Published : 20 Apr 2026, 01:19 PM
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে তারকাদের অংশগ্রহণ এখন আর নতুন কিছু নয়, বরং এক নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সংরক্ষিত নারী আসনকে কেন্দ্র করে তাদের সক্রিয়তা দিনে দিনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সম্প্রতি বিএনপির জন্য বরাদ্দ ৩৬টি সংরক্ষিত নারী আসনের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি মনোনয়নপত্র বিক্রির ঘটনা এই প্রবণতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। আগ্রহীদের এই দীর্ঘ তালিকায় অনেকেরই মূল পরিচয় রাজনৈতিক নয়, বরং পারিবারিক বা তারকা খ্যাতি। ফলে প্রশ্নটি আর কেবল সংখ্যার নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও মানদণ্ডের প্রশ্নেও রূপ নিচ্ছে।
স্বাধীনতার পর সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে। প্রত্যাশা ছিল, এই নারী প্রতিনিধিরা সংরক্ষিত কোটার সীমা অতিক্রম করে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে মূলধারার রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সংরক্ষিত আসনের ওপর এই নির্ভরশীলতা কমেনি বরং সময়ের সাথে সাথে তা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আসনের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অতীতে দেখেছি, সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতি, প্রভাব বা পারিবারিক পরিচয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এতে নারীর ক্ষমতায়নের প্রকৃত লক্ষ্যটিই আড়ালে চলে গেছে। যখন একজন তারকা বা গণমাধ্যমে পরিচিত মুখ অনায়াসেই রাজনীতিতে চলে আসেন, তখন মাঠপর্যায়ে লড়াই করা ত্যাগী ও দক্ষ নারী নেত্রীরা আড়ালে চলে যান। ফলে প্রশ্ন ওঠে, এই প্রক্রিয়ায় কি সত্যিই দক্ষ নারী নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে, নাকি সংসদ কেবলই কিছু প্রতীকী প্রতিনিধিত্বে আটকে থাকছে?
এটি ঠিক যে, সমকালীন বিশ্বে ‘তারকা খ্যাতি’ আর শুধু বিনোদন বা সংস্কৃতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পুঁজিতে পরিণত হয়েছে। চলচ্চিত্র, সংগীত, ক্রীড়া, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সব ক্ষেত্রেই জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বরা বিপুল জনপরিচিতি অর্জন করছেন এবং ওই পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে অনেকেই সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করছেন। ফলে জনপ্রিয়তা এখন আর শুধুই বিনোদনের মূল্য নয়; এটি ভোটার আকর্ষণের শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার। এই প্রবণতা কিছু মৌলিক প্রশ্নও উত্থাপন করছে, রাজনীতি কি তাহলে নীতিনির্ভরতা হারিয়ে ইমেজনির্ভর ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে?
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমা বিশ্বে টেলিভিশনের বিস্তার রাজনীতিকে দৃশ্যমানতার এক নতুন যুগে নিয়ে যায়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্রমেই মিডিয়াকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে হলিউড অভিনেতা থেকে গভর্নর এবং পরে প্রেসিডেন্ট হওয়া রোনাল্ড রিগান কিংবা আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগারের মতো ব্যক্তিত্বরা এ ধারার উজ্জ্বল উদাহরণ। সম্প্রতি ডনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান এই প্রবণতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, যেখানে ব্যবসা, রিয়েলিটি টিভি এবং ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
ক্রীড়া জগতেও একই রূপান্তর দেখা যায়। ইমরান খান ক্রিকেট তারকা থেকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, আর জর্জ উইয়া ফুটবল তারকা থেকে লাইবেরিয়ার রাষ্ট্রপতি। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে আধুনিক গণমাধ্যম, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং এবং জনপ্রিয়তা রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।
ভারতের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট। তামিলনাড়ুতে এম. জি. রামচন্দ্রন ও জে. জয়ললিতা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। এন. টি. রামা রাও পৌরাণিক চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে অর্জিত জনআবেগকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ভারতের মূলধারার রাজনীতিতেও হেমা মালিনী, স্মৃতি ইরানি, মিঠুন চক্রবর্তী, নুসরাত জাহান, মিমি চক্রবর্তীসহ অনেক তারকা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ ভারতের অভিনেতা থালাপতি বিজয় রাজনীতিতে প্রবেশের ঘোষণা দিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।
