Published : 22 Jan 2026, 02:23 PM
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাঙ্গন ও রাজনৈতিক পরিসর পর্যন্ত সর্বত্রই আমরা এক অদ্ভুত অথচ পরিচিত বৈচিত্র্যের মধ্যেই বসবাস করছি। এই বৈচিত্র্য কোনো ফুলের বাগানের মতো রঙিন বা আনন্দদায়ক নয়। এটি যুক্তি, সুবিধা, কৌশল আর অবস্থান বদলের এক জটিল মানচিত্র, যেখানে প্রত্যেকে নিজের পথটুকু খুব যত্নে আঁকে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, আমরা মতের ভিন্নতাকে উদযাপন করছি। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, এই ভিন্নতা অনেক সময় আদর্শের নয়–প্রয়োজনের, সুযোগের এবং সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির হিসাবের ফল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজকে সাধারণত সমাজের বিবেক, যুক্তির শেষ আশ্রয় বা নৈতিকতার বাতিঘর হিসেবে কল্পনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষকসমাজও সমাজের বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। তারা একই রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর শ্বাস নেন, একই ক্ষমতার কাঠামোর ভেতর চলাফেরা করেন, একই আচরণ ও প্রত্যাশার সঙ্গে আপস করেন। ফলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকসমাজের ভেতরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে দ্বিধা, মতভেদ ও প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অবস্থান দেখা যায়, তা কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; এ হচ্ছে আমাদের বৃহত্তর সামাজিক আচরণের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ।
কিছু শিক্ষক আছেন—যাদের ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত রাজনৈতিক আদর্শ দিবালোকের মতোই স্পষ্ট—তারা ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন। তাদের যুক্তি প্রস্তুত, ভাষা প্রাঞ্জল এবং আবেগ কখনো কখনো বেশ উজ্জ্বল। তারা বলছেন, গণতান্ত্রিক চর্চা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় অচল, ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া প্রশাসন অন্ধ আর ছাত্র সংসদ নির্বাচন ছাড়া ক্যাম্পাস একটি প্রাণহীন কাঠামো মাত্র। কথাগুলো শুনতে ভালো হলেও এর আড়ালে সূক্ষ্ম হিসাব লুকিয়ে আছে। এই নির্বাচন হলে কারা লাভবান হবেন, কোন রাজনৈতিক বলয় শক্তিশালী হবে এবং কার অবস্থান আরও দৃঢ় হবে, তা সেখানে নীরবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে তাদের কাছে নির্বাচন জরুরি হয়ে ওঠেছে শুধু নীতিগত নয়, কৌশলগত কারণেও।
অন্যদিকে, শিক্ষক সমাজের আরেকাংশ এই নির্বাচনকে আপাতত জরুরি না ভাবতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। তারা বলছেন, পরিবেশ অনুকূল নয়, পরিস্থিতি উপযুক্ত নয়, সময় সঠিক নয়। তাদের ভাষাও যুক্তিনির্ভর, তাদের কথাতেও আছে প্রজ্ঞার ছাপ। তারা গণতন্ত্রের বিরোধিতা করছেন না, কিন্তু গণতন্ত্রের সময়সূচি নিয়ে সতর্ক। এই সতর্কতার ভেতরেও একটি হিসাব কাজ করে। এখন নির্বাচন হলে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এবং কার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে, সেটি সেখানে মূল বিবেচ্য। ফলে নির্বাচন না হওয়াটাও এক ধরনের অবস্থান হয়ে ওঠেছে, যা উচ্চকিত না হলেও বেশ কার্যকর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নির্বাচন নিয়ে একেবারে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। আদতে শিক্ষক সমিতি শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা ও যৌথ স্বার্থ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু বাস্তবতায় তা প্রায়ই ক্ষমতার রাজনীতির আরেকটি মঞ্চে রূপ নেয়। কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় প্রতিনিধিত্বের সংকট তৈরি হয়েছে এবং সমিতির বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তাই এখনই নির্বাচন সময়ের দাবি। আবার অন্যদের মতে, দুই টার্ম পেরোলেও সময় ও নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। আসলে যাদের শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা কম, তারাই ছাত্র সংসদ নির্বাচনে যতটা সরব, শিক্ষক সমিতির প্রশ্নে ততটাই নীরব। যেন ‘সময়’ কোনো নিরপেক্ষ সত্তা, যা নিজে থেকেই এসে দরজায় কড়া নাড়বে। বাস্তবে সময় এখানে একটি সুবিধাজনক শব্দমাত্র, যার আড়ালে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত হিসাব-নিকাশ সুস্পষ্টভাবে লুকিয়ে আছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গেও একই ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ বিভক্তি দেখা যাচ্ছে। কেউ নির্বাচন চান, কারণ নির্বাচন মানেই ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের সুযোগ। কেউ নির্বাচন চান না, কারণ বর্তমান বাস্তবতায় সেই পুনর্বিন্যাস তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, নির্বাচন ব্যতিরেকে তারা যথেষ্ট ক্ষমতাবান, অন্তত ক্ষমতাসীনদের কলকাঠি নাড়ান। আবার কেউ এমন এক কৌশলী অবস্থানে থাকেন, যেখানে চাওয়ার ভেতর দিয়ে না চাওয়ার অবস্থান বজায় রাখা হয়। কথায় নির্বাচন, কাজে বিলম্ব; ভাষায় গণতন্ত্র, বাস্তবে অনিশ্চয়তা। এই অবস্থানগুলো এতটাই নিখুঁতভাবে নির্মিত যে বাইরে থেকে দেখলে এগুলোকে দ্বিচারিতা না বলে কৌশল বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় নৈতিকতা যেন মাঝেমধ্যে আলোচনার টেবিল থেকে সাময়িক ছুটি নেয়। কিন্তু যুক্তি কখনো ছুটি নেয় না। যুক্তি সবসময় হাজির থাকে, প্রস্তুত থাকে যে কোনো অবস্থানকে ব্যাখ্যা করার জন্য। কোনো সিদ্ধান্ত নিলে যুক্তি আছে, সিদ্ধান্ত না নিলেও যুক্তি আছে। প্রতিবাদ করলে যুক্তি আছে, চুপ থাকলেও যুক্তি আছে। ফলে যুক্তির অভাব কখনো হয় না; উল্টো যুক্তির প্রাচুর্যই আমাদের আসল সমস্যা।
এই যুক্তিনির্ভর সংস্কৃতির একটি স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যাচ্ছে প্রোভিসি মহোদয় ও একজন সিনিয়র শিক্ষকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর শিক্ষক সমিতির নীরবতায়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এই ধরনের ঘটনায় শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি না আসা কি অস্বাভাবিক নয়? কিন্তু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে বোঝা যায়, এটি মোটেও অস্বাভাবিক নয়। কারণ নীরবতার পক্ষেও একটি শক্তিশালী যুক্তি বিদ্যমান। সেই যুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত ও অত্যন্ত কার্যকর একটি শব্দ—‘ফ্যাসিস্ট’। মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষক সমিতি এই শব্দের ভার বহন ও ধারণ করার আশঙ্কায় ভীত ও সতর্ক।
বর্তমান সময়ে কিছু মব-সৃষ্টিকারীর কাছে ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটি যেন এক অলৌকিক ক্ষমতা লাভ করেছে। এটি একদিকে যেমন প্রতিবাদের ভাষা, অন্যদিকে তেমনি ইচ্ছেমতো দাবি আদায়ের অস্ত্র। শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি না এলে সেটিকে যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করতে এই শব্দটির চেয়ে কার্যকর আর কিছু নেই। নতুন ফ্যাসিস্ট কাঠামোর ভেতরে প্রতিবাদ আদৌ কি অর্থবহ? এ ধরনের প্রশ্ন এতটাই স্বীকৃত হয়ে উঠেছে যে নীরবতাই ক্রমে এক ধরনের নৈতিক অবস্থানে রূপ নিয়েছে।
সব মিলিয়ে আমরা সবাই কমবেশি কৌশলনির্ভর। এই কৌশল ব্যক্তিগত নয়, বরং আমাদের সামষ্টিক আচরণেরই অংশ। পরিস্থিতি বদলালে অবস্থানও বদলায়, আর সেই বদলের পক্ষে যুক্তির অভাব হয় না। আজ যা জরুরি, কাল তা অপ্রয়োজনীয়; আজ যা নীরবতা কৌশল, কাল সেটিই নৈতিকতা। লক্ষ্য একটাই, নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিরাপদ ও সুবিধাজনক থাকা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাতীয় রাজনীতি সবই যেন একটি দাবার বোর্ড, যেখানে অধিকাংশ চাল সুবিধার হিসাব অনুযায়ী নেওয়া হয়, আদর্শের তাগিদে নয়।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তাই কোনো বিচ্ছিন্ন গল্প নয়। এটি আমাদের সময়ের, আমাদের মানসিকতার, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই একটি প্রতিচ্ছবি। এখানে যা ঘটে, তা শুধু একটি ক্যাম্পাসের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; প্রতিধ্বনিত হয় জাতীয় রাজনীতিতে, সামাজিক আলোচনায়, এমনকি আমাদের ব্যক্তিগত নৈতিক হিসাবেও। এই প্রতিধ্বনি কখনো উচ্চস্বরে, কখনো নীরবভাবে, কিন্তু সবসময় উপস্থিত থাকে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়, এই কৌশলী বিজয়ের দৌড়ে আমরা কী কিছু হারাচ্ছি? হয়তো আমরা হারাচ্ছি সেই সরল সাহস, যা কোনো হিসাব ছাড়াই কথা বলতে পারে। হয়তো আমরা হারাচ্ছি সেই নৈতিক দৃঢ়তা, যা পরিস্থিতি অনুকূল না হলেও অবস্থান নিতে পারে। কিন্তু এই প্রশ্নগুলোও আপাতত আলোচনার টেবিলে নেই। কারণ যুক্তি এখনো দায়িত্ব পালন করছে, আর নৈতিকতা হয়তো আবার কোনো একদিন ছুটি কাটিয়ে ফিরবে। ততদিন পর্যন্ত আমরা আমাদের কৌশল নিয়ে এগিয়ে যাব, নিজেদের মতো করে বিজয় উদযাপন করব এবং এই জটিল চিত্রটাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেব।