Published : 30 May 2026, 12:43 PM
ঈদের পরের দিনের সকাল। প্রাতভ্রমণে বেরিয়ে ঢাকা শহরের যত রাস্তায় চোখ রেখেছি, সর্বত্রই কোরবানির চিহ্ন। সিটি করপোরেশন প্রাণপণে চেষ্টা করেছে কোরবানির বর্জ্য অপসারণের। সেই চেষ্টাও অব্যাহত আছে। মানুষেরও সচেতনতা বেড়েছে। উপরন্তু আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার কোরবানির বর্জ্য অপসারণে একটা স্বস্তিকর চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে। অবশ্য খোদ প্রধানমন্ত্রী রাজধানীতে বর্জ্য অপসারণে সিটি করপোরেশনের কাজে গাফিলতি পেয়ে কয়েকজন কর্মকর্তাকে শাস্তিও দিয়েছেন!
তবুও সর্বত্র ব্লিচিং পাউডারের গন্ধে মনে পড়ে যাচ্ছে, আগের দিনই এই নগর একটা বড় ধর্মোৎসব পালন করেছে। যদিও বিকেলে একজন অটোওয়ালার কথা শুনে চমকে উঠলাম। কিছুটা বাউলবেশধারী সেই অটোওয়ালা একথা-সেকথার পর হতাশা ব্যক্ত করলেন এই বলে যে, ‘বাহ্যিক পশুর কোরবানি তো হলো, মনের পশুর কোরবানির কী হবে?’—এই মারফতি আলাপ আর বাড়াইনি। তবে কথাটা ভাবিয়েছে সারারাত।
সকালে জেগে লাইলী খালার খবর পড়লাম পত্রিকায় সবিস্তারে। ফরিদপুরের লাইলী বেগম এখন সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে ভাইরাল। ৬৫ বছরের ভবঘুরে সহজাত শিল্পী লাইলী বেগম গত ২৪ মে ফরিদপুরে নজরুলজয়ন্তীর এক অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলামের গান, ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল’। দরদি গলায় গাওয়া সেই গান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে ফরিদপুরের সীমানা পেরিয়ে বহু মানুষের মন ছুঁয়েছে। ভাগ্যবিড়ম্বিত লাইলী বেগম এখন সংসারবিবাগী সন্ন্যাস জীবনে অভ্যস্ত। তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে স্থানীয় এক সামাজিক সংগঠনের কর্তাব্যক্তি মিডিয়ায় একটি ঘটনার বয়ান করেছেন। বলেছেন, কোনো এক অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার পর রিকশাভাড়া বাবদ তাকে ৩০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। তিনি ১০০ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘অত টাকা লাগবে না, যাগো পেটে খিদে, তাগো বেশি দেন।’
লাইলী বেগমের এই দার্শনিক বয়ান শোনার পরপরই পত্রিকায় দেখতে পেলাম ব্যাংক লুটেরা এস আলমের একটি খবর। শেখ হাসিনার বিশেষ আশীর্বাদধন্য এস আলম ব্যাংক লুট করেছে, টাকা পাচার করেছে, গোটা পরিবার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব নিয়েছে—ফ্যাসিবাদী হাসিনার কল্যাণেই। এই এস আলম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে। সেই এস আলমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অনুরোধে সাইপ্রাসের একটি আদালত তার ৮ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের সম্পদ ক্রোক করেছে; মার্কিন ডলারে যা প্রায় সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের ব্যাংক সেক্টরকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গিলে খাওয়া এস আলম গংয়ের কাহিনি এখন মানুষের জানা। খোদ সরকার, রাষ্ট্র মিলেই এস আলমকে এই জায়গায় নিতে সাহায্য করেছে। এখন আবার তাদের লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধারের কাহিনি শোনা যাচ্ছে। আবার সেই সম্পদের সঙ্গে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের কারও কারও সখ্যের খবরও জনমুখে ছড়িয়ে পড়ছে। আসলে টাকা তো টাকাই; তার আবার আওয়ামী লীগ, বিএনপি কী!
