Published : 09 Jan 2026, 05:33 PM
ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও শীর্ষ নেতৃত্বসহ বেশিরভাগ পদে জয়ী হয়েছেন শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা। পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্র শিবিরের একচেটিয়া জয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্ন সামনে এসেছে। শিক্ষার্থীরা কি শিবিরকেই সবচেয়ে ভালো বিকল্প মনে করেছে? নাকি এর পেছনে আছে দীর্ঘদিনের রাজনীতি, ভয়, শূন্যতা আর সংগঠিত কৌশলের গল্প? কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোট গণনায় অতিরিক্ত দেরি হওয়ায় নির্বাচন নিয়ে কারসাজির অভিযোগও আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একইভাবে কারসাজি কি সম্ভব?
এই প্রশ্নগুলো শুধু ছাত্র রাজনীতির নয়, এগুলো আমাদের সামগ্রিক রাজনীতির দিকেও আঙুল তোলে। বিশেষ করে এই প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ—গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পরও, যখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ডানপন্থিদের দাপটে নারী, সংখ্যালঘু, মুক্ত মতপ্রকাশ এবং সাংস্কৃতিক চর্চা চাপে আছে, তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন শিবিরকে ভোট দিচ্ছে? তবে কি সত্যিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমর্থনের পালাবদল ঘটল?
হ্যাঁ, পালাবদল যে ঘটেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লেখালেখি, মত-মন্তব্য, কনটেন্ট দেখলেও তা বোঝা যায়। এমন রাজনৈতিক বাঁক পরিবর্তনের কারণ হিসেবে সঙ্গত কারণেই সবার আগে আওয়ামী লীগের নাম আসে। আওয়ামী লীগ প্রায় ১৭ বছর টানা ক্ষমতায় ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। যাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মনে করা হয়েছে, তাদের মাঠে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি, কখনো মামলা দিয়ে, কখনো ভয় দেখিয়ে, কখনো সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করে।
এই সময়ে ছাত্রদলসহ অন্য ছাত্রসংগঠনগুলো প্রকাশ্যে কাজ করতে পারেনি। ক্যাম্পাসে কার্যত একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল ছাত্রলীগের। ফলে আওয়ামী লীগবিরোধী যে ক্ষোভ সমাজে জমছিল, তার রাজনৈতিক প্রকাশের জায়গা তৈরি হয়নি। এখানে একটা বড় শূন্যতা তৈরি হয়। এই শূন্যতাই জামায়াত ও ছাত্র শিবির খুব পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়েছে। উল্লেখ্য, গত শতকের আশির দশকে শিবির স্রেফ শক্তি প্রয়োগ ও ভীতি সৃষ্টি করে রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টিকে থাকার চেষ্টা করে। প্রভাব বিস্তারও করে। তখন সংগঠনটির সিগনেচার আইটেম ছিল প্রতিপক্ষের ‘রগ কেটে দেওয়া’ এবং এই ‘রগ কাটা’ রাজনীতি পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য কলঙ্কের বোঝা হিসেবে চেপে বসে। তারা রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে ‘রগ কাটা’ রাজনীতি থেকে সরে এসে নতুন কৌশল গ্রহণ করে। তারা শত্রুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করে আস্তে আস্তে তার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। এরই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের