জ্বালানির ফাঁদে কৃষি ও পরিবহন: সবুজ রূপান্তরই একমাত্র পথ
আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সরাসরি আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কাছে জিম্মি।
বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা এবং কৃষির ক্রমাগত উৎপাদনশীলতা। এই দুটি খাত জাতীয় অর্থনীতির ধমনী হিসেবে কাজ করে। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো, এই ধমনীতে যে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, তা মূলত আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানি বা খনিজ তেল। দেশের জ্বালানি তেলের সিংহভাগই ব্যবহৃত হয় এই দুই খাতে। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের ৯৫ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে। ফলে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সরাসরি আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কাছে জিম্মি।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামান্য বাড়লে বা ডলার সংকটে আমদানি ব্যাহত হলে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের সাধারণ মানুষ, প্রান্তিক কৃষক এবং স্বল্প আয়ের ভোক্তাদের ওপর। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এই চরম তেল-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
পরিবহন খাতের তেল-নির্ভরতা: একটি কাঠামোগত দুর্বলতা
বাংলাদেশের সড়ক, রেল, নৌ এবং আকাশপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা মূলত আমদানিকৃত তরল জ্বালানির ওপর টিকে আছে। এশিয়ান ট্রান্সপোর্ট অবজারভেটরির (ATO) ২০২৬ সালের প্রোফাইল অনুযায়ী, দেশের পরিবহন খাতে ব্যবহৃত মোট শক্তির প্রায় ৭৯ শতাংশই আসে জ্বালানি তেল থেকে। তাছাড়া আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০১০ সালে এই নির্ভরতা ছিল ৬৪ শতাংশ, যা কমার বদলে গত দেড় দশকে উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে।
সড়ক ও নৌপথের দিকে তাকালে এই নির্ভরতার আধিপত্য আরও স্পষ্ট হয়। আমাদের মালবাহী ট্রাক, রেল, কাভার্ড ভ্যান, দূরপাল্লার বাস এবং অভ্যন্তরীণ নৌযানগুলোর (লঞ্চ, কার্গো, ট্রলার) প্রায় শতভাগই চলছে ডিজেলের ওপর ভর করে। দুই দশক আগে সিএনজি রূপান্তরের একটি জোয়ার এসেছিল, যা কিছুটা পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি বহুমুখীকরণে আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় গ্যাসের তীব্র সংকট এবং এলএনজি আমদানির উচ্চমূল্যের কারণে ওই সম্ভাবনা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাপী পরিবহন ব্যবস্থা যখন দ্রুতগতিতে বিদ্যুতায়নের দিকে এগোচ্ছে, সেখানে আমাদের পরিবহন খাতে বৈদ্যুতিক যানের (EV) বা বিদ্যুতের অবদান মোট শক্তির মাত্র ১ শতাংশ। রেলপথ, যা সারা বিশ্বে সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াত মাধ্যম হিসেবে পরিচিত, সেখানেও আমরা ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের বৃত্তেই আটকে আছি। মেট্রোরেল এবং কিছু উদ্যোগ বাদ দিলে, বাংলাদেশ রেলওয়ের মূল নেটওয়ার্ক এখনো বিদ্যুতায়নের ছোঁয়া পায়নি। বিকল্প জ্বালানির এই তীব্র সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সামান্য হেরফের হলেই দেশে পরিবহন ভাড়া হুহু করে বেড়ে যায়, যার চেইন রিঅ্যাকশনে বাড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম।
কৃষি ও সেচ ব্যবস্থা: খাদ্য নিরাপত্তার অন্তরালে জ্বালানি-ঝুঁকি
বাংলাদেশের কৃষি, বিশেষ করে বোরো ধানের বাম্পার ফলন আমাদের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতার মূল ভিত্তি। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে জ্বালানি নির্ভরতার বিশাল ঝুঁকি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য এবং অর্থনৈতিক সমীক্ষা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ১২ থেকে ১৩ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্প সচল রয়েছে। অর্থাৎ, দেশের সেচযন্ত্রপাতির প্রায় ৭১ শতাংশই ডিজেলচালিত, আর মাত্র ২৯ শতাংশ বিদ্যুৎ বা সৌরশক্তির ওপর নির্ভরশীল।
ডিজেল নির্ভরতার ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায় বোরো চাষের ভরা মৌসুমে। বৃষ্টির অভাবে এই সময়ে সেচের চাহিদা তুঙ্গে থাকে। পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭,০০০ টন ডিজেল প্রয়োজন হয় কেবল কৃষিযন্ত্র ও পাম্প চালাতে। বছরে সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টন ডিজেল শুধু কৃষিকাজেই ব্যবহৃত হয়।
