Published : 23 May 2026, 01:21 PM
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যঙ্গ থেকে জন্ম নেওয়া ভারতের ককরোচ জনতা পার্টি সংক্ষেপে সিজেপি ক্ষমতাসীন বিজেপির ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক উন্মুক্ত শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশটির যুবসমাজের একটি অংশকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন। সেখানে তিনি বলেন, “কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো জীবনযাপন করে, যাদের কোনো কাজকর্ম নেই, চাকরিবাকরি জোটে না। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা হঠাৎ করে সাংবাদিক সেজে সবাইকে আক্রমণ করা শুরু করে।”
প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্যের জেরে তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লেখেন, “সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে চলে আসে, তখন কী হবে?” ওই সূত্র ধরে ১৬ মে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের সঙ্গে মিল রেখে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়।
২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা বিজেপিকে ব্যঙ্গ করেই যে এই পার্টির নাম রাখা হয়েছে, তা বলা বাহুল্য। ক্ষমতাসীন এই দলটির বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠক ও সমালোচকেরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ, নাগরিক অধিকার হরণ এবং সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দেওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। যদিও বিজেপি সব সময় এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্রধান বিচারপতি অবশ্য তাড়াহুড়ো করে তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, ভারতের তরুণ সমাজকে নয়, বরং ‘ভুয়া ও বোগাস ডিগ্রিধারী’ মানুষদের উদ্দেশ্য করেই এই মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে; ঘটতে শুরু করেছে এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
অনলাইন কাঁপাচ্ছে তেলাপোকা পার্টি
মাত্র ৫ দিনের মধ্যে ইনস্টাগ্রামে এই পার্টির অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ২০ মিলিয়নে পৌঁছে গেছে। প্রতি মিনিটে হু হু করে বাড়ছে ফলোয়ার। এ নিয়ে অনলাইনে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট হাইপ। এর মধ্যেই প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিজেপি ও কংগ্রেসের ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা (যথাক্রমে ৮.৮ ও ১৩.৩ মিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে তেলাপোকাদের নতুন এই পার্টি।
তরুণদের এই সংঘবদ্ধতায় সরকার খানিকটা ভয় পেয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। প্রমাণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বৃহস্পতিবার সকালে বিজেপি সরকারের আইটি সেল মেটার সহযোগিতা নিয়ে ককরোচ পার্টির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ব্যান করে দিয়েছিল। এরপর শুরু হয় তীব্র জনরোষ। ফলে চাপে পড়ে সেই অ্যাকাউন্ট আবার ফেরত দেওয়া হয়েছে।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, সিজেপি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়; বরং রাজনৈতিক ব্যঙ্গকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক অনলাইন আন্দোলন। যে কেউ এই আন্দোলনে যোগ দিতে পারে, তবে মানতে হবে কয়েকটি শর্ত। শর্তগুলোও বেশ মজার। আবেদনকারীকে অবশ্যই বেকার হতে হবে, অলস হতে হবে, সার্বক্ষণিক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট হতে হবে (দিনে কমপক্ষে ১১ ঘণ্টা) এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশে পারদর্শী হতে হবে।
তবে ‘তেলাপোকা পার্টি’ যে নিছক রসিকতা নয়, সেটি তাদের ইশতেহারের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। সম্প্রতি প্রকাশিত ৫ দফা ইশতেহারে বলা হয়েছে:
১. আসন সংখ্যা না বাড়িয়েই সংসদে নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন নিশ্চিত করতে হবে।
২. দলবদলকারী বিধায়ক ও সাংসদদের আগামী ২০ বছর নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করতে হবে।
৩. অবসর গ্রহণের পর কোনো বিচারপতি রাজ্যসভায় যোগ দিতে পারবেন না।
৪. বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়লে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
৫. গোদি মিডিয়ার সব উপস্থাপকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
ভারতে অনেকের ধারণা, দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রশংসায় ব্যস্ত থাকে। তাই এসব গণমাধ্যমকে ব্যঙ্গ করে ‘গোদি মিডিয়া’ বলা হয়।
কে এই অভিজিৎ দীপকে?
