Published : 07 Apr 2026, 01:05 PM
বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতায় যখন জ্বালানি বাজার টালমাটাল, তখন বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য প্রতি লিটার তেল আর প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সাশ্রয় করাটা শুধু বিলাসিতা নয়; দীর্ঘদিন টিকে থাকার লড়াইও। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আর সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রথাগত পথে হেঁটে সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সময়ের দাবি হলো সাহসী ও বাস্তবসম্মত কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন। প্রতিদিন অফিসের কয়েক ঘণ্টা সময় কমিয়ে কি বিশাল এই ঘাটতি মেটানো সম্ভব, নাকি সাপ্তাহিক ছুটিতে একটি বাড়তি দিন যোগ করলে মিলবে আরও কার্যকর সমাধান?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর যে যে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, তা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে এবং বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে তার আঘাত এসে পড়ে সরাসরি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশের মোট অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশ, এলএনজির ৬৫ শতাংশ এবং এলপিজির ৫১ শতাংশই এসেছে ওই অঞ্চল থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর এই নির্ভরশীলতার মাত্রা বুঝলেই অনুভব করা যায়, সামনে কতটা কঠিন পথ পড়ে আছে।
চলমান সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠে গেছে। একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার পূর্বাভাস, ২০২৬ সালজুড়ে যদি তেলের দাম ১০০ ডলারের বেশি থাকে, তাহলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। দেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের মোট জ্বালানির ৯৫ শতাংশই আসে বিদেশ থেকে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার অফিস ও বাজারের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনেছে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সরকারি কার্যালয় খোলা থাকবে, ব্যাংক লেনদেন চলবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত এবং দোকানপাট ও শপিং মল সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই বন্ধ করতে হবে।
পদক্ষেপটি নিশ্চয়ই দরকারি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কেবল এটুকুই কি যথেষ্ট? সংখ্যা দিয়েই বিষয়টি বোঝা যাক। ঢাকার একটি বড় বিপণিবিতানের গড় বিদ্যুৎ লোড ধরা যাক ৮ মেগাওয়াট। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা আগে বন্ধ হলে সাশ্রয় হয় ১৬ মেগাওয়াট ঘণ্টা। কিন্তু সপ্তাহে একটি পূর্ণ বন্ধের দিন দিলে একই মার্কেটে একদিনে সাশ্রয় হয় ৯ ঘণ্টা গুণ ৮ মেগাওয়াট, অর্থাৎ ৭২ মেগাওয়াট ঘণ্টা। শুধু একটি মার্কেটের হিসাবেই সাপ্তাহিক বাড়তি একটি ছুটি প্রতিদিন দুই ঘণ্টা কমানোর চেয়ে সাড়ে চারগুণ বেশি বিদ্যুৎ বাঁচিয়ে দেয়। ঢাকায় বড় বিপণিবিতানের সংখ্যা অন্তত ৩০। শুধু এই হিসাবেই প্রতিটি বন্ধের দিনে ঢাকায় বাঁচতে পারে ২,১৬০ মেগাওয়াট ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ। সারাদেশের ছোট-বড় বাজার মিলিয়ে এই পরিমাণ আরও কয়েকগুণ হবে।
এপ্রিল থেকে জুন— মাত্র এই তিন মাসের জন্য সাপ্তাহিক ছুটি একদিন বাড়ানো হলে মিলবে ১২টি বাড়তি বন্ধের দিন। বিপণিবিতান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, কলকারখানার যাতায়াত এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবহার একসঙ্গে কমলে সামগ্রিক সাশ্রয়ের চিত্রটি অনেক বড় হবে। উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর পর এক মাসে ১১টি জাহাজে ৩ লাখ ২৭ হাজার টনের বেশি জ্বালানি আমদানি হলেও নির্ধারিত আটটি জাহাজ বন্দরেই পৌঁছাতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে যা মজুত আছে, তা সাবধানে ব্যবহার করার বিকল্প নেই।
