Published : 23 May 2026, 05:12 PM
রাজশাহীতে মে মাসের রোদ আর দশটা জেলার মতো না। এখানে রোদ ঝাঁঝালো, গুমোট, থেমে থেমে। ৩৮ ডিগ্রি তাপের এক দুপুরে চার বন্ধু মিলে গরু কিনতে গেলাম সিটি হাটে। রাজশাহীর সিটি হাট উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় পশুর হাট। বানেশ্বর, কাটাখালি, দামকুড়া হাট আছে, তবে সিটি হাটের যে বিস্তার তা অন্যরকম। ঈদ এলে প্রতিদিন বসে এই হাট।
হাটে ঢুকতেই এক কোণে চোখে পড়ল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বিশাল এক কালো ষাঁড় মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। সাড়ে ছয় লাখ টাকা মূল্যের এই ষাঁড়টিকে আদর করে খামারি নাম রেখেছিলেন ‘টাইগার’। মালিকের চোখে-মুখে তখন চরম আতঙ্ক। চারপাশের মানুষের মধ্যে কানাঘুষা চলছে, কৃত্রিম উপায়ে ফিড আর ইউরিয়া খাইয়ে জোর করে মোটা বানানোর ফলেই নাকি এই দশা! তবে মালিক সে কথা অস্বীকার করে ভেজা গামছা দিয়ে ষাঁড়টির চোখ মুছে দিচ্ছেন, অনবরত পানি ছিটাচ্ছেন আর সঙ্গীদের নিয়ে সৃষ্টিকর্তার দরবারে দোয়া পড়ছেন।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, কিছু মানুষ মোবাইল বের করে ওই যন্ত্রণাকাতর পশুর ভিডিও করতে ব্যস্ত। কারও চোখে কোনো উদ্বেগ নেই; যেন একটি অসহায় প্রাণীর কষ্টও বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সস্তা বিনোদনের অংশ! গরুর মালিক বারবার বলছিলেন, অতিরিক্ত ভাড়ার হাত থেকে কয়েকটা টাকা বাঁচানোর আশায় দীর্ঘ পথ হাঁটিয়ে তিনি পশুটিকে হাটে এনেছেন। কিন্তু ওই সামান্য সাশ্রয়ের চেষ্টাই এখন তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাটের হাসিলের খরচ এবার বেশি। ইজারা কমিটির লোকজনের সঙ্গে ক্রেতাদের বাকবিতণ্ডা চলছে খোলা মাঠে। অতীতে ইজারা নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ইতিহাস আছে এই হাটের। এবার সেটা নেই, তবে উত্তেজনা আছে।
দুপুরের দিকে একটু বিরতি নিলাম। চার বন্ধু মিলে বসলাম শহরের বিখ্যাত কালাভুনার দোকানে। সিটি হাটের এই কালাভুনার সুখ্যাতি শুধু রাজশাহীতেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশে। গরম ভাতে ওই কালাভুনার ঝোল মাখলে তৃপ্তিতে মন ভরে যায়। টিনের ছাউনি দেওয়া সাধারণ ছোট দোকানগুলো বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে, ভেতরে এমন রাজকীয় স্বাদের খাবার তৈরি হচ্ছে।
এখন আসল প্রশ্ন। পশু এত আছে, তাহলে দাম কমছে না কেন? গত বছরের চেয়ে এবার গরুর খাবারের খরচ অনেক বেড়েছে। যে গরু উৎপাদনে গতবার ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল, এবার ওই একই গরুতে খরচ দাঁড়িয়েছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়। ভুষি, খড়, খৈল, ঘাস, ভেটেরিনারি ওষুধ সব মিলিয়ে খামারির উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সিটি হাটে মাঝারি সাইজের গরু এখন এক লাখ থেকে এক লাখ বিশ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একটু বড় হলে দুই লাখ থেকে দুই লাখ বিশ হাজার। তিন বছর আগেও এই দাম অর্ধেক ছিল। বরাবরের মতো এবারও চাহিদা ছোট গরুর।
শুধু বিক্রেতার নয়, টান পড়েছে ক্রেতার পকেটেও। এখন মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব একটা ভালো না। লাগামছাড়া মুদ্রাস্ফীতির কারণে মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। পাশের জেলা নাটোর আর নওগাঁর হাটগুলোতেও বিপুল সংখ্যক গরু উঠেছে, কিন্তু ওই তুলনায় ক্রেতা চোখে পড়ে কম। বগুড়াতেও গত বছরের তুলনায় পশুর চাহিদা নেমেছে প্রায় আড়াই লাখে। বাজারে পশুর অভাব নেই, অভাব আসলে ক্রেতার।