আমাদের কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ কেবল সেচেই সীমাবদ্ধ নেই। জমি চাষের জন্য পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর, ধান মাড়াইয়ের যন্ত্র এবং মাঠ থেকে ফসল পরিবহনের কাজেও ডিজেল এখন অপরিহার্য। ফলে, কৃষকের উৎপাদন খরচের একটি বিশাল অংশ চলে যায় জ্বালানি খাতে। যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে বা অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পায়, তখন ধান-চালের উৎপাদন খরচ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। এটি কেবল কৃষকের মুনাফাই কেড়ে নেয় না, বরং দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
সামষ্টিক অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব
বাস্তব তথ্য-উপাত্তের দিকে চোখ রাখলে আমাদের তেল-নির্ভরতার একটা ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবং অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদা প্রায় ৭০ থেকে ৭৩ লাখ মেট্রিক টন, যার প্রায় পুরোটাই আমাদের আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে সিংহভাগ বা প্রায় ৬৩ শতাংশ (৪৫ থেকে ৪৬ লাখ মেট্রিক টন) ব্যবহৃত হয় সড়ক, নৌ ও আকাশপথ মিলিয়ে সামগ্রিক পরিবহন খাতে। অন্যদিকে, সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে আরও প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ (১০ থেকে ১১ লাখ মেট্রিক টন)। অর্থাৎ, দেশের মোট আমদানিকৃত জ্বালানির প্রায় ৮০ শতাংশই পোড়ানো হচ্ছে পরিবহন ও কৃষি খাতে। বাকি ২০ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে। এই বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল আমদানি করতে রাষ্ট্রকে প্রতি বছর প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার বা ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
আমাদের এই পরনির্ভরশীলতার ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ, তা বৈশ্বিক ঋণমান নির্ধারণী সংস্থা ফিচের (Fitch Ratings) একটি হিসাব থেকে স্পষ্ট হয়। সংস্থাটির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলে মাত্র ১০ ডলার বাড়লেই বাংলাদেশের বার্ষিক তেল আমদানি ব্যয় প্রায় ১.২ বিলিয়ন (১২০ কোটি) ডলার বেড়ে যেতে পারে, যা আমাদের জিডিপির প্রায় ০.২ শতাংশের সমান! বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে যখন বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকতে হয়, তখন আন্তর্জাতিক বাজারের এমন সামান্য ওঠানামাতেও বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এই বাড়তি ধাক্কা কোনোভাবেই একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য টেকসই হতে পারে না। তাছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটায়।
অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি দেশীয় অর্থনীতিতে যে মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি করে তার প্রভাব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। পরিবহন খরচ বাড়লে তার প্রভাব গিয়ে পড়ে শহরের বস্তিবাসী থেকে শুরু করে গ্রামের দিনমজুর সবার ওপর। কৃষিতে উৎপাদন খরচ বাড়লে খাদ্যের দাম বাড়ে, যা স্বল্প আয়ের মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ শুষে নেয়।
তেলের দাম বৃদ্ধি অনেকটা 'রিগ্রেসিভ ট্যাক্স'-এর মতো কাজ করে, যার সবচেয়ে বড় শিকার হয় অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক এবং নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠী। সরকার দীর্ঘকাল ধরে এই খাতে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে আসছে, যা জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ গিলে খাচ্ছে। কিন্তু বিশ্ব ব্যাংক বা আইএমএফের মতো দাতা সংস্থাগুলোর চাপে যখন এই ভর্তুকি প্রত্যাহার করা হয়, তখন তার আকস্মিক ধাক্কা সামলানোর কোনো প্রস্তুতি বা বিকল্প ব্যবস্থা আমাদের প্রান্তিক মানুষের থাকে না।
সরকারের নীতিগত উদ্যোগ ও বাস্তবায়নের তাগিদ
আশার কথা হলো, জ্বালানি খাতের এই কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে সবুজ উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা সরকার নিজেও অনুধাবন করতে শুরু করেছে। কৃষিখাতে ডিজেলের ব্যবহার শূন্যে নামিয়ে আনতে সরকার ইতিমধ্যে ৪৫ হাজার ডিজেলচালিত পাম্পকে সৌর সেচ পাম্পে রূপান্তরের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার বাস্তবায়নে ইডকল এবং স্রেডার সংস্থা কাজ করছে।
অন্যদিকে, পরিবহন খাতে শিল্প মন্ত্রণালয় 'ইলেকট্রিক ভেহিকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৬' চূড়ান্ত করার কাজ করছে। এই নীতিমালার অধীনে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট যানবাহনের অন্তত ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক যানে রূপান্তর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু আমদানি নয়, বরং বাংলাদেশকে একটি ইভি উৎপাদন হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং তৈরি গাড়ি আমদানিতে করভার ৩৭ শতাংশে নামিয়ে আনার মতো প্রণোদনামূলক প্রস্তাবও রাখা হয়েছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক ও নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এসব পরিকল্পনার আসল সফলতা নির্ভর করছে এর দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কালক্ষেপণ না করে যত দ্রুত এই সবুজ রূপান্তরগুলো মাঠপর্যায়ে কার্যকর করা যাবে, ডলার সাশ্রয় ও সামষ্টিক অর্থনীতির সুরক্ষায় তা ততই মঙ্গলজনক হবে।
