Published : 08 Sep 2025, 01:30 PM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—ডাকসু—শুধু শিক্ষার্থীদের একটি নির্বাচিত ফোরাম নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য প্রতিষ্ঠানের নাম। মুক্তিসংগ্রাম থেকে শুরু করে সামরিক স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি জাতীয় সংকটে ডাকসু নেতৃত্ব দিয়েছে, দেশকে পথ দেখিয়েছে। এই ঐতিহ্য শুধু প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে অনুপ্রেরণা ছড়ায়নি, বরং জাতির সামনে একটি দিশারি হিসেবে থেকেছে। অথচ দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ডাকসু নির্বাচন বন্ধ ছিল। ২০১৯ সালে নির্বাচন ফিরে এলে অনেকেই ভেবেছিল, এবার হয়তো শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলবে। কিন্তু সে আশার ফলাফল ছিল হতাশাজনক।
সেই প্রেক্ষাপটে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ডাকসু নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে শিক্ষাঙ্গন যেমন উচ্ছ্বসিত, তেমনি সংশয়ও বিদ্যমান। অনেকের মনে প্রশ্ন—এবার কি সত্যিই নতুন ভোর আসবে, নাকি পুরনো অন্ধকারই ঘনীভূত হবে?
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এই নির্বাচনের তাৎপর্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কারণ সেই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল তরুণ প্রজন্ম। তারা শুধু রাজপথে নয়, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রূপরেখায়ও প্রভাব বিস্তার করেছে। এ প্রেক্ষাপটে ডাকসু নির্বাচন আর কেবল একটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশক হিসেবে হাজির হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এখান থেকে এমন নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আমূল বদলে দেবে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ডাকসু কি সত্যিই সেই পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠতে পারবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের সমস্যাগুলো এতটাই প্রকট যে, এসব সমাধান না হলে কোনো নেতৃত্বই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারে না। ভর্তি পরীক্ষায় ভোগান্তি, হলে সিট সংকট, ক্যান্টিনের নিম্নমানের খাবার, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাহীনতা, পুরোনো পাঠ্যক্রম, গবেষণার অপ্রতুল সুযোগ—এসব সমস্যা শিক্ষার্থীদের নিত্যসঙ্গী। উপরন্তু রাজনৈতিক সংঘর্ষ, বহিরাগতদের দাপট, সিট বাণিজ্য, মাদকাসক্তি এবং টেন্ডারবাজি ক্যাম্পাসকে আতঙ্কের পরিবেশে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের সংকট শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ। হলগুলোতে সিট পাওয়া এক দুঃসাধ্য কাজ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য না থাকলে সিট মেলে না। যারা কোনোভাবে সিট পান, তাদেরও অনেক সময় অস্বাস্থ্যকর গণরুমে থাকতে হয়। ২০-৩০ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে একটি ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকে, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব, নোংরা টয়লেট, আর অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এভাবে শিক্ষা গ্রহণের পরিবেশ কোথায়? অথচ ডাকসুর প্রধান কাজই হওয়া উচিত এসব সমস্যা সমাধানে চাপ সৃষ্টি করা।
শিক্ষাক্ষেত্রে সমস্যা আরও গভীর। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো পাঠ্যক্রম নেই, অনেক বিভাগে শিক্ষকের সংখ্যা শিক্ষার্থীর তুলনায় অত্যন্ত কম, গবেষণার জন্য অর্থায়ন প্রায় নেই বললেই চলে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া স্নাতকদের অনেকেই বৈশ্বিক চাকরি বাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো দক্ষতা অর্জন করতে পারেন না। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। এই বৈপরীত্য শুধু শিক্ষার্থীদের হতাশ করে না, বরং জাতীয় উন্নয়নের পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কোথায়? একসময় এ বিশ্ববিদ্যালয়কে দক্ষিণ এশিয়ার অক্সফোর্ড বলা হতো। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ব র্যাংকিংয়ে এর অবস্থান শোচনীয়। আন্তর্জাতিক সূচকে নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না। এর প্রধান কারণ হলো গবেষণার অভাব, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা কম, দুর্বল একাডেমিক অবকাঠামো এবং বিশ্বমানের পাঠ্যক্রমের অনুপস্থিতি। এ অবস্থান কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামকেই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং স্নাতকদের বৈশ্বিক স্বীকৃতি ও প্রতিযোগিতা ক্ষমতাকেও সীমিত করে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা হলো আরেকটি বড় সমস্যা। ছাত্র রাজনীতি আদর্শচর্চা আর নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্র হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে তা রূপ নিয়েছে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ—এসব কার্যকলাপ সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, যখন ডাকসু নির্বাচন হয়, তখন তা আর শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচন নয়; বরং বড় দলের ছায়াযুদ্ধে পরিণত হয়।
নারী শিক্ষার্থীদের অবস্থা এখানে আরও জটিল। তাদের জন্য পর্যাপ্ত আসন নেই, হলের নিরাপত্তা দুর্বল, পোশাক নিয়ে মন্তব্য বা হয়রানির ঘটনা প্রায়ই ঘটে। যৌন হয়রানির ঘটনা নিয়মিত ঘটলেও প্রতিকার পাওয়া যায় না। অনেক হলে সন্ধ্যার পর বের হওয়ার স্বাধীনতাও সীমিত, যা নারী শিক্ষার্থীদের চলাফেরার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। অথচ একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী-পুরুষ সমান সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা।
পরিবহন সমস্যা আরেকটি বড় সংকট। পর্যাপ্ত বাস নেই, যা আছে তা-ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের তুলনায় কম। যানজট ও অব্যবস্থাপনা মিলে শিক্ষার্থীদের প্রায় প্রতিদিন ক্লাস ধরতে দেরি হয়ে যায়। এর ওপর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্যও পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। টিএসসিতে কিছু অনুষ্ঠান হলেও তা নামকাওয়াস্তে আয়োজনে পর্যবেশিত হয়। অর্থ সংকটে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো টিকতে পারে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেবল মোবাইলফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর হয়ে যাচ্ছে, যেখানে সৃজনশীলতা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের অবকাশ নেই।
এই সমস্যাগুলো সমাধানে ডাকসুর ভূমিকা অপরিসীম হতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অতীতের ডাকসু তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। ২০১৯ সালের নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা আশাবাদী হলেও, শিগগিরই তারা বুঝতে পারে এটি কেবল নামমাত্র পরিবর্তন। ফলে শিক্ষার্থীদের আস্থা ভেঙে যায়।
তাহলে এবারের নির্বাচন কতটা ভিন্ন হতে পারে?
