকে তার সূচনাবিন্দুতে ফিরিয়ে আনবে। প্রেমে পড়লে, আপনি একসাথে যন্ত্রণাদায়ক এবং আনন্দদায়ক সব অনুভূতি অনুভব করেন: এটাই আপনার পাখা জন্মানো। এটি হলো আপনার হয়ে ওঠার সূচনা।
প্লেটো দেখান, কীভাবে উন্মাদ প্রেম (eros) শুধুমাত্র ক্ষতি নয় বরং ব্যক্তিগত প্রকাশের উৎস হতে পারে। প্রেমে পড়ার সময়, আমাদের অনুভূতিগুলো, কষ্ট ও আনন্দ, দুটোতেই সক্রিয় হয়, এবং এটিই আমাদের আত্মার “উড়ানের” সূচনা। সক্রেটিস ব্যাখ্যা করেন যে, আমাদের প্রাচীন পারমার্থিক জীবনের সাথে পুনঃসংযোগ করার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা রয়েছে এই উন্মাদনার। পাখাগুলো জন্মায়, এবং সঠিক শর্তে এগুলো এত শক্তিশালী হয় যে আত্মাকে তার মূল গন্তব্যে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
তিনি আরও বলেন যে, প্রচলিত কবিতা যেখানে প্রেমকে ধ্বংসাত্মক এবং আত্মাকে হারানোর রূপক হিসেবে দেখে, সেখানে তিনি তা লাভ এবং বৃদ্ধি হিসেবে বারবার রূপান্তরিত করেন। যেখানে কবিরা আত্মা বিসর্জনের ব্যথাকে দেখান, সেখানে সক্রেটিস দেখান উড়ানের আনন্দ। কবিরা প্রেমকে একজাতীয় দখল বা নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখান, কিন্তু সক্রেটিস আত্মাকে মুক্ত করার হাতিয়ার হিসেবে দেখান প্রেমকে।
উন্মাদনা যদি খারাপ কিছু হতো তবে কথাটির এখানেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, দেবতাদের দান হিসেবে যখন উন্মাদনা আমাদের ওপর নেমে আসে তখন তার মধ্য দিয়েই জীবনের শ্রেষ্ঠ কল্যাণগুলোর অনেককিছু আমরা লাভ করি।
এভাবে, সক্রেটিসের তত্ত্বে উন্মাদনা (mania) কোনো নেতিবাচক জিনিস নয়; বরং এটি জীবনের এবং প্রেমের আনন্দের প্রধান উপাদান। প্রেমিকের উন্মাদনায় আমরা আমাদের আত্মার গভীর সম্ভাবনাগুলো অনুভব করি এবং নিজেকে অনন্ত ও পারমার্থিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করি। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আনন্দ নয় বরং একটি শিক্ষণীয় প্রক্রিয়া, যা আমাদের নৈতিক ও বৌদ্ধিক বিকাশকে সমৃদ্ধ করে।
সক্রেটিসের ব্যাখ্যায় মেনিয়া (দৈব উন্মাদনা) ব্যক্তির জন্য একটি লাভজনক অভিজ্ঞতা। এই ধারণাটি আত্মার গতিবিদ্যার এক সূক্ষ্ণ তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই তত্ত্বটি এমনভাবে গঠিত, যা প্রাচীন কবিতায় এরোস-এর নিয়ন্ত্রণসম্পর্কিত প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে সক্ষম হয়। সক্রেটিস কবিদের প্রচলিত এরোস-এর রূপকগুলোকে নিজের তত্ত্বে অন্তর্ভুক্তও করে নেন, আবার সেগুলোকে পালটেও দেন; যাতে তিনি ওই প্রচলিত প্রেমানুভূতির চিত্রটিকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারেন।
যেখানে কবিরা বিষয়টিকে দেখেছেন ক্ষতি ও আত্মবিসর্জন হিসেবে, সক্রেটিস সেখানে দেখেন লাভ ও বিকাশ। যেখানে তাঁরা বরফ গলার উপমা দেন, সক্রেটিস সেখানে বলেন: ডানা গজানো। যেখানে তাঁরা আত্মরক্ষার চেষ্টা চালান, সেখানে তিনি বলেন: নিজেকে উন্মুক্ত করে উড়ে যাওয়ার কথা।
মূলগত কিছু মিল থাকা সত্ত্বেও, শেষপর্যন্ত সক্রেটিস ও লাইসিয়াস এবং ঐতিহ্যগত গ্রিক চিন্তার মধ্যে এক বিশাল পার্থক্য থেকে যায়। প্লেটো এই পার্থক্যটিকে সংক্ষিপ্ত করে ফেলেছেন একটি একক প্রতীকে (symbol): “ডানা”।
প্রচলিত কবিতায় এরোস-এর ডানা হলো সেই উপকরণ, যার দ্বারা দেবতা প্রেমিকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ব্যক্তিত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়। ডানা সেখানে ধ্বংসের যন্ত্র, অপ্রতিরোধ্য শক্তির প্রতীক। প্রেমে পড়লে, পরিবর্তন এক ঝটকায় তোমার ভিতর দিয়ে বয়ে যায় ডানার মতো, আর তুমি হারিয়ে ফেল নিজের ওপর দখল, যা ছিল তোমার সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ: তোমার সত্তা।
হেলিনীয় যুগে এসে এরোসের ডানার প্রতীকটি এক প্রবাদপ্রতিম কাব্যিক ভাষারীতিতে (poetic topos) পরিণত হয়। যেমন আর্কিয়াসের (আর্কিয়াস: আইলুস লিসিনিয়াস আর্কিয়াস, গ্রিক বংশোদ্ভূত কবি যিনি রোমে বাস করতেন; ---অনুবাদক) এই এপিগ্রামটিতে দেখা যায়:
তুমি কি প্রেম থেকে পালাতে চাও? এ তো হবে এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা!