নীতিগত উত্তরণ ও সবুজ রূপান্তর
সরকারের গৃহীত নীতিগত উদ্যোগ এবং লক্ষ্যমাত্রাগুলো নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে এই কাঙ্ক্ষিত রূপান্তরকে কেবল সরকারি ফাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর সফল বাস্তবায়নে একটি সুনির্দিষ্ট, বিজ্ঞানভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকাঠামো প্রয়োজন।
প্রথমত, কৃষি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপ্লব ঘটাতে হবে। সরকার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) সহায়তায় দেশে সোলার সেচ পাম্প স্থাপনের যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, তার পরিধি বহুগুণ বাড়াতে হবে। কৃষকদের সহজ শর্তে, বিনা সুদে বা নামমাত্র সুদে সোলার পাম্প ক্রয়ের জন্য ঋণ সুবিধা প্রদান করতে হবে। সেচের মৌসুম বাদে বছরের বাকি সময় এই সোলার প্যানেলগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ যেন নেট-মিটারিং ব্যবস্থার অধীনে কৃষকরা জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করতে পারেন, তার জন্য গ্রিড অবকাঠামো আধুনিকায়ন করতে হবে। এতে কৃষক কেবল জ্বালানি খরচ থেকেই বাঁচবেন না, বরং বিদ্যুৎ বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত, পরিবহন খাতে বৈদ্যুতিক যান এবং রেলের বিদ্যুতায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাসের মতো গণপরিবহন এবং পণ্যবাহী মাঝারি ট্রাকগুলোকে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুতায়নের আওতায় আনতে হবে। এজন্য ইভি আমদানি এবং দেশে সংযোজনের ওপর থেকে শুল্ক ও করের বোঝা একেবারে কমিয়ে আনতে হবে। মহাসড়কগুলোতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সোলার-পাওয়ার্ড চার্জিং স্টেশন গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ রেলওয়ের মূল ব্রডগেজ লাইনগুলোকে দ্রুত বিদ্যুতায়নের আওতায় আনতে হবে, যাতে পণ্য পরিবহনের বড় অংশ সড়কপথ থেকে রেলে স্থানান্তর করা যায়। এটি একদিকে যেমন জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমাবে, অন্যদিকে পরিবহন খরচও নামিয়ে আনবে। নৌপথে ছোট ও মাঝারি নৌযানগুলোকে ব্যাটারি বা হাইব্রিড ইঞ্জিনে রূপান্তরের জন্য নৌ-মালিকদের প্রণোদনা দিতে হবে।
তৃতীয়ত, আমাদের মনে রাখতে হবে, পরিবহন খাতের সব উপ-খাতে রাতারাতি বৈদ্যুতিক রূপান্তর সম্ভব নয়। বিশেষ করে আকাশপথ (এভিয়েশন) এবং ভারী নৌ-পরিবহনকে বিশ্বব্যাপী ‘হার্ড-টু-অ্যাবেট’ বা কার্বন প্রশমনে জটিল খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রযুক্তির বর্তমান সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাটারির অত্যধিক ওজনের কারণে উড়োজাহাজ বা বড় কার্গো জাহাজে এখনই বিদ্যুতের ব্যবহার বাণিজ্যিকভাবে বাস্তবসম্মত নয়। অভ্যন্তরীণ ছোট ছোট নৌযানে সোলার বা ব্যাটারি ব্যবহার করা গেলেও, বড় নৌযান এবং উড়োজাহাজকে আরও বেশ কিছুদিন তরল জ্বালানির ওপরই নির্ভর করতে হবে। তাই এই দুই উপ-খাতে আপাতত জ্বালানি দক্ষতা (Energy efficiency) বৃদ্ধি এবং পুরোনো ইঞ্জিনের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা যেতে পারে। একই সাথে দীর্ঘমেয়াদে 'সাসটেইনেবল এভিয়েশন ফুয়েল', সবুজ হাইড্রোজেন বা বায়োফুয়েলের মতো বিকল্প জ্বালানির প্রসারে বৈশ্বিক গবেষণার সাথে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ন্যায্য রূপান্তরই একমাত্র পথ
পরিবহন ও কৃষি খাতকে জ্বালানি তেলের একচেটিয়া আধিপত্য থেকে মুক্ত করা দরকার। এটা শুধু কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট মোকাবিলার জন্য জরুরি তা-ই নয়, তার চেয়ে বেশি জরুরি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য। এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আমাদের নীতিনির্ধারকদের এখনই একটি সাহসী ও সমন্বিত 'জাস্ট ট্রানজিশন' বা ন্যায্য রূপান্তরের পথে হাঁটতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক পরিবহন এবং সৌর-কৃষির যে অপার সম্ভাবনা আমাদের সামনে রয়েছে, তাকে সঠিক নীতি এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ কেবল বৈদেশিক মুদ্রা সংকট ও মূল্যস্ফীতি থেকেই রক্ষা পাবে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ও স্বনির্ভর অর্থনীতি রেখে যেতে পারবে। আমাদের এখন নীতিগত জড়তা ভেঙে পরিবর্তনের পথে দৌড়াতে হবে।
মনোয়ার মোস্তফা: জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত বিশ্লেষক। ই-মেইল monower@gmail.com
