Published : 12 Feb 2026, 12:56 AM
প্রায় আড়াই কোটি তরুণ ভোটার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। দীর্ঘদিনের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনি অভিজ্ঞতার পর অনেকে এই নির্বাচনকে রাজনৈতিক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু নির্বাচনি উত্তেজনার পাশাপাশি সমাজের একটি বড় অংশ গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। এ লেখা যখন লিখছি, এখানে-ওখানে ভোট নিয়ে নৈরাজ্যের খবর আসতে শুরু করেছে। তাই রাত পোহালে যে ভোট শুরু হওয়ার কথা, তা কেমন হবে, বলা কঠিন।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, উদারপন্থী, অসাম্প্রদায়িক এবং দল-নিরপেক্ষ নাগরিকদের একটি বড় অংশ এখনো ঠিক করতে পারছেন না—কোন রাজনৈতিক শক্তি তাদের নিরাপত্তা ও নাগরিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম হবে। নিশ্চয়ই ভোট দিতে যাবেন বলে যারা মন্যস্ত করে রেখেছিলেন, সকালে হয়তো তারা নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন।
গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো এমন কোনো সুসংগঠিত, নীতিনিষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প শক্তি গড়ে ওঠেনি, যা তাদের আস্থার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। ফলে তাদের সামনে বাস্তবিক বিকল্প দাঁড়িয়েছে মাত্র দুটি: তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ কোনো পক্ষকে বেছে নেওয়া অথবা কৌশলগত নীরবতা অবলম্বন করে ভোটদান থেকে দূরে থাকা। কারণ এই ভোটের ফলাফল তাদের ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের দমন, অপশাসন ও ক্ষোভের এক ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ। দমনমূলক শাসন, ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা হরণ, ভিন্নমত দমনের কারণে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সর্বস্তরের মানুষ ছাত্রদের নেতৃত্বে, শ্রমজীবী জনগণের সাহসে এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় সমর্থনে রাস্তায় নেমেছিল। ওই জনস্রোতে সংখ্যালঘু ও প্রগতিশীল নাগরিকদের উপস্থিতি নৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
তাদের মূল চাওয়া ছিল এটাই, রাষ্ট্র যেন সত্যিকার অর্থে বিশ্বাসযোগ্য হয়, আইন যেন পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। তারা এমন একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সামাজিক চুক্তি কামনা করেছিলেন, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক নিরাপত্তা পাবেন এবং প্রাপ্য মর্যাদা লাভ করবেন। তারা ভেবেছিলেন রাষ্ট্র যদি সত্যিই আইন, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে চলে, তাহলে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস দূর হয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিসর গড়ে উঠবে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরবর্তী পর্যায়ে ওই প্রত্যাশা কাঠামোগত রূপ নিতে পারেনি।
গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক পুঁজি থেকে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল সংস্কার, বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, নিরাপত্তা কাঠামোর সংস্কার এবং বিতর্কমুক্ত নির্বাচনমুখী রোডম্যাপের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু খুব দ্রুতই এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সততা ও দৃঢ়তার অভাব প্রকট হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধতা, মব সহিংসতা এবং সংখ্যালঘু উপাসনালয় ও সুফিবাদী স্থাপনায় অব্যাহত হামলার ঘটনায় যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতা রাষ্ট্রের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা প্রদানের অক্ষমতা স্পষ্ট করেছে।
এই পরিস্থিতি সংখ্যালঘু ও প্রগতিশীল নাগরিকদের মধ্যে গভীর আস্থাহীনতা ও অসহায়ত্বের জন্ম দিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছেন রাষ্ট্র যেভাবে আইন, নিরাপত্তা ও ন্যায় নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক মর্যাদার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
একই সময়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনে সক্রিয় হয়েছে। বিএনপি মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি বাড়িয়েছে এবং নির্বাচনি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ভাষ্য সামনে এনেছে। কিন্তু একইসঙ্গে চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তার ও সহিংসতার অভিযোগও বেড়েছে দলটির বিরুদ্ধে। জুলাই-পরবর্তী ধর্মীয় মৌলবাদী সহিংসতা, মাজার-দরগায় হামলা ও প্রগতিশীলদের বিরুদ্ধে মব সহিংসতার প্রশ্নে তাদের অবস্থানে অস্পষ্টতা রয়েছে। এছাড়া তাদের অতীত শাসনামলের (বিশেষ করে ২০০১-২০০৫) সংখ্যালঘু নির্যাতনের দালিলিক অভিযোগ এখনো জনমনে কাজ করছে। কারণ, কোনো একটি রাজনৈতিক দলের ওপর আস্থা শুধু তাদের বর্তমান প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে না; এটা ইতিহাসের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে।
সাংগঠনিক বিস্তৃতি ও জনসমর্থন বিচারে বিএনপির পর এখন সবচেয়ে বড় দল জামায়াতে ইসলামীও বিবিধ বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে ভুগছে। যদিও তারা সম্প্রতি নিজেদের একটি প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মধ্যমপন্থী দল হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং নারীর চলাচল ও উপার্জনকাজে অংশগ্রহণ বিষয়ে তুলনামূলক নরম বক্তব্য তাদের ওই কৌশলের অংশ। কিন্তু দলীয় নীতিপত্র, নেতৃত্ব কাঠামো এবং সামাজিক প্রশ্নে অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আধুনিক নাগরিক অধিকারের বিষয়ে তাদের অবস্থান এখনো সীমাবদ্ধ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে আনুষ্ঠানিক দায়স্বীকার বা ক্ষমা প্রার্থনার অনুপস্থিতি। ইতিহাসের দায় অমীমাংসিত থাকলে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা বিষয়ে আস্থা তৈরি হয় না, যেহেতু একটি দলের রাজনৈতিক নৈতিকতা তার অতীত আমলনামার সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রচলিত ধারার আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বাম ও ধর্মপন্থী মতাদর্শিক বিভাজনের বাইরে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক মধ্যপন্থী রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে গণঅভ্যুত্থান থেকে উদ্ভূত জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি। তারা রাষ্ট্রকে নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে পুনর্গঠনের কথা বলে, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির বদলে নীতিনির্ভর রাজনীতির ভাষ্য সামনে আনে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের বাইরে একটি নতুন সমঝোতার পরিসর তৈরির ঘোষণা দেয়।
দলটির এই অবস্থান বিশেষ করে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, তরুণ ভোটার এবং প্রগতিশীল নাগরিকদের একটি অংশের মধ্যে প্রত্যাশা সৃষ্টি করে, যারা দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো দ্বৈত বা ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘোরটোপের বাইরে বিকল্প সন্ধান করেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলটির ভেতরে সাংগঠনিক দুর্বলতা, অভাবিত সব অনিয়মের অভিযোগ, নেতৃত্বের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং নীতিগত অসামঞ্জস্য প্রকাশ্যে আসে। সংখ্যালঘু নিপীড়ন ও মব সহিংসতার ঘটনায় তাদের দৃশ্যমান নীরবতা ঘোষিত অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ প্রমাণিত হয়। পরবর্তীতে ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত একটি শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় আবদ্ধ হওয়া তাদের মধ্যপন্থী নৈতিক অবস্থানকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে। নতুন রাজনীতির ভাষ্য পুরোনো আপসের পুনরাবৃত্তিতে পরিণত হওয়ায় এনসিপিকে ঘিরে সংশ্লিষ্ট সংখ্যালঘু ও প্রগতিশীল শ্রেণির আস্থাও হারিয়ে যেতে থাকে।
প্রচলিত ও নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তির প্রতিই আস্থা তৈরি না হওয়ায় সংখ্যালঘু, প্রগতিশীল এবং অসাম্প্রদায়িক নাগরিকদের বড় একটি অংশ এখন রাজনৈতিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। কারণ, প্রতিটি বিকল্পের সঙ্গে নিরাপত্তা-ঝুঁকি জড়িয়ে আছে, যা তাদের সামাজিক সহাবস্থান, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং নাগরিক মর্যাদার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে অনেকে ভোটাধিকার প্রয়োগে দৃশ্যমান অংশগ্রহণ রাখলেও মানসিকভাবে সরে দাঁড়াচ্ছে, আবার কেউ কেউ সম্পূর্ণ অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। যদিও গণতন্ত্রের কাঠামো শুধু একটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব ও স্বার্থ নিশ্চিত করার জন্য নয়। গণতন্ত্রের সত্যিকারের শক্তি এটাই যে, দুর্বল ও ভিন্নমতাবলম্বীরাও এই ব্যবস্থায় নিরাপদ বোধ করবে। নিরাপত্তার এই অনুভব ও অশ্বাস না থাকলে, খোদ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোই দুর্বল হয়ে পড়ে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাই রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রতিযোগিতা তো অবশ্যই, একইসঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের এক ঐতিহাসিক পরীক্ষাও। যদি নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা তৈরি না হয়, তাহলে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা আরও গভীর হবে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব হবে বহুমাত্রিক। রাজনীতি একরঙা হয়ে উঠবে, নীতিনির্ধারণে বৈচিত্র্য কমবে, সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হবে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিশেষ একটি গোষ্ঠীর স্বার্থে কেন্দ্রীভূত হবে। রাজনীতির এই পরিণতি গোটা বাংলাদেশের জন্যই এক দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি।
সবশেষে, প্রশ্নটি রাষ্ট্রতাত্ত্বিক। যে রাষ্ট্র তার অরক্ষিত নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তা দীর্ঘমেয়াদে নিজের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন রাষ্ট্রের ওই সক্ষমতা প্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ এক পরীক্ষাপর্ব। এটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ কি ভিন্ন কণ্ঠ, ভিন্ন বিশ্বাস ও ভিন্ন জীবন-দর্শনের জন্য মানবিক সহাবস্থান নিশ্চিত করবে, নাকি রাজনৈতিক সুবিধাবাদের চাপের কাছে তাদের নিরাপত্তা ও উদ্বেগকে ঊন করে রাখবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎও এই বাস্তব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।