Published : 03 Mar 2026, 03:53 PM
শিক্ষাকে যদি কেবল একটি পণ্য হিসেবে দেখেন, তবে বাজারের আলু-পটলের মতো লাভ-লোভসানের হিসেব করাটাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে। এতে হয়তো আপনার হিসেবের খাতায় লাভ-ক্ষতি মিলবে, কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত বোধ বা দর্শন অজানাই থেকে যাবে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমরা আজও বহু বছরের পুরনো সেই ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থাকেই নামমাত্র ঘষা-মাজা করে চালিয়ে যাচ্ছি, যা যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
ব্রিটিশ ভারতে আধুনিক একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের দায়িত্ব পেয়েছিলেন লর্ড মেকলে। ১৮৩৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সংসদে তিনি বলেছিলেন, “আমি ভারতের আনাচে-কানাচে ঘুরেও কোনো ভিক্ষুক বা চোরের দেখা পাইনি। এদেশের মানুষের এতটা ধনসম্পদ, নৈতিকতা এতটাই উচ্চস্তরের দেখেছি যে, তাদের শিক্ষা, ধর্মবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে না পারলে আমরা কোনোদিনই দেশটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব না।” তিনি চেয়েছিলেন এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা, যা এদেশের মানুষকে নিজের সংস্কৃতির চেয়ে বিদেশি সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ মানতে শেখাবে এবং তাদের একটি আত্মবিস্মৃত ও পদানত জাতিতে পরিণত করবে।
ইংরেজ সাহেবদের ওই ইচ্ছার প্রতিফলন আজও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় দেখতে পাই। মজার ব্যাপার হলো, তারা নিজের দেশে এই পদ্ধতি অনেক আগেই বদলে ফেললেও আমরা আজও ওই পুরনো পথেই হাঁটছি। আমাদের পড়ালেখার মূল দর্শন এখন দুটি ভুল সূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, “ভালো রেজাল্ট করলেই ভালো চাকরি পাবে,” আর দ্বিতীয়ত সেই সেকেলে কবিতার লাইন, “লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে।” অর্থাৎ, আমাদের শিক্ষার মূল লক্ষ্যই হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবল বৈষয়িক সমৃদ্ধি বা বিলাসিতা অর্জন, প্রকৃত জ্ঞান অর্জন নয়।
কথাটা মিথ্যা নয়, কিন্তু এটা আংশিক সত্য। এমন আংশিক সত্য দিয়ে শেখানোর চেয়ে না শেখানোই ভালো। লেখাপড়ার আরও অনেক গভীর কাজ আছে, সেগুলোকে আমরা অস্বীকার করি এবং ছোটবেলা থেকেই লোভ ঢুকিয়ে দিই। ফলে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, শিক্ষায় পরিবর্তন চাইলেও যখন সত্যিকারের পরিবর্তন আসে, তখন আর মেনে নিতে পারি না। মনে হয় রাত জেগে মুখস্থ করা, পরীক্ষার হলে যত বেশি লিখে শতভাগ নম্বর তোলা—এটাই মেধা, এটাই শিক্ষার সারাংশ। এর বাইরে গেলেই অভিভাবকরা খড়গহস্ত হয়ে তেড়ে আসেন।
কে বোঝাবে এই পড়াশোনা দিয়ে বড়জোর চাকরি পাওয়া যায়, বিসিএস পাস করা যায়। কিন্তু দেশের এত চাকরিজীবীর দরকার নেই। দেশের দরকার একজন বিজ্ঞানী, একজন এপিজে আবদুল কালামের মতো মানুষ, যার হাত ধরে বাংলাদেশ পাল্টে যাবে বিশ্বমানচিত্রে।
এবার আসা যাক মূল বিষয়ে, একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে শিক্ষা কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। কল্যাণ রাষ্ট্র মানে ওই রাষ্ট্র যেখানে সাধারণ মানুষের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকার বহন করে। যেখানে সকলেই নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। পৃথিবীতে এমন কল্যাণ রাষ্ট্র সংখ্যায় খুব কম। উন্নত বিশ্বে এই ধারণা অনেকাংশে বাস্তবায়িত, যা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এখনো অস্পষ্ট।
এখানে শিক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, কারণ শিক্ষাই পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর ও স্থায়ী হাতিয়ার। কোনো রাষ্ট্রকে কল্যাণ রাষ্ট্র বানাতে হলে প্রথমে তার মানুষকে বদলাতে হয়। এটা শারীরিক বা আকৃতিগত পরিবর্তন নয়, আত্মিক পরিবর্তন। শিক্ষার কাজই মানুষের আত্মিক বন্ধনকে মজবুত করা এবং শৃঙ্খলার মধ্যে আনা।
মানুষ যে নিজেকে মানুষ হিসেবে চিনতে শেখে, সেটা তৈরি করে শিক্ষা। বইয়ের শিক্ষা হোক বা হাতে-কলমে সামাজিক শিক্ষা—যা মানুষকে কল্যাণমুখী করে তোলার প্রধান অস্ত্র। কিন্তু আমরা শিক্ষাকে কখনো সেভাবে ব্যবহার করতে শিখিনি, বরং উল্টো পথে চালিয়েছি। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা শিক্ষাকে কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানিয়ে ফেলেছি। এর ফলে আমরা ‘শিক্ষিত মানুষ’ নয়, বরং বিপুল সংখ্যক ‘শিক্ষিত অমানুষ’ তৈরি করছি, যা একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
কল্যাণ রাষ্ট্রের পথে এই ঝুঁকি থাকা উচিত নয়। আমরা নিজেদের মঙ্গলের জন্য বাজেটের আকার দ্বিগুণ-তিনগুণ করছি, কিন্তু শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়াতে হিমশিম খাই। অথচ এখানেই সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ দরকার। শিক্ষার প্রশ্ন এলেই সবাই একবাক্যে বলে, ব্যয় আরও বাড়ানো উচিত। কিন্তু তারপরও আগের অবস্থাই থেকে যায়। বছর যায়, চাহিদা বাড়ে, কিন্তু বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কমে। এ এক রহস্য!
