Published : 25 Apr 2026, 06:29 PM
নীতিনৈতিকতার কি কোনো দাম আছে? যে কাউকেই এই প্রশ্ন করলে একই সঙ্গে দুটি বিপরীত উত্তর পাওয়া যাবে। তা হলো, নীতিনৈতিকতা অত্যন্ত দামি, কিন্তু বাস্তবে আমাদের বর্তমান সমাজে এর কোনো দাম নেই। সমস্যা এখানেই—নীতিনৈতিকতার দামে এবং এর যোগানে।
অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো জিনিসের যত দামই হোক না কেন, বাজারে তার যোগান বাড়লে দাম কমতে বাধ্য। নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও এই কথাটি শতভাগ সত্য। আমাদের সমাজে নীতিনৈতিকতার যোগান কি তবে অনেক বেশি, যার ফলে এর দাম কমে এখন হতাশার কোঠায় নেমেছে? তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সমস্যা এই যে, আমরা নীতিনৈতিকতাকে বাজারের পণ্যের মতো মূল্যবান মনে করি। কারও কাছে এর মূল্য টয়োটা গাড়ির সমান, কারও কাছে রেফ্রিজারেটরের সমান, আবার কারও কাছে স্রেফ আলু-পটলের তুল্য। এসব পণ্যের মতো বেচারা নীতিনৈতিকতার যোগান বাড়লে দামও কমে যায়।
গোড়ায় গলদ হলো, আমরা নীতিনৈতিকতাকে বাজারের সাধারণ পণ্যের মতো দামি মনে করেছি। এবার কঠিন সত্যে আসি। নীতিনৈতিকতার কোনো জাগতিক মূল্য নেই এবং থাকতে পারে না। শুনে আশ্চর্য হওয়ার কারণ নেই। আমি-আপনিসহ সমস্ত জীবকুল প্রতি মুহূর্তে বাতাস থেকে যে অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকছি, তার কোনো বাজারি মূল্য নেই। থাকলে জগতের ১ শতাংশ লুণ্ঠনকারী ছাড়া আর কেউ বাঁচতে পারত না। নীতিনৈতিকতার স্বরূপ এই অক্সিজেনের চেয়েও গভীর। এগুলো জাগতিক অর্থে মূল্যহীন, ভ্যালুলেস। কারণ, আসলে এগুলো অমূল্য। এর গায়ে দামের লেবেল লাগিয়ে বাজারে তোলা যায় না; এগুলো কোনো পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে লেনদেনযোগ্য নয়।
আমরা যে নীতিনৈতিকতাকে খুব দাম দেই, তার মাঝেই লুকিয়ে আছে বাস্তবে তার মূল্যহীন হওয়ার করুণ পরিণতি। এই সমাজে আমরা প্রত্যেকেই খুব নৈতিক মানুষ! আজ পর্যন্ত কাউকে কি বলতে শুনেছেন যে তিনি একজন অসৎ, প্রতারক বা চোর? অথচ প্রতিদিন আমরা অগুনতি অসৎ মানুষের খবর পাই। কেউ নিজের দোষ স্বীকার করে না; বরং ছোটবড় নানা অন্যায় নিয়ে বেঁচে থাকলেও প্রত্যেকের গায়ে থাকে নৈতিকতার পোশাক আর মুখে মুখোশ। আমরা নৈতিকতাকে হাটে নিয়ে এসেছি এবং প্রতিযোগিতা করছি কে কত বেশি দামে তা বিক্রি করতে পারি। অর্থাৎ, নৈতিক আদর্শ বিসর্জনের বিনিময়ে ফায়দা হাসিল করছি। কেউ বিক্রি করছি টয়োটার দামে, কেউ আলুর দরে; বিক্রেতা হিসেবে যার যার ক্ষমতা অনুযায়ী। তবে বাজারে নীতিনৈতিকতার যোগান এত বেশি নয় যে দাম শূন্য হয়ে যাবে। কেন? বলছি।
