১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইরানে সরকার পতন কি আসন্ন?

বিস্ফোরণোন্মুখ ইরান। টানা নিষেধাজ্ঞা আর আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতিতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে সাধারণ মানুষের। সরকার বিরোধী এই ঢেউ কি তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দেবে?

ইরানে সরকার পতন কি আসন্ন?
ইরানে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ কি পারবে কয়েক দশকের রাজনৈতিক কাঠামো বদলে দিতে? ছবি: বিবিসি

সাঈদ ইফতেখার আহমেদ সাঈদ ইফতেখার আহমেদ

Published : 09 Jan 2026, 02:34 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:31 PM

ইরান বর্তমানে এমন এক বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, যা দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। দেশজুড়ে ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে—যা ইরানি কর্তৃপক্ষ কেবলমাত্র সবচেয়ে গুরুতর রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় গ্রহণ করে থাকে। এই পদক্ষেপ ইঙ্গিত করে যে রাষ্ট্রযন্ত্র বিক্ষোভের ব্যাপ্তি ও তীব্রতাকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছে।

২০২২ সালে মাশা আমিনির মৃত্যুর পর যে আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল, বর্তমান বিক্ষোভ তার চেয়েও বিস্তৃত, আরও সংগঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থনৈতিক পতন, রাজনৈতিক দমন‑পীড়ন, সামাজিক বৈষম্য এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা—সব মিলিয়ে ইরান এক গভীর রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

ইরানের অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘদিনের  নিষেধাজ্ঞা, দুর্বল নীতি‑ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার ফল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ইরানের তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যকে কার্যত অচল করে দিয়েছে। তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল অর্থনীতি নিষেধাজ্ঞার চাপে ভেঙে পড়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় শূন্যে নেমেছে এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থাকার কারণে দেশটি বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত থাকতে পারছে না। সাম্প্রতিক সময়ে রিয়েল মুদ্রার অবমূল্যায়ন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রতিদিন বাড়ছে, অথচ আয় স্থবির। এই পরিস্থিতি জনগণের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যা বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

তবে অর্থনৈতিক সংকটই বর্তমান আন্দোলনের একমাত্র কারণ নয়। ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো এমনভাবে নির্মিত যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শের বাইরে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দল প্রকাশ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। নির্বাচনি প্রক্রিয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সীমিত। রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এই সংকীর্ণ পরিসর জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষকে আরও তীব্র করেছে। বিশেষ করে নারীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ, বাধ্যতামূলক হিজাব আইন (তবে মাশা আমিনির হত্যাকাণ্ডের পর সাম্প্রতিক সময়ে এ আইন কিছুটা শিথিল করা হয়েছে), কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং সামাজিক স্বাধীনতার অভাব নারীদের ক্ষোভকে রাজনৈতিক রূপ দিয়েছে। একইভাবে কুর্দি জনগোষ্ঠী, সুন্নি মুসলমান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুরাও দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার। ফলে বিক্ষোভের সামাজিক ভিত্তি আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়।

ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ফার্সিতে বাজারি নামে পরিচিত শ্রেণির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানদারদের এই শ্রেণি শাহবিরোধী বিপ্লবে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরও সাধারণত সরকারের সমর্থক ছিল। কিন্তু বর্তমান বিক্ষোভে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাজারি শ্রেণির অবস্থান পরিবর্তন ইঙ্গিত করে যে সরকারের ঐতিহ্যগত সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। ঐতিহাসিকভাবে এই শ্রেণি রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে; ফলে তাদের সমর্থন হারানো সরকারের জন্য একটি গুরুতর সংকেত।

তবে বিক্ষোভের একটি মৌলিক দুর্বলতা হলো নেতৃত্বহীনতা। আন্দোলনের ভেতরে কোনো সুস্পষ্ট বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামো বা নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি। এই শূন্যতা আন্দোলনের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। কেউ কেউ শাহ আমলের শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলছেন, আবার কেউ সম্পূর্ণ নতুন গণতান্ত্রিক কাঠামোর দাবি তুলছেন। এই মতপার্থক্য আন্দোলনের অভ্যন্তরে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে, যা সরকারের জন্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় সুবিধাজনক হতে পারে। নেতৃত্বহীনতা আন্দোলনের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা উভয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ইরানের সরকার অতীতেও বড় বিক্ষোভ মোকাবেলা করেছে—২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট, ২০১৯ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি‑বিরোধী আন্দোলন, কিংবা ২০২২ সালের নারী‑নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। বিক্ষোভের ভৌগোলিক বিস্তৃতি, অংশগ্রহণকারীদের বৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক সংকটের গভীরতা—সব মিলিয়ে এটি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও সরকার পতনের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনে রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে, সিভিল সোসাইটি কার্যত নিষ্ক্রিয় এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর ধর্মীয় নেতৃত্বের কঠোর নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান। ফলে সরকার পতন হলেও নতুন রাজনৈতিক কাঠামো গঠন সহজ হবে না।

ইরানের ক্ষেত্রে অবশ্য কিছু ইতিবাচক উপাদানও রয়েছে। শাহ আমলে সক্রিয় থাকা কিছু রাজনৈতিক দল এখনও প্রবাসে সংগঠিত রয়েছে এবং ইরানের সিভিল সোসাইটি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, ছাত্রসমাজ ও নারীদের রাজনৈতিক সচেতনতা ইরানে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে না। ফলে ইরান ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো সম্পূর্ণ অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হবে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

আঞ্চলিক ভূরাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের পতন মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ইরান‑ইসরাইল সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহু দশক ধরে আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ইরান দুর্বল হলে ইসরাইল প্রথমবারের মতো একচেটিয়া সামরিক প্রভাব বিস্তারকারী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। অতীতে মিশর, ইরাক বা সিরিয়া—কেউ না কেউ ইসরাইলের বিরুদ্ধে সামরিক ভারসাম্য রক্ষা করত। ইরানের পতন সেই ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে দিতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।

বৈশ্বিক শক্তির অবস্থানও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান ইরানি সরকার রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। সামরিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সহযোগিতা তাদের সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে। কিন্তু যদি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে—এটাই স্বাভাবিক। এতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি নতুন রূপ নিতে পারে। তবে এই পরিবর্তন ইরানকে স্থিতিশীলতার পথে নেবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে—এখনই তা বলা কঠিন।

সর্বোপরি, ইরান আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক পতন, রাজনৈতিক দমন‑পীড়ন, সামাজিক বৈষম্য এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা—সব মিলিয়ে দেশটি এক বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতিতে। বিক্ষোভের ব্যাপ্তি ও তীব্রতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জনগণের ধৈর্য শেষ সীমায় পৌঁছেছে। তবে নেতৃত্বহীনতা ও রাজনৈতিক শূন্যতা আন্দোলনের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। ইরানের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে—স্থিতিশীলতার দিকে, নাকি অস্থিরতার গভীর খাদে—তা নির্ভর করবে বিক্ষোভের পরবর্তী ধাপ, আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা এবং ইরানি সমাজের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: ইরান আর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না; পরিবর্তন অনিবার্য, প্রশ্ন কেবল—কী ধরনের পরিবর্তন।