Published : 01 Mar 2026, 05:13 PM
একজন কিশোরী, যে দুই সপ্তাহ আগে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাকে যখন ধর্ষকরা তার বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল, তখন তার মনের অবস্থা কেমন ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর সবার অনুমেয়। ভয়ে নিশ্চয়ই মেয়েটির পিলে চমকে উঠেছিল। তার ওপর ফের পাশবিক নির্যাতন চলবে—হয়তো এটা সে বুঝেই গিয়েছিল। কিন্তু তার করার কিছুই ছিল না। হয়তো বাঁচার জন্য সে ধর্ষকদের হাঁতে-পায়ে ধরেছিল। ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় করেছিল।
বলছিলাম নরসিংদীর মাধবদী উপজেলায় দলবদ্ধ ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার আমেনা আক্তারের (১৫) কথা। ২৬ ফেব্রুয়ারি সেখানকার একটি সরিষা ক্ষেত থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচানো তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
পেট বাঁচাতে এসে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার এই পোশাক শ্রমিক সম্ভ্রম হারালেন। প্রাণটাও হারালেন। তার এই হত্যা-ধর্ষণ কথিত সভ্য সমাজের গায়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করল। পুরো মানবজাতির গায়ে যেন কলঙ্কের দাগ লাগল। এই দাগ তোলার কেমিকেল কী? নেই। এই দাগ কখনো যাবে না। লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ প্রশাসন, সুশীল সমাজ, বিভিন্ন সংগঠন নড়েচড়ে বসেছে। প্রধান অভিযুক্ত নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দোষীদের শাস্তি দাবিতে কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। বিচারও হবে। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া শেষ হতে কতদিন লাগে—সেটাই বড় কথা।
প্রেমের নামে ফাঁদ, ধর্ষণ ও হত্যা: মামলায় আমেনার মা ফাহিমা বেগম গুরুতর অভিযোগ করেছেন। মেয়েটিকে আসলে প্রেমের ফাঁদে ফেলেছিল নূরা। মামলায় তিনি অভিযোগ করেছেন তার মেয়ের সঙ্গে নূরার ‘প্রেমের সম্পর্ক’ গড়ে ওঠে। তাকে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে নিজের বাসায় নিয়ে যেত নূরা। ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে ‘পরিবারের অগোচরে ফুসলিয়ে’ তার মেয়েকে মহিষাসুরা ইউনিয়নের কোতোয়ালিরচর হোসেন বাজারে চৈতি টেক্সটাইল মিলের পেছনে নিয়ে যায় সে। সেখানে আগে থেকেই এবাদুল্লাহ (৪০), হযরত আলী (৪০), গাফফারসহ (৩৭) কয়েকজন ছিল। তারা দলবেঁধে কিশোরীকে ধর্ষণ করে এবং ঘটনা কাউকে না জানানোর জন্য হুমকি দেয়। মেয়েটি ঘটনাটি পরিবারকে জানায়নি। কিন্তু ঘটনাটি চাপাও থাকেনি। স্থানীয়রা বিষয়টি জেনে যায়। তাদের একজনের কাছ থেকে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন মা। পরে মেয়েটি ঘটনা স্বীকার করে।
মা ফাহিমার অভিযোগ, সাবেক ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা আহাম্মদ দেওয়ান বাড়ি এসে তাকে বলেন—বিষয়টি পুলিশকে জানানো যাবে না। তারাই এর বিচার করবেন। কিন্তু আসামিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ধর্ষণের কোনো বিচার না করে তারা বাদীর (মেয়েটির মা) পরিবারকে এলাকা ছেড়ে যেতে বলেন। এরপরও তারা এলাকায় ছিলেন। এতে আসামিরা ক্ষুব্ধ হন। বাদী আতঙ্কের মধ্যে মেয়েকে তার বোনের বাসায় পাঠানোর চিন্তা করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে বাদীর স্বামী, মেয়েটির সৎ বাবা কিশোরী মেয়েকে নিয়ে রওনা হন। কোতোয়ালীরচর বড়ইতলার তিন রাস্তার মোড়ে পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে কয়েকজন তাদের পথরোধ করে। তখন নূরা বিয়ে করার কথা বলে কিশোরীকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। কিশোরীর বাবা প্রতিবাদ করলেও তারা শোনেনি। কিশোরীকে তারা মাঠের প্রান্তের দিকে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় কিশোরীর মা নয় জনকে আসামি করে মামলা করেন। আসামিদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই সমাজ, এই দেশ যে নারীদের জন্য নিরাপদ না—তা আবারও প্রমাণ হলো নরসিংদীর মাধবদীর ওই ঘটনায়। আমেনা হত্যা-ধর্ষণ নিয়ে যখন সারাদেশে তোলপাড় চলছে; ঠিক সেই সময়েই পাবনার ঈশ্বরদীতে জমিলা আক্তার (১৫) নামে এক কিশোরীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে তার দাদি সুফিয়া খাতুনকে (৬৫)। ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রাম থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছেন ঈশ্বরদী থানার ওসি মো. মমিনুজ্জামান।
স্থানীয়দের ধারণা—নাতনিকে তুলে নিতে বাধা দেওয়ায় কুপিয়ে খুন করা হয় বৃদ্ধাকে। আর ধর্ষণ শেষে মেয়েটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হয় সরিষা ক্ষেতে। এসব ঘটনা কিছুদিন আমাদের মনে থাকবে।
এরপর আরেকটি ঘটনা ঘটলে এগুলো বেমালুম ভুলে যাব। এই কষ্ট-যন্ত্রণা বয়ে বেড়াবে কেবল ভুক্তভোগী এবং তার পরিবার।
দ্রুত বিচার, শাস্তি নিশ্চিত হোক: মাগুরার শিশু আছিয়ার কথা মনে আছে? গত বছরের ৬ মার্চ বোনের শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় আট বছরের মেয়েটি। ৮ মার্চ শিশুটির মা মাগুরা সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। পৈশাচিক ঘটনাটি সারাদেশকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দেয়। বিচারের দাবিতে সোচ্চার মানুষগুলো ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন করেন তারা। অভিযুক্তদের বাড়িতে আগুন দেয় জনতা। অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে অতিদ্রুত এই মামলার বিচার শেষ করার আশ্বাস দেওয়া হয়। ১৩ মে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিচারক এম জাহিদ হাসান রায় ঘোষণা করেন। মেয়েটির বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্যে দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। গত ২৭ এপ্রিল মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। ছুটির দিন বাদে টানা শুনানি চলেছে। আছিয়া ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডের মতো আমেনা-জমিলা ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডের বিচারও দ্রুত শেষ হোক। ২১ দিন নয়, সম্ভব হলে আরও আগে এই দুই মামলার বিচার কাজ শেষ করা হোক। শুধু রায় দিলেই হবে না। রায় কার্যকর করতে হবে। আছিয়ার ধর্ষক-খুনি হিটু শেখের সাজা কার্যকর হয়নি এখনো। কবে কার্যকর হবে, তাও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন সদিচ্ছা: মামলা দ্রুত শেষ করতে সবার আগে প্রয়োজন সদিচ্ছা। এই সদিচ্ছাটা সবার আগে থাকতে হবে রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র চাইলেই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব। মাগুরার শিশু আছিয়া হত্যা-ধর্ষণের বিচার দ্রুত শেষ হয়েছে রাষ্ট্রের সদিচ্ছার কারণেই। পুলিশ অতিদ্রুত চার্জশিট দিয়েছে। চার্জ গঠনসহ, সাক্ষ্য গ্রহণ, শুনানি, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন—সবই হয়েছে দ্রুত। ছুটির দিন ব্যতীত টানা চলেছে আদালতের কার্যক্রম। আসামি পক্ষের আইনজীবীদেরও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে সহযোগিতা করতে হবে। অহেতুক কালক্ষেপণ করা যাবে না। অনেক আইনজীবী মামলায় দীর্ঘসূত্রতা করতে নানা অজুহাতে সময় আবেদন করতে থাকেন। এটা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। ‘বিচার বিলম্বিত করা মানে ন্যায়বিচার অস্বীকার করা।’ যদি কোনও আহত পক্ষের জন্য আইনি প্রতিকার বা ন্যায়সঙ্গত প্রতিকার পাওয়া যায়, কিন্তু সময়মতো তা না আসে, তাহলে তা কার্যকরভাবে কোনও প্রতিকার না পাওয়ার সমান। এই কথাটিরও প্রমাণ মেলে আরেকটি ধর্ষণ-অপহরণের ঘটনায়। মাগুরার শিশুটির ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ড নিয়ে যখন সারাদেশ উত্তাল, ঠিক তার আগে বরগুনায় এক কিশোরী অপহরণ-ধর্ষণের শিকার হয় এবং মামলা করায় তার বাবা খুন হয়। কিন্তু সেই ঘটনা অনেকটা চাপা পড়ে গেছে। বিচার শুরু হয়েছে কি না, জানা যায়নি। বরগুনার শিশুটি অপহরণ-ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪ মার্চ রাতে। ৫ মার্চ সকালে বাড়ির পাশের ডিসিপার্ক সংলগ্ন জায়গা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর জিজ্ঞাসা করলে কিশোরী জানায়, সৃজীব (আসামি) তাকে মুখ চেপে ধরে অপহরণ করে নিয়ে নির্যাতন চালায়। এ ঘটনায় ৫ মার্চ শিশুটির বাবা মামলা করেন। এই অপহরণ-ধর্ষণ মামলার ধার্য তারিখ ছিল ১২ মার্চ। ১১ মার্চ রাত ১টার দিকে বাড়ির পেছনে তার লাশ পাওয়া যায়। ঘটনার পর শিশুটির মা পরিবারের সব সদস্যর মৃত্যু প্রার্থনা করছিলেন বলে সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়। পরে অবশ্য বিএনপি-জামায়াত এবং স্থানীয় কিছু রাজনীতিক শিশুটির পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেয়। কিছু আর্থিক সহযোগিতাও তাদের করা হয়। ব্যাস, এ পর্যন্তই। রাষ্ট্র চায়নি বলেই এই কিশোরী ধর্ষণের দ্রুত বিচার পায়নি।
সচেতনতা জরুরি: আবার আসি আমেনা প্রসঙ্গে। তার বাবার নাম হাবিব মিয়া। ১০ বছর আগে তার মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়। এক ছেলে ও মেয়ে নিয়ে মা ফাহিমা পাড়ি জমান নরসিংদীতে। তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এই সৎ বাবা আশরাফ হোসেনের হাত ধরেই কিশোরী আমেনা নিরাপত্তার খোঁজে ছুটছিল। কিন্তু যম তার পিছু ছাড়েনি। ফাহিমা অভিযোগ করেছেন, তার মেয়ের সঙ্গে অভিযুক্ত নূরার ‘প্রেমের সম্পর্ক’ ছিল। তাকে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে নিজের বাসায় নিয়ে যেত নূরা। বিয়ের প্রলোভন দিয়ে মেয়েটিকে বাসায় নিয়ে নূরা কী করতো— তা কী মেয়েটির মা অনুমান করতে পারেননি? অবশ্যই পেরেছেন। এতে তার সমর্থন ছিল বলেই মনে হয়। আসলে তিনি মেয়েটিকে বোঝা মনে করতেন। হয়তো ভেবেছিলেন কোনোমতে ‘বিয়ে’টা হলেই তিনি বেঁচে যান। আসলে নূরা যে ফাঁদ পেতেছিল, তা তিনি টের পেয়েছেন অনেক পরে। ততক্ষণে মেয়ের প্রাণটাও শেষ। আপনার মেয়ে কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে—এটা জানা জরুরি। সন্দেহজনক চলাফেরা হলে তাকে সাবধান করতে হবে। মনে রাখতে হবে— একটি দুর্ঘটনা সারাজীবনের কান্না।
ধর্ষণবিরোধী প্রচারণা দরকার: গত বছরের প্রথম ৮ মাসে দেশে ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ জন দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং ২৯ জন প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণ বা দলবদ্ধ ধর্ষণের পর ১৫ শিশু খুন হয়েছে ও ৫ জন আত্মহত্যা করেছে। কন্যাশিশুর ওপর নির্যাতন ও সহিংসতার চিত্র পর্যবেক্ষণবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম। গত বছরের ৪ অক্টোবর এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ধর্ষণ মহামারী রূপ নিয়েছে। সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ষণবিরোধী প্রচারণা চালানো দরকার। এইডস বা এসিড নিক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রচারণার আদলে এই প্রচারণা চালানো যেতে পারে। ধর্ষণের আইন ও শাস্তি সম্পর্কে মানুষকে অবগত করা জরুরি। এতে মানুষ সচেতন হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদয় আচরণ করতে হবে। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাদের সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে।