Published : 11 Feb 2026, 08:19 AM
এই নির্বাচন তরুণ প্রজন্মের রক্তে কেনা ও তাদের স্বপ্নের সীমিত অর্জন। চব্বিশের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে অভূতপূর্ব আবেগ বন্যার মতো ছড়িয়ে পড়েছিল, তা বাংলার কূলকিনারা ছাড়িয়ে গিয়ে জীবন ও সম্পদের ক্ষতিসহ নানা অস্থিরতার জন্ম দেয়। এর পরিণতিতে ঘটেছে বহু আশা ও স্বপ্নভঙ্গ। সেই বাস্তবতায় নির্বাচন একটি উত্তরণের পথ দেখাতে পারে বলেই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু দেশীয় নয়, এই নির্বাচনের একটি বৈশ্বিক—অন্তত দক্ষিণ এশীয়—প্রেক্ষাপট রয়েছে।
গত কয়েক বছরে জেন–জি প্রজন্মের একের পর এক অভ্যুত্থানের ফলে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষমতার রদবদল ঘটেছে। এসব ঘটনার সাধারণ প্রেক্ষাপট প্রায় এক—বৈষম্য ও বেকারত্ব ঘিরে জমে ওঠা গভীর ক্ষোভ। দীর্ঘদিন একচেটিয়া ক্ষমতায় থাকার ফলে শাসকগোষ্ঠীর সন্তান–স্বজনদের জীবনযাপন ও সাধারণ মানুষের বাস্তবতার মধ্যে যে তীব্র ফারাক তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে ওঠে। এই দেশগুলোতেই তরুণ প্রজন্ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো—এসব দেশে জেন-জিদের আন্দোলন সংগঠিত ও বিস্তৃত করতে সামাজিক মাধ্যম একটি কার্যকর মঞ্চ হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাইরি উডস (Ngaire Woods) তার ’জেন-জি ইজ মেকিং পলিটিক্স হোপফুল এগেইন’ শীর্ষক লেখায় এভাবেই সমকালীন বৈশ্বিক পরিবর্তনের ধারাটি ব্যাখ্যা করেছেন। (প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫)
এসব আন্দোলনে আমূল বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তা বাস্তবায়নের জন্য সুসংগঠিত প্রতিজ্ঞা ও সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব ছিল। ফলে কোথাও প্রকৃত অর্থে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেনি। এর পেছনে একটি বিস্তৃত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট, কোভিড-১৯ মহামারী, ইউক্রেইন যুদ্ধ, উন্নত দেশগুলোতে অভিবাসনের চাপ—এসব মিলিয়ে ধনী ও দরিদ্র উভয় দেশের শ্রমজীবী মানুষ ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় এসব অভ্যুত্থানে তাদের অংশগ্রহণ ও সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
উডস লিখেছেন, “তবু জেন-জি আন্দোলনকারীরা রাজনৈতিক কাঠামোগুলো ধ্বংস করতে চায়নি। বরং তারা কাজের সুযোগ সৃষ্টি, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং পরিবেশ রক্ষায় বিনিয়োগ চায়। এগুলো বাস্তবসম্মত দাবি, আর সেগুলো পূরণের উপায়ও আছে।”
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাও মূলত একই রকম। ওই একই দিনে ‘জ্যাকোবিন’ সাময়িকীতে সাজাদ হামীদ ও রেহান কাইয়ুম মীর লিখেছেন, “অধ্যাপক ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ও নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। সাময়িক ও নিরপেক্ষ সরকার হিসেবে দায়িত্ব নিলেও, অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ, নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে এই সরকার দ্রুতই বিতর্কের মুখে পড়ে। একই সঙ্গে তাদের সংস্কার উদ্যোগ সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার চাপের মধ্যে পড়ে যায়।”
“বাস্তবে অন্তর্বর্তী সরকারের মনোবাঞ্ছা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুবিধাভোগীদের স্বার্থের সঙ্গে মিলে যায়। বৈশ্বিক ঋণদাতা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি গতানুগতিক অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ও বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার কাজটি তাদের কাছে অগ্রাধিকার পায়।
“যে পোশাকশিল্পে চল্লিশ লাখের বেশি মানুষ কাজ করে এবং যা বাংলাদেশের রপ্তানিবাণিজ্যের প্রধান চালিকাশক্তি, সেটি সংস্কারের বাইরে রয়ে যায়। এই খাতের মুনাফা এখনো মূলত কম মজুরি ও শ্রমিক স্বার্থরক্ষার দুর্বল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল—যে বাস্তবতা ২০২৩ সালে পোশাকশিল্প শ্রমিকদের আন্দোলনের জন্ম দেয় এবং পরবর্তীকালে বারবার ধর্মঘট ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে চলেছে।” দ্য আপরাইজিংস ইন বাংলাদেশ উইল নট বি স্টপড, জ্যাকোবিন, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫)
দেশের এই সংকট মোকাবিলায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করা দলগুলো যেমন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, তেমনি বামপন্থী শক্তিগুলোর ভূমিকাও হতাশাজনক। ধর্মপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো অনেক ক্ষেত্রে সংকট নিরসনের বদলে অস্থিরতার আগুনে আরও ঘি ঢেলেছে। অন্যদিকে বামপন্থী দলগুলো শ্রমজীবী মানুষকে সংগঠিত করে কোনো কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি। মূলত উভয় পক্ষের কৌশলই জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার অনুকূল নয়। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অনুরূপ দলগুলো বাংলাদেশের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়ে প্রধান শক্তি হয়ে ওঠার চেষ্টা চালালেও, বাস্তবে তা সংকটকে আরও গভীর করেছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনজীবনে ইসলামী জীবনবোধ ও আদর্শের সঙ্গে যুক্ত যে ঐতিহাসিক উদারতা, সহনশীলতা এবং অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সহমর্মিতা বিদ্যমান ছিল, তা ভেঙে দিয়ে এক ধরনের অসহিষ্ণু নতুন জাতীয় পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা চলমান রয়েছে। অন্যদিকে বামপন্থী দলগুলো যারা শ্রমিক ও কৃষককে নিজেদের শক্তির ভিত্তি বলে দাবি করে, বাস্তবে সেই সামাজিক ভিত্তির কার্যকর উপস্থিতি স্পষ্ট নয়। তবে এই সংকট কেবল বাংলাদেশের বামপন্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বব্যাপী বাম রাজনীতির একটি গভীর সংকটেরই প্রতিফলন।
এই অস্থির পরিস্থিতিতে দেশ কার্যত এক ধরনের নেতৃত্ব শূন্যতায় পড়ে যায়। সেই শূন্যতাই তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসাকে সময়ের দাবি হিসেবে সামনে নিয়ে আসে। ফলে তার প্রত্যাবর্তনে দেশজুড়ে এক ধরনের স্বস্তির আবহ তৈরি হয়। যে জাতীয় ঐক্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তার এক প্রতীকী রূপ হিসেবেই তাকে দেখতে শুরু করে অনেকে।
তারেক রহমানের বক্তব্য, ভাষণ ও সামগ্রিক আচরণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করেছে। এটি ছিলো বর্তমান বিএনপির এক বিরাট পুঁজি। খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের গভীর শ্রদ্ধা ও বিএনপির প্রতি মানুষের এই আস্থা তারেক রহমানের জন্য এক বিরাট সৌভাগ্য। তবে তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়েছে মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বে এই গুণগত পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করা যা বাস্তবে সম্ভব হয়নি।
