১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মানবিক মর্যাদাপূর্ণ ও বাসযোগ্য নগরের স্বপ্ন কতদূর

একটি বাসযোগ্য মানবিক শহরের পূর্বশর্ত হলো দূষণমুক্ত পরিবেশ, যানজটমুক্ত রাস্তা, নিরাপদ গণপরিবহন, পরিচ্ছন্ন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সব নাগরিককে সমভাবে সামনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। বৈষম্য বজায় রেখে কোনো শহর ‘মানবিক’ হতে পারে না।

মানবিক মর্যাদাপূর্ণ ও বাসযোগ্য নগরের স্বপ্ন কতদূর
প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষের চাপ সামলানো এক ব্যস্ত ও দিশেহারা মেগাসিটি ঢাকা।

ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল

Published : 14 Aug 2026, 12:51 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা প্রায় চারশ বছরেরও বেশি পুরোনো ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সুবাহদার ইসলাম খাঁ ঢাকায় সুবাহ বাংলার রাজধানী স্থাপন করেন। মুঘল, সুলতানি ও ব্রিটিশ স্থাপত্য আর সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে আজকের এই ঢাকা।

তবে ঐতিহ্যের ঢাকা আজ প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষের চাপ সামলানো এক ব্যস্ত ও দিশেহারা মেগাসিটি। দেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু এই শহরে ফ্লাইওভার, আধুনিক ভবন আর মেট্রোরেলের ছোঁয়া লাগলেও তীব্র যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এখানকার নিত্যদিনের বাস্তবতা। অতিরিক্ত জনসংখ্যা, খালি জায়গার অভাব, যানজট আর শব্দদূষণ মিলে নাগরিক জীবনকে একরকম অতীষ্ঠ করে তুলেছে।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (EIU) বাসযোগ্যতার সূচকে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার স্থান ১৭১তম। তীব্র যানজট, দূষিত বাতাস আর অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর কারণে বৈশ্বিক মানদণ্ডে ঢাকা সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরগুলোর একটি। সরকারি-বেসরকারি কাজ, প্রশাসনিক কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা বিনোদন; সবকিছুর জন্য সকলেই ঢাকামুখী। অতিরিক্ত ঢাকাকেন্দ্রিকতার খেসারত দিতে গিয়েই আজ মেগাসিটি ঢাকা আমাদের যেন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।

ঢাকা আজ এক চরম বৈষম্যের শহর। একদিকে গুলশান, বনানী বা বারিধারার মতো চকচকে অভিজাত এলাকা, অন্যদিকে পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় আর বস্তিগুলোতে বাস করে লাখো প্রান্তিক মানুষ। এই শহরের একদিকে যেমন আলো ঝলমল জীবন, ঠিক তার বিপরীত পাশেই রয়েছে অন্ধকার, অব্যবস্থাপনা, দারিদ্র ও অযত্ন। প্রায় ৫০ লাখ বস্তিবাসী ও নগর-দরিদ্র মানুষ নাগরিক সুবিধার ন্যূনতম ছোঁয়া থেকেও বঞ্চিত। সার্বিক ব্যবস্থাপনা বিচারে এই ঢাকাকে শুধু উচ্চবিত্তের ঢাকা হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়।

পাশাপাশি নগরবাসীর বসবাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভোগান্তির নাম অনিয়ন্ত্রিত বাড়ি ভাড়া। বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও কাগজে-কলমে তা বন্দি। কোনো চুক্তি ছাড়াই মৌখিকভাবে বাসা ভাড়া দেওয়া হয়, যার সুযোগ নিয়ে মালিকেরা হুটহাট ভাড়া বাড়ান কিংবা যখন-তখন ভাড়াটিয়াদের নোটিশ ছাড়া বাসা ছাড়তে বাধ্য করেন।

একইভাবে গণপরিবহন ব্যবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক সংকটে নিমজ্জিত। লক্কড়ঝক্কড় বাস, অতিরিক্ত ভাড়া, ট্রাফিক জ্যাম আর যাত্রী হয়রানি এখানকার প্রতিদিনের ঘটনা। মেট্রোরেল কিছুটা স্বস্তি দিলেও পুরো গণপরিবহন নেটওয়ার্ক এখনো চরম বিশৃঙ্খল। ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ বাসে সয়লাব পুরো শহর। বাসের ভেতরের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, বাড়তি আয়ের লোভে বেপরোয়া ড্রাইভিং, নির্দিষ্ট স্টপেজে না থামানো আর যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামাসহ ভোগান্তির অন্ত নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাত্রাতিরিক্ত ব্যক্তিগত গাড়ি, যা যানজটকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

