Published : 25 May 2026, 08:55 PM
বোরো মৌসুমে যখন হাওরে ধান ওঠে, তখন ছেলে-বুড়ো, কৃষাণ-কৃষাণী সবার সময় কাটে বিরামহীন ব্যস্ততায়। এ সময়টা হওয়ার কথা কর্মমুখর এক উৎসবের। হাওরে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত যেন মিলেমিশে যায় কাজের নিরবচ্ছিন্ন ছন্দে। ধান কাটা, মাড়াই করা, ধান সেদ্ধ, শুকানো, গোলায় তোলা, বিক্রি করা, ধানখোলায় নিয়ে যাওয়া, খড়ের বন্দোবস্ত করা, সেগুলো গুছিয়ে রাখা, শুকিয়ে গেলে বিক্রির ব্যবস্থা করা, সারা বছরের খোরাক সংরক্ষণ করা সবকিছুই এই বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। বছরের পুরোনো হিসাব চুকানো থেকে শুরু করে নতুন মৌসুমের প্রস্তুতি নেওয়া সবই আবর্তিত হয় এই ধানকে কেন্দ্র করে। এই সময়ে গনগনে রোদের আশীর্বাদে মানুষের মুখে হাসি ফোটে। শিশু-কিশোররাও অনেক সময় স্কুল কামাই করে, কারণ বাড়িতে তখন এত কাজ থাকে যে সবাই মিলে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। এখন পরিবহন ব্যয় অনেক বেশি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধান কাটার শ্রমিকদের মজুরিও বেড়েছে, আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে সেটাই স্বাভাবিক। এ সময় হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল আর পাখপাখালিরও সুসময়। হাঁসের ছানাগুলো পেটভরে আধার খেয়ে হেলে-দুলে সন্ধ্যায় প্যাক প্যাক করতে করতে ঘরে ফিরে। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে তারাও ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে। আর গনগনে সূর্য ক্লান্ত হতে হতে বিকেলে লাল আভা ছড়িয়ে ডুবে যায় পশ্চিম আকাশে। শ্রান্ত রাখাল নিয়ম করে গরু নিয়ে ঘরে ফেরে। [A1]
এই ধান বেচেই সংসার খরচ, স্কুলের খরচ, কখনও মেয়ের বিয়ে, কখনও ধর্মীয় প্রয়োজন, কখনও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, আবার কখনও শখের কিছু কেনেন তারা। কিন্তু গত ১০ বছরে পরিস্থিতি যেন ওলটপালট হয়ে গেছে। কাজগুলো সব আগের মতোই আছে, কিন্তু এর সঙ্গে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন দুর্ভোগ। বাংলাদেশের বার্ষিক চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো ধান থেকে। বোরো ধানের মৌসুম সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চলে। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া–এই সাত জেলাকে হাওরাঞ্চল হিসেবে ধরা হয়। তবে হাওরের প্রভাব আশপাশের আরও অনেক জেলায় বিস্তৃত। দেশের হাওরাঞ্চলগুলো এককভাবে মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ১৫ শতাংশ এবং মোট বোরো চাল উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশের যোগান দিয়ে থাকে। এবার লক্ষাধিক কৃষকের অবস্থা নাজেহাল। দেশের বেশিরভাগ চাল উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে। পরিসংখ্যান হিসেবে প্রায় ৪.৫৫ লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হাওরের জমিতে চাষাবাদ হয়েছে।
তবে হাওরের বন্যা শব্দটি একসময় কৃষকের কাছে নেতিবাচক ছিল না। কেননা ধান কাটার পরপরই নিয়ম করে পানি আসত। পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে প্লাবনের কারণে মাটি ধৌত হয়ে যেত, নতুন পলি জমত, ফলে সেখানে ফসল চাষাবাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতো। মাছ, গবাদিপশু সব মিলিয়ে এক ধরনের স্বতন্ত্র বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছিল। পানি চলে গেলে আবার নতুন ফসলের জন্য লেগে পরা। কিন্তু এখন সংকট বহুমাত্রিক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তা আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে সময়মতো আবহাওয়ার বার্তা না পাওয়া, ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়া, সেই ধান শুকাতে না পারা, কম মূল্যে কিংবা কোথাও বিনামূল্যে দিয়ে দেওয়া, শ্রমিক সংকট, হারভেস্টারের অভাব, কিংবা অনেক জায়গায় হারভেস্টার ব্যবহার করতে না পারা সব মিলিয়ে এ যেন নিত্যদিনের দুর্ভোগ। এর বাইরে জলাবদ্ধতা তো রয়েছেই। আর বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু এখন অনেকটাই স্বাভাবিক অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হচ্ছে।

প্রাকৃতিক কিংবা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ এই সংকটের সুবিধা নেয় চাতাল মালিক ও ফড়িয়ারা। তারা কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কেনে, পরে সরকারের কাছে নির্ধারিত দামে বিক্রি করে। কারণ ধান সংরক্ষণের মতো কোনো ব্যবস্থা কৃষকের ঘরে থাকার জো নেই। ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই কিশোরগঞ্জের কটিয়াদিতে এক গরিব কৃষকের বাড়িতে বৃষ্টির দিনে দুপুরের আহার সেরেছিলাম। সেদিন বৃষ্টির কারণে সেই ঘরে থাকার কোনো উপায়ই ছিল না। দুটি ঘরের একটিতে ছিল তার দুটি গরু, আর অন্য ঘরে থাকতেন তিনি ও তার স্ত্রী। ঘরের ভেতরে প্যাচপ্যাচে কাদা, তার ওপর মোটা ছালা বিছানো। সেই ছালার ওপর বিছানা পেতে আমাদের খেতে দিয়েছিলেন। আমি শুধু ভাবছিলাম, এই কৃষক, যিনি অন্যের জমি চাষ করেন, নিজেদের শোবার বিছানাটাকেই বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষা করতে পারেন না, তিনি কীভাবে নিজের ঘরে ধান সংরক্ষণ করবেন? বিষয়টি তখন আমাকে ভীষণভাবে ভাবিয়েছিল। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, যদি সরকার মাঠ থেকেই সরকারি পরিবহনে ধান সংগ্রহ করে নিয়ে যেত, তাহলে তাদের মতো ক্ষুদ্র চাষিরা হয়তো কিছুটা বাঁচতেন। কেননা ধান নিয়ে যাওয়ার পরও তারা সেখানে থাকা মজুদদারদের সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রি করতে পারেন না। তারা এতটাই প্রান্তিক যে নিজেদের কথাও উচ্চস্বরে বলার মতো কোনো শক্তি তাদের থাকে না।
আর এবার তো প্রাকৃতিক সংকটের সঙ্গে মনুষ্যসৃষ্ট সংকটেরও সংযোগ রয়েছে। কিন্তু যখন স্বাভাবিক অবস্থা থাকে, অর্থাৎ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থাকে না, মাঠে মাঠে সোনালি ধান দুলতে থাকে, তখনও কৃষকের মুখে হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। তখনও গরিব ও প্রান্তিক কৃষক তার ফসলের ন্যায্য দাম পান না; বরং নানা ধরনের প্রতারণার শিকার হন। দামে ঠকানো হয়, ওজনে কম দেওয়া হয় বা বেশি নেওয়া হয়। অনেক সময় ধানের আর্দ্রতা সঠিক থাকলেও বলা হয় আর্দ্রতা ঠিক নেই, এই ধান নেওয়া যাবে না। ফলে বাজারে আসা-যাওয়ার খরচই কৃষকের জন্য একটি বড় সংকটে পরিণত হয়। কৃষকের কাছ থেকে ফড়িয়ারা যেমন মাঠ থেকেই ধান কিনে নিয়ে যায়, তেমনি দূরবর্তী বাজারে ধান নিয়ে যাওয়ার পরও অনেক সময় তা বিক্রি করা সম্ভব হয় না। তখন যাতায়াত ব্যয়সহ পুরো প্রক্রিয়াটিই কৃষকের জন্য অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এই অসহায়ত্বের যেন কোনো শেষ নেই। এবছরও বিভিন্ন এলাকা থেকে খবর আসছে, মোটামুটি ভালো মানের ধানও কোথাও কোথাও মণপ্রতি ৬০০ টাকায়, আবার কোথাও ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে; অথচ উৎপাদন খরচই প্রতি মণে ১,২০০ টাকার বেশি। আর বেশিরভাগ জায়গায় ধান ভিজে গেছে। অনেক স্থানে ধানে অঙ্কুরোদ্গম শুরু হয়েছে, চারা বের হয়ে যাচ্ছে। ফলে সেই ধান প্রায় বিনামূল্যেই ছেড়ে দিতে হচ্ছে কৃষকদের।

আরেকটি বড় সংকট হলো, এর ফলশ্রুতিতে গবাদিপশু পালনও বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে গেছে। খড় না থাকলে গবাদিপশুও না খেয়ে থাকে। ফলে হাওরাঞ্চলের কৃষক নামমাত্র মূল্যে গবাদিপশু বিক্রি করে দিচ্ছেন। কেননা এসব অঞ্চলে বছরের প্রায় ছয় মাস এসব পশু পুরোপুরি ধানের খড়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে, যার প্রায় ৮৫ শতাংশ জোগান আসে বোরো ধানের খড় থেকে। কিন্তু এবার ধান তলিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ কৃষক প্রয়োজনীয় খড় সংগ্রহ করতে পারেননি। যেসব জমি থেকে কোনোভাবে ধান কেটে আনা সম্ভব হয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেই খড় শুকাতে না পেরে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ধানের পাশাপাশি খড় কিংবা বিচালিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতি বছর বর্ষায় ঢল নামবে এটা তো জানা কথা। কিন্তু আগাম বন্যা, যা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে, তা মোকাবিলায় সরকারি পর্যায়ে আরও সতর্ক ও প্রস্তুত থাকা দরকার। সে কারণে বীজের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা এবং নিয়মিত মানসম্মত বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। হাওরে এবার বীজ নিয়েও কৃষকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের অভিযোগ, এমন বীজ সরবরাহ করা হয়েছে, যার অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা সন্তোষজনক ছিল না। নির্ধারিত সময়ের আগেই জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যবস্থা করা এবং প্রকৃতিকে ধ্বংস করে তথাকথিত উন্নয়নের পথ পরিহার করাও জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন, যাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদান করা।
সরকার বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত হাওরের কৃষকদের তিন মাসের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। কিন্তু এই সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। খাদ্য সহায়তার পরিবর্তে এককালীন ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হলে তা হয়তো বেশি কার্যকর হতো। ঋণ মওকুফ, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং পর্যাপ্ত সার, বীজ ও কীটনাশক সরবরাহের মাধ্যমে কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া গেলে হয়তো তাদের জীবন ও জীবিকা কিছুটা হলেও রক্ষা পেত। কিন্তু ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, সেখানে দলীয় প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
প্রতিদিন নিয়ম করে সূর্য ওঠে, নিয়ম করে অস্ত যায়; কিন্তু বাংলার গ্রামীণ কৃষক দিন দিন নিয়ম করেই বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। তাদের দেখার যেন কেউ নেই। ফলে বন্যার পানি নেমে যায় ঠিকই কিন্তু কৃষকের অন্তহীন এই দুঃখের ক্ষত দূর হবে কবে?