আমার কোরবানির সঙ্গী, বাল্যবন্ধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. আনোয়ারুল কবির রুবেল হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, তাহলে কি ভারতীয় গরু এলে পরিস্থিতি কিছুটা সামলানো যেত? তিনি কয়েক বছর আগের কথা মনে করিয়ে দিলেন। তখন রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে হাজারে হাজারে ভারতীয় গরু আসত, হাট ভরে যেত পশুতে, দামও থাকত সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। এখন ওই চিত্র বদলে গেছে। সীমান্তে কড়াকড়ি বেড়েছে, নিয়মকানুনও কঠোর হয়েছে, তাই ভারতীয় গরু আসা প্রায় বন্ধ। এতে দেশীয় খামারিরা লাভবান হলেও ক্রেতাদের জন্য ঝামেলা বেড়েছে। কারণ বাজারে বিকল্প কমে গেলে দামও বেড়ে যায়।
শুধু সীমান্ত বন্ধ করলে হবে না। দেশের পশু উৎপাদনে খরচ কমাতে না পারলে কোরবানির বাজার স্থিতিশীল হবে না। গো-খাদ্যে ভর্তুকি, খামারিদের সুলভ ঋণ, পশুস্বাস্থ্য সেবার বিস্তার, এই বিষয়গুলোতে মনোযোগ না দিলে প্রতিবছর এই একই চিত্র দেখতে হবে।
তবে এই বিশাল কোরবানির অর্থনীতির পেছনে বাংলাদেশের গবাদিপশু খাতের এক অসাধারণ রূপান্তরের গল্প লুকিয়ে আছে। মাত্র দুই দশক আগেও ভারতীয় গরুর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলাম আমরা। আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ, যেখানে সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখের কাছাকাছি। অর্থাৎ, দেশে প্রায় ২২ লাখেরও বেশি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে।
তবুও বাজারে দামের চাপ না কমার মূল কারণ উৎপাদন খরচ। খাদ্য, পরিবহন ও পরিচর্যার বাড়তি ব্যয় সামলে খামারিরা যে বিনিয়োগ করছেন, তার ন্যায্য মূল্য না পেলে এই খাতের টেকসই ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়বে। দেশীয় উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অবশ্যই গর্বের বিষয়, তবে সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা ও নীতি সহায়তা ছাড়া এই সাফল্য টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের কোরবানির বাজারে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় থেকে 'ডিজিটাল হাট' সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ই-কমার্স সাইট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক খামারগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৪০৯টি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং ৬১৪টি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে প্রায় ৮৫ হাজার ৬২৬টি পশু বিক্রি হয়েছে, যার সম্মিলিত বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৫ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। এবার এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
অনলাইনে পশু কেনাবেচার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এতে সময় বাঁচে এবং প্রথাগত হাটের শারীরিক ভোগান্তি পোহাতে হয় না। ঘরে বসেই ভিডিও বা লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে পশুর আকার ও ওজন যাচাই করা যায়। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন হোম ডেলিভারি এবং কোরবানির পর মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের পূর্ণাঙ্গ সুবিধাও দিচ্ছে।