নিরাপত্তার দিক থেকেও শহরটি করুণ অবস্থায় পৌঁছেছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, খুন, দখলদারিত্ব, মাদক ও সন্ত্রাস ঢাকার নিত্যনৈমিত্তিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অপরাধী চক্র শহরটিকে একরকম জিম্মি করে রেখেছে, আর রাজনৈতিক দলগুলো এসব চক্রকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে। ঘরের বাইরে বের হলেই আতঙ্কে থাকতে হয় নগরবাসীকে। বিশ্বের নিরাপদ শহরের তালিকায় যেখানে কোপেনহেগেন শীর্ষে, সেখানে অনিরাপদ শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান বিশ্বের ৭ম স্থানে।

ঢাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ আজ চরম বিপন্ন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী ও খালের মৃত্যু, মাত্রাতিরিক্ত বায়ু ও শব্দদূষণ এবং সবুজ জায়গার অভাবে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এই মহানগরী আজ বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। ঢাকা নিয়মিতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহরগুলোর তালিকায় শীর্ষস্থানে থাকে। বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা (পিএম ২.৫) মাত্রাতিরিক্ত থাকে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, ইটভাটা এবং যত্রতত্র নির্মাণকাজের ধুলাবালি বাতাসকে বিষাক্ত করছে। গাছপালা ও জলাশয় কমে যাওয়ায় কংক্রিটের চাদরে ঢাকা শহরে তীব্র ‘হিট আইল্যান্ড’ বা উষ্ণতার প্রভাব তৈরি হয়েছে।

বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীর পানি আজ মারাত্মক দূষিত। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শূন্যে নেমে আসে। কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য অবাধে ফেলার কারণেই ধ্বংস হচ্ছে নদীগুলো। পাশাপাশি ঢাকার আশপাশের প্রায় ১৯টি প্রাকৃতিক খাল ও জলাশয় ভরাট করে অবৈধ স্থাপনা তৈরি করায় অল্প বৃষ্টিতেই শহর ডুবে যায় জলাবদ্ধতায়।

স্বাস্থ্য ও সেবা খাতেও চরম সংকট স্পষ্ট। ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল কিংবা হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের মতো বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে বহু আধুনিক বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। কিন্তু অতিরিক্ত রোগীর ভিড় আর বেসরকারি খাতের চড়া খরচের কারণে চিকিৎসা পাওয়া যেন এক যুদ্ধ। সরকারি হাসপাতালে নামমাত্র খরচে চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও দীর্ঘ লাইন আর ওষুধের সংকট নিত্যদিনের ব্যাপার। শহরের দরিদ্র ও ভাসমান মানুষের জন্য কোনো কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতি এখনো গড়ে ওঠেনি।  

শহরের গ্যাস সংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জীবন আরও বিপর্যস্ত। আমদানিকৃত এলএনজি-নির্ভরতা আর অতীতে ভুল জ্বালানি নীতি ও দুর্নীতির কারণে এই সংকটের সৃষ্টি। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না, যা শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের গৃহস্থালি জীবনেও বিপর্যয় ডেকে আনছে।  

এতসব সঙ্কটে জর্জরিত বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের স্থায়ী আবাসের জন্য দাবি জানিয়ে আসছেন, কিন্তু এই ৫০ লক্ষ বস্তিবাসী ও ভাসমান মানুষের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে। বিগত কয়েকটি সরকার নগরের প্রান্তিক এই মানুষদের সঙ্গে প্রতারণাই করে গেছে। কেউ উচ্ছেদ করেছে, কেউবা আশ্বাসের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছে। কড়াইল বস্তিসহ ৫৮টি সম্ভাব্য এলাকায় প্রায় ১ লাখ ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রকল্প ও পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা ও দাবি উঠেছে, যেখানে স্বল্প আয়ের মানুষের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কম ভাড়ায় বা কিস্তিতে ফ্ল্যাট বরাদ্দের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তার কোনো বাস্তবায়ন আমরা লক্ষ্য করছি না।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জনগণের কাছে জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, মশা নিধনে ব্যর্থতা, দখলদারিত্ব আর মেগাপ্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতির অভিযোগই বারবার উঠে এসেছে। সিটি প্রশাসনগুলো জনগণের করের টাকায় চলেও নগরবাসীকে কাঙ্ক্ষিত সেবাদানে চরম উদাসীন।

একটি বাসযোগ্য মানবিক শহরের পূর্বশর্ত হলো দূষণমুক্ত পরিবেশ, যানজটমুক্ত রাস্তা, নিরাপদ গণপরিবহন, পরিচ্ছন্ন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সব নাগরিককে সমভাবে সামনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। বৈষম্য বজায় রেখে কোনো শহর ‘মানবিক’ হতে পারে না। একটি সুস্থ ও সুন্দর ঢাকা গড়তে প্রয়োজন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন, যার জন্য জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত এমন এক নগর প্রশাসন দরকার, যারা প্রতিনিয়ত নগরবাসীর কাছে নিজেদের কাজের হিসাব দিতে বাধ্য থাকবে।

ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও সম্পাদক, পরিবেশ বার্তা। ই-মেইল: ufardous@gmail.com