প্রবল প্রতাপের কালে শিবির সরাসরি রাজনীতি না করে গোপন সংগঠনের পথে হাঁটে। তারা প্রকাশ্যে মিছিল-মিটিং না করে নীরবে নিজেদের কর্মী তৈরির ব্যাপারে মনোনিবেশ করে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের ভেতরেই ঢুকে পড়ে তারা। ক্ষমতার দম্ভে থাকা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ এই বিষয়টি বুঝতে পারেনি, বা গুরুত্ব দেয়নি। ফলে কাকের ঘরে কোকিলের বাচ্চা পয়দা হওয়ার মতো করেই ছাত্রলীগের ঘরে অনেক শিবির কর্মী ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে, যাদের কেউ কেউ এখন শিবিরের ভিপি-জিএস বলে আবির্ভূত হয়েছে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠন ক্যাম্পাসে টিকে থাকতে পারেনি। হামলা, মামলা, ভয়ভীতি দেখিয়ে সবাইকে তাড়িয়ে ছাত্রলীগ নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছে। এই বাস্তবতায় ছাত্রদলসহ সবাই প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। একমাত্র শিবিরই আত্মগোপনে থেকেও সংগঠিত ও সক্রিয় ছিল। তারা নানা রকম অরাজনৈতিক ব্যানার, পাঠচক্র ইত্যাদির মাধ্যমে সক্রিয় থেকেছে। যখন কোটাবিরোধী আন্দোলন ধীরে ধীরে জোরালো হয়, তখনও শিবির সরাসরি নিজেদের নাম ব্যবহার করেনি। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সামনে থাকা অনেক নেতাই ছিল ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারের মুখ। কিন্তু বাস্তবে এই ব্যানারগুলোর আড়ালেই ছিল শিবিরের সংগঠন ও পৃষ্ঠপোষকতা। এগুলো মূলত ছিল ঢাল, গোপনে সংগঠিত হওয়ার কৌশল।
শিবিরের রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তাদের মগজধোলাইয়ের ব্যবস্থা। ধর্মকে সামনে রেখে তারা একটি আবেগঘন গল্প তৈরি করে—মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজি। এই ভাষা অনেক তরুণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। একবার কেউ এই সংগঠনে ঢুকে পড়লে, বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। দেশে থাকুক বা বিদেশে—শিবির তার কর্মীর পিছু ছাড়ে না।
তারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে সুদূরপ্রসারী রাজনীতির জাল বিস্তার করে। মেধাবী ও দরিদ্র ছেলেদের বই দেয়, রুটিন বানিয়ে দেয়, মসজিদে নিয়ে যায়। বই পড়তে দেয়। ‘নামাজ শিক্ষা’ দিয়ে শুরু হয়। এরপর একে একে ‘এসো আলোর পথে’, ‘এসো শিবির করি’ জাতীয় বই। বিভিন্ন মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা, নেতাদের বাড়ির বৈঠকখানায় এই গঠনমূলক আলোচনা ও পাঠচক্র চলে। কোনো একদিন মোটরবাইকে করে ‘এক ভাই’ এসে গ্রামের এই শিশুদের জিহাদের গল্প শোনায়। এদের মধ্যে যারা খুবই বিশ্বাসী, অনুগত ও প্রতিশ্রুতিশীল তাদের পড়ালেখার খরচ, হাতখরচ—সব কিছুর ব্যবস্থাও থাকে। ধীরে ধীরে শিবির হয়ে ওঠে তাদের আশ্রয়, ভরসা আর পরিচয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এই ছাত্ররা পায় আরও সুবিধা—মেসে সিট, ভর্তি সহায়তা, টিউশনি, চাকরির যোগাযোগ। অন্যদিকে, ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল পরিচিত হয়ে ওঠে চাঁদাবাজি, দখলদারি আর ফাও খাওয়া একেকটি দুর্বৃত্ত হিসেবে। এই তুলনায় শিবিরের নেতাদের অনেকের কাছে ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ’, ‘ভদ্র’ আর ‘আদর্শিক’ মনে হয়!