এসব ভাবতে ভাবতেই মনে প্রশ্ন এল, এত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লুট করে মানুষ কী কাজে লাগায়? এত টাকা খরচই বা করে তারা কী করে? একজন মানুষ বা তার পরিবারের জীবনযাপনের জন্য কত টাকাই বা দরকার পড়ে? যারা এরকম বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লুটপাটের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তারা কী সেই সম্পদ ভোগের জন্যই এসব কুকীর্তি করেন, নাকি এটা একটা জবরদস্ত নেশা!
এর আগে আমরা শেখ হাসিনার ভূমিমন্ত্রীর লন্ডনে ৩৬০টি বাড়ির মালিকানার খবর পেয়েছিলাম। একজন মানুষের বা পরিবারের জন্য কয়টা বাড়িরই বা দরকার পড়ে…? এসব একটি দার্শনিক প্রশ্নই বটে!
রাজশাহীর এক বিখ্যাত সার্জন ডাক্তারের গল্প শুনেছিলাম। ভদ্রলোক খুব ভালো অপারেশন করতেন; তার কাজের দারুণ খ্যাতি। কিন্তু কুখ্যাতি ছিল ‘কসাই ডাক্তার’ হিসেবে। কারণ ভদ্রলোক টাকার ব্যাপারে ছিলেন দারুণ হিসেবি। দুটো টাকাও কম নিতেন না রোগীদের কাছ থেকে। একবার তার এক বন্ধু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, চিবিয়ে খেলেও তো এই জীবনে টাকা শেষ করতে পারবেন না। তো গরিব-অভাবী রোগীদের কাছ থেকে কিছু টাকা কম নিলেই বা কী হয়! আপনার এত টাকা খাবে কে? উত্তরে ওই বিখ্যাত সার্জন বলেছিলেন দারুণ এক কথা। বলেছিলেন, ‘টাকা তো কম নিতেই পারি! কিন্তু টাকা কম নিলে যে আমার হাত চলতে চায় না; অপারেশনে আর মনোসংযোগ থাকে না।’ অর্থাৎ টাকা আয় করা একটি নেশাই বটে! শুধু যে প্রয়োজনেই মানুষ এটা করে তা নয়, নেশার নেশায় পড়ে যায়। ডাক্তার সাহেবের কথাই হয়তো ঠিক। নইলে দরবেশখ্যাত সালমান এফ রহমান উপর্যুপরি শেয়ারবাজার লুট করে সবাইকে সর্বস্বান্ত করতে এত উৎসাহ পেতেন কোথা থেকে? ব্যবসা-বাণিজ্য যা ছিল, তা দিয়ে তার জীবনে কোনো অভাব থাকার কথা নয়। তবুও এত বিপুলভাবে লুটপাটের মধ্যে নিজেকে জড়াতেন কেন তিনি? মানুষকে ঠকিয়ে, বিপদাপন্ন করে, সর্বস্বান্ত করে, নিজেকেও বিপদে ফেলে, জেল-জুলুমে জড়িয়ে টাকা আয়ের এই উদগ্রতা একটি বিপজ্জনক নেশাই বটে! আর কে না জানে যে, যেকোনো নেশাই ক্ষতিকর—ব্যক্তি, সমাজ ও দেশের জন্যও।
অথচ, মানুষ এর বিপরীত ভাবটা নিয়েও জন্মায়, বেড়ে ওঠে, কর্ম করে। আমাদের এখানে তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন বিখ্যাত প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি কোনো রাজনৈতিক দল করতেন না, কিন্তু ছিলেন বামপন্থার অনুসারী। জীবনের সকল দ্বান্দ্বিক প্রশ্নের সমাধান করতেন শ্রেণি বিবেচনার মানদণ্ডে। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাকে কাছ থেকে জানার। তিনি ‘শহীদুল্লাহ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’ নামে একসময়ের ডাকসাইটে প্রকৌশল ফার্মের স্বত্বাধিকারী ছিলেন। প্রচুর আয় করতেন। তার আয়কে তিনি তিন ভাগে ভাগ করে—একভাগ পরিবারের কাজে, একভাগ বামপন্থীদের রাজনৈতিক কাজে, আরেকভাগ দুস্থ-গরিব শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কাজে ব্যয় করতেন। এই কাজ খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে, নিয়মিতভাবে করতেন। একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, গরিব ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার কাজে ব্যয় করার কারণ কী? শহীদুল্লাহ ভাই হাসতে হাসতে বললেন, ‘আপনি জানেন না, দানবীর হাজী মুহম্মদ মুহসীন স্কলারশিপ না পেলে আমার নিজের লেখাপড়াই হতো না। আমাদের খুলনা এলাকায় বহু শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিয়েছে এই বৃত্তি। আমার মতো গরিব শিক্ষার্থীর জীবন গড়তে সেই স্কলারশিপের টাকার প্রভাবের কথাটা আমি ভুলি নাই।’
এই যে উপকারের কথা মনে রেখে মানুষের উপকারের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া, এই মানবিক প্রবণতাই তো মানুষকে সকল জীবের মধ্যে শ্রেষ্ঠ করে তুলেছে। মানুষ যে সৃষ্টির সেরা জীব, সে তো তার এই অতুলনীয় ‘ত্যাগের’ প্রবৃত্তির কারণেই। অনেকেই বলেন, যে দেয়, দিতে পারে, সেই ‘দেবতা’। অর্থাৎ দেবত্ব গুণের মূল কথা হচ্ছে অন্যকে দেওয়া। অন্যকে দেওয়ার মধ্য দিয়েই মনুষ্য জন্মের সার্থকতা।
এখন প্রশ্ন হলো, এই যে অসীম খিদাওয়ালা লুটেরা মানুষের বদলে, ত্যাগী-পরহিতকর-পরার্থপর মানুষ আমরা চাই বিপুল সংখ্যায়, সেটা পাব কোথায়? কেমন করে চাষবাস হবে এই মানবিক মানুষের? এটা কী প্রকৃতি থেকে আসবে? নাকি আমাদের পরিবার-বিদ্যায়তন-সামাজিক সংঘগুলো সরবরাহ করবে এই মানুষ? নাকি প্রতিষ্ঠান জোগান দেবে এই কল্যাণকামী মানুষের? সেই প্রতিষ্ঠানই বা আমরা পাব কীভাবে?—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার। কেননা ধর্ম বলি, সংস্কৃতি বলি, প্রকৃতি বলি, সবার লক্ষ্যই তো একটা মানবিক, লোভহীন, সবার প্রতি মনোযোগী, কল্যাণভাবী রাষ্ট্র-সমাজ তৈরি করা এবং তাকে টিকিয়ে রাখা।
লেখার শুরুতে সংসারত্যাগী ভবঘুরে শিল্পী লাইলী বেগমের কথা বলেছিলাম। আবার তার কথাতেই ফিরে আসি, ‘যাগো পেটে বেশি খিদা…’ অফুরন্ত-অসীম ক্ষুধা, যারা ব্যাংক-বীমা-রাষ্ট্রীয় কোষাগার সব খেয়ে ফেলে, তাদের খিদা কমাবার পন্থা আবিষ্কার করতে হবে। তাদের লোভ আর পাপের হাত থেকে রাষ্ট্র-সমাজ-দেশকে বাঁচাতে হবে। কতিপয়তন্ত্রের লোভ আর পাপের হাত থেকে সর্বসাধারণকে বাঁচাতেই হবে।
পুনশ্চ: লেখাটা শেষ করি লিও তলস্তয়ের বিখ্যাত একটা গল্প দিয়ে—গল্পটি রাশিয়ার এক লোভী লোক পাহমকে নিয়ে, যার জমি কেনার দিকে ঝোঁক বেশি। কারও কাছে জমির কথা শুনলেই তার চোখ চকচক করে ওঠে। কম দামে জমি বিক্রি হলে তিনি তা কিনতে মরিয়া হয়ে পড়েন। জমির জন্য ছুটে যান এখানে-সেখানে। সস্তায় যেখানে জমি পাওয়া যায়, সেখানেই গিয়ে পরিবারসহ হাজির হন পাহম।
