ইসরায়েলে ভোটগ্রহণ, রাজনৈতিক অস্তিত্বের কঠিন পরীক্ষায় নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের দীর্ঘ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অস্তিত্ব বর্তমানে তীব্র সংকটে রয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তার জনপ্রিয়তা এবং জোট গঠনের সক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইসরায়েলের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ভাগ্যনির্ধারণী সাধারণ নির্বাচনে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন দেশটির নাগরিকেরা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী সময়ে গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোটের বিভাজন সৃষ্টিকারী নীতির পটভূমিতে এই নির্বাচনকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রশ্নে এক ‘গণভোট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিভিন্ন মেয়াদে সর্বমোট ১৯ বছর ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা নেতা।
কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনীতি জোরদার হওয়া এবং দেশটির বিভক্ত রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে জোট সরকার গঠনের সমীকরণে তিনিই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে জনমত জরিপগুলো বলছে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার ডানপন্থি মিত্রদের সঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান ও নিরাপত্তা বিষয়ক কট্টরপন্থি গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। ডান ও মধ্যপন্থি সমর্থকদের জোটে নিয়ে এগোচ্ছেন আইজেনকোট।
আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন এই জোট এবং ইয়ার লাপিদ ও নাফতালি বেনেটের মতো নেতাদের উত্থান নেতানিয়াহুর ভোটব্যাংকে বড় ফাটল ধরিয়েছে। সর্বশেষ জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে নেতানিয়াহুর জোট অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
ইসরায়েলে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা (০৫০০ জিএমটি) থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। চলবে রাত ১০টা (২০০০ জিএমটি) পর্যন্ত। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, মোট ৭৩ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার তরুণ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় নেতানিয়াহু মূলত তার যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে সামনে এনেছেন।
ট্রাম্প তাকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রোববার নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ট্রাম্প চূড়ান্তভাবে ‘ইরানের হুমকি দূর করতে’ আবারও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, তবে শর্ত হল নেতানিয়াহুকেই ক্ষমতায় থাকতে হবে।
বিপরীতে আইজেনকোট তোপ দেগে বলেছেন, নেতানিয়াহু “ভীতিপ্রদর্শন, মিথ্যাচার ও হুমকির ওপর নির্ভর করে প্রচারণা চালিয়েছেন।” ট্রাম্পের বিষয়ে তার বক্তব্য, ট্রাম্প জনগণের ভোটে নির্বাচিত যে কোনও প্রেসিডেন্টের সঙ্গেই পূর্ণ সহযোগিতা করবেন।
সরকার গঠনে নেতানিয়াহুকে আবারও ইতামার বেন-গভির এবং বেজালেল স্মোট্রিচের মতো কট্টর ডানপন্থি নেতাদের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে এই দুই নেতার বিরুদ্ধে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও জরিপে বেন-গভিরের ‘জিউইশ পাওয়ার’ পার্টির সমর্থন বেড়েছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিরিয়াত আরবা বসতিতে মঙ্গলবার সকালে ভোট দেওয়ার পর বেন-গভির পূর্বাভাস দিয়ে বলেন, নেতানিয়াহুই আবারও প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং তারা সেই সরকারের ‘ডানপন্থি নোঙ্গর’ হিসেবে কাজ করবেন।
১২০ আসনের পার্লামেন্টে নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকোট, কারোরই সরকার গঠনের স্পষ্ট পথ নেই। নির্ধারিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা না মিললে পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে পারেন নেতানিয়াহু।
নেতানিয়াহুর বিরোধীদের অনেকের কাছে এই নির্বাচন মূলত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় নির্ধারণের বিষয়। ক্ষমতায় এলে জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিরোধী জোটগুলো।
নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ইসরায়েলের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে ভোট চাইলেও ২০২৩ সালের অক্টোবরে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাসের আকস্মিক হামলা ঠেকাতে তার সরকারের চরম গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যর্থতা তার সেই ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ করেছে।
ইসরায়েলের বেশিরভাগ নাগরিক এই ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুকে সরাসরি দায়ী করেন এবং তিনি এর ব্যক্তিগত দায় স্বীকার না করায় জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
তাছাড়া, হামাসের হাত থেকে সব ইসরায়েলি জিম্মিদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে না পারা এবং যুদ্ধ অবসানের কোনো স্পষ্ট কৌশল না থাকায় দেশের ভেতরে অসন্তোষ চরম রূপ নিয়েছে।
এছাড়াও নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থি জোটের অভ্যন্তরীন বিরোধ এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিনন্নতা ও আইনি জটিলতার বিষয়টিকেও ভোটাররা তার নেতৃত্বের ব্যর্থতা হিসাবেই দেখছে। সব মিলিয়ে এই নির্বাচন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের ‘জীবন-মরণ পণ’ লড়াই।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের ভিটারবি ফ্যামিলি সেন্টারের সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ১৩ শতাংশ ভোটার এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।
আইজেনকোটের ‘ইয়াশার’ দলের স্বেচ্ছাসেবক এলদাদ শালতিয়েল এখনও সিদ্ধান্তহীনতায় থাকা ভোটারদের টানতে জেরুজালেমের একটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোরেই প্রচার পোস্টার লাগাতে যান।
অন্যদিকে, আরেক বিরোধী নেতা ও সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলানের নেতৃত্বাধীন ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’ পার্টির স্বেচ্ছাসেবক নীলি মোর জানান, তিনি দেশে নতুন ভোর ও পরিবর্তনের প্রত্যাশায় প্রচারণা চালাচ্ছেন।
এছাড়া ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘুদের ভোটের উচ্চ উপস্থিতি আইজেনকোটের দিকে সমীকরণ ঘোরাতে পারে।
যদিও মতাদর্শগত ফারাকের কারণে আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোটে নারাজ আইজেনকোট, তবে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তারা আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন একটি সংখ্যালঘু সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এমনকি লিকুদ পার্টির কিছু শক্ত ঘাঁটিতেও ক্ষুব্ধ ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।
দীর্ঘদিনের দুর্নীতির বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া নেতানিয়াহুর ওপর থেকে অনেকে আস্থা হারিয়েছেন, যদিও সব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
জেরুজালেমের শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎস আসা-এল বলেন, “আমার অনুমান, উভয় পক্ষের ভোটের ব্যবধান হবে খুবই সামান্য। বড় ধরনের কোনো একচ্ছত্র জয়ের সম্ভাবনা নেই।”
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেও আট মাস পর নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের সমালোচনা করে পদত্যাগ করেন আইজেনকোট।
ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামাসের হামলায় ১,২০০ জন নিহত ও ২৫১ জন জিম্মি হওয়ার পর গাজায় চালানো ইসরায়েলি অভিযানে অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে সেখানকার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা, ইরানের সঙ্গে বিমান হামলা বিনিময়, ২০২৫ সালে ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় ১২ দিনের বিমান হামলা এবং এ বছর ইরানে যৌথ মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের পর আইজেনকোট জানান, শক্তি প্রয়োগ বা মার্কিন কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে হলেও ইরানকে সামরিক পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখতে হবে।
ইসরায়েলের প্রায় সব ইহুদিচালিত দলের মতো আইজেনকোটও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের বিরোধী। তবে তিনি পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার তীব্র সমালোচনা করেছেন, যা পশ্চিমাদের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ককে ক্ষুণ্ন করেছে।
একইসঙ্গে নেতানিয়াহুর চরম ডানপন্থি সঙ্গী বেন-গভির ও স্মোট্রিচকে জোটে রাখার কঠোর বিরোধিতা করছেন তিনি।