তাও অর্থনীতির চাহিদা ও যোগানের নিয়মে। যদি যোগান এত বাড়ে যে বাজারে নীতিনৈতিকতা মূল্যহীন হয়ে যাবে, তখন যোগান এমনিতেই কমে যাবে। অনেকেই তখন নীতিনৈতিকতাকে আর বাজারি পণ্য করবে না, প্রয়োজনে মাটির নিচে পুঁতে সংরক্ষণ করবে। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট যেমন বলেছেন, সবাই যদি মিথ্যা কথা বলে, তখন কেউ কারও কথা বিশ্বাস করবে না, ফলে মিথ্যা কথা তার ফলপ্রসূতা তথা মূল্য হারাবে। স্পষ্টতই যারা মিথ্যা কথা বলে তারা সেটা চালিয়ে যেতে পারে কারণ সমাজে সবসময় কিছু মানুষ থাকেন যারা কখনও বা সচরাচর মিথ্যা বলেন না। একইভাবে যারা অন্যায়, দুর্নীতি ও অপরাধ করে বেড়ায় তারা তা করতে সক্ষম হয় কারণ সবসময় কিছু মানুষ থাকেন যারা অন্যায়, অপরাধ ও দুর্নীতি করেন না। কিছু লোক যে ট্রেনের টিকেট না কেটেই ভ্রমণ করতে পারে তার কারণ বেশিরভাগ মানুষ টিকেট কেটেই ট্রেনে চড়েন। অর্থাৎ, একদিক থেকে নীতিবান লোকেরাই সব দুর্নীতির জন্য দায়ী, কেননা তারাই দুর্নীতিবাজদের দাঁড়ানোর জন্য পা রাখতে নিজেদের কাঁধ এগিয়ে দেন। তারা কাঁধ সরিয়ে নিলে কেবল দুর্নীতিবাজ নয়, ভূমিকম্পের চেয়ে উচ্চ শব্দে পুরো সমাজটাই ধসে পড়বে। যেমন কেউ টিকেট না কাটলে সেদিন ট্রেনই চলবে না।
তাহলে নীতিনৈতিকতা কী? যা ট্রেনকে চালায়, একইরকমে সমাজকে চলমান রাখে। এটি কেনাবেচার বস্তু নয় অমূল্য। কিছু মানুষের কাছে তা জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান। সংখ্যায় যত কমই হোক, মাইলস্টোনের শিক্ষিকা মাহেরীনের মতো মানুষ সমাজে থাকেন বলেই সমাজ যেভাবেই হোক টিকে থাকে। সুসময়ে তাদের অনেককেই দেখা যায় না, বরং দুঃসময়েই আচমকা তাদের আবির্ভাব ঘটে। তারা সকলের ঊর্ধ্বে, তারাই বীর। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে যেমন বীরদের আবির্ভাব ঘটেছিল কোনো আর্থিক বিনিময়ের শর্ত ছাড়াই। বেতন দিয়ে কর্মচারী নিয়োগ করা যায়, মুক্তিযোদ্ধা বা নৈতিক বীরদের পাওয়া যায় না। তারা নৈতিকতা ধারণ করেন আপন সত্তার অংশ হিসেবে, পোশাক বা মুখোশ হিসেবে নয়। পোশাক বা মুখোশ খুলে ফেলা যায় বা বিনিময় করা যায়, অন্তর্গত সত্তার বিনিময় হয় না। মাহেরীন তাই মৃত্যুর আগে তার স্বামীর প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, “কিন্তু ওরাও তো আমার ছেলেমেয়ে।” তাদের নৈতিকচেতনা সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুরস্কার মাহেরীনদের যত না বড় করে, পুরস্কার নিজে তারচেয়ে বেশি বড় হয়।