এভাবে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকা ঘুরতে ঘুরতে পাহম এমন এক এলাকার সন্ধান পান, যেখানকার মানুষ খুবই সহজ-সরল। তাদের কাছ থেকে খুবই কম দামে জমি কেনা যায়। তারাও খুব আন্তরিক। পাহম তার পরিবার নিয়ে সেখানেই থাকতে শুরু করেন। সেখানকার উর্বর জমি থেকে তার আয় দিন দিন বাড়তেই থাকে। কিন্তু জমি নিজের করে নেওয়ার যে লোভ, তা থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে পারেন না। আরও জমি লাগবে তার। জমির চিন্তা তাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না।
এমন সময় তার কাছে খবর আসে, অনেক দূরে উর্বর এক এলাকা রয়েছে। সেখানে জমির দাম এখানকার থেকেও অনেক অনেক সস্তা। ফসলও বেশ ভালোই ফলবে। অনেক চিন্তাভাবনা করে পাহম সিদ্ধান্ত নেন সেখানে পাড়ি জমাবেন। জমি তার দরকার।
সেখানে গিয়ে কথা হয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। জমির দাম একদিনে মাত্র এক হাজার রুবল। কিন্তু হিসাবটা বুঝে উঠতে পারে না পাহম। দিনের হিসাবে কী করে জমি বিক্রি করা হয়, তা তার বোধগম্য নয়। তখন তিনি জানতে পারেন, একদিনে তিনি যতদূর জমি ঘুরে আসতে পারবেন, ততটুকু জমিই তার হবে! এজন্য তাকে দিতে হবে মাত্র এক হাজার রুবল। তবে যেখান থেকে শুরু করেছে, সেখানে এসেই শেষ করতে হবে যাত্রা; এবং তা সূর্য ডুবে যাওয়ার আগেই।
আনন্দে আত্মহারা হয় পাহমের মন। পরদিন পাহাড়ে থাকা লোকদের কাছে গিয়ে হাজির হন। তার মাথায় থাকা টুপিতে এক হাজার রুবল রেখে যাত্রা শুরু করেন। যাত্রার শুরু থেকেই বেছে বেছে ফসলের জন্য উপযোগী জমিগুলোতে চিহ্ন দেন। মাঝে কিছুটা বিশ্রাম নিলেও জমির লোভে এগোতেই থাকেন পাহম। একটার পর একটা জায়গা তার নিজের জন্য চাই।
কিন্তু হায়! সূর্য তো অস্ত যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন তাকে ফিরতেই হবে। কিন্তু দৌড়েও টুপিটার কাছে ফিরতে পারবেন না বলে মনে হয়। তাই দ্রুতলয়ে জোরে জোরে পা চালান পাহম। এতে তার প্রচুর কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। অবশেষে সবার উৎসাহ পেয়ে দ্রুত পা চালিয়ে শুরুর জায়গায় এসেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন পাহম। সবাই বাহবা দিতে থাকে তাকে। অনেক জমি পেয়েছে সে, যা অনেকটাই কল্পনাতীত।
কিন্তু তার মুখ তুলে দেখা যায়, মুখ থেকে রক্ত বের হচ্ছে। জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে ইতোমধ্যেই। মারা গেছে পাহম। এত জমির মালিকানা আর উপভোগ করা হলো না। তার লাশ দাফন করা হলো সাড়ে তিন হাত জমিতেই…! জমির এত খিদে মিটল বটে!