Published : 05 Apr 2026, 12:09 PM
“তৈল যে কি পদার্থ, তাহা সংস্কৃত কবিরা কতক বুঝিয়াছিলেন।” এই তেল অবশ্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের সেই তেল নয়; তবুও আমি ইহার মহিমা ‘কতক বুঝিলাম’।
ঈদের পর গ্রামের বাড়ি থেকে এসে নেব-নিচ্ছি করতে করতেই তেলের কাঁটাটা একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকলো। ভাবছিলাম ছুটির দিনে একটু সুযোগ বুঝে তেলটা নেব। সে কারণেই এই বিলম্ব। আর সেই বিলম্বের মাসুল দিতে হলো সাড়ে ১১ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে। রাতের ঢাকার ব্যস্ততা দেখলাম, ভোর দেখা হলো, এমনকি সকালও কিছুটা পেরোনোর পর পাম্পের ভেতরে ঢোকার সুযোগ হলো। কিন্তু ছোট গাড়ির জন্য পরিমাণ বেঁধে দেওয়া হয়েছে; সর্বোচ্চ দেড় হাজার টাকার তেল নেওয়া যাবে। অর্থাৎ সাড়ে ১১ ঘণ্টা অপেক্ষার পর সাড়ে ১২ লিটার তেল প্রাপ্তি ঘটল।
সাধারণত ৮ ঘণ্টায় এক কর্মদিসবস হিসাব করা হয়। সেখানে সাড়ে ১২ লিটার তেলের জন্য এক কর্মদিবসের চেয়েও বেশি সময় কাটিয়ে ফেললাম। হায় তেল, হায় যুদ্ধ!
মহাখালীর অফিসে থাকার সময় এদিক-ওদিক খোঁজ লাগিয়ে জানলাম তেল দেওয়া হচ্ছে কেবল বিজয় সরণির ট্রাস্ট পাম্পে। বিকেল ৫টায় ট্রাস্ট পাম্পের লাইনে দাঁড়ানো একজনের ফোন নম্বর পাওয়া গেল। রাত সাড়ে ৮টায় ফোন করে জানলাম তিনি তখনো জাহাঙ্গীর গেট অতিক্রম করেননি; সামনে অন্তত তিনশ গাড়ি। মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। কিন্তু উপায় নেই। বউকে জানিয়ে দিলাম রাতে আর আসছি না। যথারীতি বউ জানতে চাইল, “কার সাথে কোথায় যাচ্ছি?” ছুটির রাত বলে কথা! বললাম তেলের লাইনে দাঁড়াচ্ছি, চাইলে সে আসতে পারে। বউ ‘গুডনাইট’ বলে বিদায় জানাল।
এরপর যোগাড়যন্ত্রের পালা। অফিসের সামনের বাদাম বিক্রেতা কবীরের কাছ থেকে ৫০ টাকার বাদাম, সামনের দোকানগুলো থেকে ৬ প্যাকেট লেক্সাস বিস্কুট, দুটো রুটি, এক হালি কলা আর দুই লিটারের পানির বোতল ভরে সৃষ্টিকর্তার নাম নিয়ে রওনা দিলাম। কোথায় ট্রাস্ট পাম্প! মহাখালী রেলগেট পার হতেই দেখি গাড়ির সারি। জানালা দিয়ে মাথা বের করতেই সামনের গাড়ির ড্রাইভার ভাইটি বললেন, “হ হ ভাই, ত্যালের লাইন। নিলে খাড়ায়া পড়েন।” আর যাওয়ার উপায় নেই, আমিও ‘খাড়ায়া’ পড়লাম। তখন রাত ঠিক ৯টা বাজে।
এরপর শুরু হলো অপেক্ষার প্রহর। আধঘণ্টার মধ্যে গাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল মশক বাহিনী। না বসা যায় গাড়ির ভেতর, না বাইরে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়। চৈত্রের চিটচিটে গরমে গাড়িচালকেরা অনেকেই প্যান্ট ছেড়ে লুঙ্গি পরে স্টিয়ারিংয়ে বসেছেন। আমার সামনের টয়োটা প্রিমিও গাড়ির চালক পারভেজ জানালেন, তারা এসেছেন তাদের কোম্পানিরই দুই কর্মকর্তার দুটো গাড়ি নিয়ে; সাথে তিনজন চালক। যাতে তারা অদল-বদল করে অন্তত বাথরুমটা সারতে যেতে পারেন। আর পেছনে ছিল একটি হুন্দাই এইচ-ওয়ান মাইক্রোবাস। এর চালক বেশ বয়োজ্যেষ্ঠ ও চুপচাপ। সবার সঙ্গেই গল্প হচ্ছিল। তাদের আমি বাদাম-বিস্কুট দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে সামনের গাড়ির চালক কোত্থেকে যেন এক ঠোঙা ঘটিগরম চানাচুর নিয়ে এলেন। মশা আর ধুলোবালির সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এপাশ-ওপাশের চালকদের সঙ্গে গল্প করেই সময় কাটছিল।
