Published : 17 Apr 2026, 06:34 PM
আজ থেকে এক হাজার দিনেরও বেশি সময় পূর্বে সুদান যুদ্ধের বিস্ফোরণ ঘটে। এ পর্যন্ত যুদ্ধে নিহত হয়েছে দশ হাজারের অধিক মানুষ এবং লাখ লাখ মানুষ খুইয়েছে জীবিকা ও বাড়িঘর। শকুনের মতো পুরো দেশজুড়ে নেমে পড়েছে ধ্বংসযজ্ঞের কালো ছায়া।
সুদান আমার এবং লাখ লাখ সুদানি মানুষের কাছে কোনো বিশ্লেষণের বস্তু নয়; এই দুনিয়ায় সুদান আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। সহজভাবে বললে, সুদানই জীবন-যৌবন। চোখের সামনে দেশ ধ্বংস, উপেক্ষিত ও লন্ডভন্ড হওয়া এবং নৃশংসতা ঘটতে দেখা আমাদের গভীরভাবে বদলে দিয়েছে। এই দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের কবর দিতে এখন দরকার একটি যুদ্ধবিরতি। শুধু সংঘাত বন্ধের জন্য নয়, যুদ্ধবিরতি দরকার নিরাপত্তা, অঙ্গীকার, সুরক্ষা এবং সুদানের সকল মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। তারপরেই একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়া উচিত, যেখানে রাজনৈতিক শক্তিগুলো থাকবে এবং সুদানিরা একটি নতুন শাসনব্যবস্থায় অংশ নিতে পারবে।
মেরুকরণ ও সংঘাত
তিন দশক ধরে দারফুর, নুবা পর্বতমালা এবং দেশের অন্যান্য অংশে জাতিগত সহিংসতা ও গণহত্যাসহ নানামুখী কৌশল প্রয়োগ করে সুদানে নৃশংস শাসন চলেছে। অবশেষে ২০১৯ সালে শাসকগোষ্ঠীর সব কৌশল নিঃশেষ হয়ে পড়ে। সে সময় সুদানের জনগণ জাতি হিসেবে সম্মিলিত শক্তি প্রমাণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। ওমর আল-বশিরের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। নারী, পুরুষ, যুবক, বৃদ্ধ সবাই একসঙ্গে, এক মন ও এক প্রাণে লড়াই করেছিল। ওই গণঅভ্যুত্থান এতই শক্তিশালী ছিল, যার তোপের মুখে স্বৈরাচারী আল-বশিরের পতন ঘটে।
তবে পরে গণঅভ্যুত্থানের বেসামাল পরিবেশ জনগণের প্রত্যাশা মেটাতে ব্যর্থ হয়। আল-বশিরের শাসনের সমাপ্তির পরে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা বিরোধী দলগুলো নিজেদের ঐক্য ধরে রাখতে পারেনি। আবার দশকের পর দশক ধরে নির্মম মেরুকরণের ফলে ক্ষয়িষ্ণু সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি ছিল। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তৃণমূল গোষ্ঠীগুলোর একটি সুস্পষ্ট রূপকল্প ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক শক্তি আকারে তাদের স্বীকৃতি ছিল সীমিত। একই সঙ্গে বহু বহিরাগত শক্তি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি তৈরি করে এবং একটি ঐক্যবদ্ধ রূপকল্পের সম্ভাবনা নস্যাৎ করে। সে সময় রাজধানীতে ঘটা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড জনমনে গভীর ভীতির সঞ্চার করেছিল। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে অস্থিতিশীল অর্থনীতি ও ভঙ্গুর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
ওই বাস্তবতায়, দারফুরে জানজাবিদ মিলিশিয়া বাহিনীর কর্ণধার ‘র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’ (RSF) সুদানি শাসনব্যবস্থার ভাগীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। ইয়েমেন যুদ্ধে বাহিনীটি ভাড়াটে হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। তাই বাহিনীটির ক্ষমতা শুধু দেশের অভ্যন্তর থেকে উৎসারিত হয়নি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্কও তাদের শক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