মানুষকে সম্পদে পরিণত করে রাষ্ট্রের কাজে লাগাতে হলে শিক্ষাদান পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা এমন হতে হবে যাতে বারবার ঘষামাজার দরকার না পড়ে। আমাদের দেশে বছরে দু-বারও নতুন পদ্ধতি চালু করার নজির আছে! শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ বানিয়ে, শিক্ষকদের ঠেলেঠুলে বাস্তবায়ন করতে গেলে অবস্থা বেগতিক হয়, যা আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি। অথচ শিক্ষা আসলে কী—এই ধারণাটাই আমরা রাষ্ট্রের সামনে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারিনি আজও।
অনেকেই বলেন, এই শিক্ষা দিয়ে তো কিছুই হচ্ছে না—উন্নত বিশ্ব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা পিছিয়ে পড়ছি। কিন্তু শুনবে কে? মঞ্চে উঠে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিন, সকলেই হাত তালি দেবে। মুখে আশার কথা বলুন, সকলেই খুশি। কিন্তু আসল পরিবর্তনের পথ কেউ দেখাবে না।
প্রথমেই শিক্ষাকে ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব দিয়ে কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। যেসব দেশ কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণযোগ্য, তাদের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের তফাৎ রাত আর দিনের। জাপানে শিশুরা মাঠে গিয়ে চাষ শিখছে, এটা তাদের শিক্ষার অংশ। আমাদের দেশে এটা চালু করলে অভিভাবকদের রিঅ্যাকশন কী হবে ভাবুন! অভিভাবকরা বলবে, আমার সন্তানকে স্কুলে পাঠাই অফিসার বানাতে, কৃষক বানাতে নয়!
অথচ একজন দক্ষ কৃষক দেশের বিশাল সম্পদ, এ কথা কে বোঝাবে? কারণ মানসিকতা। ডাক্তারকে যেমন হুজুর-হুজুর করি, কৃষককেও তেমন মাথায় তোলার শিক্ষা আমাদের দেওয়া হয়নি। আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চিন্তা খাদ্য নিরাপত্তা, আর তা পূরণ করবে কৃষক। তাকেই তো আগে সম্মান দিতে হবে। পেটের ক্ষুধা মেটাতে তো ডাক্তারের কাছে যাব না!
আমরা পিছিয়ে পড়ছি কারণ আমাদের শিক্ষা পিছিয়ে আছে। শিক্ষার জায়গায় কুশিক্ষা ও কুসংস্কার গেঁথে গেছে। শ্রীলঙ্কার উদাহরণ দেখুন। সেখানে শতভাগ মানুষ শিক্ষিত। একসময় এমন ছিল না। তারা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে শতভাগ শিক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। শিক্ষিত হলে নারী-পুরুষ দুজনেই কাজ খুঁজবে, অধিক সন্তানের ভুল করবে না। অথচ, আমরা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে প্রতি বছর যা ব্যয় করি, তাতেও বৃদ্ধির হারে খুব একটা পরিবর্তন আসছে না। শতভাগ শিক্ষিত নাগরিক তৈরি হচ্ছে না।
শিক্ষা আসলে একটা পরশপাথর। দক্ষ, শিক্ষিত মানুষ তৈরি করতে পারলে প্রতিটি সেক্টরকেই সোনায় মোড়ানো যায়। কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে শিক্ষার অবস্থান সবার আগে। শিক্ষাকে অগ্রাধিকার না দিলে কোনো খাতেই সফলভাবে এগোনো যাবে না।