Published : 02 Sep 2025, 02:14 PM
একটা প্রবাদ আছে: ‘তুমি যদি কোনো গ্রুপের সবচেয়ে বুদ্ধিমান লোক হও, তবে নিশ্চিত থাকো—তুমি ভুল গ্রুপে আছো।’ প্রবাদটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে লেখা হয়নি, তবে যেন তাকে মাথায় রেখেই বলা, এখন এটা তার ব্যাপারে দারুণভাবে প্রযোজ্য। কারণ, তিনি নিজের জন্য একা এক গ্রুপ বানালেন আর শুল্কনীতি ঝেড়ে পৃথিবীর ৬০টা দেশকে মাত্র চার মাসে তটস্থ করে দিলেন। ভাবখানা এমন—বিশ্বের সর্বশক্তিমান দেশের সর্বশক্তিমান নেতা, আর তিনি নিজেই নিজেকে মনে করেন সর্ববুদ্ধিমান। প্রশ্ন হলো, এমন মানুষকে আসলেই কে চ্যালেঞ্জ করবে?
কিন্তু ট্রাম্প বেচারার সর্ববুদ্ধিমানের সিলমোহরটা বেশিদিন টিকল না। তিনি ধরতেই পারলেন না, একা একা নিজের গ্রুপে তিনি হয়তো বুদ্ধিমানদের রাজা। কিন্তু হায়! দুনিয়ায় তো আরও অনেক গ্রুপ আছে, আর সেই সব গ্রুপে আরো অনেক নেতা আছেন, যাদের সামনে ট্রাম্পের ‘বুদ্ধিমত্তা’ দাঁড়ালেই হাঁটু ভেঙে পড়তে পারে।
সম্প্রতি সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে ভারত, রাশিয়া ও চীন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আঁতাত করে সেই জিনিসটাই বুঝিয়ে দিল।
ট্রাম্প ও মোদী অনেক বছর ধরে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। টেক্সাসের হিউস্টনের ‘হাওডি মোদী’ কিংবা গুজরাটের আহমেদাবাদের ‘নমস্তে ট্রাম্প’ অনুষ্ঠানের সেই উষ্ণ আলিঙ্গন এখন শুধু স্মৃতি।
ট্রাম্প রাশিয়া থেকে ভারতকে তেল আমদানি বন্ধ করতে বলেছেন। ভারত তেলের জন্য রাশিয়ার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, তাই ট্রাম্পের অনুরোধ বা আদেশ—যাই হোক না কেন, তারা তা পালন করতে অস্বীকার করেছে। তাতেই বাঁধছে ট্রাম্প ও মোদীর বিবাদ—সম্পর্ক গড়াতে গড়াতে এখন একেবারেই তিক্ত। ট্রাম্প জরিমানা করে ভারতের রপ্তানি পণ্যের ওপর আরও বাড়তি ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ধার্য করেছেন। এখন যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানির ওপর ভারতকে ৫০ শতাংশ হারে শুল্ক দিতে হবেভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করাতে ট্রাম্প এত ক্ষিপ্ত কেন? ট্রাম্প মনে করেন, ভারতের আমদানির জন্যই রাশিয়ার অর্থনীতি ভালো অবস্থায় আছে। ভালো অর্থনীতির কারণেই রাশিয়া ইউক্রেইনে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারছে। ট্রাম্পের ধারণা—পাকিস্তান ও ভারতের যুদ্ধ তিনি বেশিদূর গড়াবার আগে থামাতে পেরেছেন, এবার যদি ইউক্রেইনের যুদ্ধটা থামাতে পারেন, তাহলে ২০২৫ সালের শান্তিতে তার নোবেল পুরস্কার কেউ ঠেকাতে পারবে না।
কিন্তু তেল রপ্তানির অর্থ দিয়ে রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং নোবেলের পথে বাধা হলো রাশিয়ার তেল আমদানিকারকেরা। যদিও কিছুটা ছেলেমানুষি মনে হতে পারে, তবুও ট্রাম্প নোবেল পুরস্কারের জন্য যুদ্ধ বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর।
রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক হলো চীন। ট্রাম্প চীনকেও বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ করতে, কিন্তু চীনের সঙ্গে পেরে উঠেননি। এখন ভারতও অনড়। তাই তিনি আলাস্কায় পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করে যুদ্ধ বন্ধের একটা ফর্মুলা বের করেছেন। সেখানে বলির পাঠা ইউক্রেইন—তাদেরকে নিজেদের দেশের অনেক জায়গা রাশিয়াকে ছেড়ে দিতে হবে। ইউক্রেইন রাজি নয়, তাই যুদ্ধ সম্ভবত চলতেই থাকবে। এখন ইউক্রেইনের জন্যও নিশ্চয় শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু ট্রাম্পের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কী হবে?
এদিকে নরেন্দ্র মোদীও বসে নেই। তিনি চীন ও রাশিয়াকে নিয়ে জোটবদ্ধ হয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছেন। চীন এবং রাশিয়াও ট্রাম্পের বাড়তি শুল্কনীতির ভুক্তভোগী। তারাও এগিয়ে এল জোট বাঁধতে। তিন দেশের তিন নেতাই সম্প্রতি সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে একাত্মতা ঘোষণা করলেন। বেইজিংয়ের তিয়ানজিন থেকে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে তিন শীর্ষ নেতার কথাবার্তায় ও শারীরিক ভাষায় তাদের দৃশ্যমান সৌহার্দ্য ধরা পড়েছে।
সেপ্টেম্বরের ১ তারিখে ভারতীয় নেতার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে চীনের নেতা শি জিনপিং বলেছেন, “দুই দেশকে পারস্পরিক আস্থা আরও গভীর করতে হবে এবং হুমকির পরিবর্তে একে অপরের উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে।”
মনে হচ্ছে, ভারত ও চীন তাদের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ নিয়ে তিক্ততা ভুলে গিয়ে নতুনভাবে সম্পর্ক গড়তে উদ্যোগী হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, “আমাদের একে অপরের উদ্বেগকে বিবেচনা করা উচিত এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা উচিত। সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা যৌথভাবে রক্ষা করা উচিত, নিশ্চিত করতে হবে যে সীমান্ত সমস্যাগুলো চীন-ভারতের সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত না করে।”
ভালো প্রতিবেশী এবং বন্ধু হওয়া, পারস্পরিক সাফল্য অর্জনকারী অংশীদার হওয়া এবং ‘ড্রাগন ও হাতির নৃত্য’ উপলব্ধি করা—চীন ও ভারত উভয়ের জন্যই সঠিক পছন্দ হওয়া উচিত।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে আলোচনায় যোগ দেন।
ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই তিন নেতার সম্মেলনের ওপর নজর রাখছিলেন। অনেক বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন করছেন, ট্রাম্প কি তার শুল্ক কার্ড প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যবহার করেছেন? এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বড় একটা শক্তি জোটবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে আছে পৃথিবীর দ্বিতীয়, পঞ্চম ও এগারোতম অর্থনীতি। ভারত ও চীন—এই দুই দেশে পৃথিবীর ৩৬ শতাংশ মানুষ বাস করে।
ট্রাম্প এখন বলেছেন, “ভারত তার কাছে প্রস্তাব দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির ওপর তারা কোনো শুল্ক ধার্য করবে না। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে, এটা তাদের অনেক বছর আগে করা উচিত ছিল।” ভারতের পক্ষ থেকে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে, রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ না হলে ভারতের ৫০ শতাংশ শুল্ক কমানোর কোনো সম্ভাবনা নেই, অন্তত এখনও, এমন কিছু দৃশ্যমান হয়নি।
এশিয়ার ড্রাগন ও হাতি যখন নাচতে শুরু করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ঈগল ও মিকি মাউসরা কি করবে?
এই জোট কোথায় গিয়ে ঠেকবে, বা এই জোটবদ্ধতার জন্য ট্রাম্প কিছুটা নমনীয় হবেন কিনা—সেসব দেখতে আরো অপেক্ষা করতে হবে। তবে মনে হচ্ছে, এই সম্মেলনে ভারত, রাশিয়া ও চীনের তিন দেশের সরকার প্রধানেরা বেশ উচ্ছ্বল ও উজ্জীবিত। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একটি অর্থনৈতিক জোট গড়ে তুলতে তারা বদ্ধপরিকর।
বেইজিংয়ের এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও, আরো একটি দেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। সেটা পাকিস্তান—সম্ভবত পাকিস্তানের জন্য এটা হবে আরও নির্মম। এত বছর ধরে পাকিস্তান ভারত-চীন বৈরিতার সুযোগে চীন থেকে যথেষ্ট সাহায্য ও সহযোগিতা পেয়েছিল। এখন তাদের কি হবে? চীনের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্ব স্থাপন হলে, পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ ঘটবে।
বেইজিংয়ের সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফও যোগ দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম বলছে, তাকে বিমর্ষ মুখে তিন দেশের আলোচনার বাইরে অবস্থান করতে হচ্ছে । ভারতের সংবাদমাধ্যম এনটিভি, এক ভিডিও পর্যালোচনা করে বলেছে—“প্রধানমন্ত্রী মোদী ও প্রেসিডেন্ট পুতিনকে দেখা যাচ্ছে হাঁটতে হাঁটতে শেহবাজ শরীফকে অতিক্রম করে যাচ্ছেন, তারা দুজন আলাপ-আলোচনায় ব্যস্ত। আর শেহবাজ শরীফ দুহাত সামনে এনে কাঁচুমাচু হয়ে গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।”
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরেও অনেকে মুখ গোমড়া করবেন বলে অনুমান করা যায়। মাত্র কয়েকদিন আগে তারা পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দারকে লালগালিচা পেতে বাংলাদেশে বরণ করেছিলেন। তখন বলা হয়েছিল, চীন ও পাকিস্তানকে নিয়ে নতুন ভুনিতির কথা। অনেকেই তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে পাকিস্তান বাংলাদেশের কি কাজে আসবে? পাকিস্তান যদি চীনের বন্ধুত্ব হারায়, সেটা আমাদের স্থবির পররাষ্ট্রনীতিতে আরেক ব্যর্থতার ছাপ ফেলবে।