অতীতে এই বাহিনীর গণহত্যার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সুদানের প্রতিবেশী দেশগুলো নীরব ছিল। তারা আশঙ্কা করেছিল, এ বিষয়ে কথা বললে তাদের নিজস্ব স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে পারে। অনেক আন্তর্জাতিক সংগঠনও এমন বয়ান সামনে আনছিল যে, আরএসএফ আল-বশিরের শাসনব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে এবং স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হবে। তবে এই ধরনের প্রস্তাব সুদানি জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছিল।
২০১৯ থেকে ২০২৩—যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখেও সুদানের জনগণ এই জঘন্য পরিকল্পনার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তোলে। বিপরীতে নারী প্রতিবাদকারীদের রাস্তায় ধর্ষণ করা হয়, শত শত মানুষকে হত্যা, নির্যাতন ও কারারুদ্ধ করা হয়। শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রতিরোধ সুদান যুদ্ধ বন্ধ করতে সক্ষম হয়নি।
সংঘাতের এই তিন বছরে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, ক্ষয়ক্ষতি ও ভয়াবহতা ছাড়া সুদানকে দেওয়ার মতো আরএসএফ-এর কিছুই নেই। তারা স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও সরকারি ভবন নির্বিচারে ধ্বংস করেছে। এর সঙ্গে চালিয়েছে বেশুমার লুটপাট, প্রাতিষ্ঠানিক যৌন সহিংসতা এবং নাগরিক নির্যাতন। এই বিষয়গুলো আরএসএফ, সুদানের জনগণ এবং সুশাসন ধারণার মধ্যে যোজন যোজন দূরত্বের চিহ্ন বহন করে। তারই ফলে আরএসএফ-এর কর্মকাণ্ড সুদানের জনগণ ঘৃণা ও বর্জন করছে।
অপর পক্ষে, রাষ্ট্রদর্শনের সুস্পষ্ট অভাব থাকলেও সুদানি সেনাবাহিনী (SAF) শাসনক্ষমতা আঁকড়ে ধরে আছে। তারা অতীতের অসংখ্য ভুল এবং রাখঢাকহীন দুর্নীতি থেকে শিখতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের শাসনব্যবস্থা নাগরিক চাহিদা তো মেটাতে পারেই না, উপরন্তু একেবারে সীমিত গণসেবা ও ভাঙাচোরা অর্থনীতি সচল রাখাও তাদের পক্ষে বিলাসী চিন্তা। এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী কি টিকতে পারে? আমি মনে করি না এই বাহিনীটি টিকবে।
কীভাবে যুদ্ধ বন্ধ হবে?
সাধারণ সুদানি, শরণার্থী ও ডায়াসপোরা গোষ্ঠী চায় স্থিতিশীলতা, শান্তি এবং তাদের গ্রামে ও শহরে ফেরার অধিকার। এই মুহূর্তে শাসনব্যবস্থার মুকুট কে পরবে, তাদের কাছে তা মূল বিবেচ্য নয়; তারা নিদেনপক্ষে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরতে চায়। প্রাণ খুলে শ্বাস নিতে চায় ও নিজের নাগরিক অধিকার পুনরুদ্ধার করতে চায়।
সুশাসন সম্পর্কিত সংকটগুলো আপাতত বিশেষাধিকারের বিষয়। এজন্য সংঘাত নিরসনের ওপর মনোযোগ দেওয়া উচিত, যার মধ্যে শুধু যুদ্ধবিরতিই নয়, আরও অনেক বিষয় যুক্ত থাকবে। সুদানি হিসেবে আমরা যা চাই: ধর্ষণ নয়, লুটপাট নয়, নির্বিচারে আটক নয়; চাই বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, হাসপাতাল, স্কুল ও বাজারসহ বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং একটি মৌলিক ও কার্যকর অর্থনীতি।
আলোচনা ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া উচিত। প্রথম পর্যায়ে সামরিক সব পক্ষের আলোচনায় যুক্ত হওয়া উচিত। এখানে একটি কার্যকর সমঝোতাকারী দল অত্যাবশ্যক। এতে প্রশ্নাতীতভাবে সব পক্ষকে যুক্ত করে নিরাপত্তা খাতের ব্যবস্থাপনার ওপর মনোযোগ দিতে হবে।
