২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

ইসরায়েলের নির্বাচনে শীর্ষ প্রার্থী যারা

গাজা ও লেবাননে যুদ্ধ এবং ইরানে বিমান হামলার প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলে মঙ্গলবার প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

ইসরায়েলের নির্বাচনে শীর্ষ প্রার্থী যারা

ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 26 Oct 2026, 05:35 PM

Updated : 26 Oct 2026, 05:35 PM

ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারাতে যাচ্ছেন বলে দীর্ঘদিন ধরে আভাস পাওয়া গেলেও ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়ে উঠেছে। তবে তার বিরোধীদের সামনেও সরকার গঠনের স্পষ্ট কোনো পথ তৈরি হয়নি।

২৭ অক্টোবর (মঙ্গলবার) অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে ভোটাররা কোনও ব্যক্তিকে নয়, বরং দলগুলোকে ভোট দেবেন। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার ভিত্তিতে দলগুলোর পাওয়া ভোটের অনুপাতে পার্লামেন্টে আসন বরাদ্দ করা হবে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর পশ্চিম এশিয়াজুড়ে চরম যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে; গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং ইরানে বিমান হামলার প্রেক্ষাপটে দেশটিতে এই প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

এই নির্বাচনের শীর্ষ প্রার্থীদের পরিচিতি তুলে ধরা হল

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

নব্বইয়ের দশকে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর ২০০৯ সাল থেকে প্রায় পুরোটা সময়ই ক্ষমতায় রয়েছেন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনিই ইসরায়েলের মূল প্রতিচ্ছবি, আবার দেশের ভেতরে অন্যতম মেরুকরণকারী ব্যক্তিত্ব।

সমর্থকেরা নেতানিয়াহুকে “কিং বিবি” হিসেবে আখ্যা দিয়ে মনে করেন, বৈরি অঞ্চলে ইসরায়েলকে রক্ষার জন্য তার মতো দৃঢ় নেতাই প্রয়োজন।

তবে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং নিজ দেশে দুর্নীতির মামলার বিচার চলার মুখে তিনি এখন রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই চালাচ্ছেন। অবশ্য উভয় অভিযোগই তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

৭ অক্টোবরের হামলার পর নেতানিয়াহুর ‘নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী’ ভাবমূর্তি ভেঙে পড়ে এবং জনমত জরিপগুলোতে তার লিকুদ পার্টির জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নামে। এছাড়া ধর্ম ও রাষ্ট্র সংক্রান্ত তার সরকারের নীতিও অনেক ইসরায়েলিকে ক্ষুব্ধ করেছে।

তবে সংকটে টিকে থাকার বিদ্যায় পারদর্শী ৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, জয়ী হলে তিনি একটি ‘বৃহৎ জাতীয়’ সরকার গঠন করতে চান। আর কোনো পক্ষ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়ে অচলাবস্থা তৈরি হলে তিনি অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আরও কয়েক মাস ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন।

নেতানিয়াহুর প্রধান বিরোধীরা

গাদি আইজেনকোট (৬৬): গাজায় সামরিক অভিযানে নিজ সন্তানকে হারানো সাবেক এই সেনাপ্রধান নিজেকে রাজনীতির বাইরের একজন ব্যক্তি, সৈনিক ও আপসহীন নিরাপত্তা ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরছেন। তার সাধারণ পারিবারিক পটভূমি ও পরিবারের আত্মত্যাগ নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শীর্ষ ক্ষমতা ও দুর্নীতির মামলার ঠিক বিপরীত ভাবমূর্তি তুলে ধরে। তিনি ‘যাশার’ (হিব্রু ভাষায় যার অর্থ ‘সৎ’ বা ‘ধার্মিক’) নামের নতুন একটি মধ্যপন্থি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