প্রার্থীদের ইশতেহার দেখে মনে হচ্ছে, অন্তত কিছুটা হলেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তারা সিট সংকট, ক্যান্টিনের খাবারের মান, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো সামনে এনেছেন। এটি অবশ্যই ভালো দিক। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মনে সংশয়—এগুলো কি কেবল ভোটের প্রতিশ্রুতি, নাকি বাস্তবায়নের ইচ্ছাও আছে?
বাস্তবতা হলো, সমস্যাগুলো এতটাই গভীর যে শুধু ডাকসু নেতৃত্ব চাইলেই এসব সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। এর জন্য প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আন্তরিকতা, শিক্ষকদের সক্রিয় ভূমিকা, আর সবচেয়ে বড় কথা রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ রাজনীতিবিদরা যদি শিক্ষাঙ্গনকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার চালিয়ে যান, তবে কোনো ডাকসুই কার্যকর হবে না।
এছাড়া আর্থিক সীমাবদ্ধতাও বড় বাধা। নতুন হল নির্মাণ, পুরোনো অবকাঠামো সংস্কার, গবেষণাগার স্থাপন—এসবের জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন। সরকারি অনুদান সীমিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয়ও খুব কম। ফলে স্বপ্ন দেখলেও বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না।
প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। একটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে মাসের পর মাস লেগে যায়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বহু বছর ধরে অনিষ্পন্ন থেকে যায়। তার ওপর জবাবদিহির অভাবের কারণে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা চলতেই থাকে।
ডাকসু নির্বাচনের সাফল্য নির্ভর করবে এ প্রশ্নের ওপর—যোগ্য, সৎ এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্ব উঠে আসবে কি না। যদি ক্ষমতার রাজনীতির ছায়ায় একই ধরণের নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়, তবে পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু যদি সত্যিই নতুন প্রজন্মের চিন্তাশীল, মানবিক এবং সাহসী নেতৃত্ব উঠে আসে, তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবারও আলোর মশাল হতে পারে।
৯ সেপ্টেম্বরের ডাকসু নির্বাচন তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির পরীক্ষাও বটে। শিক্ষার্থীরা তাদের ভোটের মাধ্যমে জানিয়ে দেবে—তারা পুরোনো পথেই হাঁটতে চায়, নাকি নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে যেতে চায়।
একটি জাতির তরুণদের স্বপ্ন ভাঙতে থাকলে, সে জাতি কখনো মহৎ হতে পারে না। ডাকসু নির্বাচন তাই শুধু নেতা নির্বাচনের বিষয় নয়, এটি স্বপ্ন রক্ষার সংগ্রাম। ৯ সেপ্টেম্বর আমাদের জানিয়ে দেবে—আমরা কি সেই স্বপ্নকে জীবিত রাখতে পেরেছি, নাকি আবারও তাকে কবর দিয়েছি।
কিন্তু ফলাফল যাই হোক না কেন, শিক্ষার্থীদের করণীয় স্পষ্ট। তারা যদি নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতন না হন, তবে কোনো ডাকসুই তাদের মুক্তি এনে দিতে পারবে না। ভোট দেওয়ার সময় দলীয় আনুগত্য নয়, যোগ্যতা ও সততার মানদণ্ডকে প্রাধান্য দিতে হবে। নির্বাচনের পরও তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; প্রতিটি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দাবি জানাতে হবে, নেতৃত্বকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সক্রিয়, সংগঠিত ও সচেতন শিক্ষার্থী সমাজই একটি কার্যকর ডাকসু গড়ে তুলতে পারে।
একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে ভাবতে হবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তারা যদি নিজেদের ভেতরে জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ, মানবিকতা, সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে না তোলে, তবে কোনো নেতৃত্বই দেশের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারবে না। ডাকসুর ভেতর থেকে গড়ে ওঠা নেতৃত্বও তখন কেবল নামমাত্র হয়ে থাকবে। তাই এই প্রজন্মের দায়িত্ব—নিজেদেরকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো জাতির জন্য আলোর মশাল হতে পারে।