Published : 01 Feb 2026, 04:42 PM
ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচন দুয়ারে দাঁড়ানো। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে দেশের অধিকাংশ মানুষই এখন আশাবাদী। অথচ সাধারণ মানুষের ছোট ছোট আড্ডা বা জটলায় একটু সময় কাটাতে গেলেই আলোচনার এক পর্যায়ে শুনতে পাচ্ছি একই প্রশ্ন, নির্বাচন হবে তো? নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই মানুষের মনের মধ্যে শঙ্কা বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়েও মানুষের মনে একটু-আধটু শঙ্কা থাকেই। কিন্তু এবারের বিষয়টি ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকে একের পর এক এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফলে আমজনতার মনে সংশয় জাগা খুবই স্বাভাবিক এবং তাদের দোষ দেওয়া যায় না।
অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের মেয়াদের শেষ সময়ে এমন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যার প্রভাব নির্বাচিত নতুন সরকারের ওপর পড়বে বলে প্রতীয়মান। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে এসব দায়-দায়িত্ব কতটা সামলাতে পারবে, সেটা শুধু তারাই বলতে পারবে। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে এসব বিষয়কে একেবারেই বিবেচনার বাইরে রাখছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার শুধু রুটিন দৈনন্দিন কাজ চালাবে, একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণ সহযোগিতা করবে এবং জনগণ যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে তার ব্যবস্থা করবে। সর্বোপরি, ক্ষমতায় আসার সময় রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে যেসব সংস্কারের অঙ্গীকার করা হয়েছিল, সেগুলো পূরণের চেষ্টা করবে। ওই সংস্কারের অগ্রগতি বিচারের দায়িত্ব বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সরকার নির্বাচনের নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে মনোযোগ দেবে—এটাই ছিল প্রত্যাশা। কিন্তু তাদের সাম্প্রতিক কয়েকটি পদক্ষেপে তার ব্যত্যয় ঘটেছে, যা নিয়ে এই নিবন্ধে আলোচনা করতে চাই।
অতি সম্প্রতি সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে, যা দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আলোচনা ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করেছিল। কমিশনের সুপারিশে দেখা যায়, বর্তমান বেতন কাঠামোকে দ্বিগুণের বেশি করে নতুন স্কেলের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করতে গেলে সাড়ে তের লাখ সরকারি কর্মচারীর জন্য অতিরিক্ত এক লাখ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করতে হবে। এ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকই ছিল।
বেতন কাঠামো ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে পুরোনো-নতুন বেতনের হিসাব কষে খুশি হচ্ছিলেন। সমস্যা বাঁধল যখন একজন উপদেষ্টা বললেন, “প্রতিবেদন গ্রহণ করা মানেই তা সরাসরি বাস্তবায়নের পথে যাওয়া নয়, এখনো বেশকিছু আনুষ্ঠানিক ও নীতিগত প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে তাই এই স্বল্প সময়ের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কোনো পদক্ষেপ নেবে না বর্তমান অন্তবর্তী সরকার।” এই বিশাল অর্থনৈতিক চাপ নতুন নির্বাচিত সরকার কীভাবে সামলাবে, তা কিন্তু একবারও ভাবলেন না উপদেষ্টা মহাশয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন নিয়ে এখনো কোনো আলোচনাই শুরু হয়নি।
একইভাবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নতুন করে ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১৫টি কর্মসূচিতে মাসিক ভাতা ৫০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে এবং ১১ লাখ ৬২ হাজার ৭১২ জন নতুন সুবিধাভোগী যুক্ত হচ্ছেন—যা ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে কার্যকর হবে। অন্যান্য সুবিধাভোগীদের সঙ্গে খেতাবপ্রাপ্ত ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহতদের সম্মানি ভাতা সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনার সুপারিশও করা হয়েছে।