রাত যখন ৩টা, তখনো জাহাঙ্গীর গেট পার হতে পারিনি। একপর্যায়ে সামনের গাড়ির চালকদের হাওলায় গাড়ি ছেড়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। একটু সামনে থেকেই শুরু হয়েছে মোটরসাইকেলের সারি। বাইকারদের কেউ এসেছেন দল ধরে। ধুমসে আড্ডা চলছে, দফায় দফায় চলছে চা-সিগারেট। মোটরসাইকেলের খালি ট্যাংকিতে বাজনা তুলে গানও জুড়ে দিয়েছেন একজন। ভোরের মৃদু-মন্দ হাওয়াও বইছে বেশ।

বাইকারদের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আরেকটু সামনে গিয়ে পাওয়া গেল ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের সারি। তাদের পাশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সামনের ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে পৌঁছালাম ট্রাস্ট পাম্পের সামনে। যথারীতি হইচই চলছে। হ্যান্ডমাইক হাতে পাম্পের একজন কর্মকর্তা হইচই থামানোর চেষ্টা করছেন। বারবার বলছেন, “যার যার গাড়িতে ফেরত যান। এখানে গ্যাঞ্জাম কইরা কোনো লাভ নাই, এইটা সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠান।” একপর্যায়ে তিনি জয়ী হলেন; বাইকাররা যার যার বাইকে ফিরে এল।
এদের একজন জানালেন, তারা ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু ওপাশ থেকে কিছু মোটরসাইকেল চালককে লাইনে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরে অবশ্য বিষয়টার সত্যতাও পাওয়া গেল—সেটা আসছে পরে।
ট্রাস্ট পাম্পের ছয়টি ফুয়েল ডিসপেন্সারের ১২টি নজেলের মধ্যে একটিতে কার-জিপ-মাইক্রোবাস, একটিতে মোটরসাইকেল আর একটিতে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-পিকআপে ডিজেল দেওয়া হচ্ছিল। বাকি নয়টি নজেলের মধ্যে দুটি নিয়োজিত ছিল ‘ভিআইপি’দের জন্য। পাম্পে ঢোকার মুখেই লেখা রয়েছে সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যদের জন্য আলাদা লাইন। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা এক্সিটওয়ে দিয়ে ঢুকেই তেল নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। আর সেনা কর্মকর্তা বা সদস্য মোটরসাইকেল চালকদেরও সামনে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। যখনই মোটরসাইকেলের লাইনে কাউকে সামনে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখনই পেছন থেকে হইচই শুরু করছিলেন মোটরসাইকেল চালকেরা।
গভীর রাতে পাম্পে তিনজন মাত্র নজেলম্যান কাজ করছিলেন। আর বাকি কয়েকজন ছিলেন নিরাপত্তার দায়িত্বে। পাম্পটিতে মোটরসাইকেল ৬০০ টাকা, কার ১৫০০ টাকা, মাইক্রোবাস/এসইউভি (ঘ-সিরিয়াল) ২০০০ টাকার আর প্রাডো, পাজেরো বা কোস্টার ২০ লিটার করে তেল পাচ্ছিল। এর বাইরেও পাম্পের করপোরেট গ্রাহক যারা স্লিপ নিয়ে আসছিলেন, তাদের গাড়িতে ২০ লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছিল।
পাম্পের নজেলম্যান নাঈমের সঙ্গে আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে দেখা গেল, একেকটি গাড়িতে গড়ে সাড়ে ৪ মিনিট করে সময় লাগছে। অনেকে কার্ডে টাকা পরিশোধ করছিলেন, তাতে সময় আরও বেশি লাগছিল; আর স্লিপ নিয়ে আসা গ্রাহকেরা স্লিপ লিখতে আরও বেশি সময় নিচ্ছিলেন। তেল নিতে এসে প্রায় সব গাড়িচালকই কিছু বাড়তি তেল দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছিলেন নজেলম্যানকে। কেউ অনুনয় করছিলেন, কেউ হাত ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন, ঘুষের প্রস্তাবও দিচ্ছিলেন অনেকে, কেউ আবার রাগ করে গালিগালাজ করছিলেন।
বাড়তি তেলের জন্য অনুরোধ ও অনুনয় করে কেউ কেউ নজেলের সামনে থেকে গাড়িই সরাচ্ছিলেন না। যার কারণে সময় লাগছিল আরও বেশি। তেল না পেয়ে গজরাতে গজরাতে পাম্প ছাড়তে দেখা গেল অনেক চালককেই।