গত সপ্তাহে অফিসের কাজে ঢাকায় গিয়ে সাভার ও বিরুলিয়া এলাকার কয়েকটি আধুনিক ডেইরি ফার্ম ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, এবার ফেইসবুক ও ইউটিউবকে মাধ্যম করে অনেকেই ডিজিটাল বিপণন করছেন। অনেক খামার এখন ক্রেতাদের আধুনিক সেবা দিচ্ছে। অনলাইন বুকিং ও লাইভ ভিডিওর সুবিধা থাকায় অনেক উন্নত জাতের পশু হাটে ওঠার আগেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। খামারিরা অত্যন্ত আশাবাদী, কারণ এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের দৌরাত্ম্য থাকে না, ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই লাভবান হন।
রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো অঞ্চলগুলোও এখন এই ডিজিটাল বিপ্লব থেকে পিছিয়ে নেই। চাঁপাইনবাবগঞ্জে এখন মুঠোফোনের এক ক্লিকেই মিলছে উন্নত জাতের স্বাস্থ্যসম্মত গাড়ল বা ভেড়া। ফেইসবুক লাইভে দরদাম করে পশু সরাসরি বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সংস্কৃতি দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। কাদা মাড়ানো, তীব্র রোদ-বৃষ্টির ধকল এবং দালালের প্রতারণা এড়াতে শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে এটি এক বড় স্বস্তি। ডিজিটাল স্কেলে ওজন মাপার কারণে ওজনে কারচুপির সুযোগও কমে যাচ্ছে।
তবে সবকিছুরই কিছু ঝামেলা আছে, অসুবিধাও আছে। পশু সশরীরে না দেখে কেনার কারণে এক ধরনের ঝুঁকি থেকেই যায়। অনেক সময় ছবিতে বা ভিডিওতে যা দেখা যায়, বাস্তবে পশুর আকার বা স্বাস্থ্য তেমন মেলে না। ডেলিভারির সময় পশু অদলবদল হওয়া বা অনলাইন লেনদেনে প্রতারণার অভিযোগও একেবারে কম নয়। তাছাড়া, গ্রামীণ ও প্রবীণ ক্রেতাদের জন্য এখনো এই প্রযুক্তির ব্যবহার বেশ জটিল। এই খাতের জন্য এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আইনি নীতিমালা গড়ে ওঠেনি।
তা সত্ত্বেও, ভবিষ্যৎ কিন্তু এই ডিজিটাল ও ক্যাশলেস ব্যবস্থার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের বড় বড় মহানগরের ঐতিহ্যবাহী পশুর হাটগুলোতেও বাণিজ্যিক ব্যাংকের অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হচ্ছে। সেখানে থাকছে জাল টাকা শনাক্তকরণ যন্ত্র, এটিএম বুথ এবং আধুনিক 'নগদহীন' বা ক্যাশলেস লেনদেনের সুবিধা। এটি প্রমাণ করে যে, আমাদের চিরাচরিত হাট ব্যবস্থা ধীরে ধীরে আধুনিক রূপ নিচ্ছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোরবানির এই মৌসুমী বাজারটি অত্যন্ত বিশাল। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, এই অর্থনীতির আকার প্রায় ৫.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ৭০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। একটি পশু বিক্রির পেছনে জড়িয়ে থাকে গ্রামীণ অর্থনীতি, খামারি, ঘাসচাষি, পরিবহন শ্রমিক, হাটের কর্মচারী, কসাই, চামড়া ব্যবসায়ী ও লবণের বাজার। এই বাজারের সঙ্গে অনেক মানুষের আয়-রোজগার জড়িয়ে থাকে। একটা পশু বিক্রি হলে সেই টাকার ভাগ অনেক মানুষের কাছেই পৌঁছে যায়।
ঈদ আসতে এখনো কয়েক দিন বাকি। হাটে পশুর কোনো ঘাটতি নেই। হয়তো শেষ মুহূর্তে এসে দাম কিছুটা কমতেও পারে। কিন্তু দিনশেষে সাধারণ মানুষের পকেট যদি শূন্য থাকে, তবে ওই মূল্য হ্রাসের স্বস্তি কতটুকুই বা কাজে আসবে?
আসলে কোরবানির হাট কেবল একটি কেনাবেচার মাঠ নয়; এটি বাঙালির ঐতিহ্য, ধর্মীয় অনুভূতি, ত্যাগের মহিমা এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এক নিখুঁত দর্পণ। হাটের ভিড়, দরদাম আর পশুর সংখ্যার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে দেশের সাধারণ মানুষের ভালো মন্দের আসল চালচিত্র। খামারির হাসিমুখ আর ক্রেতার স্বস্তি এই দুইয়ের ভারসাম্যই হোক এবারের কোরবানির মূল সুর।