তুলনার জন্য বেশিদূর যেতে হয় না। শ্রীলঙ্কা জ্বালানি সংকটে সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন থেকে তিন দিনে নিয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তান মন্ত্রী-এমপিদের বেতনে কাটছাঁট এবং হোম অফিস চালুসহ কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। এই দেশগুলো শুধু সময়সূচি সংকোচনে সীমাবদ্ধ থাকেনি, কাঠামোগত পরিবর্তনও ঘটিয়েছে।
এখানে একটি প্রশ্ন এসে পড়ে স্বাভাবিকভাবেই—ছুটি বাড়লে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা কমবে না তো? উত্তরটা বরং উল্টো। একটি পূর্ণ বিশ্রামের দিন পেলে কর্মী পরিবারকে সময় দিতে পারেন এবং মাথা ঠান্ডা করে পরের দিন কাজে ফেরেন। অথচ প্রতিদিন মাত্র এক ঘণ্টা কম কাজ করলে যাতায়াতের ধকল বিন্দুমাত্র কমে না, বরং তাড়াহুড়ার বাড়তি চাপ তৈরি হয়। তাছাড়া জাতীয় সংকটের সময় মানুষ কিছু সুবিধা ছেড়ে দিতে রাজি থাকেন, যদি সামনে স্পষ্ট একটি কারণ থাকে। বাড়তি ছুটির দিনটি তখন কর্মীকে বলে, ‘তোমার এই সাশ্রয় দেশের কাজে লাগছে’। এই অনুভূতিটুকুই অনুপ্রেরণার বড় উৎস হয়।
তাহলে ছুটির দিনে জরুরি আর্থিক লেনদেন কীভাবে সচল থাকবে? উদ্বেগটা বাস্তব, তবে সমাধানও বাস্তবিক। ছুটির আগের সন্ধ্যায় সব এটিএম বুথে পর্যাপ্ত নগদ টাকা লোড করা থাকলে মানুষকে শাখায় যেতে হবে না। পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা সচল রাখলে লেনদেন নিরবচ্ছিন্ন থাকবে। ব্যাংক শাখা বন্ধ রেখেও ডিজিটাল সেবা চালু রাখলে মানুষের ভোগান্তি এড়ানো সম্ভব। এই একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে ছুটি বাড়ানোর পথে সবচেয়ে বড় আপত্তিটাও আর থাকে না।
সরকারি কার্যালয়ের ক্ষেত্রে আরেকটি কথা বলা দরকার। প্রতিদিন জেলা থেকে উপজেলায় কিংবা বিভাগ থেকে জেলায় কত কর্মকর্তা কেবল বৈঠকে যোগ দিতে কতটা পথ পাড়ি দিচ্ছেন? একটি সরকারি গাড়ির ট্যাংক ভরাতে এখন কত খরচ, তা আমরা সবাই কমবেশি জানি। একটি অনলাইন বৈঠক সেই পুরো খরচ বাঁচিয়ে দিতে পারে নিমেষে। মহামারির সময় প্রমাণ হয়েছিল, ভার্চুয়াল বৈঠক সম্ভব এবং কার্যকরও। সেই অভিজ্ঞতাকে এখন কাজে লাগানোর সুযোগ এসেছে।
উৎসব ও অনুষ্ঠানের আলোকসজ্জার বিষয়টিও ভাবনায় রাখা দরকার। সংকটের এই সময়ে বিয়েসহ যেকোনো অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত আলোক ব্যবহার কমিয়ে আনা একটি সামাজিক দায়িত্বের জায়গা। এলইডি বাতিতে ব্যক্তিগত বিল কম হলেও পুরো গ্রিডের ওপর সমন্বিত চাপ কমে না। একইভাবে সেচ মৌসুমে গ্রামীণ এলাকায় ডিজেলের চাহিদাও এখন অনেক বেশি, তাই সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।
সরকার ইতিমধ্যে কিউআর কোডের মাধ্যমে জ্বালানি বিতরণের ব্যবস্থা নিয়েছে; এটি ভালো উদ্যোগ। এই ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করা হলে মজুতদারি কমবে এবং সাধারণ মানুষ ন্যায্য সরবরাহ পাবেন।
দেশে এখন মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম জ্বালানি মজুত আছে। এই বাস্তবতায় প্রতিটি লিটার তেলের সাশ্রয় একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। সংকট কতদিন চলবে তা কেউ জানে না। তাই স্বল্পমেয়াদে যা করা সম্ভব, তা দ্রুত করাটাই বিচক্ষণতার কাজ। সময়সূচি কমানো একটি সূচনা মাত্র, পূর্ণ সমাধান নয়। ছুটি বাড়ানো, অনলাইন বৈঠক নিশ্চিত করা, এটিএম সচল রাখা এবং জনসাধারণকে এই জাতীয় প্রচেষ্টার শরিক করে নেওয়া—এই পথগুলো একসঙ্গে নিলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের সংকট অনেকটাই পার করা সম্ভব হবে।