‘জরুরি ওষুধ’ লেখা একটি মাইক্রোবাস এসে দাঁড়ানোর পর মোটে ২০ লিটার তেল পাবেন শুনেই চালক রেগে গেলেন। “১১ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর মোটে ২০ লিটার!”—বারবার আউড়াচ্ছিলেন আর ধমক দিচ্ছিলেন তিনি। নজেল অপারেটর তাকে তেল দেওয়া বন্ধ করে দিলে তিনি আরও রেগে যান। শুরু হয় হইচই। হাতাহাতি শুরুর আগে নিরাপত্তাকর্মীরা ছুটে এসে তাকে একপাশে সরিয়ে দেন।

পাম্পের বের হওয়ার মুখে সেনা কর্মকর্তাদের গাড়ির সারি। অল্প কয়েকটি গাড়ি, তবুও সেখানে দুই লাইন করে রেখেছেন অনেকে। পাম্পের নিরাপত্তা কর্মকর্তা হ্যান্ডমাইকে বারবার বলছিলেন, “অফিসার স্যাররা কেউ দুই লাইন করবেন না। এক লাইনে আসেন।”
সেনা কর্মকর্তাদের লাইনে অনেক সরকারি সংস্থা ও সরকারি কর্মকর্তার গাড়ি ঢুকে পড়ছিল। তাদেরও তেল না দিয়ে লাইন থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছিল।
রাত ৩টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের একটি পাজেরো জিপ আসে সেনা কর্মকর্তাদের লাইনে। পাম্পের নিরাপত্তাকর্মী, যিনি সেনা কর্মকর্তাদের পরিচয় যাচাই করছিলেন, তিনি নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে এসে জানালেন ফায়ার সার্ভিসের জিপে কোনো ‘অফিসার’ নেই। তৎক্ষণাৎ জিপটিকে লাইনের বাইরে যেতে বলা হয়। প্রায় ৪০ মিনিট পর সেনা কর্মকর্তাদের ভিড় কমে গেলে ফায়ার সার্ভিসের চালক তেল পেলেন। তবে মোটে ২০ লিটার তেল নিতে তিনি আপত্তি জানালে এ নিয়ে সেখানে আরেক দফা হইচই তৈরি হয়। পাম্পের নিরাপত্তা কর্মকর্তার সোজাসাপ্টা জবাব, “না পোষালে চলে যান। আমাদের এটাই বলা হয়েছে, সবাইকেই এটা দেওয়া হচ্ছে।”
লাশবাহী গাড়ি, বাড়ি বদলের জিনিসপত্রসহ কয়েকটি পিকআপকে ‘ভিআইপি’ সার্ভিসে তেল দেওয়া হলো।
ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের জন্য রয়েছে পৃথক লাইন। তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডের কয়েকজন নেতাগোছের ব্যক্তি এই লাইনের শৃঙ্খলা রক্ষা করছেন। এখানেও লাইন ভেঙে কোনো কোনো গাড়িকে সামনে এগিয়ে দেওয়া নিয়ে হইচই হলো। তাদের যুক্তি—যাদের গাড়িতে জরুরি মাল, তাদের কয়েকজনকে এগিয়ে দিতে হচ্ছে; না হলে তারা সকালের আগে ঢাকা ছাড়তে পারবেন না।
চোখের সামনে যেন লাইভ নাটক দেখছি। বাইকার তরুণেরা মাঝেমধ্যেই হইচই করছেন। একজন ‘অ্যাংরি ইয়াংম্যান’ কিছুক্ষণ পরপর অন্যদের গিয়ে উস্কানোর চেষ্টা করছেন; “সবাই কী হাতে চুড়ি পরে আছেন?”—এমন কথাও বললেন কয়েকবার। তার এলাকার পাম্প হলে ‘দেখিয়ে দিতেন’—এমন হম্বিতম্বিও করলেন কতক্ষণ। এর মধ্যেই ছয় বছরের মেয়েসহ তেল নিতে আসা এক বাইকারকে একেবারে সামনে সুযোগ করে দিলেন অন্য বাইকাররা। কৃতজ্ঞতায় যেন নুয়ে পড়লেন সেই ‘বাবা’ বাইকার।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আবারও গেলাম নিজের গাড়ির কাছে। কিছুক্ষণ রাস্তায় হাঁটা আর কিছুক্ষণ গাড়িতে বসে ঝিমানো; মশার কামড়ে আবার রাস্তায় নেমে আসা—এভাবেই কাটছিল সময়। ভোরের আলো ফুটল, স্ট্রিট লাইটগুলোও বন্ধ হয়ে এল। তবুও পাম্পের দেখা নেই। সকাল ৮টার দিকে গাড়িসহ পাম্পের ত্রিসীমানায় আসতে পারলাম।
মোটরসাইকেলের লাইনে তখন উদযাপনের পালা। যারা তেল পাচ্ছিলেন, তারা রীতিমতো চিৎকার করে উদযাপন করছিলেন। একজন বলছিলেন, “ভাই, মার্কিন দেশের ভিসা পাইলে মানুষ মনে হয় এরম খুশি হয়, এখন যেমন খুশি লাগতেছে।” হায় তেল, হায় যুদ্ধ! সাড়ে ১২ লিটার তেলের জন্য জীবন থেকে চলে গেল সাড়ে ১১ ঘণ্টা। তবুও মানুষের মুখে যে তৃপ্তির হাসি, তা যেন অকল্পনীয়।