গোটা উদ্যোগের পেছনে কাজ করেছে অভিজিৎ দীপকে নামের এক তরুণের ক্ষোভ। তিনি রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে দক্ষ এবং বর্তমানে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে তিনি আম আদমি পার্টির (আপ) সঙ্গে কাজ করেছেন। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই দলটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচনে তারা বিজেপির কাছে দিল্লির ক্ষমতা হারালেও পাঞ্জাবের ক্ষমতা এখনো তাদের হাতে। দিল্লির নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলটির উপপ্রধান রাঘব চাড্ডা আরও কয়েকজন বিধায়ককে নিয়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এরই মধ্যে অভিজিৎ দীপকেকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ইশতেহারের দ্বিতীয় দফায় কেউ কেউ রাঘব চাড্ডাকে ইঙ্গিত করার কথা বলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অন্তত কয়েক শ ভিডিওতে অভিজিৎকে ‘ডিপ স্টেটের এজেন্ট’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, এর পেছনে রয়েছে বিজেপিবিরোধী শক্তির হাত।
তবে অভিজিৎ বিবিসিকে জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি প্রথমে নিছক মজা হিসেবেই শুরু হয়েছিল। “আমি ভেবেছিলাম, সবাইকে একত্র করা যাক। হয়তো একটা প্ল্যাটফর্ম শুরু করা যায়। এরপর যা ঘটল, তা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল।” কয়েক দিনের মধ্যেই গুগল ফর্মের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ সদস্যপদের জন্য আবেদন করে। শুরু হয় #MainBhiCockroach (আমিও তেলাপোকা) হ্যাশট্যাগ।
তেলাপোকা পার্টি এখন আলোচনার কেন্দ্রে
অনলাইনে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনীতিবিদরাও এই পার্টির কার্যক্রমে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছেন; বিশেষ করে বিরোধী নেতারা। তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ এবং প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ এতে সমর্থন জানিয়েছেন। বুধবার শীর্ষ বিরোধী নেতা অখিলেশ যাদব এক্সে লিখেছেন: “বিজেপি বনাম সিজেপি।”
অনলাইন আলোচনার পাশাপাশি বাস্তব জীবনেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তরুণ স্বেচ্ছাসেবকেরা তেলাপোকার মতো পোশাক পরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। তারা অপমানসূচক উপাধিটিকে নাটকীয়ভাবে নিজেদের পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সমর্থকদের কাছে সিজেপি যেন “তাজা বাতাসের ঝলক”।
ইদানীং ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত এবং সেখানে ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে ইনস্টাগ্রামের মন্তব্য ঘরে অনেকে এই দলকে ‘প্রজন্মের ক্লান্তির প্রতীক’ হিসেবে দেখছেন। অনেক তরুণ বলছেন, তারা সারাক্ষণ রাজনীতির মধ্যে থাকলেও নিজেদের প্রতিনিধিত্ব অনুভব করেন না। ভারতের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ৩০ বছরের নিচে, অথচ আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ মাত্র ১১ শতাংশ। সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২৯ শতাংশ তরুণ রাজনীতিতে সম্পূর্ণ অনাগ্রহী।
একই কথা অভিজিৎ দীপকের কণ্ঠেও শোনা যায়: “মানুষ হতাশ, কারণ তারা মনে করে তাদের কথা কেউ শুনছে না, তাদের প্রতিনিধিত্ব করা হচ্ছে না।” তবে বিজেপিপন্থী সমালোচকেরা এটিকে বিরোধীদের ‘ডিজিটাল নাটক’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। তারা দীপকের আম আদমি পার্টির সঙ্গে আগের সংযোগের কথা উল্লেখ করে এটিকে ‘সুচিন্তিত অনলাইন রাজনীতি’ বলে অভিহিত করেছেন।
ভারতে জেন-জি আন্দোলনের ইঙ্গিত?
নিছক মজা থেকে শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ যে বেশ সিরিয়াস দিকে মোড় নিচ্ছে, সেটা স্পষ্ট। পার্টির জনসম্পৃক্ততার গতি ও ব্যাপকতা অনেককেই বিস্মিত করেছে। যদিও এখনো এমন কোনো প্রমাণ নেই যে এটি ভারতের মাঠের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলন সরকার পতনের কারণ হয়েছে; শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশে চাকরি, মূল্যবৃদ্ধি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষোভ থেকেই এসব ঘটেছে। ভারতে এখনো তেমন কিছু ঘটেনি, কিন্তু অন্তর্নিহিত চাপগুলো একই রকম। ফলে সম্ভাবনাকে একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি সত্ত্বেও চাকরি, বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভারতে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে রুপির দাম রেকর্ড পরিমাণে কমেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী বছরজুড়ে কৃচ্ছ্রসাধনের ওপর জোর দিয়েছেন। অনেক তরুণের কাছে এখন শুধু পড়াশোনা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
তবে অভিজিৎ নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো অস্থিরতার সঙ্গে ভারতের তুলনা মানতে নারাজ। তিনি বিবিসিকে বলেছেন, তরুণদের হতাশা বাস্তব, সমস্যা হলো এসব হতাশা এলোমেলোভাবে অনলাইনে প্রকাশ পাচ্ছে। তার মতে, “জেন-জিরা দেশের পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছে এবং তারা নিজেদের ভাষায় নিজেদের রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি করতে চায়। ফলে তারা তরুণদের এমন এক আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে, যারা ‘সব ঠিক আছে’ বলে ভান করতে করতে ক্লান্ত।”
তবে ইনস্টাগ্রামের মন্তব্য ঘরে কেউ কেউ তেলাপোকাকে প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়াকে অর্থবহ বলে মনে করছেন। তেলাপোকা বীরের প্রতীক নয়; বরং টিকে থাকার প্রতীক। এরা সহনশীল, অভিযোজনক্ষম এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কম প্রত্যাশা নিয়ে বেঁচে থাকতে সক্ষম।
পৃথিবীতে রাজনীতি ও হাস্যরসের মিশ্রণ নতুন কিছু নয়। ইতালিতে কৌতুকাভিনেতা বেপ্পে গ্রিলো ব্যঙ্গধর্মী রাজনীতির মাধ্যমে ‘ফাইভ স্টার মুভমেন্ট’ গড়ে তুলেছিলেন। ইউক্রেইনে ভলোদিমির জেলেনস্কি টিভিতে কাল্পনিক প্রেসিডেন্টের চরিত্রে অভিনয় করতে করতেই সত্যিকারের প্রেসিডেন্ট হয়ে যান। সম্প্রতি নেপালের কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহও ছিলেন স্টেজের জনপ্রিয় রকস্টার।
পৃথিবীতে রাজনীতি ও হাস্যরসের মিশ্রণ নতুন কিছু নয়। ইতালিতে কৌতুকাভিনেতা বেপ্পে গ্রিলো ব্যঙ্গধর্মী রাজনীতির মাধ্যমে ফাইভ স্টার মুভমেন্ট গড়ে তুলেছিলেন। ইউক্রেনে ভলোদিমির জেলেনস্কি টিভিতে কাল্পনিক প্রেসিডেন্টের চরিত্রে অভিনয় করতে করতেই সত্যিকারের প্রেসিডেন্ট হয়ে যান। সম্প্রতি নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহও ছিলেন স্টেজে জনপ্রিয় রকস্টার।
ফলে তেলাপোকা দিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে চোখ না রেখে উপায় কী?