Published : 20 Jul 2025, 02:23 PM
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ এবং ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ কর্তৃক বাংলাদেশকে পাঠানো তথাকথিত ‘গোপনীয়’ চিঠির বিষয়বস্তু আর কোনো রাষ্ট্রীয় রহস্য নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হওয়া তথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এখন সচেতন নাগরিকসমাজ ওই চিঠির প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখে।
আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে যদিও ‘অপ্রকাশযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, বাস্তবতা হলো—এই চিঠি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির খসড়া নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত আল্টিমেটাম। এর মধ্যে বাহ্যিকভাবে বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধার মসৃণ ভাষা থাকলেও, ভেতরে চাপা আছে একগুচ্ছ রাজনৈতিক, নিরাপত্তাগত এবং ভূ-রাজনৈতিক শর্ত, যার উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক অর্ডার’-এর অনুসারী করে তোলা এবং চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান অংশীদারত্ব ভেঙে দেওয়া।
চিঠিতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে চীনা সামরিক সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে, চীনা সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এমনকি চীনের তৈরি লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্ম যেমন LOGINK—তা দেশের বন্দরে ব্যবহার করাও বন্ধ করতে হবে। এইসব নির্দেশনা যে অর্থনৈতিক নয় বরং কৌশলগত নিরাপত্তা নীতির অঙ্গ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখানেই প্রশ্ন ওঠে, একটি স্বাধীন দেশের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আরেকটি দেশ কতটা হস্তক্ষেপ করতে পারে? আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, প্রতিটি রাষ্ট্রেরই নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা কৌশল ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রাখার অধিকার রয়েছে। কিন্তু এই চিঠির শর্তগুলো ওই সার্বভৌমতার ওপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
এর বাইরেও, শুল্কনীতি, শ্রম আইন, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, কৃষিনীতি, বিনিয়োগ নীতিমালা এমনকি মেধাস্বত্ব আইন পর্যন্ত মার্কিন মানদণ্ডে ঢেলে সাজানোর কথা বলা হয়েছে। এই ধরনের শর্ত বাস্তবায়নের অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, আইন ও প্রযুক্তি কাঠামো ধীরে ধীরে হয়ে উঠবে একটি ‘আমদানিকৃত কাঠামো’, যার ওপর দেশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। এর পরিণতি হবে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, নীতি-নির্ধারণে স্বাধীনতার অবসান এবং কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতির উপর একটি অদৃশ্য কিন্তু দৃঢ় বিদেশি নিয়ন্ত্রণ।
এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, এই তথাকথিত ‘চুক্তিপত্র’ আসলে একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক চয়েস’ চাপিয়ে দেওয়ার দলিল—যেখানে বিকল্প ভাবনার কোনো জায়গা নেই। এটি ‘করো বা মরো’ ধাঁচের একতরফা চাপ, যা একটি গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য মর্যাদাহানিকর এবং পরবর্তীতে আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে পরিণত হতে পারে। এমন এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উচিত হবে শুধু অর্থনীতিকেই নয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে সমান্তরালভাবে বিবেচনায় নিয়ে অতি সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কেননা, এখানকার প্রতিটি পদক্ষেপ ভবিষ্যতের স্বাধীনতার দিক নির্ধারণ করবে।
যদি বাংলাদেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, তাহলে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য নয়, তাদের শর্ত, আইন, নিয়ম, এমনকি চিন্তাভাবনাও আমদানি করতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক বাজার, প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো, কৃষি ও পরিবেশনীতি হয়ে পড়বে ‘ওয়াশিংটন-কেন্দ্রিক’ নিয়ন্ত্রণের আওতায়। বাংলাদেশের বাজার আমেরিকার জন্য উন্মুক্ত হবে, অথচ বাংলাদেশের স্বার্থ সেখানে গৌণ হয়ে পড়বে। এটি দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আত্মনির্ভরশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
সবচেয়ে দুঃখজনক দিক হলো, এই চুক্তির আলোচনার সঙ্গে দেশের নাগরিক, মিডিয়া, ব্যবসায়ী, এমনকি সংসদ বা রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সরকার এ ব্যাপারে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করছে, ফলে জনগণ জানতেই পারছে না আড়ালে আসলে কী ঘটছে। অথচ সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের মতামত এবং সংসদের অনুমোদন অপরিহার্য। এই গোপনীয়তা কেবল সন্দেহ বাড়ায় এবং প্রশ্ন তৈরি করে যে, কেন সরকার এই বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে চাইছে না?
একটি স্বাধীন গণমাধ্যম যখন জনগণকে তথ্য জানাতে চায়, তখন সেটিকে চাপে ফেলে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা সব সময় বাকস্বাধীনতার বুলি কপচায়, তারাই এখন তথ্য প্রকাশে ক্ষুব্ধ। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে তারা কি ‘ফ্রি স্পিচ’ কেবল তাদের সুবিধার জন্যই চায়? এই দ্বৈত নীতি তাদের নিজেদের মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই তথাকথিত ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত শর্তগুলো নিছক বাণিজ্যিক নয়—এগুলোর ভেতর লুকিয়ে আছে এমন ছয়টি স্পষ্ট ও গুরুতর হুমকি, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি এবং বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলতে পারে। এগুলোকে কোনোভাবেই সাধারণ ‘চুক্তির শর্ত’ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; বরং এটি একরকম আত্মবিক্রয়মূলক ম্যান্ডেট, যেটি স্বাক্ষর করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর একটি ভারী বোঝা চাপিয়ে দেওয়া।
১. সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ: চীনের পণ্য নিষিদ্ধকরণ এবং মার্কিন পণ্য বাধ্যতামূলক করা—এসব শর্ত দেশের পররাষ্ট্রনীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ধারণার পরিপন্থী এবং দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে সীমিত করে দেবে।
২. ডিজিটাল দাসত্ব: তথ্য-প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিতে চাওয়া শর্তগুলোর মাধ্যমে দেশের ডেটা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হবে। এটি কেবল দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা নয়, জাতীয় তথ্য ভাণ্ডারকেও ঝুঁকিতে ফেলবে।
৩. কৃষি ও স্বাস্থ্যখাত দখল: কৃষি, খাদ্য ও ওষুধে মার্কিন স্ট্যান্ডার্ড বাধ্যতামূলক করার ফলে দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হবে। স্থানীয় উৎপাদন ও গবেষণা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বাংলাদেশ বিদেশি পণ্যের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
৪. নিরাপত্তার নামে নজরদারি: লজিস্টিকস, শিপিং ও সাইবার আইন নিয়ে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তা নীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি দেশের প্রতিরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে, যা কোনো স্বাধীন দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
৫. শ্রমনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: শ্রমিক সংগঠন, মামলা প্রত্যাহার, ইপিজেডে ইউনিয়ন—এসব বিষয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রশ্ন, বিদেশি চাপ নয়। এই শর্তগুলো বাংলাদেশের শ্রম আইন এবং সামাজিক কাঠামোতে অযাচিত হস্তক্ষেপের শামিল।
৬. বিনিয়োগে একচেটিয়া আধিপত্য: মার্কিন কোম্পানিকে সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসা ও উদ্যোক্তারা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এটি স্থানীয় শিল্পের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করবে।
এই ছয়টি দিক স্পষ্টভাবে দেখায় যে, এই প্রস্তাবিত চুক্তি আদতে স্বাধীনতার শর্তে সমৃদ্ধি নয় বরং নির্ভরতার বিনিময়ে আত্মসমর্পণের আহ্বান। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ ও টেকসই রাখতে হলে এইসব শর্ত পর্যালোচনা না করে অন্ধভাবে গ্রহণ করা যাবে না। দরকার হলে বাণিজ্যিক ক্ষতির ঝুঁকি নেওয়া যাবে—কিন্তু রাষ্ট্রীয় আত্মসম্মান ও স্বাধীনতার বিনিময়ে নয়।
এই আসলে চুক্তি নয় বরং এক ধরনের ‘ডিল’। এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই ভূ-রাজনৈতিক চুক্তির শর্ত দেশের বর্তমান সরকার আদৌ সামাল দিতে পারবে কি? বাণিজ্য উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তাদের হাতে এই চুক্তি পরিচালনার পরিপূর্ণ ক্ষমতা নেই; বরং তারা যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলানোর চেষ্টায় আছেন মাত্র। সরকার বলছে, তারা আলোচনায় যাচ্ছে। কিন্তু আলোচনার টেবিলে ‘বিকল্প কণ্ঠ’ নেই, নেই বিরোধী দল, ব্যবসায়ী সমাজ, বা পেশাজীবীদের পরামর্শ। এমন একতরফা আলোচনা দেশের স্বার্থ রক্ষায় যথেষ্ট নাও হতে পারে।
বর্তমানে যেহেতু অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়, কাজেই তাদের এখন স্বচ্ছতার সঙ্গে নানামুখী ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রথমেই এই চুক্তি নিয়ে জাতীয় ঐক্য গঠনের চেষ্টা করতে হবে। এই চুক্তির বিরুদ্ধে বা পক্ষে জাতীয় পর্যায়ে একটি সর্বদলীয় আলোচনা, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজ নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ফোরাম তৈরি করতে হবে। এই ফোরামের মাধ্যমে একটি সম্মিলিত জাতীয় অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে, যা বিদেশি চাপ মোকাবিলায় দেশকে শক্তিশালী করবে।
মনে রাখতে হবে, সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস নয়। কোনো শর্তই গ্রহণযোগ্য নয় যা দেশের পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা বা আইন প্রণয়নে অন্য দেশের মতামতকে বাধ্যতামূলক করে।
একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনীতি জোরদার করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিধর রাষ্ট্র, ও জাতিসংঘের মাধ্যমে কূটনৈতিক চাপ প্রশমনের উদ্যোগ নিতে হবে। বহুপাক্ষিক ফোরামে এই বিষয়টি উত্থাপন করে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করা যেতে পারে।
পাশাপাশি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকতা হলো গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সত্য প্রকাশে বাধা দিলে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা আরও কমবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ কোনো ‘কোল্ড ওয়ার’ বা ‘প্রক্সি কনফ্লিক্ট’-এর ময়দানে নামেনি। দেশের অবস্থান গড়ে তুলতে হবে স্বাধীনতা ও স্বার্থের ভিত্তিতে, কারও প্রভাব বিস্তার বা চাপের মুখে নয়। বর্তমান চুক্তির খসড়া ‘ভয়’ দেখিয়ে স্বাক্ষর আদায়ের একটি অপচেষ্টা মাত্র। আমাদের উচিত হবে, চীন বা যুক্তরাষ্ট্র—কোনো পক্ষেই অন্ধভাবে যাওয়া নয়; বরং দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত এই চুক্তি, তাদের কথিত ‘অংশীদারত্ব’ নয়—এটি একপাক্ষিক ‘শর্তের খসড়া’। তাই এই চুক্তি যদি হয়, তাহলে সেটা হতে হবে সমতার ভিত্তিতে, সম্মানজনকভাবে এবং সর্বজনীন আলোচনার মাধ্যমে। অন্যথায়, এটি হবে আত্মবিক্রয়ের দলিল, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনোই মেনে নেবে না।