মনে রাখা জরুরি, দুর্নীতির প্রতি তীব্র অসহিষ্ণুতা এই তরুণ প্রজন্মের অন্যতম মৌলিক মানসিক বৈশিষ্ট্য। সে কারণেই চব্বিশের সফল আন্দোলনকারীদের মধ্যেও দুর্নীতির প্রশ্নে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, চব্বিশের তুখোড় নেতানেত্রীদের কেউ কেউ নানা ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। আর্থিক স্বার্থ, ক্ষমতার লোভ কিংবা আদর্শগত স্খলন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কিছু ব্যক্তির বিচ্যুতি তাদের সহযোদ্ধা ও বন্ধুদের হতাশ ও দিশাহীন করে তুলছে। তবু যে বিশাল প্রজন্ম একটি সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে চব্বিশে জীবন বাজি রেখেছিল, তারা সেই স্বপ্ন এখনও বুকে লালন করে চলেছে। দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের কাজ হলো এই স্বপ্নের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করে, তা বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করা। সমগ্র নির্বাচনি প্রচারপর্বে ধর্মপন্থী, বামপন্থী ও মধ্যপন্থী—সব রাজনৈতিক শক্তির লক্ষ্যই ছিল এই স্বাপ্নিক তরুণদের নিজেদের দলে পাওয়া।
এদের মন জয় করা সম্ভব রাজনীতিতে কেবল নৈতিকতামুখী পরিবর্তন সাধন করে— চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করে বা যথাসম্ভব কমিয়ে এনে। যেসব দল ধর্মের পরিচয় ব্যবহার করে রাজনীতি করছে তাদের এক্ষেত্রে সুবিধা বেশি, যেহেতু ধর্মের আকর্ষণ ক্ষমতা অনেক। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি রাজনৈতিক মাঠকে অসমতল করে তোলে, প্রতিযোাগী দলগুলোর মাঝে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। ফলে যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে না তারা অসুবিধার মুখে পড়তে পারে। কারণ একই জনগোষ্ঠির মাঝে রাজনীতি করেও এবং একই বা আরও ভাল রাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা সত্ত্বেও কেবল নামের সঙ্গে ধর্ম না জুড়ে দেওয়ার ফলে তারা মানুষের আবেগীয় দুর্বলতা পুঁজি করতে পারে না বা চায় না। নির্বাচনের ফলাফলে এসব প্রভাব বিস্তার করবে সন্দেহ নেই।
তবে নির্বাচনে জয়লাভই একমাত্র বিষয় নয়। বরং আসল দায়িত্ব তার পরে, যা পালন করা তখন সহজ না হয়ে আরও কঠিন হয়ে পড়ে। যথেচ্ছ ক্ষমতা ও দুর্নীতি তখন চারদিক থেকে হাতছানি দেয়। ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে নানা পার্থক্য উসকে দিয়ে জনগণের মাঝে বিভাজন তৈরির ইচ্ছেও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। ক্ষমতায় বসা যত কঠিন, সেখান থেকে নামা হয় আরও কঠিন কারণ নামতে আর ইচ্ছে করে না। ভদ্রভাবে নামার ঘটনা তাই হাতে গোনা। যে গরিব মানুষগুলো ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসায় তাদের কথা আর মনেও থাকে না। রাষ্ট্রকে তখন একটা দুধেল গাই মনে হয়, যত ইচ্ছে ও যেভাবে ইচ্ছে দুইয়ে যাও। কোনোরকম উৎপাদনী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও এবং সমাজে একপয়সা অবদান না রেখেও এই দুধেল গাইয়ের বাঁটে হাত রেখে বা যারা হাত রেখেছে তাদের সর্বশেষটির লেজ ধরেও অঢেল সম্পত্তির মালিক হওয়া যায়। মানুষ সেসব জানে, যেকোনো অভ্যুত্থানের পরে সাবেক ক্ষমতাসীন ও তাদের দোসরদের প্রতি মানুষের আক্রোশে তা প্রকাশ পায়।
দেশের মাটিতে নেমে তারেক রহমান যে ভাষণ দিয়েছেন তা আশা জাগিয়েছিল। এরপর এই আশা ধরে রাখাই হয়েছে তার ও তার দলের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর যেই ক্ষমতায় যাক না কেন— এই তরুণ প্রজন্ম জেগে আছে ও নতুন প্রজন্ম আসবে জেগে থাকতে—দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবজি ও জাতিগত বিভাজনের চিরাচরিত খেলা বন্ধ না করলে ক্ষমা পাবে না কেউ। আর ক্ষমতায় যারা আসুক তাদেরকে জেন-জিদের এই দুর্নীতির প্রতি অসহিষ্ণুতা ও বৈষম্যবিরোধী আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করে রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন আনতেই হবে।