Published : 02 Nov 2025, 06:53 PM
বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সচকিত করে তুলেছিল বিশ্বসম্প্রদায়কে। পাকিস্তান পর্বেও এমনটি ঘটতে দেখা যায়নি। সাড়ে ১৫ বছরের একটি স্বেচ্ছাচারী সরকার অনিবার্য করে তুলেছিল এটাকে। শুভবুদ্ধির পরিচয় দিতে পারলে অবশ্য রক্তক্ষয় কিছুটা কম হত; কিন্তু সরকারের পতন ঘটতই। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটানোই এর উদ্দেশ্য ছিল বলা যাবে না। এ ধরনের শাসকগোষ্ঠীর উত্থান যেন আর না ঘটে, সেটা নিশ্চিত করাও ছিল উদ্দেশ্য। গণঅভ্যুত্থানের বেশ কিছুটা আগে মাঠের বিরোধী দল বিএনপির তরফ থেকেও কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কারে ৩১ দফা পেশ করা হয়েছিল। তারও আগে, ‘ওয়ান ইলেভেন’ সরকারও রাষ্ট্র সংস্কারে জোরালো কিছু উদ্যোগ নেয়। প্রক্রিয়াটি কার্যত বাতিল করে দেয় ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আসা হাসিনা সরকার। সংস্কারের বিপরীতে চলতে চলতে সেই সরকার বরং হয়ে ওঠে কর্তৃত্ববাদী। সেটা নিশ্চিত করতে নির্বাচন ব্যবস্থাই ধ্বংস করে দেয় তারা।
এ অবস্থায় নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারও এক বড় কর্তব্য। এটি না করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানও কঠিন। সেজন্য গণঅভ্যুত্থানের পর যারা ‘দ্রুত নির্বাচন’ চাইছিলেন, তারাও জোর দিচ্ছিলেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের ওপর। এমনটিও বলা হচ্ছিল, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার করে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের ব্যবস্থা হলেই চলবে। তবে নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচন ব্যবস্থার পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবিও জোরালো হয়ে ওঠে। এতে নেতৃত্বদানকারীরা গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ার আগমুহূর্তে শহীদ মিনারের বিশাল জমায়েত থেকে ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা’ বিলোপের আওয়াজ তুলেছিলেন। এর বিরোধিতা করেনি কেউ। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর বিরোধিতার সুযোগও নেই। এ অবস্থায় খাতওয়ারি সংস্কারের চেয়ে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বলাই বাহুল্য। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আসা অন্তর্বর্তী সরকারও এ বিষয়ে জোর দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার সংক্রান্ত আলোচনাকে নিয়ে আসে সামনে।
এটা ঘিরে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে উত্তরণের এজেন্ডাও যায় পিছিয়ে। অবশ্য বলা হচ্ছিল, মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের বাইরে সরকার নিজে কিছু করতে যাবে না। সংস্কার আলোচনায় ঐকমত্য না হওয়া বিষয়গুলো রেখে দেওয়া হবে ভাবীকালের জন্য। সরকার থেকে এমন বক্তব্য আসার পর বিএনপিসহ সব দলই নির্দ্বিধায় সংস্কার আলোচনায় যোগ দেয়। বিএনপির কথা আলাদা করে বলতে হয় এজন্য যে, সবার ধারণা–সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এ দলই ক্ষমতায় যাবে। হাসিনার শাসনামলে সত্যিকারের নির্বাচন হলে বিএনপি অনেক আগেই ক্ষমতায় যেত বলেও ধারণা রয়েছে। তাদেরকে সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে চক্রান্ত ও বাহুবল দুটোই ব্যবহার করে। এ অবস্থায় গণঅভ্যুত্থানে পুরো প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ার পর দলটির পক্ষ থেকে দ্রুত নির্বাচন দাবি করাটাই ছিল স্বাভাবিক। সেটা থেকেও তারা সরে আসেন সংস্কারের দাবি চারদিক থেকে উত্থাপিত হতে থাকায়। বিএনপি রাষ্ট্র সংস্কার করবে বলে নিজে থেকে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ায় এ সংক্রান্ত আলোচনায় যোগ দিতেও তার বাধেনি।
কমিশনগুলো সুপারিশ পেশের পর বাছাইকৃত একগুচ্ছ ইস্যুতে দীর্ঘ সংস্কার আলোচনা হতে দেখেছি। জাতির জন্য এটা অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা। সুশীল সমাজের বাইরে সংস্কার যে রাজনৈতিক দলগুলোরও আগ্রহের বিষয় হতে পারে, তা দেখা গেল এই প্রথম। এমনকি সংবিধান সংস্কারের মতো কিছু প্রশ্নেও দলগুলোকে দেখা গেল একমত হতে। প্রধান উপদেষ্টার উদ্যোগে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন চেষ্টা করেছে রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোকে যতটা সম্ভব কাছাকাছি নিয়ে আসতে। এতে তার সাফল্য-ব্যর্থতা দুটোই আছে। দলগুলোকেও ধন্যবাদ দিতে হবে এজন্য যে, তারা কিছু ক্ষেত্রে অন্তত দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে অন্যান্য পক্ষের যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য মেনে নিয়েছে। তারপরও সংবিধান সম্পর্কিত বিভিন্ন ইস্যুতে অনেক চেষ্টা করেও প্রতিষ্ঠা করা যায়নি ঐকমত্য। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও বিএনপিসহ কয়েকটি দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়ে গেছে। সেগুলো লিপিবদ্ধ করেই স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদে’।
তার আগে সংস্কারের সুপারিশ সংবলিত এ সনদে জনসম্মতি লাভে গণভোট আয়োজনেও দলগুলো একমত হয়। হাসিনা সরকার গণভোটের সুযোগ রহিত করে গেলেও সেটি ফিরিয়ে আনার ঘটনা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, সে ব্যাপারেও সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়। কথা ছিল, ভিন্নমতসহ সংস্কার প্রস্তাব গণভোটে পাস হলে নির্বাচনে বিজয়ী দল তার ইশতেহার অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। কোনো ইস্যুতে ভিন্নমত থাকলে সেটা তারা বাস্তবায়ন না করলেও সনদ লঙ্ঘন হবে না। কিন্তু পরে–তৃতীয়বারের মতো বর্ধিত সময়ে নিজ কার্যপরিধির বাইরে গিয়ে সনদ ‘বাস্তবায়ন পদ্ধতি’ বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ দেওয়ার সময় ঐকমত্য কমিশন ভিন্নমত আমলে না নেওয়ায় দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮ প্রস্তাব গণভোটে যাবে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত ছাড়া! অথচ এর অধিকাংশ প্রস্তাবেই কারও না কারও, কিছু না কিছু ভিন্নমত রয়েছে। এ অবস্থায় বিশেষত সেইসব দল সমর্থক ভোটাররা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, এর কোনো সদুত্তর নেই। সাধারণ ভোটারদের পক্ষেও সব সুপারিশে একমত বা ভিন্নমত হওয়া খুব কঠিন।
অনেক ইস্যুকে একটি প্রশ্নের আওতায় এনে গণভোট আয়োজনও আসলে প্রশ্নবিদ্ধ। তারপরও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এমন উদ্যোগ হয়তো কখনও কখনও জরুরি হয়ে পড়ে। কিছু দেশে এর উদাহরণও হয়তো রয়েছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তো সংস্কার আলোচনায় অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে ওইসব প্রশ্নে একমত হতে হবে। গণভোট আয়োজনে সবাই এক হওয়ার পর ঐকমত্য কমিশন যদি কেবল একমত হওয়া প্রস্তাবগুলো প্যাকেজ আকারে গণভোটে তোলার প্রস্তাব দিত, সেটা হত একপ্রকার বাস্তবসম্মত। সব দলের সমর্থকরা অন্তত তখন সাগ্রহে অংশ নিত গণভোটে, তা সেটা যখনই অনুষ্ঠিত হোক। কিন্তু ঐকমত্য কমিশন যেভাবে গণভোট আয়োজনের সুপারিশ জমা দিয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিশেষত যে দল মৌলিক কিছু সংস্কারে ভিন্নমত দিয়ে রেখেছে এবং একইসঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, তারা তো এ নিয়ে প্রশ্ন তুলবেনই। এভাবে গণভোট আয়োজন করে অন্যের ইচ্ছায় সংস্কারে যেতে তাকে বাধ্য করা হচ্ছে কিনা, এ প্রশ্ন রাজনীতিসচেতন মানুষ মাত্রই তুলবেন। এভাবে রাষ্ট্র সংস্কারে আদৌ কোনো অগ্রগতি হয় কিনা, সেটাই বা কে বলবে!