নাফতালি বেনেট (৫৪): সেনাবাহিনীর সাবেক কমান্ডো, নেতানিয়াহুর একসময়ের সহযোগী ও প্রযুক্তি খাতের ধনকুবের নাফতালি বেনেট মধ্যপন্থি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। রাজনৈতিক মেরুকরণের দুই প্রান্তে অবস্থান করা সত্ত্বেও এই দুই নেতা ২০২১ সালের নির্বাচনে জোট বেঁধে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন।

তাদের নতুন দলের নাম ‘টুগেদার’ (একত্রে), যা মূলত মানসিকভাবে বিপর্যস্ত জাতিকে নিরাময় ও দেশকে সঠিক পথে ফেরানোর বার্তা দিচ্ছে।

অ্যাভিগডোর লিবারম্যান (৬৮): একসময় নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী। নেতানিয়াহুর চেয়েও কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত লিবারম্যান ২০১৮ সালে তার মন্ত্রিসভা ত্যাগ করেন। সে সময় গাজায় ফিলিস্তিনি সশস্ত্র যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহু ‘নমনীয় আচরণ’ করছেন বলে অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি।

পরবর্তীতে তিনি নেতানিয়াহুর অন্যতম তীব্র সমালোচকে পরিণত হন। তার দল ‘ইসরায়েল আওয়ার হোম’-এর মূল সমর্থক সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা অভিবাসীরা।

ইয়ার গোলান (৬৪): সাবেক এই জেনারেল ৭ অক্টোবরের হামলায় আক্রান্ত এলাকা থেকে মানুষকে উদ্ধার করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান। তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’ নামের দলের, যা ঐতিহাসিক লেবার পার্টি ও ছোট বামপন্থি দল মেরেৎজের অবশিষ্টাংশ নিয়ে গঠিত হয়েছে।

নেতানিয়াহুর শিবিরের প্রার্থীরা

অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ (৪৬) এবং জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির (৫০), উভয় কট্টর ডানপন্থি নেতাই ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাদের চরম নীতির কারণে আন্তর্জাতিক মহলের কঠোর নজরদারির মধ্যে পড়েছেন।

স্মোট্রিচ পশ্চিম তীরে দ্রুতগতিতে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে এটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে ‘কবর’ দেবে।

অন্যদিকে, ২০০৭ সালে আরবদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী উসকানির দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত বেন-গভির দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনি সশস্ত্র বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড, কারাবন্দি ফিলিস্তিনিদের জন্য জেলখানার পরিবেশ কঠোর করা এবং ইসরায়েলি নাগরিকদের সহজে অস্ত্র পাওয়ার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

তারা উভয়েই গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়ন ও সেখানে আবারও ইসরায়েলি বসতি গড়ে তোলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

অতি-গোঁড়া ধর্মীয় মিত্ররা

রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য বহু বছর ধরে ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম’ এবং ‘শাস’ নামের দুটি অতি-গোঁড়া (আল্ট্রা-অর্থোডক্স) ইহুদি দলের ওপর নির্ভর করে আসছেন নেতানিয়াহু।

এই সম্প্রদায়ের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে দীর্ঘদিনের ছাড়, কর্মসংস্থানে কম অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় ভাতার ওপর নির্ভরতা অনেক সাধারণ ইসরায়েলিকে ক্ষুব্ধ করেছে; বিশেষ করে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এই অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করেছে।

কোনও পক্ষের সঙ্গেই সরাসরি যুক্ত না থাকা কয়েকটি দল নেতানিয়াহু কিংবা তার বিরোধীদের দিকে বিজয়ের পাল্লা ঝুঁকিয়ে দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের ২০ শতাংশ আরব সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী দল ‘রাম’ ও ‘জয়েন্ট লিস্ট’।

তাছাড়া, ডানপন্থি ‘পিপল অব ইসরায়েল’ এবং মধ্য-ডানপন্থি ‘দ্য রিজার্ভিস্টস’ নামের নতুন দুটি দলও রয়েছে, জনমত জরিপে যাদের সমর্থন এখনও দোদুল্যমান।