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিবিরের রাজনৈতিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। এই দেশে ধর্ম ও ভারতবিরোধিতা এক নেশার নাম। জনপ্রিয় হওয়ার ক্ষেত্রে এটা টনিকের মতো কাজ করে। শিবির এই দুটি বিষয়কে খুব কৌশলে ব্যবহার করে। হারাম-হালাল, বেহেশত, পর্দা—এসব কথা বলে তরুণদের, বিশেষ করে মেয়েদেরও দলে টানার চেষ্টা করা হয়। অনেক মেয়ের কাছে সালাম দেওয়া, ভদ্র আচরণ, ধর্মীয় লেবাস, এসব খুব আকর্ষণীয় লাগে। একাত্তরের ইতিহাস তাদের কাছে ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায়, বিশেষ করে যখন চারপাশ থেকে শোনা যায়—‘আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবসা বানিয়েছে’। ‘ধর্ম ব্যবসায়ী’ কথাটিকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে ‘চেতনা ব্যবসায়ী’ শব্দবন্ধ দিয়ে।
এদেশে রাজনীতি করতে গেলে টাকা লাগে। শিবির ও তাদের মূল সংগঠন জামায়াতের রয়েছে শক্ত আর্থিক ভিত্তি। তাদের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান আছে। শিবির ও জামায়াত কর্মীরা নিয়মিত তহবিলে টাকা দেয়। ফলে সংগঠনের টাকার অভাব নেই। বেকার কর্মীরা জামায়াত পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি পায়। আপদে-বিপদে ভাতা-অনুদানও পায়। জীবনে অনিশ্চয়তা থাকে না।
এই দেশে মাদ্রাসা বৃদ্ধিও শিবিরের রাজনীতি বৃদ্ধির অন্যতম নিয়ামক। অনেক মাদ্রাসা কার্যত শিবির তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিবিরের ভোটও বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বানানো ভিডিও, অডিও, ফটোকার্ড ইত্যাদি ‘হিজাব পরার কারণে নির্যাতন’, ‘ভারতে মুসলমান নিপীড়ন’—এসব ছড়ানো হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। ধর্মীয় বক্তাদের মুখেও এ ধরনের কাহিনির বয়ান থাকে। যা ভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের নিশ্চিহ্ন করে জিহাদি সমাজ গড়ার রাজনীতিকে আরও শক্ত করে। সব মিলিয়ে শিবিরের রাজনীতি অনেক সহজ হয়ে গেছে।
প্রশ্ন হলো—পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই একচেটিয়া জয় কি কেবল ক্যাম্পাস রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর সরাসরি প্রতিফলন পড়বে জাতীয় রাজনীতিতে? বাস্তবতা বলছে, এর প্রভাব জাতীয় নির্বাচনেও পড়বে। পড়বেই। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। এখানকার শিক্ষার্থীরা গ্রাম, মফস্বল ও শহরের পরিবার থেকেই আসে। তারা শুধু নিজেরা ভোট দেয় না, পরিবারের ভেতরে মতামত গঠন করে, রাজনৈতিক আলোচনা চালায়, আত্মীয়-স্বজনকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ যখন শিবিরঘেঁষা হয়ে ওঠে, তখন তার প্রভাব ভোটকেন্দ্র পেরিয়ে সমাজের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি সচেতনভাবে তৈরি করা রাজনৈতিক বয়ান—‘বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে তো বহু বছর ধরে দেখেছেন, এবার অন্তত একবার জামায়াতকে সুযোগ দিয়ে দেখুন।’ এই কথাটি এখন আর প্রান্তিক নয়; এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মসজিদ-মাদ্রাসা, এমনকি পারিবারিক আড্ডাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিনের হতাশা, ক্ষোভ ও বিকল্পহীনতার অনুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে এই বয়ান অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াত যদি জাতীয় নির্বাচনে ভালো ফল করে, সেটাকে কোনো আকস্মিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিই হবে গত এক যুগের বেশি সময় ধরে চলা ভুল রাজনীতির স্বাভাবিক পরিণতি। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, গণতান্ত্রিক চর্চার অনুপস্থিতি, দুর্নীতি, দখলদারিত্ব ও ক্ষমতার অহংকার—ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষকে রাজনীতিবিমুখ ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
এই ক্ষোভের জায়গাতেই জামায়াত-শিবির নিজেদের ‘পরিচ্ছন্ন’, ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ’ ও ‘ভদ্র’ বিকল্প হিসেবে হাজির করছে। বাস্তবতা হলো, যখন মূলধারার রাজনীতি মানুষের আস্থা হারায়, তখন সমাজ বিকল্প খুঁজে নেয়—সে বিকল্প কতটা কল্যাণের বা বিপজ্জনক, তা তখন আর মুখ্য থাকে না।