সে কারণে যদি একজন মানুষের সব কেড়ে নেয়া হয়—পোষাক, ধনসম্পদ, ক্ষমতা, বংশপরিচয় ইত্যাদি, তবে শেষ পর্যন্ত যা তার নিজের হিসেবে থেকে যায় তা তার নৈতিকতা ও আদর্শ। যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। যার এই নীতি-আদর্শ যত বেশি থাকে তার মনুষ্যত্ব তত বেশি। যার এসব থাকবে না, সে জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হিউম্যান সত্তা বা হোমো সেপিয়েন্স, মানুষ নয়। কারণ মনুষ্যত্ব তথা ন্যূনতম নীতিনৈতিকতা ছাড়া কেউ ‘মানুষ’ হয় না। জনপ্রিয় আমেরিকান লেখক মার্ক ম্যানসন একেই বলেছেন হিউম্যানের সাবালক হওয়া, বাংলায় যাকে মানুষ হওয়া বলে। এর কারণ নীতিনৈতিকতা শিখতে ও অর্জন করতে হয়। নৈতিকতা নিয়ে কেউ ভূমিষ্ঠ হয় না। ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্রই কেউ কাঙ্ক্ষিত ‘মানুষ’ হয় না, সাধনা করে হতে হয়। কেউ হয়তো কৈশোরেই নৈতিকতা শেখে, কেউ আশিতেও শেখে না। যারা তা শিখতে ও অর্জন করতে পারে না, তারা অঢেল ধনসম্পদের ও পিলে চমকানো ক্ষমতার মালিক হয়েও জীবনের বৃহত্তম ব্যর্থতা নিয়ে পৃথিবীতে থেকে বিদায় হয়, যেহেতু তারা অমূল্য মনুষ্যত্বেরই ছোঁয়া পায় না।
কান্টের চিন্তা থেকে ধার করে ম্যানসন লিখেছেন যে, জীবনের বেশিরভাগ ভালো জিনিসগুলোই বিনিময়যোগ্য নয়, অর্থাৎ বাজারে তোলার জিনিস নয়, তা নিঃশর্ত। যা ভালো তা ভালো বলেই ভালো। মানুষকে সঠিক বা ন্যায্য কাজটি করতে হয়, কাজটি থেকে লাভবান হওয়ার জন্য নয়, যেহেতু তা সঠিক বা ন্যায্য সেজন্য, শর্তহীনভাবে। অর্থাৎ কান্টের নীতি অনুযায়ী, মনুষ্যত্ব নিজেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, অন্য কিছু হাসিল করার উপায় নয়।
গ্রিক দার্শনক জেনো ও তার অনুসারীদের মতে, “যুক্তি হচ্ছে খোলস, বস্তুবিদ্যা হচ্ছে ডিমের সাদা অংশ আর নৈতিকতা হলো তার কুসুম।” তাদের অন্য তুলনায়, “যুক্তি হচ্ছে মাঠের চারদিকের দেয়াল, বস্তুবিদ্যা হচ্ছে মাঠের ভিতরের গাছপালা আর নৈতিকতা হলো ফুলফল।” (পিটার অ্যাডামসন, আ হিস্টোরি অব ফিলোসোফি উইদাউট এনি গ্যাপস: ফিলোসোফি ইন দ্য হেলেনিস্টিক অ্যান্ড রোমান ওয়ার্ল্ডস, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস)
অন্যদিকে আমাদের বর্তমান সমাজে নীতিনৈতিকতা হচ্ছে খোলস, আর তা ক্রমে ক্রমে খসে পড়ছে। যদিও সমাজ কখনো পূর্ণ অনৈতিক হতে পারে না কারণ কিছু মানুষ থাকেনই যারা জীবনের মতো অমূল্য ও নিঃশর্ত বিবেচনায় নৈতিকতা আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকেন, দুর্বলভাবে নয়, বীরের মতো। তারা দরিদ্র গ্রিক দার্শনিক ডায়োজিনিসের মতো, যিনি বীর আলেকজান্ডার তার জন্য কী করতে পারেন জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন, “আপনি আমার জন্য রোদটুকু ছেড়ে দাঁড়াতে পারেন।”