আমি কী করে পায়ে হেঁটে পালাতে পারি,
যখন সে আমাকে ডানায় উড়ে তাড়া করছে?
(পালাতিনা অ্যান্থোলজি: ৫.৫৯)
কিন্তু প্লেটো এই প্রচলিত প্রতীকের রূপান্তর ঘটান। তাঁর ধারণায় ডানা আর কোনো বাইরের আক্রমণের সামগ্রী নয়; বরং আত্মার অন্তর্গত অঙ্গ, অমর আরম্ভের এক স্মৃতি।
প্লেটো এরোসের প্রচলিত ডানার ধারণাটিকে গ্রহণ করেন এবং তাকে নতুনভাবে কল্পনা করেন। তাঁর ধারণায় এই ডানা আত্মার মধ্যে বাইরে থেকে প্রবেশ করানো কোনো যন্ত্র নয়। বরং প্রতিটি আত্মার মধ্যেই এর স্বাভাবিক শিকড় রয়েছে যা তার অমর আদি-উৎসের এক অবশিষ্ট চিহ্ন। প্লেটো বলেন--- আমাদের আত্মা একসময় দেবতাদের সঙ্গে ডানায় ভর করে উড়ে বেড়াত, বাস্তবতাকে নিরন্তর প্রত্যক্ষ করার যে অসীম আনন্দে দেবতারা পুষ্ট হন, আমাদের আত্মাও সেই আনন্দে পুষ্ট হতো; কিন্তু এখন আমরা সেই স্থান এবং জীবনের মান থেকে নির্বাসিত, কিন্তু মাঝে মাঝে আমরা তা স্মরণ করি, যখন আমরা সৌন্দর্য দেখি এবং প্রেমে পড়ি।
তদুপরি, আত্মার ডানার মাধ্যমেই আমাদের সেই অবস্থাটি পুনরুদ্ধারের ক্ষমতাও রয়েছে। সক্রেটিস ব্যাখ্যা করে বলেন যে সঠিক পরিবেশে সেই ডানাগুলো আবার গজাতে শুরু করে, এত শক্তিশালী হয় যে আত্মাকে তার উৎসের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে তা। প্রেমে পড়লে আমরা বেদনাদায়ক ও আনন্দদায়ক, ---এই এক অদ্ভুত দ্বৈততাকে অনুভব করতে থাকি; এই অনুভূতিগুলোই তোমার নতুন গজিয়ে ওঠা ডানা। এটাই সেই সত্তায় পরিণত হওয়ার সূচনা যা হয়ে উঠতে চাও তুমি।
শুরু করাটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। এখন এটা স্পষ্ট বোধগম্য যে কেন সক্রেটিস এটাকে এত গুরুত্ব দেন। তাঁর কাছে যে মুহূর্তে এরোসের জন্ম হয় সেই মুহূর্তেই আত্মার আদি সূত্রের এক ঝলক দৃষ্টিগোচর হয়। আকাঙ্ক্ষা এখন যেন সময়ের গভীরে প্রোথিত একটি শলাকা যা আবার কালের বাইরে সেই কালাতীত জগতে চলে যায়, যেখানে দেবতারা বিচরণ করেন এবং বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ করে আনন্দে নিমগ্ন হয়ে থাকেন।
যখন তুমি এই ‘এখন’-এর মধ্যে প্রবেশ করো তখন তুমি স্মরণ করতে পারো প্রকৃত অর্থে জীবন্ত হওয়া কাকে বলে, যেভাবে দেবতারা থাকেন জীবন্ত। একটি কালাতীত সময়ের এই স্মৃতির মধ্যে এক ধরনের আপাতবিরোধিতা আছে। সক্রেটিস ও লাইসিয়াসের প্রেমবিষয়ক তত্ত্বের প্রকৃত পার্থক্যটি এই আপাতবিরোধের মধ্যে নিহিত।
লাাইসিয়াস এই আকাঙ্ক্ষার আপাতবিরোধে বিচলিত হন এবং অতঃপর এটিকে বাদ দেন। তাঁর কাছে প্রেম বা কামনার প্রতিটি ‘এখন’ কেবল একটি সমাপ্তির সূচনা, এর বেশি কিছু নয়। তিনি এমনই একটি অপরিবর্তনীয় অন্তহীন ‘তখন’কে পছন্দ করেন। কিন্তু সক্রেটিস ‘এখন’ (now) নামে পরিচিত এই আপাতবিরোধময় মুহূর্তটির দিকে তাকান এবং সেখানে এক অদ্ভুত গতিবিধি লক্ষ করেন। যে বিন্দুতে আত্মা নিজেকে আরম্ভ করে, সেখানে যেন একটি অন্ধ বিন্দু প্রকাশিত হয়ে যায়। এই অন্ধ বিন্দুর মধ্যে ‘তখন’( then) হারিয়ে যায়।