এই সমঝোতায় আমাদের অবশ্যই র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স ও সুদানি সেনাবাহিনীর দ্বিবিভাজন এড়িয়ে চলতে হবে। যদিও তারা এই যুদ্ধের দৃশ্যমান মুখ, কিন্তু তারাই একমাত্র পক্ষ নয়। এই সংঘাতের অনেক স্তর আছে এবং এখানে বিচিত্র উদ্দেশ্য ঘিরে অগণিত পক্ষ জড়িত। ১০টিরও বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের হয়ে লড়ছে। প্রতিটি পক্ষের নিজস্ব দুরভিসন্ধি ও স্বার্থ রয়েছে এবং অনেকেই সুদানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। এই যুদ্ধে রাজনৈতিক বেসামরিক গোষ্ঠীগুলো নিশ্চিতভাবে সফট পাওয়ার এবং কৌশলী সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে।
সুদানের শান্তির চাবিকাঠি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের হাতে। এই সংস্থার ক্ষমতা রয়েছে যুদ্ধের প্রধান চালিকাশক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকার ইতি টানার। একই সঙ্গে সংঘাতকে উসকে দিচ্ছে এমন অন্যান্য দেশের প্রভাব কমানোও অত্যন্ত জরুরি।
জাতিসংঘ ও আফ্রিকান ইউনিয়নসহ গ্রহণযোগ্য সংস্থাগুলোর মধ্যস্থতায় যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে প্রকৃত, বাস্তব ও অর্থবহ আলোচনার সুযোগ সৃষ্টির এটাই উপায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার লক্ষ্যে একটি তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা অত্যাবশ্যক।
ভবিষ্যতের যেকোনো শাসনব্যবস্থার জন্য সুস্পষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে, যাতে সুদানের জনগণ রাষ্ট্র গঠনে মতামত প্রকাশের সুযোগ পায় এবং সক্রিয় ও গঠনমূলক অর্থে অংশগ্রহণ করতে পারে।
সকল রাজনৈতিক দলকে একই সঙ্গে পুনর্মিলন ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে হবে। পরবর্তী পদক্ষেপ হওয়া উচিত স্থানীয় পরিষদ ও সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনগুলো বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি ও শরণার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত।
এরপরে উচ্চকক্ষকে নির্বাচিত করবে নিম্নকক্ষ। উচ্চকক্ষ হবে চার বছর মেয়াদি যুদ্ধোত্তর সরকার এবং তাদের দায়িত্ব থাকবে নতুন সংবিধান প্রণয়নের। এর মাধ্যমে সুদান পুনর্গঠন ও চার বছর পরে নির্বাচন আয়োজন করার গতিপথ সুগম হবে। সমান্তরালভাবে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা টেকসই করার প্রচেষ্টা হিসেবে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর উচিত সুদানের জনগণের ইচ্ছাকে শ্রদ্ধা করা। সংঘাত সকলের জন্য কানাগলি এবং তা অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতেই থাকে। কেননা বাস্তব সমস্যা এড়িয়ে যায় এবং ঐক্য বিনষ্ট করে এমন যেকোনো কর্মসূচি রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবে ও গণদুর্ভোগ তৈরি করবে।
নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা যুদ্ধ বন্ধের দায়িত্ব না নিলে এবং জোরকদমে এগিয়ে চলতে না পারলে সুদানে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড থামবে না। এর প্রভাবে হর্ন অফ আফ্রিকা এবং সাহেল অঞ্চলের সীমানাজুড়ে যুদ্ধংদেহি পরিস্থিতি ও দ্বন্দ্ব মুহুর্মুহু ছড়াতে থাকবে; যা আরও বৈশ্বিক বিপর্যয়, মৃত্যু এবং বাস্তুচ্যুতির দিকে ঠেলে দেবে।
লেখাটি আল-জাজিরা থেকে অনূদিত; এর লেখক হালা আল-কারিব সুদানের একজন নারী অধিকার কর্মী, গবেষক এবং হর্ন অফ আফ্রিকা (SIHA) নেটওয়ার্কের স্ট্র্যাটেজিক ইনিশিয়েটিভ ফর উইমেন-এর আঞ্চলিক পরিচালক। তিনি যুদ্ধে যৌন সহিংসতা, নারী অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে কাজ করেন। তিনি SIHA-র বার্ষিক সাময়িকী ‘উইমেন ইন ইসলাম’-এর সম্পাদকীয় প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন