Published : 19 Aug 2026, 12:59 PM
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের আগে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের যে বাড়িতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকসহ বিপুল মানুষের ঢল নামতো, সেই বাড়িটা এখন কার্যত নিষিদ্ধ। এখানে শ্রদ্ধা জানানো বা ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির সামনে গিয়ে কারো মন খারাপ করারও সুযোগ নেই। কেননা এখানে গেলেই প্রশ্ন করা হবে, “আপনি কে এবং এখানে কেন এসেছেন?” যদি উত্তর আসে যে, বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এসেছেন, তাহলে তার ওপর আক্রমণ করা বৈধ—এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেই। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা যেন এমন কাউকে পেলে আটক করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন।
অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতির পর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে এই বাড়িতে দুই দফায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এখন মূলত দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটার কঙ্কাল। কিন্তু সেটিকেও সার্বক্ষণিকভাবে পুলিশি পাহারায় রাখতে হয়।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা একটি নিরীহ আন্দোলন সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন এবং একপর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেওয়ায় আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটলেও, তার পিতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত এই ঐতিহাসিক বাড়িটি কেন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হলো—সেটি বিরাট প্রশ্ন।
যারা এই বাড়িতে বারবার আক্রমণ চালিয়েছেন তাদের যুক্তি হলো, এই বাড়িকে কেন্দ্র করেই আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ খুঁজছে। তারা এটিকে আওয়ামী লীগের ‘মক্কা’ বলেও অভিহিত করেন।
প্রশ্ন হলো, দুই দফায় বুলডোজার দিয়ে আক্রমণ চালিয়েও বাড়িটাকে কেন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া সম্ভব হলো না? এই ধ্বংসস্তূপটিকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে বেষ্টিত রাখতে হচ্ছে কেন? বছরের দু-একদিন এখানে কিছু লোক জড়ো হলে বা শ্রদ্ধা জানালেই আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসবে—বিষয়টা কি এত সহজ? আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসা কি একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির ওপর নির্ভর করে?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের ৪(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখনও বাংলাদেশের জাতির পিতা—যার প্রতিকৃতি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির কার্যালয়সহ সকল সরকারি, আধা-সরকারি অফিসে প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ কেউ এটা অমান্য করলে সেটি সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে। সংবিধান সংশোধন করে এই বিধান বাতিল না করা পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা—এটিই বাস্তব।
আবার সংবিধানে তার এই স্বীকৃতি থাকা না থাকার ওপরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং স্বাধিকার আন্দোলনে তার ভূমিকা ম্লান হয়ে যাবে কি না, সেটি অন্য তর্ক। কিন্তু সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীগণ শপথ নেওয়ার সময় যে সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের নিশ্চয়তা দেন—সেই সংবিধানের কোনো বিধান অমান্য করার সুযোগ তাদের নেই। কিন্তু চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই সংবিধান অমান্য করা, বিদ্যমান সংবিধানকে ‘মুজিববাদী সংবিধান’ আখ্যা দিয়ে এর কবর রচনা করা ও এই সংবিধান ছুড়ে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো দেড় বছর সংবিধান নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিষোদ্গার করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও শপথ গ্রহণের সময় এই সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের নিশ্চয়তা দিলেও উপদেষ্টা মাহফুজ আলম নিজে বঙ্গভবন থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি নামিয়ে দিয়ে ফেইসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন এবং শূন্য দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে সেটি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেছেন। এটি স্পষ্টত সংবিধানের লঙ্ঘন। কেননা, সংবিধানে যতক্ষণ পর্যন্ত ৪(ক) অনুচ্ছেদ বিদ্যমান থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ছবি না টানানো এবং তার কোনো ধরনের অবমাননার সুযোগ নেই।
তবে শুধু সরকারি অফিস থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি নামিয়ে ফেলাই নয়, বরং ১৫ অগাস্ট তার মৃত্যুবার্ষিকীতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হয়েছেন অনেকেই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অভ্যুত্থানের পরে দেড় বছর এবং নির্বাচিত সরকারের ছয় মাস পরেও সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া মানুষের চেয়ে তাদের প্রতিহত করতে চাওয়া লোকের সংখ্যা অনেক বেশি!
সবশেষ গত ১৫ অগাস্ট এখানে শ্রদ্ধা জানাতে আসা অর্ণব দাস নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশ। এ সময় এক সাংবাদিক ও এক রিকশাচালকের ওপর ‘মব’ চালায় ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দেওয়া কয়েকজন যুবক। রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম (এসডিএফ) নামে একটি সংগঠনের সদস্যসচিব আ ন ম আয়াসের নেতৃত্বে এদিন সকাল থেকে একদল যুবক ৩২ নম্বরের প্রবেশ সড়কে অবস্থান নেন। কাউকে সন্দেহ হলে তাকে মারধর করেন। বেলা পৌনে ১২টার দিকে ৩২ নম্বরের প্রবেশ সড়কের মুখে একজন রিকশাচালক তার মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। একপর্যায়ে আয়াস ওই রিকশাচালকের কাছে যান এবং তার ফোন চেক করেন। এ সময় তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ উঠেছে, এ সময় ঘটনাস্থলের পাশে পুলিশ, এপিবিএন সদস্য ও গোয়েন্দা পুলিশের অসংখ্য সদস্য থাকলেও তারা কেউ এগিয়ে আসেননি এবং আয়াস ও তার লোকজনকে নিবৃত্ত করেননি। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা পুলিশকে প্রশ্ন করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, তারা বিষয়টা দেখছেন। আ ন ম আয়াস সাংবাদিকদের বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা যাতে কোনো অপতৎপরতা করতে না পারে, সেজন্য তারা অবস্থান করছেন।
পুলিশের সামনে মানুষের মোবাইল তল্লাশি ও মারধর করা এবং উল্টো মারধরের শিকার মানুষকে আটক করার এসব ঘটনা কি অভ্যুত্থান-পূর্ব বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মকাণ্ডই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে না? রাজনীতি যদি সেই একই বৃত্তে ঘুরতে থাকে, তাহলে একটি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে বিপুল মানুষের প্রাণহানি কী অর্থ বহন করে? এখনও যদি প্রতিপক্ষ দমনের একই কায়দা চলতে থাকে এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো আগের মতোই সরকারের অনুগত বাহিনী হিসেবে কাজ করে—তাহলে অভ্যুত্থানের পরে যে ‘সংস্কার’ বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলা হলো—সেই সংস্কার কোথায় হলো বা আদৌ এই দেশে কোনো সংস্কার সম্ভব কি না—সেই প্রশ্ন তোলাই সংগত।
এদিন বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকীর কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীর তোপখানা রোডে বাংলাদেশ জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান নেয় পুলিশ। দলটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, “অনুষ্ঠান শুরুর আগে থেকে কার্যালয়টি দখল করে রাখে পুলিশ। রাজনৈতিক দলের অফিসে পুলিশ দিয়ে কর্মসূচি পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনা বিগত ফ্যাসিবাদের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।”
একই দিন ১৫ অগাস্ট চট্টগ্রামের ডবলমুরিং মনসুরাবাদ ওয়াপদা কলোনিতে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী পালনের আয়োজন থেকে পাঁচ নারীসহ ১৫ আইনজীবীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া দুই নারীকেও ৬ মাস আগের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের এক মামলায় কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত।
প্রশ্ন হলো, সংবিধান-স্বীকৃত জাতির পিতা তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতিকে শ্রদ্ধা জানানো কী করে সন্ত্রাসী কাজ হয় এবং এই ‘অপরাধে’ কী করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কাউকে কারাগারে পাঠানো হয়? এই মুহূর্তে দেশ যে সংবিধান দ্বারা পরিচালিত, সরকার কি সেটি স্থগিত করেছে? অভ্যুত্থানের পরে সংবিধান স্থগিত করার দাবি উঠেছিল। বিপ্লবী সরকার গঠনের দাবিও ছিল। কিন্তু তার কোনো কিছুই সম্ভব হয়নি। যদি না হয়ে থাকে, তাহলে এখন নির্বাচিত সরকারের আমলে কী করে এই ধরনের তৎপরতা চলে—সেই প্রশ্ন জনমনে আছে।
প্রশ্ন হলো, সরকার কি কোনো পরিপত্র জারি করে ১৫ অগাস্টের কর্মসূচি বা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানানো নিষিদ্ধ করেছিল, বা এই ধরনের নির্দেশনার জারির আইনি এখতিয়ার কি সরকারের আছে? নেই বলেই কি এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যাতে সেখানে কেউ গেলেই মবের শিকার হয়? অর্থাৎ সরকার বা সরকারি দল নিজেরা কিছু না করলেও অন্যদেরকে এখানে মব সৃষ্টির অনুমতি দিয়ে রেখেছে কি না—সেই প্রশ্নটি উঠছে। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পরেই সালাহউদ্দিন আহমদ বেশ জোর দিয়ে বলেছিলেন, দেশে মব কালচার শেষ। তাহলে কি বিষয়টায় এমন যে, কিছু কিছু মব বৈধ?
মনে রাখতে হবে, যদি আওয়ামী লীগের রাজনীতি দেশে নিষিদ্ধও হয়; যদি সংবিধান সংশোধন করে বঙ্গবন্ধুর জাতির পিতার স্বীকৃতি বাতিল করাও হয়—তারপরও তার মৃত্যুবার্ষিকীতে এই দেশের মানুষের শোক পালনের অধিকার থাকবে। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠেও কেউ যদি বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চায়, সেই অধিকার প্রতিটি নাগরিকের থাকার কথা। রাষ্ট্র যেমন কোনো বিশেষ ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নাগরিকদের বাধ্য করতে পারে না, তেমনি কারো শোক পালনে বাধাও দিতে পারে না। এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে দায়ী করে যদি তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়, তারপরও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কোনো আয়োজনে বাধা দেওয়া বা কেউ বাধা দিলে তাতে সমর্থন দেওয়ার কোনো সুযোগ রাষ্ট্রের নেই।
শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগের অপরাধের দায় মৃত মুজিবের নয়। মৃত মুজিব এই দেশের কোটি মানুষের কাছে অমর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনে তার কী ভূমিকা—সেটি ইতিহাসের পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ। নতুন করে যত বয়ান তৈরি করা হোক না কেন, গত ৫৫ বছরে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে হাজার হাজার বই ও প্রবন্ধ লিখিত হয়েছে, যেসব গবেষণা হয়েছে—সেখানে শেখ মুজিবই প্রধান চরিত্র, বাকিরা পার্শ্বচরিত্র। কিন্তু পার্শ্বচরিত্রদের মহিমান্বিত করতে গিয়ে মূল চরিত্রকে আড়াল করা তথা ইতিহাস থেকে তার নাম মুছে দেওয়ার চেষ্টা নিতান্তই বালখিল্যতা। এভাবে ইতিহাস নির্মিত হয় না। বরং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধিকার আন্দোলনে যার যে অবস্থান—সেটি এরই মধ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসে অনেক নতুন উপাদান যুক্ত হতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
আমীন আল রশীদ সাংবাদিক ও লেখক। ই-মেইল: aminalrasheed@gmail.