ঐকমত্য কমিশন দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে বলতে হবে। সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী কোনো মহলের চাপে তারা ওই প্রস্তাব দিয়েছেন কিনা, এমন প্রশ্নও উঠেছে। তবে বল এখন সরকারের কোর্টে। মেয়াদ শেষে ঐকমত্য কমিশন ইতোমধ্যে বিদায়ও নিয়েছে। দীর্ঘ ও আকর্ষণীয় সংস্কার আলোচনা শেষে তারা রাজনীতির একটি পক্ষকে খুশি আর অন্য পক্ষকে ক্ষুব্ধ করেই বিদায় নিলেন, যা কাঙ্ক্ষিত ছিল না। তবে এখন সরকারের দায়িত্ব একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। জুলাই সনদ প্রশ্নে কবে গণভোট হবে, সেটা বড় কথা নয়। আগে বা পরে যখনই অনুষ্ঠিত হোক, এর ফল আপাতত একই। গণভোটের রায় ইতিবাচক হলে সংস্কার বাস্তবায়ন করবে নির্বাচিত সংসদ, যা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে শুরুতে কাজ করবে। ভিন্নমত উপেক্ষা করে গণভোট আয়োজিত হলে এবং ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে সেই পরিষদ কি সংবিধান সংস্কারের সব সিদ্ধান্ত হুবহু বাস্তবায়ন করবে? নাকি সার্বভৌম সংসদে এ নিয়ে সৃষ্টি হবে জটিলতা এবং তাতে করে দেখা দেবে নতুন সংকট? এর পটভূমি জুগিয়ে যাওয়াটা কি মাঠে থাকা সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে আসা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য মানানসই হবে?
মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের উচিত হবে দ্রুত এ জটিলতা থেকে জাতিকে মুক্ত করা। শুরুতে নেওয়া তাদের সিদ্ধান্তে ফিরে যাওয়া। সেটা হলো, রাজনৈতিক ঐকমত্য না হওয়া ইস্যুগুলো ‘জরুরি’ বিবেচিত হলেও তা নিয়ে নাড়াচাড়া না করা। সংস্কার প্রশ্নে বিবদমান কোনো পক্ষের দিকে হেলে না পড়া। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। সেই বিষয়গুলো বরং দেশের মালিক জনগণের ওপর ন্যস্ত করা। গণতন্ত্রে এটাই সঙ্গত। সংবিধান সম্পর্কিত যেসব সংস্কারে সবাই পুরোপুরি একমত, সেগুলোয় জনসম্মতি নিয়ে বাস্তবায়ন করা গেলে তাতে কি গণতন্ত্র বিকশিত হবে না? সুশাসনের কিছুটা ব্যবস্থাও কি হবে না?
সরকারকে বরং অভিযুক্ত করা যায় এটা বলে যে, তারা তো ‘আশু বাস্তবায়নযোগ্য’ সংস্কারেও আগ্রহ দেখাননি– দীর্ঘ সময় চলে গেলেও। সংবিধান সংস্কার লাগবে না; বরং নির্বাহী আদেশ বা অধ্যাদেশ জারি করেই বাস্তবায়ন করা যায়, এমন অনেক সুপারিশ কিন্তু দেখা যাচ্ছে অবহেলিত। কোনো কোনো সংস্কার কমিশনের একটি সুপারিশও বাস্তবায়ন করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। অর্থ খরচের প্রশ্ন জড়িত নেই, এমন সংস্কারও রয়ে গেছে অবাস্তবায়িত। জুলাই সনদেও এ ধরনের কিছু সুপারিশ রাখা হয়েছে, যেগুলো গণভোটে তোলা হবে না। আমরা কি আশা করতে পারি, নির্বাচন আসতে আসতে এগুলোর অন্তত সিংহভাগ বাস্তবায়ন করা হবে?
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আসা একটি সরকারের কাছে তার নিয়মিত কাজে দক্ষতাও ছিল প্রত্যাশিত। তার কাছ থেকে সুশাসন কতটা মিলেছে, সে প্রশ্নও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। এ অবস্থায় সংস্কার প্রক্রিয়ায় অহেতুক জটিলতা সৃষ্টির ঘটনা জনমনে সংশয় বাড়িয়ে তুলবে। শঙ্কা বাড়বে আসছে নির্বাচন নিয়ে। সেটা দূর করার জন্যও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সরকারের দলনিরপেক্ষ অবস্থান দ্রুত স্পষ্ট করতে হবে।