মনে রাখা প্রয়োজন, আমজনতার ভাতা দুই অঙ্ক থেকে তিন অঙ্কে উন্নীত হলেও, সম্মানিত সুবিধাভোগীদের ক্ষেত্রে ভাতা শতকের ঘরে নয়, হাজারের ঘরে বাড়ানো হচ্ছে। এতে কোনো আপত্তি করে নিজের বিপদ বাড়াতে চাই না। কিন্তু বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধীদের ভাতা দিয়ে কি ভিক্ষাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব? বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় এই ভাতা দিয়ে একবেলা খাওয়া, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বা ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব কি? এসব প্রশ্ন থাকলেও এখানে গুরুত্ব দিতে চাই না। শুধু বলতে চাই, এমন অর্থনৈতিক বোঝা নতুন সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত হয়েছে তা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে অতিরিক্ত সচিবের ২১২টি স্থায়ী পদের বিপরীতে ২৮৫ জন কর্মরত থাকা সত্ত্বেও নতুন করে ১১৮ জন যুগ্ম সচিব বা সমমানের কর্মচারীকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে উপেক্ষা করে এমন পদোন্নতি অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ারে পড়ে কি না, তা ভেবে দেখার বিষয়।
একই সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাড়ে ১৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। নির্বাচনের আগে রেকর্ড সময়ে দশ লাখ আবেদনকারীর লিখিত-মৌখিক পরীক্ষা শেষ করে নিয়োগপত্র দেওয়ার বিষয়ে সরকার বদ্ধপরিকর। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক সংকট সর্বজনবিদিত। তবে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর যদি মেধাই একমাত্র যোগ্যতা হয়, তাহলে এই তড়িঘড়ি কেন? জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বিষয়টি নিয়ে। শিক্ষা সংস্কারের কোনো উদ্যোগ না নিয়ে বরং নির্বাচিত সরকারের হাতে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে কি না, তাও বিবেচনার দাবি রাখে।
এখানেই শেষ নয়। সম্প্রতি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার উদ্যোগও গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় নির্বাচনের একমাস আগে অনলাইনে তিন হাজার ৬১৫টি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে, সামগ্রিক আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করতে ৭ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, গ্রেডিংয়ের ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত তালিকা মোতাবেক আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তি পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্ত করায় উদ্যোগী হবে নির্বাচিত সরকার।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে আরও জানা যায়, অন্তবর্তী সরকার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভা করে ১২টি মন্ত্রণালয়ের মোট ২৪টি প্রকল্পকে আলোচনায় এনেছে। এর মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৬টি প্রকল্প যার মোট ব্যয় ৩ হাজার ৬২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের একটি নতুন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের এক মাস আগে আয়োজিত এ সভায় শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ নয় পাশাপাশি বেশ কিছু সংশোধিত প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির প্রস্তাব আছে। কোন বিবেচনায় এসব নতুন প্রকল্প গ্রহণ এবং সংশোধন এই মুহূর্তে খুব জরুরি হয়ে পড়ল তা বিশদ ভাবনার বিষয়। নদী ভাঙ্গন রোধ, পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় গৃহীত এ প্রকল্পগুলো জাতীয় পর্যায়ে কি এমন পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা গেল না? ভাবার কিংবা শঙ্কার কি সত্যিই কিছু নেই?
অতীত ইতিহাস বলে, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই পূর্বনির্ধারিত পথে চলে না। তারা নিজেদের পরিকল্পনা বদলায়, শত-সহস্র কোটি টাকার ক্ষতি হলেও পিছপা হয় না। তবু অন্তর্বর্তী সরকার কেন একের পর এক দায়িত্ব নতুন সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে যাচ্ছে—এটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।
এসব প্রশ্নই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে জনমনে শঙ্কা তৈরি করেছে। তার ওপর প্রায় প্রতিদিন শোনা যাচ্ছে, এটা না হলে নির্বাচন হতে দেব না, ওটা না হলে নির্বাচন বন্ধ করে দেব ইত্যাদি। ফলে শঙ্কার পাশাপাশি অনেক ভোটারের মধ্যে ভোট না দেওয়ার প্রবণতাও তৈরি হচ্ছে। বিদ্বেষপূর্ণ রাজনীতির কারণে এই প্রবণতা সহিংস রূপ নেয় কিনা, তাও শঙ্কার বিষয়। মব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ এ সরকার কীভাবে ভোটারদের সুরক্ষা দেবে?