বাংলাদেশে তারকাদের রাজনীতির ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও এটি দ্রুত দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ১৯৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় কিছু জনপ্রিয় তারকা রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় হন এবং কেউ কেউ সরাসরি যুক্ত হন রাজনৈতিক দলে। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতনের পর গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে তারকাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায়।
নব্বই-পরবর্তী সময়ে আসাদুজ্জামান নূর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যদিও তাকে রাজনীতিতে আগন্তুক বলাটা যথোচিত হবে না। এরপর সারাহ বেগম কবরীসহ আরও অনেক তারকা সংসদে আসেন। অভিনয়, সংগীত ও ক্রীড়া জগতের তারানা হালিম, সুবর্ণা মুস্তাফা, আকবর হোসেন পাঠান ফারুক, ফেরদৌস আহমেদ, আরিফ খান জয়, মাশরাফি বিন মর্তুজা, নাঈমুর রহমান দুর্জয়, সাকিব আল হাসান এবং মমতাজ বেগমের মতো তারকারা সংসদ সদস্য হয়েছেন। তবে সবক্ষেত্রে এই রূপান্তর সমানভাবে সফল হয়নি। ডলি সায়ন্তনী, মাহিয়া মাহি বা হিরো আলমের মতো অনেকেই নির্বাচনে অংশ নিয়েও পরাজিত হয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয়, জনপ্রিয়তা সব সময় ভোটে রূপান্তরিত না-ও হতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর থেকে দেশের নির্বাচনি রাজনীতির চরিত্রে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটে। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় নির্বাচনের স্বাভাবিক উৎসবমুখর পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে ম্লান হয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনপ্রিয় তারকাদের রাজনীতিতে যুক্ত করার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়।
তারকাদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার পেছনে কয়েকটি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, আওয়ামী লীগের অধীনে ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তিনটি জাতীয় নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ফলে তারা নির্বাচনি বৈধতা পেতে এবং জনসংযোগ বিস্তারের উদ্দেশ্যে পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখকে সামনে আনার কৌশল গ্রহণ করে। কারণ তারকারা স্বভাবতই জনমনে দ্রুত সাড়া জাগাতে পারেন। তাদের উপস্থিতি প্রচারণায় গতি এনে দেয় এবং গণমাধ্যমে দৃশ্যমানতা বাড়ায়। এর মাধ্যমে নির্বাচনি কার্যক্রমে এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়, যা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রক্রিয়াটি আবার সবক্ষেত্রে একমুখী নয়। তারকাদের নিজস্ব আগ্রহও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দায়বদ্ধতাহীন ক্ষমতার লোভের সাথে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক বা ক্রীড়াজীবনের মাধ্যমে অর্জিত জনপ্রিয়তাকে একীভূত করতে তারা আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ওই জায়গা থেকে রাজনীতি হয়ে ওঠে তাদের জন্য একটি স্বাভাবিক পরবর্তী ধাপ। ব্যক্তিগত তারকা খ্যাতি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তরিত হয়। এই জনবিচ্ছিন্ন তারকা-নির্ভর রাজনীতির ঝোঁকই আওয়ামী লীগের দলীয় কাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। ফলে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দলটির পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি সংরক্ষিত নারী আসনকে ঘিরে একই ধরনের বাস্তবতা সামনে এসেছে। বিভিন্ন অঙ্গনের তারকারা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এতে দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলে রাজনীতি করা নেতাকর্মীদের মধ্যে একধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছেন, তাদের ত্যাগ, সংগ্রাম ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছে না।
সংরক্ষিত নারী আসনের মূল উদ্দেশ্য ছিল নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্ব তৈরি করা। দীর্ঘ মেয়াদে এটি তখনই সফল হতো যদি নারীদের সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করা হতো এবং দলীয় কাঠামোতে তাদের যোগ্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকত। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও ওই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
রাজনীতি মূলত রাষ্ট্র পরিচালনা, জনস্বার্থ রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার বিষয়। এখানে জনপ্রিয়তা একটি সহায়ক উপাদান হতে পারে। কিন্তু জনপ্রিয়তাই যদি প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তাহলে রাজনৈতিক কাঠামোয় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, নীতি ও দায়বদ্ধতার সমন্বয়।
সংরক্ষিত নারী আসন কেবল একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু। এটি কি সত্যিই নারীর ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করছে, নাকি ধীরে ধীরে এটি তারকা-নির্ভর রাজনীতির একটি নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠছে; এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সময়ের দাবি।